সময়ের পরিবর্তনে বদলে গেছে মানুষের সংবাদ পড়ার অভ্যাস। হাতে পত্রিকা নিয়ে স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষা, নতুন ম্যাগাজিন ঘিরে পাঠকের ভিড় কিংবা সকালে পত্রিকা কেনার ব্যস্ততা—সবই এখন অনেকটা অতীত।
ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারে কাগজের পত্রিকার পাঠক কমেছে, কমেছে বিক্রিও। তবু বাবার স্মৃতি ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে টিকে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনের পুরোনো পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের দোকান ‘অবসর রেলওয়ে বুকস্টল’। প্রায় ৭০ বছর ধরে স্টেশন চত্বরে পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও বিভিন্ন ধরনের বই বিক্রি করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
একসময় প্রতিদিন পত্রিকা ও ম্যাগাজিন কিনতে এখানে পাঠকদের ভিড় জমত। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। পাঠক ও ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। তবু ঐতিহ্য ধরে রাখতে বুকস্টলটি চালিয়ে যাচ্ছেন এর বর্তমান কর্ণধার মোয়াজ্জেম হোসেন স্বপন। তার বাবা প্রয়াত একেএম নাজির হোসেন ছিলেন বুকস্টলটির প্রতিষ্ঠাতা। বাবার মৃত্যুর পর ২০০৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পালন করছেন স্বপন।
মোয়াজ্জেম হোসেন স্বপন বলেন, ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে তার বাবা বুকস্টলের ব্যবসা শুরু করেন। সেখানে পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও বই বিক্রি হতো। ছোটবেলায় তারা চার ভাই মাঝেমধ্যে বাবার সঙ্গে দোকানে বসতেন। ১৯৯০-৯১ সালের দিকে তিনিও নিয়মিত বাবার সঙ্গে দোকানে বসতে শুরু করেন। সেখান থেকেই বই ও পত্রিকার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে বুকস্টলের ব্যবসার প্রতি মায়া জন্মে যায়।
তিনি বলেন, ২০০৭ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন। আগের মতো বেচাকেনা না থাকলেও বাবার স্মৃতি ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এখনো বুকস্টলটি চালিয়ে যাচ্ছেন। একসময় দিনে বিক্রি হতো এক হাজার কপি পত্রিকা নব্বইয়ের দশকে অবসর বুকস্টলে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কপি পত্রিকা বিক্রি হতো বলে জানান স্বপন। সে সময় তরুণ-যুবক, কলেজশিক্ষার্থী ও ট্রেনযাত্রীরা নিয়মিত পত্রিকা কিনতেন।
গল্প-উপন্যাসের বই এবং বিভিন্ন সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনেরও ভালো চাহিদা ছিল। স্বপন বলেন, সকালে ঢাকা থেকে পত্রিকা এসে পৌঁছানোর পর দোকানে পাঠকদের ভিড় লেগে যেত। পত্রিকা পাঠকের হাতে তুলে দিতে পারলে আনন্দ লাগত। কয়েকজন হকারও পত্রিকা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করতেন। তিনি আরও বলেন, নব্বইয়ের দশকে আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে তাদের বুকস্টলের পাশাপাশি আরও দুটি পত্রিকার দোকান গড়ে উঠেছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাঠক ও ক্রেতা কমতে থাকায় ওই দুটি দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। হকাররাও অন্য পেশায় চলে গেছেন। এখন কোনো রকমে টিকে আছে অবসর বুকস্টল। বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে স্বপন বলেন, আগে তরুণ-যুবক ও কলেজশিক্ষার্থীরা পত্রিকা-ম্যাগাজিন কিনে পড়তেন। এর মাধ্যমে তারা দেশ-বিদেশের খবর জানার পাশাপাশি জ্ঞান অর্জন করতেন। ট্রেনযাত্রীরাও যাত্রাপথে পড়ার জন্য পত্রিকা কিনতেন।
এখন মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে কাগজের পত্রিকার পাঠক অনেক কমে গেছে। আগের মতো বিক্রিও নেই। বুকস্টল ঘিরে জড়িয়ে আছে স্মৃতি ও আবেগ আখাউড়া মসজিদপাড়ার বাসিন্দা ও ব্যাংকার নূরে আলম চৌধুরী বলেন, অবসর বুকস্টল শুধু একটি বইয়ের দোকান নয়, এ অঞ্চলের মানুষের আবেগের জায়গা। তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে ট্রেনে কোথাও যাওয়ার সময় স্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতেন।
তখন বুকস্টলে পত্রিকা পড়তেন। এখনো দোকানটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবসায়ী দিলিপ ঘোষ বাপ্পি বলেন, পত্রিকা পড়ে দেশ-বিদেশের খবর জানা যায় এবং জ্ঞান অর্জন করা যায়। দীর্ঘদিন ধরে বুকস্টলটি পত্রিকা ও ম্যাগাজিন বিক্রি করে আসছে। বর্তমানে পাঠক কমে যাওয়ায় ব্যবসার অবস্থাও খারাপ।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে বুকস্টলের কর্ণধার স্বপন এখনো ব্যবসাটি চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকুক—এটাই তার প্রত্যাশা। সময়ের সঙ্গে পাঠাভ্যাস বদলেছে, কাগজের পত্রিকার বাজারও সংকুচিত হয়েছে। তারপরও আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে অবসর বুকস্টল যেন পুরোনো দিনের পাঠসংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক। বাবার স্মৃতি, পাঠকের ভালোবাসা আর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে সঙ্গী করেই প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।





















