আজ মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৭°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২%

চলে গেলেন ষাটের দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা নাসিমা খান

  • MIT ERP
  • Update Time : 05:31:22 am, Tuesday, 13 October 2026
  • 14

চলে গেলেন ষাটের দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা নাসিমা খান

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি বুকে নিয়েই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন ষাটের দশকের জনপ্রিয় রুপালি পর্দার তারকা নাসিমা খান। ঢাকার চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের যে কজন অভিনয়শিল্পী নিজেদের মেধা ও নান্দনিক সৌন্দর্য দিয়ে রুপালি পর্দা মাতিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়।

১৯৪৪ সালে ঢাকার লালবাগে জন্ম নেওয়া নাসিমা খানের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটেছিল ১৯৫৯ সালে প্রখ্যাত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্রটিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নাসিমা খানের। সিনেমাটি ১৯৫৯ সালের মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপদক অর্জন করে।

তবে নায়িকা হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিতি ও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ষাটের দশক থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত বাংলা ও উর্দুÑউভয় ভাষার চলচ্চিত্রেই তিনি দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। সাবলীল অভিনয়, চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে তৎকালীন চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বহু ব্যবসা সফল ও প্রশংসিত সিনেমা উপহার দিয়েছেন এই গুণী শিল্পী। বড় পর্দায় তাকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ ও ‘মাটির পিঞ্জিরা’ চলচ্চিত্রে। নাসিমা খানের শেষ জীবনটা কেটেছে ভীষণ একাকিত্ব ও এক নীরব যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি এক গভীর মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন।

তার একমাত্র ছেলে অনেক বছর ধরে নিখোঁজ। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি কেবল অপেক্ষা করে গেছেন তার নাড়িছেঁড়া ধন, সেই প্রিয় সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার এই অপূর্ণ আকুতি নিয়েই গত রোববার রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ষাটের দশকে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন তিনি।

নাসিমা খানের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ ও ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’। এসব সিনেসাতে বিভিন্ন সময়ে আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, রহমান, গোলাম মুস্তাফা, আজিমসহ অনেক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

শুধু ঢাকার চলচ্চিত্রেই নয়, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরের চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন নাসিমা খান। পাকিস্তানের চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার পাকিস্তান ফিল্ম ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, তার অভিনীত লাহোরে নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নয়ি লায়লা নয়া মজনু’ (১৯৬৯), ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ (১৯৬৯), ‘আঁসু বন গয়ে মোতি’ (১৯৭০) ও ‘রোড টু সোয়াত’ (১৯৭১)।

এর মধ্যে ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর একসময় চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান নাসিমা খান। পরে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আবার পর্দায় ফেরেন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেছেন তিনি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা সময়ে পর্দায় ফিরলেও জীবনের শেষ ভাগে অভিনয়ে অনেকটাই অনিয়মিত হয়ে পড়েন এই অভিনেত্রী।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি ইতিহাসের পাতায় নাসিমা খানের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার এই চলে যাওয়া ঢালিউডের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

চলে গেলেন ষাটের দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা নাসিমা খান

Update Time : 05:31:22 am, Tuesday, 13 October 2026

নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি বুকে নিয়েই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন ষাটের দশকের জনপ্রিয় রুপালি পর্দার তারকা নাসিমা খান। ঢাকার চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের যে কজন অভিনয়শিল্পী নিজেদের মেধা ও নান্দনিক সৌন্দর্য দিয়ে রুপালি পর্দা মাতিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়।

১৯৪৪ সালে ঢাকার লালবাগে জন্ম নেওয়া নাসিমা খানের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটেছিল ১৯৫৯ সালে প্রখ্যাত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্রটিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নাসিমা খানের। সিনেমাটি ১৯৫৯ সালের মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপদক অর্জন করে।

তবে নায়িকা হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিতি ও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ষাটের দশক থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত বাংলা ও উর্দুÑউভয় ভাষার চলচ্চিত্রেই তিনি দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। সাবলীল অভিনয়, চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে তৎকালীন চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বহু ব্যবসা সফল ও প্রশংসিত সিনেমা উপহার দিয়েছেন এই গুণী শিল্পী। বড় পর্দায় তাকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ ও ‘মাটির পিঞ্জিরা’ চলচ্চিত্রে। নাসিমা খানের শেষ জীবনটা কেটেছে ভীষণ একাকিত্ব ও এক নীরব যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি এক গভীর মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন।

তার একমাত্র ছেলে অনেক বছর ধরে নিখোঁজ। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি কেবল অপেক্ষা করে গেছেন তার নাড়িছেঁড়া ধন, সেই প্রিয় সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার এই অপূর্ণ আকুতি নিয়েই গত রোববার রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ষাটের দশকে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন তিনি।

নাসিমা খানের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ ও ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’। এসব সিনেসাতে বিভিন্ন সময়ে আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, রহমান, গোলাম মুস্তাফা, আজিমসহ অনেক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

শুধু ঢাকার চলচ্চিত্রেই নয়, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরের চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন নাসিমা খান। পাকিস্তানের চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার পাকিস্তান ফিল্ম ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, তার অভিনীত লাহোরে নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নয়ি লায়লা নয়া মজনু’ (১৯৬৯), ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ (১৯৬৯), ‘আঁসু বন গয়ে মোতি’ (১৯৭০) ও ‘রোড টু সোয়াত’ (১৯৭১)।

এর মধ্যে ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর একসময় চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান নাসিমা খান। পরে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আবার পর্দায় ফেরেন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেছেন তিনি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা সময়ে পর্দায় ফিরলেও জীবনের শেষ ভাগে অভিনয়ে অনেকটাই অনিয়মিত হয়ে পড়েন এই অভিনেত্রী।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি ইতিহাসের পাতায় নাসিমা খানের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার এই চলে যাওয়া ঢালিউডের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।