আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
২৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৪°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৮১%

এখনো অনিশ্চয়তায় বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধানের ভবিষ্যৎ

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:30:51 pm, Saturday, 10 October 2026
  • 15
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর এক দশক পরও ব্যর্থতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ। এর আগে চারটি বিদেশি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও তিনটি বঙ্গোপসাগর ছেড়ে গেছে বহু আগেই।

২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নতুন করে উৎপাদনের অংশীদার চুক্তি (পিএসসি) অনুমোদন হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে। পরের বছর অর্থাৎ, ২০২৩ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের এক্সন মোবিল, শেভরনসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বাঘা বাঘা ১৭টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনেছিল। কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের কারণে এই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার আবারও দরপত্র আহ্বান করে।

কিন্তু তখন একটি কোম্পানিও দরপত্র কেনা বা জমা দেয়নি। বরং পিএসসিতে কিছু সংশোধনীর কথা জানায় কোম্পানিগুলো। বর্তমানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পিএসসি সংশোধন করে আবারও দরপত্র আহ্বান করে। আগামী ৩০ নভেম্বর শেষ হচ্ছে দরপত্র জমাদানের তারিখ। কিন্তু তুরস্কের একটি কোম্পানি ছাড়া আর কোনো কোম্পানি এখন পর্যন্ত দরপত্র কেনেনি।

তারাও শেষ পর্যন্ত আবেদন জমা দেবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে আর কোনো কোম্পানির দরপত্র কেনার সম্ভাবনাও দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। ফলে আবারও শঙ্কায় পড়েছে সমুদ্রে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা। গ্যাস ও খনিজ প্রাপ্তির সম্ভাবনা বিবেচনায় দেশের স্থলভাগকে ২২টি এবং সমুদ্রভাগকে ২৬টি ব্লকে ভাগ করে পেট্রোবাংলা। এই ২৬টির মধ্যে ১১টি ব্লক অগভীর সমুদ্রে অবস্থিত।

বাকি ১৫টি গভীর সমুদ্রে। এখন পর্যন্ত শুধু অগভীর অংশের দুটি ব্লকে (এসএস-০৪ এবং এসএস-০৯) অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেড ও অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড। যদিও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পিএসসির শর্ত সংশোধন এবং বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ— সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও কোনো আবেদন জমা না পড়ার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নভেম্বরের ৩০ তারিখ দরপত্র জমার শেষ সময় নির্ধারিত থাকলে অক্টোবরের শেষে এসে হাতে থাকবে প্রায় এক মাস। এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব জমা দেওয়ানোই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ, সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ মাত্র। প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ, চুক্তি স্বাক্ষর এবং অনুসন্ধান কূপ খননের ওপর। তারা বলছে, বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে।

সমুদ্রের সম্ভাবনাময় ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান শুরু করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বড় সুযোগ পিছিয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা। দেশে বিদ্যমান গ্যাস সংকট দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে তেল, গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এ জন্য উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর জন্য আকর্ষণীয় নয় বলে দাবি করছিল সরকারগুলোর বিভিন্ন অংশ।

সেই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পিএসসি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বরে গঠিত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (ইএমআরডি) এ-সংক্রান্ত একটি দাপ্তরিক আদেশ জারি করে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসীনকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

পর্যালোচনা শেষে গত ১৫ জানুয়ারি এটি মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু এর পরপরই জাতীয় নির্বাচনে রাজনীতিতে পরিবর্তন আসে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই দেশের অভ্যন্তরীণ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেয়। চলতি বছরের মার্চে এ লক্ষ্যে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়। এই পরিকল্পনায় গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি কমানোর লক্ষ্যে স্থলভাগ ও সাগরের ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানোর জোর তৎপরতার কথা বলা হয়।

কিন্তু প্রায় সাত মাস পার হলেও সাগরে দরপত্র গ্রহণ প্রক্রিয়া ছাড়া তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আর কোনো লক্ষণীয় অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু এবং টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দেশীয় কূপগুলো খননের অপরিহার্যতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। তাই অভ্যন্তরীণ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ তাদের।

এ বিষয়ে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে জানিয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকার দায়িত্ব নিয়েই গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লকের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আগ্রহী কোম্পানিগুলো দরপত্র জমা দিতে পারবে। আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি।

শেষ পর্যন্ত কী হয় দেখা যাক। বর্তমান স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দরপত্র না কেনার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য দেশে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র বা ডাটা প্রায় বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান সরকার দরপত্রের মূল্যই ধরেছে ৭ হাজার ডলার, যার কারণে তুর্কির (তুরস্ক) রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টার্কিশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (টিপিএও) ছাড়া আর কোনো কোম্পানি এখনো দরপত্র কেনেনি বা জমা দেয়নি।

যদিও টার্কিশ এই কোম্পানির দরপত্র কেনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা; কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দরপত্র নিয়ে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন রোড শো করার কথা থাকলেও তা না করায় অন্য কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে মত তাদের। শুধু তাই নয়, এখানে দরপত্রের দামও একটা বড় বিষয় বলে মনে করছেন তারা। পেট্রোবাংলার প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ মে ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড’ চালু করা হয়।

