আজ সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৬%

স্কুলছাত্রী তাজমিনের ভুল সময়ে বাসে ওঠার কারণ

  • MIT ERP
  • Update Time : 05:27:07 pm, Monday, 12 October 2026
  • 14

স্কুলছাত্রী তাজমিনের ভুল সময়ে বাসে ওঠার কারণ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় বাসে ফিরতে সাধারণত সময় লাগে ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা। কুমিল্লার যাত্রীরা রাত ১০ থেকে ১২টার মধ্যে নাইট কোচে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়। এতে রাতের ফাঁকা রাস্তায় পৌঁছতে সময়ও কম লাগে এবং ভোরের আলোয় কুমিল্লা এসে পৌঁছায়।

কিন্তু কুমিল্লার স্কুল শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) কেন দুপুর ১২টার দিকে বাস উঠেছিলেন? – এই প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের মনে। কক্সবাজার আইকনিক বাসের টিকিট কাউন্টারের আবদুল্লাহ বলেন, ‘ওদের (তাজমিন ও রাজুর) বোঝা উচিত ছিল যে আমি দিনে যাচ্ছি (রওনা হচ্ছি)। একটা মেয়ে রাতে ওইখানে (কুমিল্লায়) পৌঁছবে। ওরও (তাজমিন) বোঝা উচিত ছিল।

আমি বলতে চাইছিলাম ওদের, কিন্তু কাস্টমারের চয়েজ থাকতে পারে’- তাই বলা হয়নি। ’ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) তারা যখন টিকিট কাটতে যান তখন রাত আনুমানিক ৮-৯টা। পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার টিকিট কাটেন। বাস ছাড়ে দুপুর একটার দিকে। একা একজন মেয়ে তাই সিংগেল টিকিট কেটে দেয় প্রেমিকা রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরী (২০)। একা একজন মেয়ে তাই সিংগেল সিট, এ বিষয়টা গুরুত্ব পেলেও দুপুরে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় রওনা দিলে মধ্য রাতে পৌঁছে শহরের বাসায় যাওয়া একজন মেয়ের জন্য কতটা নিরাপদ তা গুরুত্ব পেল না কেন, এ প্রশ্নই সবার মনে।

এর সহজ উত্তর মেলেনি। তবে রাজুর দাবি, কক্সবাজারে অবস্থানকালে তাজমিনের বাবা তাকে বহুবার ফোন করে তার অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন। তাজমিনকে বাড়ি ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাজমিনকে বাবার কাছে বলতে শুনেছিলেন যে সে শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। তারপর ওই রাত মঙ্গলবার ৬ অক্টোবরই তারা আইকনিক এক্সপ্রেস বাসের টিকিট কাটতে যান। পরের দিন বুধবারের টিকিট কাটেন ও রওনা দেন।

তাজমিনকে নিরাপদে কুমিল্লা বাসায় পৌঁছতে তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল তার। তারপরও ঘটে যায় ওই হত্যার মতো নৃশংসতা। রাজু আরও বলেন, হাতঘড়ি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তাজমিন রাজুকে বলেছিলেন যে ওই নারী তার সৎ মা এবং তার আপন মা মারা গেছেন। এরপর তিনি বান্ধবীর বাসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে যান।

সেখান থেকে কুমিল্লা ফিরে কক্সবাজার রওনা হন। ব্রাক্ষণবাড়িয়া থেকেই রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু তাজমিনের। এরপর মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর সকালে কক্সবাজার গিয়ে পৌঁছে। পরিবারের দাবি, ৪ অক্টোবর ঘটনার চারদিন আগে তাজমিন বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর থেকে সে নিজের ইচ্ছায় চলা শুরু করে। অবশ্য এ সময়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে মোবাইলে তার যোগাযোগ ছিল। তবে সে কোথায়, কার কাছে ছিল, তা তারা সঠিক ভাবে জানতে পারেনি।

