আজ শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
১৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩০°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

অনিশ্চিত দূরত্ব: খেতের আল ধরে হেঁটে যাওয়ার পথে দূর থেকে ভেসে আসে গানের সুর

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:45:23 am, Friday, 2 October 2026
  • 10

অনিশ্চিত দূরত্ব: খেতের আল ধরে হেঁটে যাওয়ার পথে দূর থেকে ভেসে আসে গানের সুর

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

‘ও সাধের লাউ বানাইছে মোরে বৈরাগী, ও সাধের লাউ…’ দূর থেকে ভেসে আসা গানের সুরটা ধীরে ধীরে কাছে আসে। আবজল খেতের আল ধরে হাঁটছিল। মাথায় গামছা প্যাঁচানো, পরনে পুরোনো লুঙ্গি।

শরীরজুড়ে ঘামের চিকচিকে আস্তরণ। কলিম উদ্দিন দাদা আলের ওপর দাঁড়িয়ে হেসে বললেন, ‘কিতা রে আবজইল্লা, ভালোই রং লাগছে দেখি তোর শরীলও বে! ’ মাথার গামছাটা আরেকটু শক্ত করে পেঁচিয়ে আবজল বলল, ‘না দাদা! রং আর পাইলাম কই? ঐযে দেখইন না, খেতের মধ্যে দুনিয়ার বাছা পড়ছে ইবারÑকচুরিপানা, বড় শাপলা, টেন্ডেরা ঘাসে ইনজাম অই গেছে।

’ পাশাপাশি দুটো খেত। একটায় আবজল চাষ করে, অন্যটা উজ্জ্বল বেদখল করে রেখেছে। কত কষ্ট করে আগলে রেখেছে আবজল খেত। এই খেতের ধানেই দুটো ছেলেমেয়ের মুখে সারা বছরের আহার জোটে। বাপের দেওয়া ওই জমিটুকুই তার একমাত্র ভরসা। কলিম উদ্দিন দাদা একটু কাছে এসে নিচু গলায় বললেন, ‘তোর বড় ভাই উজ্জ্বল নাকি তোর জমি লইয়া টালবাহানা করতেছে?

কেনে রে, তোর কাগজপত্র আছে না? ’ আবজল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর কণ্ঠস্বর নামিয়ে বলল, ‘দাদা, আছে তো। এই ভাইটা আমার বউ কাঙাইল্লা, বউ যা কয় তা-ই। নিজের আপন ভাইরে মাথা ফাডাইতে আয় বউয়ের কথায়। ’ কথাটা বলতে বলতে আবজলের গলায় রাগ জমে উঠল। চোখের কোণে কেমন একটা আগুন জ্বলে উঠতে দেখলেন তিনি। কলিম উদ্দিন দাদা তার কাঁধে হাত রাখলেন।

‘যা অইছে অইছে। ভাইয়ে ভাইয়ে কামড়াকামড়ি করা ঠিক না। মাইনষেরে হাসাইয়া লাভ নাই। তুই আইনিভাবে দেখ। ‘যার দলিল, তার জমি। ’ কলিম উদ্দিন দাদা কিছুক্ষণ চুপ করে আবজলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘ধন-সম্পত্তির লাইগ্যা মানুষ কেমন জানি হইয়া যায় রে আবজইল্লা। আপন মানুষও পর হইয়া যায়। ’ আবজল কোনো জবাব দিল না।

মাথার গামছাটা খুলে আবার পেঁচিয়ে নিল শুধু। পাশাপাশি দুটো খেত। মাঝখানে সরু একটা আল। ‘আমি তোর কে, তুই বা আমার কে তা তো তুই বুঝলি না’ গুনগুনিয়ে গাইতে গাইতে আবজল বাড়ি ফেরে। সন্ধ্যার আঁধার চারদিকে ঘন হয়ে আসছিল। বিদ্যুৎ গেছে সেই কবেÑ দুই ঘণ্টা তো হবেই। সারাদিন ভাদ্রের রোদে টিনের ঘরটা তেতে আগুন হয়ে আছে। উঠানে পাটি বিছিয়ে আবজলের বউ বাচ্চা দুটোর দিকে বাতাস করতে করতে বলল, ‘মেম্বারের ধারে গেছলায়?

