আজ শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩৩°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৩৫%

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন স্বর

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:41:56 am, Friday, 2 October 2026
  • 17

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন স্বর

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

কখনো কখনো একটি দেশের কণ্ঠ তার সীমানা পেরিয়ে বহুদূর চলে যায়। নদীর স্রোত যেমন একদিন সাগরে মিশে যায়, তেমনি একটি দেশের মানুষের আশা, সংকট, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাও পৌঁছে যেতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চে।

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর তেমনই একটি জায়গাÑ যেখানে একটি দেশের বক্তব্য শুধু শোনা হয় না, তার অগ্রাধিকার, উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ ভাবনাও আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সেই মঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাধ্যমে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে তিনি বাংলায় বক্তব্য দেন।

এটি ছিল তার প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ। ভাষণে তিনি একই সঙ্গে বৈশ্বিক সংকট এবং বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন। শান্তি, কূটনীতি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-বক্তব্যের পরিসর ছিল বিস্তৃত। তবে একটি রাষ্ট্রপ্রধানের আন্তর্জাতিক ভাষণের গুরুত্ব শুধু তিনি কী বললেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

আরও বড় প্রশ্ন হলোÑ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিজেকে বিশ্বের সামনে কীভাবে উপস্থাপন করতে চাইছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ভাষণের কয়েকটি দিক বিশেষভাবে সামনে আসে। বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির চাপ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।

এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী সংঘাতের সমাধানে সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার কথা বলেছেন তিনি। বাংলাদেশের জন্য এই অবস্থান নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন বক্তব্য নয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকার সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা ভূমিকা এবং নারীদের অংশগ্রহণের কথাও তুলে ধরেছেন। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য কূটনীতির জায়গাটি তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মতো দেশের কাছে শান্তি কেবল একটি নৈতিক অবস্থান নয়; এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের অন্যতম প্রধান বিষয় রোহিঙ্গা সংকট। জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনই এই সংকটের সমাধানের পথ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

এই সংকটের সবচেয়ে কঠিন দিক হলোÑ সময়। একটি অস্থায়ী মানবিক ব্যবস্থা যখন বছরের পর বছর স্থায়ী হয়, তখন তা শুধু শরণার্থী ব্যবস্থাপনার বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ত্রাণ সহায়তা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমারকেন্দ্রিক কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজনÑ এটাই বাংলাদেশের অবস্থানের কেন্দ্রীয় বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের কোনো দূরের বিপদ নয়। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিÑ এসবের সঙ্গে দেশের মানুষের জীবন বহুদিন ধরেই জড়িয়ে আছে।

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, অভিযোজন অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে পৃথক উচ্চপর্যায়ের আলোচনাতেও বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরেছে। কিন্তু জলবায়ু মোকাবিলা শুধু আন্তর্জাতিক অর্থায়নের দাবি জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দেশের নদী, খাল, জলাধার ও উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও সমান জরুরি।

ভাষণে খাল খনন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি সহযোগিতার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। এখানেই বাংলাদেশের জলবায়ু নীতির সঙ্গে উন্নয়ন পরিকল্পনার সম্পর্ক তৈরি হয়। পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আলাদা দুটি বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। আগামী দিনের বাংলাদেশে নদী বাঁচানো, কৃষি রক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখাÑ সবকিছুকেই একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অর্থনৈতিক রূপান্তর। বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশকে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি ডলারের বরাদ্দের কথাও ভাষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হওয়ার অর্থ শুধু কারখানার সংখ্যা বাড়ানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, বন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, লজিস্টিকস, ব্যাংকিং সুবিধা, দক্ষ শ্রমিক, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার সক্ষমতা। বাংলাদেশের সামনে এখানে বড় সুযোগ রয়েছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে হলে শুধু কম খরচে উৎপাদন যথেষ্ট হবে না। মান, সময়, প্রযুক্তি এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু জনসংখ্যার এই কাঠামো তখনই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হবে, যখন শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাস্তব সংযোগ তৈরি হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিকস এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু সনদনির্ভর রাখলে চলবে না। প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ। একই সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। নারীর কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতির পরিসর আরও বিস্তৃত হবে।

এই জায়গায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা, স্টার্টআপ, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রয়োজন আরও বাড়বে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সম্পর্ক গভীর। লাখ লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও বহু পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার কেবল সংখ্যার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। তাই ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সনদ এবং কাজের নিরাপত্তাÑ এসবকে অভিবাসন নীতির কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

জাতিসংঘের মঞ্চে একটি দেশের বক্তব্য কয়েক মিনিটের। কিন্তু তার বাস্তবায়নের সময় অনেক দীর্ঘ। এ কারণেই আন্তর্জাতিক ভাষণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় দেশের ভেতরে। তরুণের হাতে কাজ পৌঁছাল কি না, নারী নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না, কৃষক ন্যায্য বাজার পাচ্ছেন কি না, শিল্প উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পাচ্ছেন কি না, নদী ও খাল রক্ষা হচ্ছে কি না, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষ নিরাপদ হচ্ছে কি না-এসব প্রশ্নের উত্তরেই শেষ পর্যন্ত বোঝা যাবে একটি আন্তর্জাতিক বক্তব্য কতটা কার্যকর নীতিতে পরিণত হলো।