তদন্ত কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের পরপরই তার আইফোন ট্র্যাক ব্রাক্ষণবাড়িয়া ও কক্সবাজার যাওয়ার সত্যতা খুঁজে পান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, তাজমিনের বাবা-মা তাকে মোবাইলে বাসায় ফিড়তে তাড়া, কার কাছে কোথায় আছে, জানালে তারা গিয়ে আনবে- এমন চিন্তায় তোড়জোরে তাজমিন বাসায় ফিরতে রাজি হয়। রাত-দিনের নিরাপত্তার বিষয়টি তাদেরকে ভাবায়নি।

পুলিশ জানায়, ঘটনা জানতে আটক রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। তথ্য যাচাই-বাছাই করতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা থেকে কক্সবাজার গেছেন। হয়তো জিজ্ঞাসাবাদে এসবের উত্তর মিলবে। এদিকে ঘটনার পর তাজনিমের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে।

মা বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিল। কেয়া খাতুন মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও সে কিছু জানায়নি। তিনি আরও জানান, মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন।

জানতে চাইতেন তার চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে। কিন্তু এত সতর্কতার পরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি। এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যে বান্ধবীকে দুষছেন তাজমিনের মা তিনি তার চেয়ে বয়সে বড়। কুমিল্লাতেই থাকেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা এখনো মেলেনি। যেমন মেলেনি প্রেমিকা রাজুর।

পুলিশ বলেছে, ঘাতক একজনই, সিএনজি অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া(৩৫)। শনিবার রাতে সে আদালতে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। হত্যারহস্য উদঘাটন হয়ে গেছে। তবে তদন্ত অব্যাহত আছে। সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান মনে করেন, রাজুর সঙ্গে তার সম্পর্ক না হলে তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না। এতে মৃত্যুর মতো বিপদ থেকে হয়তো সে বেঁচে যেত।

পুলিশ জানায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজারের বাস থেকে নেমে কুমিল্লা শহরের রেইসকোর্স বাসায় যেতে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করেন শিক্ষার্থী জান্নাতুন তাজমিন। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন দুই মার্কিন শিক্ষাবিদ রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ড

স্কুলছাত্রী তাজমিনের ভুল সময়ে বাসে ওঠার কারণ

Update Time : 05:27:07 pm, Monday, 12 October 2026

কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় বাসে ফিরতে সাধারণত সময় লাগে ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা। কুমিল্লার যাত্রীরা রাত ১০ থেকে ১২টার মধ্যে নাইট কোচে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়। এতে রাতের ফাঁকা রাস্তায় পৌঁছতে সময়ও কম লাগে এবং ভোরের আলোয় কুমিল্লা এসে পৌঁছায়।

কিন্তু কুমিল্লার স্কুল শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) কেন দুপুর ১২টার দিকে বাস উঠেছিলেন? – এই প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের মনে। কক্সবাজার আইকনিক বাসের টিকিট কাউন্টারের আবদুল্লাহ বলেন, ‘ওদের (তাজমিন ও রাজুর) বোঝা উচিত ছিল যে আমি দিনে যাচ্ছি (রওনা হচ্ছি)। একটা মেয়ে রাতে ওইখানে (কুমিল্লায়) পৌঁছবে। ওরও (তাজমিন) বোঝা উচিত ছিল।

আমি বলতে চাইছিলাম ওদের, কিন্তু কাস্টমারের চয়েজ থাকতে পারে’- তাই বলা হয়নি। ’ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) তারা যখন টিকিট কাটতে যান তখন রাত আনুমানিক ৮-৯টা। পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার টিকিট কাটেন। বাস ছাড়ে দুপুর একটার দিকে। একা একজন মেয়ে তাই সিংগেল টিকিট কেটে দেয় প্রেমিকা রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরী (২০)। একা একজন মেয়ে তাই সিংগেল সিট, এ বিষয়টা গুরুত্ব পেলেও দুপুরে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় রওনা দিলে মধ্য রাতে পৌঁছে শহরের বাসায় যাওয়া একজন মেয়ের জন্য কতটা নিরাপদ তা গুরুত্ব পেল না কেন, এ প্রশ্নই সবার মনে।

