আজ মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩৭°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৬১%

ডেঙ্গু ও হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের হিমশিম দশা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:16:33 pm, Tuesday, 27 October 2026
  • 9

ডেঙ্গু ও হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের হিমশিম দশা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

চলতি বছরের ১০ অক্টোবর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল ২৯৯ জনের। এর পরদিন অর্থাৎ, ১১ অক্টোবর মৃত্যুর সংখ্যা তিন শতাধিক। এর মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে আরও ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে ক্ষুদ্র একটি মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০০। এদিকে চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুর সংক্রমণে। একই দিন হাম এবং এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েও প্রাণ গেছে সাতজনের। ডেঙ্গু ও হামে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ঝরে গেছে ১৮ তাজা প্রাণ। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি হয়েছে রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং দেশের দক্ষিণ বঙ্গের বিভিন্ন জেলায়।

শুধু মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই যে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেই রোগে এত প্রাণহানী উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। তারা বলছেন, হামের টিকা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে সরকার হাম নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনে দেখা যাচ্ছে না দৃশ্যমান বিশেষ কোনো উদ্যোগ। ফলে প্রাণহানী বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আসন্ন নভেম্বরে ডেঙ্গুর তীব্রতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।

তাদের দাবি, মশাবাহিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ডেঙ্গুতে ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। এ নিয়ে বছরজুড়ে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে।

একই সময়ে হামে আরও সাতজনের মৃত্যুর তথ্য সামনে এসেছে। এতে হাম ও হাম-সংশ্লিষ্ট উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৪০। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর প্রবণতা বেশি। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আক্রান্তের চাপ বাড়ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সংক্রমণের বিস্তার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ডেঙ্গুতে এক দিনে ১১ জনের মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি রোগটির ভয়াবহতা ও প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। বছরের শেষ প্রান্তে এসে মৃত্যুর এমন ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বরের পাশাপাশি তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তক্ষরণ, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে রোগের জটিল পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে।

তবে শুধু হাসপাতালে রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর হিসাব প্রকাশ করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কোথায় সংক্রমণ বাড়ছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, কোথায় মৃত্যুহার বেশি এবং কোন এলাকায় মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা রয়েছে— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে বেশি মৃত্যুর প্রবণতা নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে উল্লেখ করে কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা সবাই জানি এটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা।

যেখানে রয়েছে অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি জমে থাকা, নির্মাণাধীন ভবন, উন্মুক্ত জলাধার এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি। ফলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এডিস মশা প্রজননের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার লার্ভা ধ্বংস, প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এসব কার্যক্রম বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। একই এলাকায় বারবার মশার বিস্তার ঘটলে বোঝা যায়, শুধু কীটনাশক ছিটানো যথেষ্ট নয়, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায়ও জোর দিতে হবে। শুধু দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নয়, দেশে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ কমাতে নগর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়নে নিয়মিত জরিপ, লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপ, ওয়ার্ডভিত্তিক রোগীর তথ্য এবং মৃত্যুর স্থান বিশ্লেষণ জরুরি।

তাই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম ছাড়া জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই জমে থাকা পানি অপসারণ, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম এবং এর উপসর্গে মৃত্যুর খবরও জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।

সর্বশেষ হামে আরও সাতজনের মৃত্যুর তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হাম-সংশ্লিষ্ট উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৪০। এই সংখ্যা সংক্রমণ প্রতিরোধ, টিকাদান কার্যক্রম, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং শিশুদের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সালেহ মাহমুদ তুষার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ।

আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এর পরিচিত লক্ষণ। শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার দুর্বলতা এবং চিকিৎসা পেতে দেরি হলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার মতো জটিলতা গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

তাই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের আওতা বাড়ানো, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কোন এলাকায় টিকাদানের হার কম, কোথায় টিকা থেকে বাদ পড়া শিশু বেশি এবং কোথায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে— এসব তথ্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে, কিন্তু ব্যক্তি সচেতনতা না বাড়ায় এটি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ডেঙ্গু ও হামের মতো দুই ধরনের সংক্রমণ একই সময়ে বাড়লে হাসপাতালগুলোতে রোগী ব্যবস্থাপনার চাপ তৈরি হয়। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যবেক্ষণ, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং জটিলতা অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন। অন্যদিকে হামে আক্রান্ত শিশুদের জ্বর নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি ও পানিশূন্যতা মোকাবিলা এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা দিতে হয়।

এর ব্যাত্যয় ঘটলেই প্রাণহানির মতো করুণ ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অক্সিজেনসহ জরুরি চিকিৎসাসুবিধা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। রোগীর চাপ বাড়ার আগেই কোন হাসপাতালে কত শয্যা প্রস্তুত, কোথায় শিশুদের চিকিৎসাসুবিধা সীমিত এবং কোথায় রোগী স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে— এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।

একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। শুধু মোট আক্রান্ত বা মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ না করে বয়স, লিঙ্গ, জেলা, হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় এবং রোগের জটিলতা অনুযায়ী তথ্য প্রকাশ করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা সহজ হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

