আজ শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩৩°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৩৫%

অভাবমুক্ত জীবনে নববী শিক্ষা ও অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:37:10 am, Friday, 2 October 2026
  • 19

অভাবমুক্ত জীবনে নববী শিক্ষা ও অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। অর্থ দিয়ে জীবনের প্রয়োজন মেটানো যায়, পরিবার পরিচালনা করা যায়, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায় এবং কল্যাণমূলক কাজ করা যায়। কিন্তু অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে বিপুল সম্পদও একসময় অপ্রতুল হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে সীমিত সম্পদও যদি বিচক্ষণতা ও পরিমিতিবোধের সঙ্গে ব্যয় করা হয়, তা অনেক সময় দীর্ঘদিন মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হয়। এ কারণেই ইসলাম সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দিয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। মহানবী (সা.) মিতব্যয়িতার গুরুত্ব বোঝাতে বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিতব্যয়িতা অবলম্বন করে, সে অভাবগ্রস্ত হয় না। ‘(মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৪২৬৯) মিতব্যয়িতা আসলে কী মিতব্যয়িতা বলতে অনেকে শুধু কম খরচ করাকে বোঝেন।

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মিতব্যয়িতা শুধু কম ব্যয় করা নয়; বরং যেখানে যতটুকু প্রয়োজন, সেখানে ততটুকু ব্যয় করা এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় থেকে বিরত থাকা। আরবি ‘ইকতিসাদ’ শব্দের মধ্যে মধ্যপন্থা, ভারসাম্য ও পরিমিতিবোধের অর্থ নিহিত রয়েছে। তাই মিতব্যয়িতা একদিকে যেমন কৃপণতা নয়, অন্যদিকে তেমনি বিলাসিতা ও অপচয়ও নয়। ইমাম গাজালি (রহ.) ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ ও দূরদর্শিতাকে মিতব্যয়িতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

(ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/২৪১-২৪২)। অন্যদিকে আল্লামা মুনাভি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, মিতব্যয়িতা হলোÑ এমনভাবে ব্যয় করা, যাতে আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে অর্থ ব্যয় না হয় এবং পরিবারের প্রাপ্য অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও কৃপণতা করা না হয়। (ফয়জুল কাদির, ৫/৪৫৪-৪৫৫) অপচয় ও কৃপণতার মাঝখানে মুমিনের অবস্থান ইসলাম মানুষকে সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুটি চরমপন্থা থেকে সতর্ক করেছে কৃপণতা ও অপচয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ের সঙ্গে শিকলবদ্ধ করে রেখ না এবং তা একেবারে প্রসারিতও করে দিও না; তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে। ’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৯) এ আয়াতে অত্যন্ত চমৎকার উপমার মাধ্যমে ইসলামের অর্থনৈতিক ভারসাম্য তুলে ধরা হয়েছে। একদিকে এমন কৃপণতা করা যাবে না, যার ফলে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় অধিকারও নষ্ট হয়।

অন্যদিকে এমন বেহিসাবি ব্যয়ও করা যাবে না, যা মানুষকে ভবিষ্যতে নিঃস্ব করে ফেলে। কোরআনে আল্লাহর বিশেষ বান্দাদেরÑইবাদুর রহমানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তাদের ব্যয় হয় এ দুয়ের মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ। ’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৭)।

মিতব্যয়িতা মানে কৃপণতা নয় অনেকে মনে করেন, মিতব্যয়ী ব্যক্তি হয়তো নিজের বা পরিবারের প্রয়োজনেও অর্থ খরচ করতে চান না। এটি মিতব্যয়িতা নয়; বরং কৃপণতা। ইসলাম পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে উৎসাহ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে, তোমার চোখের হক রয়েছে এবং তোমার পরিবারেরও তোমার ওপর হক রয়েছে। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)।

পরিবারের প্রয়োজনীয় খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান কিংবা অন্যান্য বৈধ প্রয়োজন পূরণে ব্যয় করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আর মিতব্যয়িতা হলোÑ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে নিজেকে সংযত রাখা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তুমি অপচয় করো না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। ’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৬-২৭)।

খাবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিয়ে ফেলে দেওয়া, ব্যবহারযোগ্য জিনিস অযথা নষ্ট করা, লোক দেখানোর জন্য সামর্থ্যরে বাইরে ব্যয় করা কিংবা শুধু সামাজিক প্রতিযোগিতার কারণে অপ্রয়োজনীয় ঋণ নেওয়াÑ এসবের বিপরীতে ইসলামের শিক্ষা হলোÑ সংযম ও বিবেচনাবোধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে উদার মানুষদের একজন। তিনি মানুষের কল্যাণে অকাতরে দান করতেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনযাপনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযমী ও পরিমিতিবোধসম্পন্ন। এখান থেকে বোঝা যায়, মিতব্যয়িতা মানে দান থেকে বিরত থাকা নয়। বরং নিজের অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমিয়ে প্রয়োজনমতো অন্যের জন্য ব্যয় করাও মিতব্যয়িতার সৌন্দর্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদ কমে না। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)।

মিতব্যয়িতা ও আল্লাহর ওপর ভরসা মিতব্যয়িতা অবলম্বনের সঙ্গে তাওয়াক্কুলের কোনো বিরোধ নেই। একজন মুমিন পরিকল্পনা করবে, বৈধ উপায়ে উপার্জন করবে, অপচয় থেকে বাঁচবে এবং একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করে না।

আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। ’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে অপচয় ও কৃপণতা থেকে বেঁচে মধ্যপন্থি, সংযমী ও কৃতজ্ঞ জীবনযাপন করার তৌফিক দান করুন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