বিচার না করতে পারলে কওক, নাইলে আমরা মামলায় যাইমু। ’ আবজলের শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল অবিরাম। গাছের পাতাগুলোও যেন আজ ধর্মঘটে গেছে। বাতাসের নামগন্ধ নেই। ‘শালার কোন দেশে আছি! ’ আবজল বিরক্ত হয়। বউ হাতের পাখার গতি বাড়িয়ে দিল। আবজল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘মামলা করলেই তো টেকা লাগে। এত টাকা পাইমু কই? এখন তো রুজি-রোজগারও নাই।

ধানটা লাগাই আগে খেতে। মেম্বাররে পান খাওয়ার টাকা দিলাম শুক্রবার। আইজকা তো আরেক শুক্রবার। ’ কথার শেষে তার গলায় এমন হতাশা জমল, যেন সামনে আর কোনো পথ নেই। ঠিক তখনই বউ পাখাটা থামিয়ে তার দিকে সরাসরি তাকাল। ঘামে ভেজা মুখে জেদের ছাপ। ‘পান খাওয়ার টাকা আর কত দিবায়? দোকানির দোকানে গেছিলাম। কয়Ñ এসব মামলা করতে অহন আর শহরে কোর্টে যাওন লাগে না, উকিলেও হাজার হাজার টাকা খায় না।

ইউনিয়ন পরিষদেই গ্রাম আদালত বসে। তুমি এইডাও জানো না? ’ আবজল চুপ করে তাকিয়ে রইল। বউ এবার আরও জোরে বলল, ‘জায়গা-জমির দখল ফিরাইয়া নেওনের মামলা করা যায় ওইখানে। বেদখল হওনের এক বছরের মইধ্যে আবেদন করতে অয়। আর দেওয়ানি মামলা বইলা ফি লাগে মাত্র বিশ টাকা। মেম্বারের পেছনে আর না ঘুইরা কালকে সকালেই চেয়ারম্যান সাবের কাছে যাইবা।

গ্রাম আদালত বসাইবার লাইগ্যা লিখিত আবেদন দিয়া আইবা। ’ আবজল অবাক হয়ে বলল, ‘বিশ টাকা? ’ ‘হ, বিশ টাকা। এতদিন মেম্বারেরে পান খাওয়াইয়া কী পাইলা? ’ আবজল আর কোনো কথা বলল না। এতক্ষণ যে গরমে বুকটা আগুনের গোলা হয়েছিল, সেখানে হঠাৎ এক পশলা ঠান্ডা বাতাস এসে লাগল। সে ভ্যাপসা অন্ধকারে বরইগাছটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, হয়তো এখনো একটা পথ খোলা আছে। পরদিন চেয়ারম্যানকে পাওয়া গেল না। আবজল বাজারে এসে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করল। শেষ পর্যন্ত চায়ের দোকানের সামনে বড় ভাই উজ্জ্বলকে দেখতে পেল। উজ্জ্বল তাকে হাত নেড়ে ডাকল, ‘এইদিকে আয় আবজল। ’ আবজল কিছুটা অবাক হয়ে এগিয়ে গেল। চায়ের স্টলে ঢুকতেই মেম্বার কাপের শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে পড়ল।

আবজলের চোখের দিকে তাকাল না। উজ্জ্বল চায়ের কাপটা নামিয়ে বলল, ‘কালকে আব্বার ওফাতের তারিখ। তুই তো ভুইল্যা গেছস মনে হয়! ’ কথাটা শুনে আবজলের বুকের ভেতরটা নরম হয়ে গেল। কতদিন পর বড় ভাই তাকে এভাবে ডাকল! এক টুকরো জমি নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে ভাই এমন করতে পারেÑ এটা হঠাৎ তার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হলো। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর বাবাই তাদের মানুষ করেছিলেন।

একই থালায় ভাত খেয়েছে দুই ভাই। বর্ষায় একই নৌকায় বসে স্কুলে গেছে। শীতের রাতে একই কাঁথার নিচে শুয়ে থেকেছে। বাবা মারা যাওয়ার পরই যেন তাদের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল উঠতে শুরু করেছিল। আবজল গলা ঝেড়ে বলল, ‘আমি, আমি ভুলছি না। তুমি ভুলছো মিয়া ভাই। দেখ, আমি বাজার কইরা নিতাছি। মসজিদের হুজুররে মিলাদের দাওয়াতও দিয়া আইছি। ’ উজ্জ্বল মৃদু হেসে বলল, ‘তাইলে ভালোই অইছে।

’ দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল অন্ধকারে। জমির কথা আর কেউ তুলল না। কিছুক্ষণ পর আবজল নিজেই বলল, ‘গ্রাম আদালতের কথা জানোনি? ইউনিয়নেই নাকি বিচার অয়। বিশ টাকা ফি। ’ উজ্জ্বল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘জানি তো। মেম্বার আর মুরুব্বিদের ওপর আর ভরসা নাই। কালকে তাইলে লইস। ’ আবজল ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল।

সেই মুখে আজ কোনো রাগ নেই। হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। দুই ভাই দুই বাড়ির দিকে চলে গেল। রাত গভীর হলো। শুধু হিন্দুপাড়া থেকে কীর্তনের আওয়াজ আসছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পুরো গ্রাম ডুবে গেল। খালের ওপার থেকে হঠাৎ একটা ভেজা, ছিন্নভিন্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এলোÑ ‘ওরে উজ্জ্বল! এইডা কিতা হইল গো! কী সর্বনাশ হইল! ’ আবজল বিছানা থেকে উঠে বসে।

বউ তার হাত চেপে ধরে বলল, ‘যাইও না। ’ ‘কিতা অইছে দেখি, চোর আইছে নাকি? ’ ‘অহন যাওনের দরকার নাই। আমি খলিলের মারে পাঠাই। আবজল হাত ছাড়িয়ে নিল। ‘তোর মুখটা বন্ধ কর তো! দেখি গিয়া কিতা হইছে। মরার মতন কানতাছে কেন এরা? ’ সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। খালের পাড়ে তখন মানুষের ভিড় বাড়ছে। উজ্জ্বলের বউ বুক চাপড়ে চিৎকার করছে আর আবজলকে দেখেই বলে, ‘এই পোলা আমার জামাইরে মারছে!

এই পোলা মারছে! জমির লাইগ্যা ভাইরে মাইরা ফালাইছে গো পিশাচ খুনি পোলা! ’ উজ্জ্বলের বউয়ের মুখে বিছা ফুটছে যেন। আবজল থমকে দাঁড়াল। তার সামনে পড়ে আছে উজ্জ্বল। মাটির ওপর কাদামাখা শরীর। আবজলের পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল। ‘ভাই…’ শব্দটা তার গলা থেকে বেরোল না। শুধু ঠোঁট কাঁপল। কেউ একজন বলল, ‘মা লো মা, একটা খেতের লাগি ভাইরে মারলো!

’ আরেকজন বলল, ‘আবজল তার ভাইরে মারছেÑ এইডা বিশ্বাস করি না। ’ আরেকজন ইতোমধ্যে বলে উঠেছে, ‘জমির প্যাঁচ আছিল। এইডার লাইগ্যাই অইছে। ’ কেউ বলল, দুই ভাইয়ের মধ্যে আগেই ঝামেলা ছিল। কলিম উদ্দিন দাদা ভিড় ঠেলে এসে কয়েকটা ধমক দিয়ে বললেন, ‘মুখে যা আয় তাই কও তোমরা। নিজের চক্ষে কেউ দেখছোনি আবজল তার ভাইরে মারছে, বেত্তমিজের ঘরের বেত্তমিজ অকল আজাইরা কথা কওয়ার আর জায়গা পাও না?

’ কলিম উদ্দিন দাদা রাতের বেলা দেখছিলেন দুই ভাই কথা বলতে বলতে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু আবজলের গলাটা তো উঁচু ছিলÑ কলিম উদ্দিন দাদা আর ভাবতে পারেন না। নীরব হয়ে গেল খালের পাড়। শুধু উজ্জ্বলের বউ প্রলাপ বকছে। কিন্তু ওই নীরবতা বেশিক্ষণ টিকল না। ভোরের আলো ফোটার আগেই কথাটা ছড়িয়ে পড়ল। খালপাড় থেকে বাজারে। বাজার থেকে মসজিদের বারান্দায়।

মসজিদ থেকে চায়ের দোকানে। চায়ের দোকান থেকে বাড়ির উঠানে উঠানে। যে কথা কেউ কোনোদিন শোনেনি, ভোরের আগে সেটাও শোনা গেল। আর আবজল পাথরের মতো বসে রইল। তার চোখের সামনে শুধু একটা কথাই ঘুরছিলÑ ‘কালকে তাইলে লইস।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