এতে বঙ্গোপসাগরের ১১টি অগভীর সমুদ্রে এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রের ব্লক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দরপত্র জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১টা। অর্থাৎ, গতকাল শনিবারের হিসাবে হাতে রয়েছে প্রায় সাত সপ্তাহ। এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো কোম্পানির দরপত্র না কেনা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা যত দূর জানতে পেরেছিলাম, জুনে পাঁচটি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান সমুদ্রাঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক তথ্যের প্যাকেজ কিনেছিল।

কিন্তু তখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রের নথি কেনেনি। তথ্য কেনা মানে কোনো ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া নয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রাথমিক আগ্রহ থাকলেও তা দরপত্রে অংশগ্রহণে রূপ নিচ্ছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। তিনি বলেন, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগকারীদের সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নতুন নয়।

২০২৪ সালের অফশোর দরপত্রেও কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি প্রস্তাব জমা দেয়নি। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের মধ্যে ছিল গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, অনুসন্ধানের ব্যয়, ভূতাত্ত্বিক তথ্যের পর্যাপ্ততা এবং চুক্তির আর্থিক শর্ত। যদিও এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পিএসসি প্রণয়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য সংযুক্ত করা, বিনিয়োগের ব্যয় পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা, কর-সুবিধা এবং নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস বিক্রি ও রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এসব সুবিধা বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে অনুসন্ধানে আগ্রহী করে তোলার কথা। কিন্তু এর বিপরীতে কেউ দরপত্র কেন কিনছেই না— এ বিষয় নিয়ে সরকারকে কাজ করতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার বিদেশেও প্রচার চালিয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর লন্ডনে ওয়ার্ল্ড এনার্জিস সামিটে বাংলাদেশের ২৬টি সমুদ্র ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তখন তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি পরিমাপযোগ্য ফলের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে কতটি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনেছে, কতটি কোম্পানি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে, কয়টি ব্লকের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, নির্বাচিত কোম্পানিগুলো কত অর্থ বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ কবে শুরু হবে।

এসব তথ্য প্রকাশিত না হলে সরকার কতটা অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা মূল্যায়ন করা কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে আসায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

এ অবস্থায় বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে অনুসন্ধান শুরু, মজুত যাচাই এবং উৎপাদনে যাওয়ার সময়ও পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

বাস থেকে নেমে ১৫ মিনিট আইফোন চার্জ দেয় তাজমিন, এরপর কোথায় যায়?

এখনো অনিশ্চয়তায় বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধানের ভবিষ্যৎ

Update Time : 10:30:51 pm, Saturday, 10 October 2026

সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর এক দশক পরও ব্যর্থতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ। এর আগে চারটি বিদেশি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও তিনটি বঙ্গোপসাগর ছেড়ে গেছে বহু আগেই।

২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নতুন করে উৎপাদনের অংশীদার চুক্তি (পিএসসি) অনুমোদন হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে। পরের বছর অর্থাৎ, ২০২৩ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের এক্সন মোবিল, শেভরনসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বাঘা বাঘা ১৭টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনেছিল। কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের কারণে এই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার আবারও দরপত্র আহ্বান করে।

কিন্তু তখন একটি কোম্পানিও দরপত্র কেনা বা জমা দেয়নি। বরং পিএসসিতে কিছু সংশোধনীর কথা জানায় কোম্পানিগুলো। বর্তমানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পিএসসি সংশোধন করে আবারও দরপত্র আহ্বান করে। আগামী ৩০ নভেম্বর শেষ হচ্ছে দরপত্র জমাদানের তারিখ। কিন্তু তুরস্কের একটি কোম্পানি ছাড়া আর কোনো কোম্পানি এখন পর্যন্ত দরপত্র কেনেনি।

তারাও শেষ পর্যন্ত আবেদন জমা দেবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে আর কোনো কোম্পানির দরপত্র কেনার সম্ভাবনাও দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। ফলে আবারও শঙ্কায় পড়েছে সমুদ্রে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা। গ্যাস ও খনিজ প্রাপ্তির সম্ভাবনা বিবেচনায় দেশের স্থলভাগকে ২২টি এবং সমুদ্রভাগকে ২৬টি ব্লকে ভাগ করে পেট্রোবাংলা। এই ২৬টির মধ্যে ১১টি ব্লক অগভীর সমুদ্রে অবস্থিত।

বাকি ১৫টি গভীর সমুদ্রে। এখন পর্যন্ত শুধু অগভীর অংশের দুটি ব্লকে (এসএস-০৪ এবং এসএস-০৯) অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেড ও অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড। যদিও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পিএসসির শর্ত সংশোধন এবং বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ— সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও কোনো আবেদন জমা না পড়ার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নভেম্বরের ৩০ তারিখ দরপত্র জমার শেষ সময় নির্ধারিত থাকলে অক্টোবরের শেষে এসে হাতে থাকবে প্রায় এক মাস। এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব জমা দেওয়ানোই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ, সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ মাত্র। প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ, চুক্তি স্বাক্ষর এবং অনুসন্ধান কূপ খননের ওপর। তারা বলছে, বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে।