১৫ চার ১৩ ছক্কায় ১৮৮ রানের ঝড়ো ইনিংস, ভেঙে গেল ক্রিস গেইলের টি-টোয়েন্টি রেকর্ড

অভাবমুক্ত জীবনে নববী শিক্ষা ও অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা

Update Time : 07:37:10 am, Friday, 2 October 2026

মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। অর্থ দিয়ে জীবনের প্রয়োজন মেটানো যায়, পরিবার পরিচালনা করা যায়, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায় এবং কল্যাণমূলক কাজ করা যায়। কিন্তু অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে বিপুল সম্পদও একসময় অপ্রতুল হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে সীমিত সম্পদও যদি বিচক্ষণতা ও পরিমিতিবোধের সঙ্গে ব্যয় করা হয়, তা অনেক সময় দীর্ঘদিন মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হয়। এ কারণেই ইসলাম সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দিয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। মহানবী (সা.) মিতব্যয়িতার গুরুত্ব বোঝাতে বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিতব্যয়িতা অবলম্বন করে, সে অভাবগ্রস্ত হয় না। ‘(মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৪২৬৯) মিতব্যয়িতা আসলে কী মিতব্যয়িতা বলতে অনেকে শুধু কম খরচ করাকে বোঝেন।

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মিতব্যয়িতা শুধু কম ব্যয় করা নয়; বরং যেখানে যতটুকু প্রয়োজন, সেখানে ততটুকু ব্যয় করা এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় থেকে বিরত থাকা। আরবি ‘ইকতিসাদ’ শব্দের মধ্যে মধ্যপন্থা, ভারসাম্য ও পরিমিতিবোধের অর্থ নিহিত রয়েছে। তাই মিতব্যয়িতা একদিকে যেমন কৃপণতা নয়, অন্যদিকে তেমনি বিলাসিতা ও অপচয়ও নয়। ইমাম গাজালি (রহ.) ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ ও দূরদর্শিতাকে মিতব্যয়িতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

(ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/২৪১-২৪২)। অন্যদিকে আল্লামা মুনাভি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, মিতব্যয়িতা হলোÑ এমনভাবে ব্যয় করা, যাতে আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে অর্থ ব্যয় না হয় এবং পরিবারের প্রাপ্য অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও কৃপণতা করা না হয়। (ফয়জুল কাদির, ৫/৪৫৪-৪৫৫) অপচয় ও কৃপণতার মাঝখানে মুমিনের অবস্থান ইসলাম মানুষকে সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুটি চরমপন্থা থেকে সতর্ক করেছে কৃপণতা ও অপচয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ের সঙ্গে শিকলবদ্ধ করে রেখ না এবং তা একেবারে প্রসারিতও করে দিও না; তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে। ’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৯) এ আয়াতে অত্যন্ত চমৎকার উপমার মাধ্যমে ইসলামের অর্থনৈতিক ভারসাম্য তুলে ধরা হয়েছে। একদিকে এমন কৃপণতা করা যাবে না, যার ফলে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় অধিকারও নষ্ট হয়।

অন্যদিকে এমন বেহিসাবি ব্যয়ও করা যাবে না, যা মানুষকে ভবিষ্যতে নিঃস্ব করে ফেলে। কোরআনে আল্লাহর বিশেষ বান্দাদেরÑইবাদুর রহমানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তাদের ব্যয় হয় এ দুয়ের মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ। ’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৭)।

মিতব্যয়িতা মানে কৃপণতা নয় অনেকে মনে করেন, মিতব্যয়ী ব্যক্তি হয়তো নিজের বা পরিবারের প্রয়োজনেও অর্থ খরচ করতে চান না। এটি মিতব্যয়িতা নয়; বরং কৃপণতা। ইসলাম পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে উৎসাহ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে, তোমার চোখের হক রয়েছে এবং তোমার পরিবারেরও তোমার ওপর হক রয়েছে। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)।

পরিবারের প্রয়োজনীয় খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান কিংবা অন্যান্য বৈধ প্রয়োজন পূরণে ব্যয় করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আর মিতব্যয়িতা হলোÑ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে নিজেকে সংযত রাখা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তুমি অপচয় করো না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। ’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৬-২৭)।

খাবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিয়ে ফেলে দেওয়া, ব্যবহারযোগ্য জিনিস অযথা নষ্ট করা, লোক দেখানোর জন্য সামর্থ্যরে বাইরে ব্যয় করা কিংবা শুধু সামাজিক প্রতিযোগিতার কারণে অপ্রয়োজনীয় ঋণ নেওয়াÑ এসবের বিপরীতে ইসলামের শিক্ষা হলোÑ সংযম ও বিবেচনাবোধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে উদার মানুষদের একজন। তিনি মানুষের কল্যাণে অকাতরে দান করতেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনযাপনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযমী ও পরিমিতিবোধসম্পন্ন। এখান থেকে বোঝা যায়, মিতব্যয়িতা মানে দান থেকে বিরত থাকা নয়। বরং নিজের অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমিয়ে প্রয়োজনমতো অন্যের জন্য ব্যয় করাও মিতব্যয়িতার সৌন্দর্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদ কমে না। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)।

মিতব্যয়িতা ও আল্লাহর ওপর ভরসা মিতব্যয়িতা অবলম্বনের সঙ্গে তাওয়াক্কুলের কোনো বিরোধ নেই। একজন মুমিন পরিকল্পনা করবে, বৈধ উপায়ে উপার্জন করবে, অপচয় থেকে বাঁচবে এবং একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করে না।

আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। ’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে অপচয় ও কৃপণতা থেকে বেঁচে মধ্যপন্থি, সংযমী ও কৃতজ্ঞ জীবনযাপন করার তৌফিক দান করুন।