প্রধানমন্ত্রী ভাষণে বাংলাদেশের পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠনের জন্য ‘থ্রি-আর’-রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশনÑ কৌশলের কথা বলেছেন। এই তিনটি শব্দ তাই শুধু প্রশাসনিক পরিকল্পনার ভাষা নয়; এর সঙ্গে বাস্তব জীবনের প্রত্যাশার সম্পর্ক রয়েছে। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, অর্থনীতির ভিত্তি বিস্তৃত করা, মানবসম্পদ উন্নত করা এবং নাগরিকের আস্থা পুনর্গঠনÑ সবকিছুকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হয়।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক শান্তি থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে অভিবাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান থেকে শিল্পায়নÑ একটি দেশের বহুমাত্রিক বাস্তবতা উঠে এসেছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় এখন কেবল সাহায্যপ্রার্থী একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ একই সঙ্গে একটি শ্রমশক্তির দেশ, একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতি, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ভূখ-, বড় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর দেশ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র। এই বহুমাত্রিক পরিচয়কে কূটনীতিতে আরও সুসংহতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে একটি দেশের প্রভাব শুধু তার আয়তন বা অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

তার অবস্থান কতটা সুস্পষ্ট, তার স্বার্থ কতটা ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপিত এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেÑ সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন স্বর তাই শুধু একটি বক্তৃতার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের সামনে থাকা সুযোগ ও দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। নিউইয়র্কের সেই মঞ্চে বাংলাদেশের কথা উচ্চারিত হয়েছে।

এখন তার প্রতিধ্বনি শোনা দরকার দেশের মাঠে, কারখানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কৃষকের জীবনে, তরুণ উদ্যোক্তার স্বপ্নে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতায়। একটি বক্তৃতা তখনই দীর্ঘস্থায়ী অর্থ পায়, যখন তার অঙ্গীকার নীতিতে রূপ নেয়, নীতি বাস্তবায়নে যায় এবং বাস্তবায়নের সুফল মানুষের জীবনে পৌঁছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ যত দূরেই পৌঁছাক, তার প্রকৃত শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে দেশের মানুষের জীবনে।

সেই বাংলাদেশই হবে বিশ্বমঞ্চে উচ্চারিত কথার সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

১৫ চার ১৩ ছক্কায় ১৮৮ রানের ঝড়ো ইনিংস, ভেঙে গেল ক্রিস গেইলের টি-টোয়েন্টি রেকর্ড

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন স্বর

Update Time : 07:41:56 am, Friday, 2 October 2026

কখনো কখনো একটি দেশের কণ্ঠ তার সীমানা পেরিয়ে বহুদূর চলে যায়। নদীর স্রোত যেমন একদিন সাগরে মিশে যায়, তেমনি একটি দেশের মানুষের আশা, সংকট, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাও পৌঁছে যেতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চে।

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর তেমনই একটি জায়গাÑ যেখানে একটি দেশের বক্তব্য শুধু শোনা হয় না, তার অগ্রাধিকার, উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ ভাবনাও আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সেই মঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাধ্যমে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে তিনি বাংলায় বক্তব্য দেন।

এটি ছিল তার প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ। ভাষণে তিনি একই সঙ্গে বৈশ্বিক সংকট এবং বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন। শান্তি, কূটনীতি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-বক্তব্যের পরিসর ছিল বিস্তৃত। তবে একটি রাষ্ট্রপ্রধানের আন্তর্জাতিক ভাষণের গুরুত্ব শুধু তিনি কী বললেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

আরও বড় প্রশ্ন হলোÑ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিজেকে বিশ্বের সামনে কীভাবে উপস্থাপন করতে চাইছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ভাষণের কয়েকটি দিক বিশেষভাবে সামনে আসে। বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির চাপ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।

এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী সংঘাতের সমাধানে সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার কথা বলেছেন তিনি। বাংলাদেশের জন্য এই অবস্থান নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন বক্তব্য নয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকার সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা ভূমিকা এবং নারীদের অংশগ্রহণের কথাও তুলে ধরেছেন। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য কূটনীতির জায়গাটি তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মতো দেশের কাছে শান্তি কেবল একটি নৈতিক অবস্থান নয়; এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের অন্যতম প্রধান বিষয় রোহিঙ্গা সংকট। জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনই এই সংকটের সমাধানের পথ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

এই সংকটের সবচেয়ে কঠিন দিক হলোÑ সময়। একটি অস্থায়ী মানবিক ব্যবস্থা যখন বছরের পর বছর স্থায়ী হয়, তখন তা শুধু শরণার্থী ব্যবস্থাপনার বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ত্রাণ সহায়তা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমারকেন্দ্রিক কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজনÑ এটাই বাংলাদেশের অবস্থানের কেন্দ্রীয় বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের কোনো দূরের বিপদ নয়। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিÑ এসবের সঙ্গে দেশের মানুষের জীবন বহুদিন ধরেই জড়িয়ে আছে।