সমুদ্রের সম্ভাবনাময় ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান শুরু করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বড় সুযোগ পিছিয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা। দেশে বিদ্যমান গ্যাস সংকট দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে তেল, গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এ জন্য উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর জন্য আকর্ষণীয় নয় বলে দাবি করছিল সরকারগুলোর বিভিন্ন অংশ।

সেই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পিএসসি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বরে গঠিত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (ইএমআরডি) এ-সংক্রান্ত একটি দাপ্তরিক আদেশ জারি করে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসীনকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

পর্যালোচনা শেষে গত ১৫ জানুয়ারি এটি মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু এর পরপরই জাতীয় নির্বাচনে রাজনীতিতে পরিবর্তন আসে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই দেশের অভ্যন্তরীণ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেয়। চলতি বছরের মার্চে এ লক্ষ্যে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়। এই পরিকল্পনায় গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি কমানোর লক্ষ্যে স্থলভাগ ও সাগরের ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানোর জোর তৎপরতার কথা বলা হয়।

কিন্তু প্রায় সাত মাস পার হলেও সাগরে দরপত্র গ্রহণ প্রক্রিয়া ছাড়া তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আর কোনো লক্ষণীয় অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু এবং টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দেশীয় কূপগুলো খননের অপরিহার্যতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। তাই অভ্যন্তরীণ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ তাদের।

এ বিষয়ে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে জানিয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকার দায়িত্ব নিয়েই গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লকের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আগ্রহী কোম্পানিগুলো দরপত্র জমা দিতে পারবে। আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি।

শেষ পর্যন্ত কী হয় দেখা যাক। বর্তমান স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দরপত্র না কেনার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য দেশে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র বা ডাটা প্রায় বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান সরকার দরপত্রের মূল্যই ধরেছে ৭ হাজার ডলার, যার কারণে তুর্কির (তুরস্ক) রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টার্কিশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (টিপিএও) ছাড়া আর কোনো কোম্পানি এখনো দরপত্র কেনেনি বা জমা দেয়নি।

যদিও টার্কিশ এই কোম্পানির দরপত্র কেনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা; কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দরপত্র নিয়ে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন রোড শো করার কথা থাকলেও তা না করায় অন্য কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে মত তাদের। শুধু তাই নয়, এখানে দরপত্রের দামও একটা বড় বিষয় বলে মনে করছেন তারা। পেট্রোবাংলার প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ মে ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড’ চালু করা হয়।

এতে বঙ্গোপসাগরের ১১টি অগভীর সমুদ্রে এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রের ব্লক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দরপত্র জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১টা। অর্থাৎ, গতকাল শনিবারের হিসাবে হাতে রয়েছে প্রায় সাত সপ্তাহ। এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো কোম্পানির দরপত্র না কেনা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা যত দূর জানতে পেরেছিলাম, জুনে পাঁচটি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান সমুদ্রাঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক তথ্যের প্যাকেজ কিনেছিল।

কিন্তু তখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রের নথি কেনেনি। তথ্য কেনা মানে কোনো ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া নয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রাথমিক আগ্রহ থাকলেও তা দরপত্রে অংশগ্রহণে রূপ নিচ্ছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। তিনি বলেন, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগকারীদের সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নতুন নয়।

২০২৪ সালের অফশোর দরপত্রেও কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি প্রস্তাব জমা দেয়নি। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের মধ্যে ছিল গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, অনুসন্ধানের ব্যয়, ভূতাত্ত্বিক তথ্যের পর্যাপ্ততা এবং চুক্তির আর্থিক শর্ত। যদিও এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পিএসসি প্রণয়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য সংযুক্ত করা, বিনিয়োগের ব্যয় পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা, কর-সুবিধা এবং নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস বিক্রি ও রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এসব সুবিধা বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে অনুসন্ধানে আগ্রহী করে তোলার কথা। কিন্তু এর বিপরীতে কেউ দরপত্র কেন কিনছেই না— এ বিষয় নিয়ে সরকারকে কাজ করতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার বিদেশেও প্রচার চালিয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর লন্ডনে ওয়ার্ল্ড এনার্জিস সামিটে বাংলাদেশের ২৬টি সমুদ্র ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তখন তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি পরিমাপযোগ্য ফলের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে কতটি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনেছে, কতটি কোম্পানি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে, কয়টি ব্লকের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, নির্বাচিত কোম্পানিগুলো কত অর্থ বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ কবে শুরু হবে।

এসব তথ্য প্রকাশিত না হলে সরকার কতটা অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা মূল্যায়ন করা কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে আসায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

এ অবস্থায় বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে অনুসন্ধান শুরু, মজুত যাচাই এবং উৎপাদনে যাওয়ার সময়ও পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।