এর সহজ উত্তর মেলেনি। তবে রাজুর দাবি, কক্সবাজারে অবস্থানকালে তাজমিনের বাবা তাকে বহুবার ফোন করে তার অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন। তাজমিনকে বাড়ি ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাজমিনকে বাবার কাছে বলতে শুনেছিলেন যে সে শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। তারপর ওই রাত মঙ্গলবার ৬ অক্টোবরই তারা আইকনিক এক্সপ্রেস বাসের টিকিট কাটতে যান। পরের দিন বুধবারের টিকিট কাটেন ও রওনা দেন।

তাজমিনকে নিরাপদে কুমিল্লা বাসায় পৌঁছতে তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল তার। তারপরও ঘটে যায় ওই হত্যার মতো নৃশংসতা। রাজু আরও বলেন, হাতঘড়ি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তাজমিন রাজুকে বলেছিলেন যে ওই নারী তার সৎ মা এবং তার আপন মা মারা গেছেন। এরপর তিনি বান্ধবীর বাসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে যান।

সেখান থেকে কুমিল্লা ফিরে কক্সবাজার রওনা হন। ব্রাক্ষণবাড়িয়া থেকেই রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু তাজমিনের। এরপর মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর সকালে কক্সবাজার গিয়ে পৌঁছে। পরিবারের দাবি, ৪ অক্টোবর ঘটনার চারদিন আগে তাজমিন বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর থেকে সে নিজের ইচ্ছায় চলা শুরু করে। অবশ্য এ সময়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে মোবাইলে তার যোগাযোগ ছিল। তবে সে কোথায়, কার কাছে ছিল, তা তারা সঠিক ভাবে জানতে পারেনি।

তদন্ত কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের পরপরই তার আইফোন ট্র্যাক ব্রাক্ষণবাড়িয়া ও কক্সবাজার যাওয়ার সত্যতা খুঁজে পান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, তাজমিনের বাবা-মা তাকে মোবাইলে বাসায় ফিড়তে তাড়া, কার কাছে কোথায় আছে, জানালে তারা গিয়ে আনবে- এমন চিন্তায় তোড়জোরে তাজমিন বাসায় ফিরতে রাজি হয়। রাত-দিনের নিরাপত্তার বিষয়টি তাদেরকে ভাবায়নি।

পুলিশ জানায়, ঘটনা জানতে আটক রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। তথ্য যাচাই-বাছাই করতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা থেকে কক্সবাজার গেছেন। হয়তো জিজ্ঞাসাবাদে এসবের উত্তর মিলবে। এদিকে ঘটনার পর তাজনিমের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে।

মা বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিল। কেয়া খাতুন মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও সে কিছু জানায়নি। তিনি আরও জানান, মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন।

জানতে চাইতেন তার চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে। কিন্তু এত সতর্কতার পরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি। এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যে বান্ধবীকে দুষছেন তাজমিনের মা তিনি তার চেয়ে বয়সে বড়। কুমিল্লাতেই থাকেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা এখনো মেলেনি। যেমন মেলেনি প্রেমিকা রাজুর।

পুলিশ বলেছে, ঘাতক একজনই, সিএনজি অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া(৩৫)। শনিবার রাতে সে আদালতে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। হত্যারহস্য উদঘাটন হয়ে গেছে। তবে তদন্ত অব্যাহত আছে। সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান মনে করেন, রাজুর সঙ্গে তার সম্পর্ক না হলে তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না। এতে মৃত্যুর মতো বিপদ থেকে হয়তো সে বেঁচে যেত।

পুলিশ জানায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজারের বাস থেকে নেমে কুমিল্লা শহরের রেইসকোর্স বাসায় যেতে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করেন শিক্ষার্থী জান্নাতুন তাজমিন। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।