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, অভিযোজন অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে পৃথক উচ্চপর্যায়ের আলোচনাতেও বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরেছে। কিন্তু জলবায়ু মোকাবিলা শুধু আন্তর্জাতিক অর্থায়নের দাবি জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দেশের নদী, খাল, জলাধার ও উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও সমান জরুরি।

ভাষণে খাল খনন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি সহযোগিতার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। এখানেই বাংলাদেশের জলবায়ু নীতির সঙ্গে উন্নয়ন পরিকল্পনার সম্পর্ক তৈরি হয়। পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আলাদা দুটি বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। আগামী দিনের বাংলাদেশে নদী বাঁচানো, কৃষি রক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখাÑ সবকিছুকেই একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অর্থনৈতিক রূপান্তর। বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশকে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি ডলারের বরাদ্দের কথাও ভাষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হওয়ার অর্থ শুধু কারখানার সংখ্যা বাড়ানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, বন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, লজিস্টিকস, ব্যাংকিং সুবিধা, দক্ষ শ্রমিক, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার সক্ষমতা। বাংলাদেশের সামনে এখানে বড় সুযোগ রয়েছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে হলে শুধু কম খরচে উৎপাদন যথেষ্ট হবে না। মান, সময়, প্রযুক্তি এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু জনসংখ্যার এই কাঠামো তখনই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হবে, যখন শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাস্তব সংযোগ তৈরি হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিকস এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু সনদনির্ভর রাখলে চলবে না। প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ। একই সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। নারীর কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতির পরিসর আরও বিস্তৃত হবে।

এই জায়গায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা, স্টার্টআপ, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রয়োজন আরও বাড়বে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সম্পর্ক গভীর। লাখ লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও বহু পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার কেবল সংখ্যার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। তাই ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সনদ এবং কাজের নিরাপত্তাÑ এসবকে অভিবাসন নীতির কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

জাতিসংঘের মঞ্চে একটি দেশের বক্তব্য কয়েক মিনিটের। কিন্তু তার বাস্তবায়নের সময় অনেক দীর্ঘ। এ কারণেই আন্তর্জাতিক ভাষণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় দেশের ভেতরে। তরুণের হাতে কাজ পৌঁছাল কি না, নারী নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না, কৃষক ন্যায্য বাজার পাচ্ছেন কি না, শিল্প উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পাচ্ছেন কি না, নদী ও খাল রক্ষা হচ্ছে কি না, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষ নিরাপদ হচ্ছে কি না-এসব প্রশ্নের উত্তরেই শেষ পর্যন্ত বোঝা যাবে একটি আন্তর্জাতিক বক্তব্য কতটা কার্যকর নীতিতে পরিণত হলো।

প্রধানমন্ত্রী ভাষণে বাংলাদেশের পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠনের জন্য ‘থ্রি-আর’-রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশনÑ কৌশলের কথা বলেছেন। এই তিনটি শব্দ তাই শুধু প্রশাসনিক পরিকল্পনার ভাষা নয়; এর সঙ্গে বাস্তব জীবনের প্রত্যাশার সম্পর্ক রয়েছে। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, অর্থনীতির ভিত্তি বিস্তৃত করা, মানবসম্পদ উন্নত করা এবং নাগরিকের আস্থা পুনর্গঠনÑ সবকিছুকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হয়।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক শান্তি থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে অভিবাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান থেকে শিল্পায়নÑ একটি দেশের বহুমাত্রিক বাস্তবতা উঠে এসেছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় এখন কেবল সাহায্যপ্রার্থী একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ একই সঙ্গে একটি শ্রমশক্তির দেশ, একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতি, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ভূখ-, বড় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর দেশ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র। এই বহুমাত্রিক পরিচয়কে কূটনীতিতে আরও সুসংহতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে একটি দেশের প্রভাব শুধু তার আয়তন বা অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

তার অবস্থান কতটা সুস্পষ্ট, তার স্বার্থ কতটা ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপিত এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেÑ সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন স্বর তাই শুধু একটি বক্তৃতার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের সামনে থাকা সুযোগ ও দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। নিউইয়র্কের সেই মঞ্চে বাংলাদেশের কথা উচ্চারিত হয়েছে।

এখন তার প্রতিধ্বনি শোনা দরকার দেশের মাঠে, কারখানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কৃষকের জীবনে, তরুণ উদ্যোক্তার স্বপ্নে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতায়। একটি বক্তৃতা তখনই দীর্ঘস্থায়ী অর্থ পায়, যখন তার অঙ্গীকার নীতিতে রূপ নেয়, নীতি বাস্তবায়নে যায় এবং বাস্তবায়নের সুফল মানুষের জীবনে পৌঁছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ যত দূরেই পৌঁছাক, তার প্রকৃত শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে দেশের মানুষের জীবনে।

সেই বাংলাদেশই হবে বিশ্বমঞ্চে উচ্চারিত কথার সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর।