আজ শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
১৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩০°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

কিশোর গ্যাং দমনে প্রয়োজন মূলহোতাদের শনাক্তকরণ

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:39:41 am, Friday, 2 October 2026
  • 8

কিশোর গ্যাং দমনে প্রয়োজন মূলহোতাদের শনাক্তকরণ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, থাকার কথা স্বপ্নের খাতা, অথচ সেই হাত যখন দলবদ্ধ সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি কিংবা অন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ঘটনাটিকে কেবল কিশোর অপরাধ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।

কারণ কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার আসলে একটি শিশুর নৈতিক পতনের গল্প নয়। এটি পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, অর্থনীতি, নগরজীবন, প্রযুক্তি, অপরাধীচক্র এবং ক্ষমতার সম্পর্কের সম্মিলিত ব্যর্থতার বহির্প্রকাশ। বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়। ২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরায় আদনান কবির হত্যাকা-ের পর ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে জনআলোচনায় আসে।

তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল কিশোরদের দলবদ্ধতা সব সময় নিছক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কখনো তা সংঘবদ্ধ অপরাধের কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের আগস্টে পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং এবং চার হাজারের বেশি সদস্যের কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ২৩৭টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।

সংখ্যার পার্থক্য দেখায়, দেশে কিশোর গ্যাংয়ের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে তথ্যভান্ডার ও সংজ্ঞাগত সামঞ্জস্য এখনো একটি বড় প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ কিশোররা গ্যাংয়ে ঢোকে কেন? প্রথম কারণটি অর্থনৈতিক। দারিদ্র্য একাই কাউকে অপরাধী বানায় না, কিন্তু অর্থনৈতিক বঞ্চনা যখন শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি বাড়ে।

বাংলাদেশে তরুণ অপরাধ নিয়ে গবেষণায় অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও শিক্ষার ঘাটতির সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় তরুণ বন্দিদের ৮০ শতাংশ অর্থনৈতিক সংকটকে অপরাধে জড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন; অন্য একটি জরিপে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক সমস্যা ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা তরুণদের সহিংসতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসে।

দ্বিতীয় সমীকরণ পরিবার। সন্তানকে শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেওয়া আর তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, অভিভাবকের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা অপরাধী পরিবেশ এসব একটি কিশোরকে বিকল্প ‘পরিবার’ খুঁজতে বাধ্য করতে পারে। গবেষণায় পারিবারিক বন্ধন ও তদারকির দুর্বলতা এবং পরিবারের অপরাধ-সম্পৃক্ততার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তৃতীয় সমীকরণ হলো ‘পরিচয়ের সংকট’। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন কিশোর নিজের অবস্থান ও সামাজিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পরিবার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি তাকে ইতিবাচক পরিচয়ের জায়গা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাস্তার দল, বড় ভাই বা গ্যাং তাকে ক্ষমতা, বন্ধুত্ব ও ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হওয়ার একটি কৃত্রিম অনুভূতি দিতে পারে।

ঢাকার কিশোর গ্যাং নিয়ে গবেষণায় বন্ধুত্ব, পরিচয় প্রকাশ, উত্তেজনা, সুরক্ষা ও আর্থিক লাভÑ এসবকে গ্যাংয়ে যুক্ত হওয়ার প্রেরণা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চতুর্থ সমীকরণ খেলার মাঠের সংকট। একটি শহর যখন ক্রমাগত ভবন, সড়ক ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় ভরে ওঠে কিন্তু শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও উন্মুক্ত সামাজিক পরিসর সংকুচিত হয়, তখন অবসর সময়ও একটি সামাজিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

ঢাকার কিশোর অপরাধ নিয়ে একটি গবেষণায় খেলার মাঠের অভাব, বড় ভাইয়ের প্রভাব এবং ইলেকট্রনিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারকে গ্যাং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পঞ্চম সমীকরণ প্রযুক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে অপরাধের কারণ নয়; কিন্তু এটি পরিচয় প্রদর্শন, দলীয় প্রভাব, সংঘাতের প্রচার এবং অপরাধকে ‘রোমাঞ্চকর’ হিসেবে উপস্থাপনের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বিশেষজ্ঞরা কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার কথা বলেছেন। ফলে সমস্যার সমাধান প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়; বরং ডিজিটাল নাগরিকত্ব, মিডিয়া লিটারেসি এবং অনলাইন আচরণ সম্পর্কে কিশোরদের সচেতন করা। ষষ্ঠ এবং সবচেয়ে জটিল সমীকরণ প্রাপ্তবয়স্কদের ছায়া। কিশোর গ্যাংকে শুধু ‘কিশোরদের দল’ হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