অনিশ্চিত দূরত্ব: খেতের আল ধরে হেঁটে যাওয়ার পথে দূর থেকে ভেসে আসে গানের সুর

Update Time : 07:45:23 am, Friday, 2 October 2026

‘ও সাধের লাউ বানাইছে মোরে বৈরাগী, ও সাধের লাউ…’ দূর থেকে ভেসে আসা গানের সুরটা ধীরে ধীরে কাছে আসে। আবজল খেতের আল ধরে হাঁটছিল। মাথায় গামছা প্যাঁচানো, পরনে পুরোনো লুঙ্গি।

শরীরজুড়ে ঘামের চিকচিকে আস্তরণ। কলিম উদ্দিন দাদা আলের ওপর দাঁড়িয়ে হেসে বললেন, ‘কিতা রে আবজইল্লা, ভালোই রং লাগছে দেখি তোর শরীলও বে! ’ মাথার গামছাটা আরেকটু শক্ত করে পেঁচিয়ে আবজল বলল, ‘না দাদা! রং আর পাইলাম কই? ঐযে দেখইন না, খেতের মধ্যে দুনিয়ার বাছা পড়ছে ইবারÑকচুরিপানা, বড় শাপলা, টেন্ডেরা ঘাসে ইনজাম অই গেছে।

’ পাশাপাশি দুটো খেত। একটায় আবজল চাষ করে, অন্যটা উজ্জ্বল বেদখল করে রেখেছে। কত কষ্ট করে আগলে রেখেছে আবজল খেত। এই খেতের ধানেই দুটো ছেলেমেয়ের মুখে সারা বছরের আহার জোটে। বাপের দেওয়া ওই জমিটুকুই তার একমাত্র ভরসা। কলিম উদ্দিন দাদা একটু কাছে এসে নিচু গলায় বললেন, ‘তোর বড় ভাই উজ্জ্বল নাকি তোর জমি লইয়া টালবাহানা করতেছে?

কেনে রে, তোর কাগজপত্র আছে না? ’ আবজল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর কণ্ঠস্বর নামিয়ে বলল, ‘দাদা, আছে তো। এই ভাইটা আমার বউ কাঙাইল্লা, বউ যা কয় তা-ই। নিজের আপন ভাইরে মাথা ফাডাইতে আয় বউয়ের কথায়। ’ কথাটা বলতে বলতে আবজলের গলায় রাগ জমে উঠল। চোখের কোণে কেমন একটা আগুন জ্বলে উঠতে দেখলেন তিনি। কলিম উদ্দিন দাদা তার কাঁধে হাত রাখলেন।

‘যা অইছে অইছে। ভাইয়ে ভাইয়ে কামড়াকামড়ি করা ঠিক না। মাইনষেরে হাসাইয়া লাভ নাই। তুই আইনিভাবে দেখ। ‘যার দলিল, তার জমি। ’ কলিম উদ্দিন দাদা কিছুক্ষণ চুপ করে আবজলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘ধন-সম্পত্তির লাইগ্যা মানুষ কেমন জানি হইয়া যায় রে আবজইল্লা। আপন মানুষও পর হইয়া যায়। ’ আবজল কোনো জবাব দিল না।

মাথার গামছাটা খুলে আবার পেঁচিয়ে নিল শুধু। পাশাপাশি দুটো খেত। মাঝখানে সরু একটা আল। ‘আমি তোর কে, তুই বা আমার কে তা তো তুই বুঝলি না’ গুনগুনিয়ে গাইতে গাইতে আবজল বাড়ি ফেরে। সন্ধ্যার আঁধার চারদিকে ঘন হয়ে আসছিল। বিদ্যুৎ গেছে সেই কবেÑ দুই ঘণ্টা তো হবেই। সারাদিন ভাদ্রের রোদে টিনের ঘরটা তেতে আগুন হয়ে আছে। উঠানে পাটি বিছিয়ে আবজলের বউ বাচ্চা দুটোর দিকে বাতাস করতে করতে বলল, ‘মেম্বারের ধারে গেছলায়?

বিচার না করতে পারলে কওক, নাইলে আমরা মামলায় যাইমু। ’ আবজলের শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল অবিরাম। গাছের পাতাগুলোও যেন আজ ধর্মঘটে গেছে। বাতাসের নামগন্ধ নেই। ‘শালার কোন দেশে আছি! ’ আবজল বিরক্ত হয়। বউ হাতের পাখার গতি বাড়িয়ে দিল। আবজল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘মামলা করলেই তো টেকা লাগে। এত টাকা পাইমু কই? এখন তো রুজি-রোজগারও নাই।

ধানটা লাগাই আগে খেতে। মেম্বাররে পান খাওয়ার টাকা দিলাম শুক্রবার। আইজকা তো আরেক শুক্রবার। ’ কথার শেষে তার গলায় এমন হতাশা জমল, যেন সামনে আর কোনো পথ নেই। ঠিক তখনই বউ পাখাটা থামিয়ে তার দিকে সরাসরি তাকাল। ঘামে ভেজা মুখে জেদের ছাপ। ‘পান খাওয়ার টাকা আর কত দিবায়? দোকানির দোকানে গেছিলাম। কয়Ñ এসব মামলা করতে অহন আর শহরে কোর্টে যাওন লাগে না, উকিলেও হাজার হাজার টাকা খায় না।

ইউনিয়ন পরিষদেই গ্রাম আদালত বসে। তুমি এইডাও জানো না? ’ আবজল চুপ করে তাকিয়ে রইল। বউ এবার আরও জোরে বলল, ‘জায়গা-জমির দখল ফিরাইয়া নেওনের মামলা করা যায় ওইখানে। বেদখল হওনের এক বছরের মইধ্যে আবেদন করতে অয়। আর দেওয়ানি মামলা বইলা ফি লাগে মাত্র বিশ টাকা। মেম্বারের পেছনে আর না ঘুইরা কালকে সকালেই চেয়ারম্যান সাবের কাছে যাইবা।

গ্রাম আদালত বসাইবার লাইগ্যা লিখিত আবেদন দিয়া আইবা। ’ আবজল অবাক হয়ে বলল, ‘বিশ টাকা? ’ ‘হ, বিশ টাকা। এতদিন মেম্বারেরে পান খাওয়াইয়া কী পাইলা? ’ আবজল আর কোনো কথা বলল না। এতক্ষণ যে গরমে বুকটা আগুনের গোলা হয়েছিল, সেখানে হঠাৎ এক পশলা ঠান্ডা বাতাস এসে লাগল। সে ভ্যাপসা অন্ধকারে বরইগাছটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, হয়তো এখনো একটা পথ খোলা আছে। পরদিন চেয়ারম্যানকে পাওয়া গেল না। আবজল বাজারে এসে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করল। শেষ পর্যন্ত চায়ের দোকানের সামনে বড় ভাই উজ্জ্বলকে দেখতে পেল। উজ্জ্বল তাকে হাত নেড়ে ডাকল, ‘এইদিকে আয় আবজল। ’ আবজল কিছুটা অবাক হয়ে এগিয়ে গেল। চায়ের স্টলে ঢুকতেই মেম্বার কাপের শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে পড়ল।

আবজলের চোখের দিকে তাকাল না। উজ্জ্বল চায়ের কাপটা নামিয়ে বলল, ‘কালকে আব্বার ওফাতের তারিখ। তুই তো ভুইল্যা গেছস মনে হয়! ’ কথাটা শুনে আবজলের বুকের ভেতরটা নরম হয়ে গেল। কতদিন পর বড় ভাই তাকে এভাবে ডাকল! এক টুকরো জমি নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে ভাই এমন করতে পারেÑ এটা হঠাৎ তার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হলো। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর বাবাই তাদের মানুষ করেছিলেন।

একই থালায় ভাত খেয়েছে দুই ভাই। বর্ষায় একই নৌকায় বসে স্কুলে গেছে। শীতের রাতে একই কাঁথার নিচে শুয়ে থেকেছে। বাবা মারা যাওয়ার পরই যেন তাদের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল উঠতে শুরু করেছিল। আবজল গলা ঝেড়ে বলল, ‘আমি, আমি ভুলছি না। তুমি ভুলছো মিয়া ভাই। দেখ, আমি বাজার কইরা নিতাছি। মসজিদের হুজুররে মিলাদের দাওয়াতও দিয়া আইছি। ’ উজ্জ্বল মৃদু হেসে বলল, ‘তাইলে ভালোই অইছে।

’ দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল অন্ধকারে। জমির কথা আর কেউ তুলল না। কিছুক্ষণ পর আবজল নিজেই বলল, ‘গ্রাম আদালতের কথা জানোনি? ইউনিয়নেই নাকি বিচার অয়। বিশ টাকা ফি। ’ উজ্জ্বল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘জানি তো। মেম্বার আর মুরুব্বিদের ওপর আর ভরসা নাই। কালকে তাইলে লইস। ’ আবজল ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল।

সেই মুখে আজ কোনো রাগ নেই। হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। দুই ভাই দুই বাড়ির দিকে চলে গেল। রাত গভীর হলো। শুধু হিন্দুপাড়া থেকে কীর্তনের আওয়াজ আসছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পুরো গ্রাম ডুবে গেল। খালের ওপার থেকে হঠাৎ একটা ভেজা, ছিন্নভিন্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এলোÑ ‘ওরে উজ্জ্বল! এইডা কিতা হইল গো! কী সর্বনাশ হইল! ’ আবজল বিছানা থেকে উঠে বসে।

বউ তার হাত চেপে ধরে বলল, ‘যাইও না। ’ ‘কিতা অইছে দেখি, চোর আইছে নাকি? ’ ‘অহন যাওনের দরকার নাই। আমি খলিলের মারে পাঠাই। আবজল হাত ছাড়িয়ে নিল। ‘তোর মুখটা বন্ধ কর তো! দেখি গিয়া কিতা হইছে। মরার মতন কানতাছে কেন এরা? ’ সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। খালের পাড়ে তখন মানুষের ভিড় বাড়ছে। উজ্জ্বলের বউ বুক চাপড়ে চিৎকার করছে আর আবজলকে দেখেই বলে, ‘এই পোলা আমার জামাইরে মারছে!

এই পোলা মারছে! জমির লাইগ্যা ভাইরে মাইরা ফালাইছে গো পিশাচ খুনি পোলা! ’ উজ্জ্বলের বউয়ের মুখে বিছা ফুটছে যেন। আবজল থমকে দাঁড়াল। তার সামনে পড়ে আছে উজ্জ্বল। মাটির ওপর কাদামাখা শরীর। আবজলের পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল। ‘ভাই…’ শব্দটা তার গলা থেকে বেরোল না। শুধু ঠোঁট কাঁপল। কেউ একজন বলল, ‘মা লো মা, একটা খেতের লাগি ভাইরে মারলো!

’ আরেকজন বলল, ‘আবজল তার ভাইরে মারছেÑ এইডা বিশ্বাস করি না। ’ আরেকজন ইতোমধ্যে বলে উঠেছে, ‘জমির প্যাঁচ আছিল। এইডার লাইগ্যাই অইছে। ’ কেউ বলল, দুই ভাইয়ের মধ্যে আগেই ঝামেলা ছিল। কলিম উদ্দিন দাদা ভিড় ঠেলে এসে কয়েকটা ধমক দিয়ে বললেন, ‘মুখে যা আয় তাই কও তোমরা। নিজের চক্ষে কেউ দেখছোনি আবজল তার ভাইরে মারছে, বেত্তমিজের ঘরের বেত্তমিজ অকল আজাইরা কথা কওয়ার আর জায়গা পাও না?

’ কলিম উদ্দিন দাদা রাতের বেলা দেখছিলেন দুই ভাই কথা বলতে বলতে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু আবজলের গলাটা তো উঁচু ছিলÑ কলিম উদ্দিন দাদা আর ভাবতে পারেন না। নীরব হয়ে গেল খালের পাড়। শুধু উজ্জ্বলের বউ প্রলাপ বকছে। কিন্তু ওই নীরবতা বেশিক্ষণ টিকল না। ভোরের আলো ফোটার আগেই কথাটা ছড়িয়ে পড়ল। খালপাড় থেকে বাজারে। বাজার থেকে মসজিদের বারান্দায়।

মসজিদ থেকে চায়ের দোকানে। চায়ের দোকান থেকে বাড়ির উঠানে উঠানে। যে কথা কেউ কোনোদিন শোনেনি, ভোরের আগে সেটাও শোনা গেল। আর আবজল পাথরের মতো বসে রইল। তার চোখের সামনে শুধু একটা কথাই ঘুরছিলÑ ‘কালকে তাইলে লইস।