আজ একটু ঘাসফুলের জগৎ থেকে ঘুরে আসবে নাকি? চলো তবে এক মজার গল্প শোনা যাক- গল্পটি নদীর ধারের একটি সুন্দর দ্বীপের। দ্বীপটির নাম ছিল পিঁপড়া দ্বীপ। সেখানে ছিল হাজার হাজার পরিশ্রমী পিঁপড়ার এক বিশাল কলোনি।
তাদের কাজ ছিল সারাদিন খাবার জোগাড় করা। কিন্তু মুশকিলটা ছিল এই যে, প্রতি বছর গ্রীষ্মকাল এলেই একদল নিষ্ঠুর ফড়িং সেখানে চড়াও হতো। এই ফড়িংদলের সর্দার ছিল হপার নামের এক চতুর ফড়িং। প্রতি গ্রীষ্মে হপার এসে পিঁপড়াদের কষ্টার্জিত সব খাবার জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যেত। পিঁপড়ারা ফড়িংদের এতই ভয় পেত যে তারা নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য মুখ বুজে এই অন্যায় সহ্য করত।
এমনকি তারা হপারের জন্য খাবার সংগ্রহ করে রাখত। সেই কলোনিতেই বাস করত ফ্লিক নামের একটি বুদ্ধিমান অথচ একটু আনাড়ি পিঁপড়া। ফ্লিক সবসময় নতুন নতুন যন্ত্র বানিয়ে পিঁপড়াদের কাজ সহজ করতে চাইত। কিন্তু প্রায়ই তার কোনো না কোনো কা- উল্টো গোলমাল পাকিয়ে ফেলত। ফলে অন্য পিঁপড়ারা ফ্লিকের ওপর খুব বিরক্ত হয়ে তাকে এড়িয়ে চলত। এভাবেই চলতে চলতে একদিন ফ্লিক তার নিজের বানানো একটি শস্য কাটার যন্ত্র দিয়ে কাজ করার সময় ভুলবশত হপারের জন্য জমানো খাবারের স্তূপ পাশের নদীতে ফেলে দেয়!
আর ঠিক তখনই হপার তার দলবল নিয়ে দ্বীপে হাজির হয়। তার জন্য জমানো খাবার গায়েব দেখে সে ভীষণ রেগে যায় এবং পিঁপড়াদের রাজকুমারী অ্যাটা ও বৃদ্ধা রানিকে হুমকি দিয়ে বলে, পরেরবার আসার আগে তাদের দ্বিগুণ খাবার জমিয়ে রাখতে হবে, নয়তো পুরো কলোনি ধ্বংস করে দেওয়া হবে। সব পিঁপড়া তখন মহা চিন্তায় পড়ে যায়। তবে হপারের ভয়াবহ হুমকির মুখে সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচতে ফ্লিক একটি অদ্ভুত বুদ্ধি বের করে।
সে কলোনির সবাইকে বলে যে, ফড়িংদের সঙ্গে লড়ার জন্য তাদের শহর থেকে শক্তিশালী কিছু যোদ্ধা পোকা ডেকে আনা উচিত। এই ফাঁকে রাজকুমারী অ্যাটা ভাবল ফ্লিকের জন্য নানা বিপদ তৈরি হয়, তাই তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর হয় না, তাই সে সানন্দে ফ্লিককে যোদ্ধা পোকা খুঁজতে পাঠিয়ে দেয়। যোদ্ধা পোকা খুঁজতে শহরে পৌঁছে ফ্লিক একটি ময়লার স্তূপের পাশের পানশালায় গিয়ে হাজির হয়।
সেখানে সে একদল পোকাকে মারামারি করতে দেখে ভুলবশত তাদেরই যোদ্ধা পোকা ভেবে বসে! আসলে তারা কোনো যোদ্ধা ছিল না, তারা ছিল সার্কাস থেকে চাকরি হারিয়ে আসা একদল বেকার ও হতাশ পোকা। আর সার্কাসের পোকারাও ফ্লিককে কোনো বড় থিয়েটারের ম্যানেজার ভেবে তাদের কাজের কন্টাক্ট দিতে এসেছে মনে করে আনন্দে তার সঙ্গে অ্যান্ট আইল্যান্ডে যেতে রাজি হয়ে যায়।
সার্কাস পোকাদের সঙ্গে নিয়ে ফ্লিক যখন দ্বীপে ফিরে এলো, তখন পুরো কলোনি তাদের রাজকীয় সংবর্ধনা দিল। কিন্তু কিছুদিন পর আসল সত্য প্রকাশ পেয়ে গেল যে এরা কেউ যোদ্ধা নয়, স্রেফ সার্কাসের খ্যাপাটে শিল্পী! এটা দেখে কলোনির সবাই যখন ভেঙে পড়ল, তখন ছোট্ট রাজকুমারী ডটকে বাঁচানোর জন্য সার্কাস পোকারা তাদের জাদুকরী কসরত দেখিয়ে সবার হিরো বনে গেল।
ফ্লিক তখন বুদ্ধি দিল যে, ফড়িংরা পাখিদের ভীষণ ভয় পায়, তাই তারা সবাই মিলে খড় ও পাতা দিয়ে একটা বিশাল নকল পাখি বানাবে। ফড়িংরা যখন খাবার নিতে আসবে, তখন সেই নকল পাখি উড়িয়ে তাদের চিরতরে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। সবাই মিলে মনের আনন্দে সেই বিশাল কৃত্রিম পাখিটা বানিয়ে ফেলল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সার্কাসের লোভী মালিক পি.টি. ফ্লি তার পোকাদের খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এসে হাজির হলো এবং সবার সামনে ফাস করে দিল যে এরা আদতে কোনো যোদ্ধা নয়, নিছকই সার্কাস পোকা!