২০২৬ সালের একটি একাডেমিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশের কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে অপরাধী পরিবারের প্রভাব ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়; তাই প্রতিটি ঘটনায় নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করা ঠিক নয়। তবে যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীচক্র কিশোরদের ব্যবহার করে, সেখানে কেবল কিশোরকে আটক করলেই অপরাধের মূল কাঠামো ভাঙে না।

এখানেই আইন প্রয়োগের সঙ্গে সামাজিক নীতির পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ২০২১ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত অপরাধের তথ্য পর্যালোচনা করে কিশোর গ্যাংকে নগর এলাকার উদীয়মান আইনশৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্র হিসেবে রাস্তার সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ ও সাইবার অপরাধের কথা বলা হয়েছে।

কমিটি গোয়েন্দাভিত্তিক টহল, সিসিটিভি, অপরাধের হটস্পট শনাক্তকরণ এবং বিশেষায়িত ব্যবস্থার মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছে। তবে এখানেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থাকে কিশোর অপরাধ দমন কি কেবল অভিযাননির্ভর হবে, নাকি প্রতিরোধনির্ভরও হবে? কুমিল্লায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এক অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করার ঘটনা দেখিয়েছে, সমস্যাটির ব্যাপ্তি কতটা বড় হতে পারে।

পরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আটক কিশোরদের একটি বড় অংশকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ধরনের অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একজন কিশোর কেন গ্যাংয়ে গেল, তার স্কুলে ফেরার সুযোগ আছে কি না, পরিবার তাকে গ্রহণ করছে কি না এবং সে কোন সামাজিক পরিবেশে ফিরে যাচ্ছেÑ এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে একই সমস্যা অন্য নামে আবার ফিরে আসতে পারে।

অতএব কিশোর গ্যাং দমনের সমীকরণ হতে হবে বহুমাত্রিক। পুলিশের অভিযান থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং, ঝুঁকিপূর্ণ কিশোর শনাক্তকরণ, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি এবং অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি প্রতিটি কিশোর অপরাধী নয় এবং প্রতিটি দলবদ্ধ কিশোর গ্যাং সদস্যও একই মাত্রার অপরাধে জড়িত নয়। শিশু-কিশোরদের একবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলেই তাদের সারাজীবনের জন্য ‘অপরাধী’ পরিচয়ে আটকে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়। বরং সংশোধন, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও সামাজিক পুনঃএকীকরণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। কারণ একজন কিশোর আজ অপরাধের পথে গেলে তার দায় শুধু তার নিজের নয় তার পরিবার, বিদ্যালয়, পাড়া, নগরব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও সেখানে প্রশ্ন আছে।

আমরা যদি কেবল অপরাধ সংঘটনের পর কিশোরকে খুঁজে বের করি, তাহলে আমরা সমস্যার শেষ প্রান্তে পৌঁছাই; কিন্তু যদি জানতে চাইসে সেখানে পৌঁছাল কীভাবে তাহলে আমরা সমস্যার শুরুটা দেখতে পাব। কিশোর গ্যাং তাই পুলিশের একার সমস্যা নয় এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র তার কিশোরদের জন্য মাঠ তৈরি করতে পারে না, নিরাপদ সামাজিক পরিসর তৈরি করতে পারে না, পরিবারকে সহায়তা করতে পারে না এবং অপরাধীচক্রের প্রভাব থেকে তাদের সুরক্ষিত রাখতে পারে না সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কারাগার ও আদালতের ওপর চাপ বাড়াতে বাধ্য হয়।

আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক। তাকে ভয় পাওয়ার আগে তাকে বোঝা দরকার; তাকে শাস্তি দেওয়ার আগে তাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া কাঠামো চিহ্নিত করা দরকার। কারণ কিশোর গ্যাংয়ের হাতে যে অপরাধ দেখা যায়, তার শিকড় অনেক সময় কিশোরের হাতে নয় শিকড় ছড়িয়ে থাকে পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে, আর কখনো কখনো সেই অদৃশ্য প্রাপ্তবয়স্ক স্বার্থের ভেতরেও, যারা নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে কিশোর বয়সকে ব্যবহার করে।

সুতরাং কিশোর গ্যাং দমনের প্রকৃত সাফল্য কতজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হলোÑ শুধু সেই সংখ্যায় মাপা যাবে না। সাফল্যের প্রকৃত পরিমাপ হবে, কতজন কিশোরকে অপরাধে যাওয়ার আগেই ফিরিয়ে আনা গেল, কতটি পরিবারকে শক্তিশালী করা গেল, কতটি পাড়া নিরাপদ করা গেল এবং কতজন কিশোরকে গ্যাংয়ের পরিচয়ের বদলে শিক্ষা, দক্ষতা, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেওয়া গেল।