আইজিপির ক্রসফায়ার মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক, সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স

ডেঙ্গু ও হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের হিমশিম দশা

Update Time : 10:16:33 pm, Tuesday, 27 October 2026

চলতি বছরের ১০ অক্টোবর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল ২৯৯ জনের। এর পরদিন অর্থাৎ, ১১ অক্টোবর মৃত্যুর সংখ্যা তিন শতাধিক। এর মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে আরও ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে ক্ষুদ্র একটি মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০০। এদিকে চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুর সংক্রমণে। একই দিন হাম এবং এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েও প্রাণ গেছে সাতজনের। ডেঙ্গু ও হামে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ঝরে গেছে ১৮ তাজা প্রাণ। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি হয়েছে রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং দেশের দক্ষিণ বঙ্গের বিভিন্ন জেলায়।

শুধু মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই যে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেই রোগে এত প্রাণহানী উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। তারা বলছেন, হামের টিকা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে সরকার হাম নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনে দেখা যাচ্ছে না দৃশ্যমান বিশেষ কোনো উদ্যোগ। ফলে প্রাণহানী বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আসন্ন নভেম্বরে ডেঙ্গুর তীব্রতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।

তাদের দাবি, মশাবাহিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ডেঙ্গুতে ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। এ নিয়ে বছরজুড়ে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে।

একই সময়ে হামে আরও সাতজনের মৃত্যুর তথ্য সামনে এসেছে। এতে হাম ও হাম-সংশ্লিষ্ট উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৪০। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর প্রবণতা বেশি। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আক্রান্তের চাপ বাড়ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সংক্রমণের বিস্তার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ডেঙ্গুতে এক দিনে ১১ জনের মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি রোগটির ভয়াবহতা ও প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। বছরের শেষ প্রান্তে এসে মৃত্যুর এমন ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বরের পাশাপাশি তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তক্ষরণ, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে রোগের জটিল পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে।

তবে শুধু হাসপাতালে রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর হিসাব প্রকাশ করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কোথায় সংক্রমণ বাড়ছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, কোথায় মৃত্যুহার বেশি এবং কোন এলাকায় মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা রয়েছে— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে বেশি মৃত্যুর প্রবণতা নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে উল্লেখ করে কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা সবাই জানি এটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা।

যেখানে রয়েছে অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি জমে থাকা, নির্মাণাধীন ভবন, উন্মুক্ত জলাধার এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি। ফলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এডিস মশা প্রজননের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার লার্ভা ধ্বংস, প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এসব কার্যক্রম বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। একই এলাকায় বারবার মশার বিস্তার ঘটলে বোঝা যায়, শুধু কীটনাশক ছিটানো যথেষ্ট নয়, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায়ও জোর দিতে হবে। শুধু দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নয়, দেশে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ কমাতে নগর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়নে নিয়মিত জরিপ, লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপ, ওয়ার্ডভিত্তিক রোগীর তথ্য এবং মৃত্যুর স্থান বিশ্লেষণ জরুরি।

তাই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম ছাড়া জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই জমে থাকা পানি অপসারণ, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম এবং এর উপসর্গে মৃত্যুর খবরও জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।

সর্বশেষ হামে আরও সাতজনের মৃত্যুর তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হাম-সংশ্লিষ্ট উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৪০। এই সংখ্যা সংক্রমণ প্রতিরোধ, টিকাদান কার্যক্রম, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং শিশুদের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সালেহ মাহমুদ তুষার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ।

আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এর পরিচিত লক্ষণ। শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার দুর্বলতা এবং চিকিৎসা পেতে দেরি হলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার মতো জটিলতা গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

তাই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের আওতা বাড়ানো, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কোন এলাকায় টিকাদানের হার কম, কোথায় টিকা থেকে বাদ পড়া শিশু বেশি এবং কোথায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে— এসব তথ্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে, কিন্তু ব্যক্তি সচেতনতা না বাড়ায় এটি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ডেঙ্গু ও হামের মতো দুই ধরনের সংক্রমণ একই সময়ে বাড়লে হাসপাতালগুলোতে রোগী ব্যবস্থাপনার চাপ তৈরি হয়। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যবেক্ষণ, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং জটিলতা অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন। অন্যদিকে হামে আক্রান্ত শিশুদের জ্বর নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি ও পানিশূন্যতা মোকাবিলা এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা দিতে হয়।

এর ব্যাত্যয় ঘটলেই প্রাণহানির মতো করুণ ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অক্সিজেনসহ জরুরি চিকিৎসাসুবিধা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। রোগীর চাপ বাড়ার আগেই কোন হাসপাতালে কত শয্যা প্রস্তুত, কোথায় শিশুদের চিকিৎসাসুবিধা সীমিত এবং কোথায় রোগী স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে— এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।

একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। শুধু মোট আক্রান্ত বা মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ না করে বয়স, লিঙ্গ, জেলা, হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় এবং রোগের জটিলতা অনুযায়ী তথ্য প্রকাশ করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা সহজ হবে।