রাগে ও ক্ষোভে রাজকুমারী অ্যাটা ফ্লিককে কলোনি থেকে চিরতরে তাড়িয়ে দিল। অসহায় পিঁপড়ারা ভয়ে ভয়ে হপারের জন্য অল্প কিছু খাবার জোগাড় করে রাখল। কিন্তু সামান্য খাবার দেখে হপার ক্ষেপে গিয়ে পুরো দ্বীপ দখল করে নিল এবং রানির ওপর অত্যাচার করতে গেল। গোপন সূত্রে এই খবর জানতে পেরে ছোট ডট ছুটে গিয়ে কলোনি ছেড়ে চলে যাওয়া ফ্লিককে সব খুলে বলল।
ফ্লিক তার হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল এবং সার্কাস পোকাদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত দ্বীপে ফিরে এল। দ্বীপে এসে সার্কাস পোকারা নানারকম মজার কৌতুক করে ফড়িংদের মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল, আর ফ্লিক ও ডট মিলে সেই বিশাল নকল পাখিটা আকাশে উড়িয়ে দিল! নকল পাখি দেখে ফড়িংরা তো ভয়ে আধমরা হয়ে পালানোর পথ খুঁজছিল, কিন্তু হঠাৎ সার্কাসের মালিক পি.টি. ফ্লি আসল পাখি ভেবে সেই নকল পাখিটায় আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিল!
প্রতারণা ধরা পড়ে যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হপার ফ্লিককে ধরে দারুণ মারধর করল। রক্তে ভেসে যাওয়া ফ্লিক মাটিতে পড়ে থাকলেও সে সাহস হারাল না। সে কলোনির সব পিঁপড়াদের উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলল, পিঁপড়ারা ফড়িংদের সেবা করার জন্য জন্মায়নি! তোমরাই আমাদের ওপর নির্ভর করো। আমরা যদি সবাই এক হই, তবে তোমরাই ধুলোয় মিশে যাবে! ফ্লিকের এই কথার জাদুতে হাজার হাজার পিঁপড়ার বুক থেকে ভয় চিরতরে উধাও হয়ে গেল।
তারা সবাই একজোট হয়ে ফড়িংদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাদের ধাওয়া করে তাড়িয়ে দিল। কেবল হপার ও তার ভাই আটকা পড়ে রইল। ঠিক তখনই আকাশে প্রকা- মেঘ ডেকে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটার মাঝে হপার সুযোগ বুঝে ফ্লিককে ধরে আকাশে উড়ে পালিয়ে গেল। রাজকুমারী অ্যাটা আকাশে উড়ে গিয়ে ফ্লিককে বাঁচাল এবং ফ্লিক চতুরতার সঙ্গে হপারকে একটি আসল পাখির বাসার সামনে নিয়ে গেল।
হপার সেটিকেও নকল ভেবে বিদ্রƒপ করতে লাগল, আর তখনই গাছের কোটর থেকে একটা আস্ত প্রকা- পাখি বেরিয়ে এসে হপারকে তার ছানাদের খাওয়ার জন্য গিলে ফেলল! এভাবেই অত্যাচারী হপারের পতন হলো। ফড়িংদের হাত থেকে চিরতরে মুক্ত হয়ে পিঁপড়া দ্বীপে আবার সুখের দিন ফিরে এলো। ফ্লিকের নতুন নতুন যন্ত্রে কাজ সহজ হয়ে গেল, রাজকুমারী অ্যাটা নতুন রানি হলো এবং ফ্লিক ও অ্যাটা মিলে এক সুন্দর জীবনের সূচনা করল।
সার্কাসের বন্ধুরা বিদায় নেওয়ার সময় সবাই চোখের জলে তাদের বিদায় জানাল। চমৎকার এই গল্পটি ১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া এনিমেশন সিনেমা ‘আ বাগস লাইফ’-এর। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন বিখ্যাত পিক্সার স্টুডিওর জন ল্যাসেটার ও অ্যান্ড্রু স্ট্যান্টন। ঈশপের বিখ্যাত পিঁপড়া ও ফড়িং নীতিগল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছবিটি বানানো হয়েছিল। ১২০ মিলিয়ন ডলার বাজেটে তৈরি এই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬৩ মিলিয়ন ডলার আয় করে বক্স অফিসে দারুণ ইতিহাস গড়েছিল।
এই গল্পটিতে খুব সুন্দর একটি শিক্ষা লুকিয়ে আছে। একা একটি পিঁপড়া যত ছোট বা দুর্বলই হোক না কেন, সবাই যদি একজোট হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে, তবে পৃথিবীর যেকোনো বড় শক্তি বা অত্যাচারীকেও পরাজিত করা সম্ভব। একতা, সাহস আর নিজের বুদ্ধির ওপর ভরসা রাখলেই যে জীবনের যেকোনো বাধা জয় করা যায়, ফ্লিকের এই গল্প আমাদের সেটাই শিখিয়ে দেয়।





