সেই জায়গাতেই বাংলাদেশের কিশোর গ্যাং সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আসল পরীক্ষা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

কিশোর গ্যাং দমনে প্রয়োজন মূলহোতাদের শনাক্তকরণ

Update Time : 07:39:41 am, Friday, 2 October 2026

একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, থাকার কথা স্বপ্নের খাতা, অথচ সেই হাত যখন দলবদ্ধ সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি কিংবা অন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ঘটনাটিকে কেবল কিশোর অপরাধ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।

কারণ কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার আসলে একটি শিশুর নৈতিক পতনের গল্প নয়। এটি পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, অর্থনীতি, নগরজীবন, প্রযুক্তি, অপরাধীচক্র এবং ক্ষমতার সম্পর্কের সম্মিলিত ব্যর্থতার বহির্প্রকাশ। বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়। ২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরায় আদনান কবির হত্যাকা-ের পর ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে জনআলোচনায় আসে।

তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল কিশোরদের দলবদ্ধতা সব সময় নিছক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কখনো তা সংঘবদ্ধ অপরাধের কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের আগস্টে পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং এবং চার হাজারের বেশি সদস্যের কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ২৩৭টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।

সংখ্যার পার্থক্য দেখায়, দেশে কিশোর গ্যাংয়ের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে তথ্যভান্ডার ও সংজ্ঞাগত সামঞ্জস্য এখনো একটি বড় প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ কিশোররা গ্যাংয়ে ঢোকে কেন? প্রথম কারণটি অর্থনৈতিক। দারিদ্র্য একাই কাউকে অপরাধী বানায় না, কিন্তু অর্থনৈতিক বঞ্চনা যখন শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি বাড়ে।

বাংলাদেশে তরুণ অপরাধ নিয়ে গবেষণায় অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও শিক্ষার ঘাটতির সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় তরুণ বন্দিদের ৮০ শতাংশ অর্থনৈতিক সংকটকে অপরাধে জড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন; অন্য একটি জরিপে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক সমস্যা ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা তরুণদের সহিংসতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসে।

দ্বিতীয় সমীকরণ পরিবার। সন্তানকে শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেওয়া আর তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, অভিভাবকের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা অপরাধী পরিবেশ এসব একটি কিশোরকে বিকল্প ‘পরিবার’ খুঁজতে বাধ্য করতে পারে। গবেষণায় পারিবারিক বন্ধন ও তদারকির দুর্বলতা এবং পরিবারের অপরাধ-সম্পৃক্ততার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তৃতীয় সমীকরণ হলো ‘পরিচয়ের সংকট’। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন কিশোর নিজের অবস্থান ও সামাজিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পরিবার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি তাকে ইতিবাচক পরিচয়ের জায়গা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাস্তার দল, বড় ভাই বা গ্যাং তাকে ক্ষমতা, বন্ধুত্ব ও ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হওয়ার একটি কৃত্রিম অনুভূতি দিতে পারে।

ঢাকার কিশোর গ্যাং নিয়ে গবেষণায় বন্ধুত্ব, পরিচয় প্রকাশ, উত্তেজনা, সুরক্ষা ও আর্থিক লাভÑ এসবকে গ্যাংয়ে যুক্ত হওয়ার প্রেরণা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চতুর্থ সমীকরণ খেলার মাঠের সংকট। একটি শহর যখন ক্রমাগত ভবন, সড়ক ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় ভরে ওঠে কিন্তু শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও উন্মুক্ত সামাজিক পরিসর সংকুচিত হয়, তখন অবসর সময়ও একটি সামাজিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

ঢাকার কিশোর অপরাধ নিয়ে একটি গবেষণায় খেলার মাঠের অভাব, বড় ভাইয়ের প্রভাব এবং ইলেকট্রনিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারকে গ্যাং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পঞ্চম সমীকরণ প্রযুক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে অপরাধের কারণ নয়; কিন্তু এটি পরিচয় প্রদর্শন, দলীয় প্রভাব, সংঘাতের প্রচার এবং অপরাধকে ‘রোমাঞ্চকর’ হিসেবে উপস্থাপনের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বিশেষজ্ঞরা কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার কথা বলেছেন। ফলে সমস্যার সমাধান প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়; বরং ডিজিটাল নাগরিকত্ব, মিডিয়া লিটারেসি এবং অনলাইন আচরণ সম্পর্কে কিশোরদের সচেতন করা। ষষ্ঠ এবং সবচেয়ে জটিল সমীকরণ প্রাপ্তবয়স্কদের ছায়া। কিশোর গ্যাংকে শুধু ‘কিশোরদের দল’ হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

