শরতের আকাশে নীল রঙের তোয়ালে যেন পরম মায়ায় মেলে দিয়েছে। চঞ্চল বাতাস এসে যখনই কাশবনে দোলা দিয়ে যায়, সাদা কাশফুলগুলো নুয়ে পড়ে নদীর দিকে। তাদের সেই হেলে পড়া দেখতে দেখতে হঠাৎ বুকের গহীনে মনে হয়—আহা, এই নদী আর কাশবন নিশ্চয়ই কোনো চিরচেনা প্রিয়জনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে!
মধ্যরাতের বাতাসে তখন তানপুরার গুঞ্জন। দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দে কেঁপে উঠছে বাংলার বুক। ধমনিতে জেগে উঠেছে এক শিহরণ—মা আসছেন! কিন্তু এই আগমনের চিরন্তন রহস্য হলো, মহাশক্তি দুর্গা কখনোই একা পদার্পণ করেন না; তিনি কোল ঘেঁষে নিয়ে আসেন জীবন্ত নদীকে। রূপসী বাংলার ভূখণ্ডের শরীরজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য নদী।
আর এই নদীমাতৃক বাংলায় দুর্গাপূজা কেবল কোনো কাঠ-মাটির মণ্ডপে রাখা অবয়ব নয়। তিনি সর্বজীবের আদ্যাশক্তি এবং প্রকৃতিরই অনন্য প্রকাশ। নদীকে বাদ দিয়ে বাংলার শারদীয় দুর্গোৎসবের কথা চিন্তাও করা যায় না। গল্পটা শুরু হয় প্রথমে, মৃৎশিল্পীদের কোনো নিভৃত পল্লীতে। নদীর পাড় থেকে কারিগররা যখন পরম নিষ্ঠায় পলিমাটি তুলে আনেন, তখনই দেবীর প্রথম রূপ উন্মোচিত হয়।
নদীর জল আর পলিমাটির সুবাস ছাড়া প্রতিমার কাঠামোর প্রাণপ্রতিষ্ঠা ঘটে না। নদীই যেন দেবী দুর্গার প্রথম প্রাণের অনুভূতির নাম। তারপর আসে আনন্দঘন মহাসপ্তমী। খুব ভোরে, চরাচরে যখন রূপালি আলোর চাদর জড়িয়ে থাকে, তখন শুরু হয় ‘নবপত্রিকা’ বা কলার বউকে নদীর জলে স্নান করানোর অপূর্ব অনুষ্ঠান। নদীর জল আর মুক্ত বাতাসকে সাক্ষী রেখে প্রকৃতির এই রূপকে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ ও পরিবেশের বন্ধনই নতুন করে উজ্জ্বল হয়।
উৎসবের শেষে আসে অশ্রুসজল বিজয়া দশমী। মা বিদায় নেবেন। কোথায় যাবেন তিনি? ঘুরেফিরে সেই নদীর বুকেই! পলিমাটি থেকে রূপ নেওয়া দেবীকে পুনরায় নদীর জলধারায় সঁপে দেওয়ার এই প্রথা আমাদের সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ায়—যা মাটি থেকে উঠে আসে, তা একদিন মাটিতেই ফিরে যায়। প্রকৃতির দান প্রকৃতিতেই বিলীন হয়ে যাওয়ার এই দৃশ্য আমাদের জীবনের এক নীরব শিক্ষা।
কিন্তু বিপত্তিটা বেঁধেছে এই আধুনিকতার মোহজালে এসে। আমরা কি নদীর সেই আদিম রূপ ও পবিত্রতার ধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছি? উত্তরটা আমাদের সবারই জানা—না, আমরা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। আধুনিকতার বিষাক্ত জালে জড়িয়ে আজ আমরা এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, প্লাস্টিকের স্তূপ আর নির্দয় দখলের কবলে পড়ে আমাদের প্রাণবন্ত নদীগুলো আজ অসহায়, মুমূর্ষু ও বিষাক্ত নালায় পরিণত হয়েছে।
যে ঐতিহ্যে একসময় ছিল কেবল মাটি ও জলের সহাবস্থান, সেখানে আজ থাবা বসিয়েছে প্লাস্টার অব প্যারিস, রাসায়নিক রঙ আর কৃত্রিম সাজসজ্জা। দশমীর বিসর্জনের আড়ালে আমরা নদীর বুকে যে বিষ ঢেলে দিচ্ছি, তা তিলে তিলে ধ্বংস করছে পানি, মাটি, বাতাস ও জলজ প্রাণী। মাটির রূপ ধরে যে নদী দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করল, আমাদের অজ্ঞতায় সেই নদীকেই কি আমরা চিরতরে বিসর্জন দিতে বসেছি?
এই আত্মঘাতী ভুল শুধরে নেওয়ার সময় এখনই। নদী থমকে গেলে কাশবনের সুর থামবে, মৃৎশিল্পীর সৃষ্টি থমকে যাবে, এমনকি দেবীর আগমনী বার্তাও হারিয়ে ফেলবে তার সুর। তাই কৃত্রিমতার বিষাক্ত ফাঁদ ছিন্ন করে প্রকৃতিমুখী হওয়া কোনো উপদেশ নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। নদী বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ। নদী প্রবহমান থাকলেই সার্থক হবে শারদোৎসবের প্রকৃত চেতনা।
নদীকে পরিচ্ছন্ন রেখে মাকে বিদায় জানানোই হোক এই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।





















