আফগানিস্তানের আকাশে আবারও দেখা দিয়েছে যুদ্ধের ছায়া। প্রতিবেশী দেশটির কুনার ও হেলমান্দ প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলায় হতাহতের ঘটনা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে ইসলামাবাদ ও কাবুল। পাকিস্তান বলছে, সীমান্তের ওপারে সশস্ত্র গোষ্ঠীর দুটি শিবির ও গোপন আস্তানায় চালানো অভিযানে ২২ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার বলছে, হামলায় বেসামরিক মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে এবং নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছে। দুই পক্ষের কোনো দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সময় বুধবার গভীর রাতে কুনার ও হেলমান্দ প্রদেশে এসব বিমান হামলা চালানো হয়। আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, কুনারের শুলতান জেলার চুগাম এবং হেলমান্দের গারমসের এলাকায় হামলা হয়েছে।
তার দাবি, হামলায় তিনটি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। নিহত ও আহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের বিমান হামলা ছিল পরিকল্পিত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক। ‘নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের’ ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্বাচন করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ। তাদের ভাষ্য, আফগানিস্তানের দুটি স্থানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্যবহৃত শিবির ও গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে সেখানে ২২ জন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ওই সব স্থানে মজুত থাকা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ধ্বংস করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের দাবি, অভিযান পরিচালনার সময় বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল। দেশটির বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল সীমান্তের ওপার থেকে পাকিস্তানে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি।
ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের মাটিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী আশ্রয় পাচ্ছে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানের ভূখ-ে হামলা চালানো হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে কাবুল। তালেবান সরকারের বক্তব্য, আফগানিস্তানের মাটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আস্তানায় হামলার নামে পাকিস্তান বেসামরিক মানুষের বসতবাড়িকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় হামলার নিন্দা জানিয়ে একে আগ্রাসন ও স্বীকৃত নীতির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, হামলায় নিহত ৯ জনই বেসামরিক নাগরিক এবং আহত হয়েছে আরও ১১ জন। হতাহতের সংখ্যা নিয়েও দুই দেশের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। পাকিস্তান যেখানে ২২ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হওয়ার কথা বলছে, আফগানিস্তান সেখানে নারী ও শিশুসহ ৯ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার দাবি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দুই পক্ষের দাবির কোনোটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে হামলায় প্রকৃতপক্ষে কতজন নিহত বা আহত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এই হামলা এমন এক সময়ে হলো, যখন কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্ত অবস্থার পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় সীমান্তঘেঁষা এলাকায় সশস্ত্র হামলা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বেড়েছে।
পাকিস্তান এসব হামলার জন্য আফগান ভূখ-ে অবস্থানকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করছে। অন্যদিকে তালেবান সরকার বলছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তাজনিত সমস্যার জন্য আফগানিস্তানকে দায়ী করা ঠিক নয় এবং তারা প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে নিজেদের ভূখ- ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে না। এর আগে গত কয়েক সপ্তাহেও আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানের বিমান হামলার অভিযোগ উঠেছে।
কাবুলের অভিযোগ, এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। ইসলামাবাদ অবশ্য প্রতিবারই বলেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি। ফলে সীমান্তের দুই পাশে হামলার পরপরই তৈরি হচ্ছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, আর প্রকৃত হতাহতের তথ্য নিয়ে থেকে যাচ্ছে অনিশ্চয়তা। জাতিসংঘের আফগানিস্তানবিষয়ক মিশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সীমান্তপারের সহিংসতায় আফগানিস্তানে এক হাজার একশর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে।
সীমান্তে সংঘাত ও পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। নতুন এই বিমান হামলার পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার পুরোনো বিরোধ আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে ইসলামাবাদ সীমান্তপারের সশস্ত্র হামলা ঠেকাতে অভিযান চালানোর কথা বলছে, অন্যদিকে কাবুল এসব হামলাকে নিজেদের ভূখ-ের ওপর সামরিক আগ্রাসন হিসেবে দেখছে।
ফলে সীমান্তে উত্তেজনা কমার বদলে তা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছেÑ পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী হামলার লক্ষ্য সত্যিই সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি ছিল, নাকি আফগানিস্তানের অভিযোগ অনুযায়ী বেসামরিক বসতিতে আঘাত হেনেছে বিমানগুলো। স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত থাকায় এর নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে স্পষ্ট, সীমান্তের উত্তেজনা আবারও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে।






