২০২৬ সালের একটি একাডেমিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশের কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে অপরাধী পরিবারের প্রভাব ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়; তাই প্রতিটি ঘটনায় নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করা ঠিক নয়। তবে যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীচক্র কিশোরদের ব্যবহার করে, সেখানে কেবল কিশোরকে আটক করলেই অপরাধের মূল কাঠামো ভাঙে না।

এখানেই আইন প্রয়োগের সঙ্গে সামাজিক নীতির পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ২০২১ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত অপরাধের তথ্য পর্যালোচনা করে কিশোর গ্যাংকে নগর এলাকার উদীয়মান আইনশৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্র হিসেবে রাস্তার সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ ও সাইবার অপরাধের কথা বলা হয়েছে।

কমিটি গোয়েন্দাভিত্তিক টহল, সিসিটিভি, অপরাধের হটস্পট শনাক্তকরণ এবং বিশেষায়িত ব্যবস্থার মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছে। তবে এখানেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থাকে কিশোর অপরাধ দমন কি কেবল অভিযাননির্ভর হবে, নাকি প্রতিরোধনির্ভরও হবে? কুমিল্লায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এক অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করার ঘটনা দেখিয়েছে, সমস্যাটির ব্যাপ্তি কতটা বড় হতে পারে।

পরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আটক কিশোরদের একটি বড় অংশকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ধরনের অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একজন কিশোর কেন গ্যাংয়ে গেল, তার স্কুলে ফেরার সুযোগ আছে কি না, পরিবার তাকে গ্রহণ করছে কি না এবং সে কোন সামাজিক পরিবেশে ফিরে যাচ্ছেÑ এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে একই সমস্যা অন্য নামে আবার ফিরে আসতে পারে।

অতএব কিশোর গ্যাং দমনের সমীকরণ হতে হবে বহুমাত্রিক। পুলিশের অভিযান থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং, ঝুঁকিপূর্ণ কিশোর শনাক্তকরণ, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি এবং অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি প্রতিটি কিশোর অপরাধী নয় এবং প্রতিটি দলবদ্ধ কিশোর গ্যাং সদস্যও একই মাত্রার অপরাধে জড়িত নয়। শিশু-কিশোরদের একবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলেই তাদের সারাজীবনের জন্য ‘অপরাধী’ পরিচয়ে আটকে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়। বরং সংশোধন, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও সামাজিক পুনঃএকীকরণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। কারণ একজন কিশোর আজ অপরাধের পথে গেলে তার দায় শুধু তার নিজের নয় তার পরিবার, বিদ্যালয়, পাড়া, নগরব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও সেখানে প্রশ্ন আছে।

আমরা যদি কেবল অপরাধ সংঘটনের পর কিশোরকে খুঁজে বের করি, তাহলে আমরা সমস্যার শেষ প্রান্তে পৌঁছাই; কিন্তু যদি জানতে চাইসে সেখানে পৌঁছাল কীভাবে তাহলে আমরা সমস্যার শুরুটা দেখতে পাব। কিশোর গ্যাং তাই পুলিশের একার সমস্যা নয় এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র তার কিশোরদের জন্য মাঠ তৈরি করতে পারে না, নিরাপদ সামাজিক পরিসর তৈরি করতে পারে না, পরিবারকে সহায়তা করতে পারে না এবং অপরাধীচক্রের প্রভাব থেকে তাদের সুরক্ষিত রাখতে পারে না সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কারাগার ও আদালতের ওপর চাপ বাড়াতে বাধ্য হয়।

আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক। তাকে ভয় পাওয়ার আগে তাকে বোঝা দরকার; তাকে শাস্তি দেওয়ার আগে তাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া কাঠামো চিহ্নিত করা দরকার। কারণ কিশোর গ্যাংয়ের হাতে যে অপরাধ দেখা যায়, তার শিকড় অনেক সময় কিশোরের হাতে নয় শিকড় ছড়িয়ে থাকে পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে, আর কখনো কখনো সেই অদৃশ্য প্রাপ্তবয়স্ক স্বার্থের ভেতরেও, যারা নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে কিশোর বয়সকে ব্যবহার করে।

সুতরাং কিশোর গ্যাং দমনের প্রকৃত সাফল্য কতজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হলোÑ শুধু সেই সংখ্যায় মাপা যাবে না। সাফল্যের প্রকৃত পরিমাপ হবে, কতজন কিশোরকে অপরাধে যাওয়ার আগেই ফিরিয়ে আনা গেল, কতটি পরিবারকে শক্তিশালী করা গেল, কতটি পাড়া নিরাপদ করা গেল এবং কতজন কিশোরকে গ্যাংয়ের পরিচয়ের বদলে শিক্ষা, দক্ষতা, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেওয়া গেল।

সেই জায়গাতেই বাংলাদেশের কিশোর গ্যাং সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আসল পরীক্ষা।