রাজধানীর একটি স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠান থেকে পরামর্শ নিয়ে প্রায় ১৭ বছর আগে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ শেষ করে সেখানেই পেশাগত জীবন শুরু করেন প্রভাংশু কুমার মজুমদার। বর্তমানে ইউকেতে সুপ্রতিষ্ঠিত বাঙালিদের একজন তিনি। অন্যদিকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়ে সম্প্রতি কয়েকশ শিক্ষার্থীর কাছে থেকে ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে ‘জাস্ট থট এডুকেশন’ ও ‘ভিসা গাইড’ নামে দুটি স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান দুটি অন্য নামের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারেও টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। এর আগে বিএসবি গ্লোবাল, এসএসবিসিএলসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগে মামলা হয়েছে। বিদেশে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়ে এমন প্রতারণা দীর্ঘদিন ধরে চললেও যেসব ঘটনা মামলা-হামলা পর্যন্ত গড়াচ্ছে, শুধু সেগুলোই জানা যাচ্ছে। বাকিগুলো আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে। আবার বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মাফিক টিউশন ফি পাঠানো হলেও ভিসাও হয়নি, টাকাও পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা- এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে দেশের শিক্ষার্থীদের বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজধানীসহ দেশের সব বড় শহরে কার্যক্রম চালাচ্ছে ‘বিদেশে পড়াশোনার জন্য পরামর্শ কেন্দ্র’ বা ‘স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং’ নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ক্ষেত্রেবিশেষে উপকৃত হলেও প্রতারণা করে শিক্ষার্থীদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। নামসর্বস্ব একশ্রেণির এসব প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে তাদের বিজ্ঞাপনে পড়শোনার জন্য শতভাগ স্টুডেন্ট ভিসার গ্যারান্টি, স্টুডেন্ট ভিসায় পরিবারসহ যাওয়ার সুযোগ, নিশ্চিত স্কলারশিপ, পড়াশোনার সময় খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ, পড়া শেষে ফ্যামিলিসহ স্থায়ী বসবাসের সুযোগ ইত্যাদি প্রলোভন দিয়ে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার ফাঁদ পাতে। বিদেশে যাওয়া এবং উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর শিক্ষার্থীরা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ভিড়ে ভালো-মন্দের বিচার করতে বিভ্রান্ত হয়। এ যেন অনেকটা ‘ঠক বাছতে গাঁ উজাড়’-এর মতো পরিস্থিতি। অন্যদিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। ফলে লাগামছাড়া প্রতারণারও অবাধ সুযোগ পাচ্ছে প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কারণে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা সার্বিকভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই খাতকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদেশে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দ্রুত এই খাতকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অসংখ্য প্রতিষ্ঠান : প্রতারণা ও বিপত্তি একসময় দেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে প্রধান গন্তব্য ছিল ভারত ও রাশিয়া। আশির দশক থেকে সীমিত আকারে যুক্তরাজ্য এবং পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়ার চর্চা শুরু হয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশ করছে দেশের শিক্ষার্থীরা। আগে তেমন চর্চা না থাকলেও শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশে যাওয়ার চাহিদা বাড়ায় পড়াশোনা, ভিসা প্রক্রিয়া, আবাসন, চাকরির সুযোগ ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য রাজধানীকেন্দ্রিক গড়ে ওঠে স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে গত কয়েক বছরে এই কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কাজ করে প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে দেশে কতটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সে সম্পর্কে সরকারের কাছে তথ্য নেই। তবে স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাসোসিয়েশন ‘ফরেন অ্যাডমিশন অ্যান্ড ক্যারিয়ার ডেভলপমেন্ট কনসালট্যান্টস অব বাংলাদেশ-ফ্যাড ক্যাব’-এর সদস্য ৫৬০টি। এর বাইরে আরো ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে ধারণা ফ্যাড-ক্যাব সূত্রের। ফ্যাড-ক্যাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত সংগঠন। সম্প্রতি জাস্ট থট এডুকেশন ও ভিসা গাইড নামে যে প্রতিষ্ঠান দুটি শিক্ষার্থীদের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তারা ফ্যাড-ক্যাবের সদস্য না হওয়ায় অ্যাসোসিয়েশন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ফ্যাড-ক্যাবের প্রেসিডেন্ট মো. জুলফিকার আলী জুয়েল। তবে প্রতারণার অভিযোগে ফ্যাড-ক্যাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এদিকে রাজধানীর পান্থপথের ড্রিমল্যান্ড স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় ১০-১৫টি প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ কোরিয়ার বেসরকারি শিনগুয়াংজু বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২০ শিক্ষার্থীর টিউশন ফি বাবদ ১৮ কোটি টাকা পাঠায় ব্যাকিং চ্যানেলে। ফ্যাড-ক্যাবের সদস্য ড্রিমল্যান্ড প্রতিষ্ঠানটির ২৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২২ জনই ভিসা পায়নি। তবে ভিসা না পেলেও টিউশন ফির টাকা ফেরত আনতে প্রায় চার মাস ধরে ঘুরতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। টাকা ফেরত চেয়ে ফ্যাড-ক্যাবের কাছেও অভিযোগ করেছেন ড্রিমল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি স্বীকার করে ড্রিমল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী আব্দুর রউফ বলেন, ‘আমরা সব নিয়মমাফিক করেছি। যেহেতু মার্চ ইনটেকে এই ভর্তির কাজ হয়েছে, তাই টাকা ফেরত আসতে সময় লাগছে।’ এখন বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি দেখছে বলে তিনি জানান। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সে দেশে আইনি সমস্যা থাকায় শিক্ষার্থীদের টাকা পাওয়া সময় সাপেক্ষ। এতে বিপত্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক নারী স্বামী-সন্তানহ শিক্ষার্থী ভিসায় কানাডায় যাওয়ার জন্য জাস্ট থট এডুকেশনের অফিসে ২০ লাখ টাকা দেন। কিন্তু ভিসা না হওয়ায় তিনি টাকা ফেরত চান। এর মধ্যেই একদিন তিনি দেখতে পান জাস্ট থট এডুকেশন তাদের নদ্দা ও বনানীর অফিসে তালা দিয়ে পালিয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা, স্কুলিং ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের স্বপ্ন দেখিয়ে শত শত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকে অন্তত ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে জাস্ট থট এডুকেশন ও ভিসা গাইডের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে এই প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে দুটি করে চারটি মামলা হয়েছে উত্তরা-পূর্ব ও ভাটারা থানায়। মামলাগুলো ইতিমধ্যে ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে জানিয়ে ভাটারা থানার ওসি মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘জাস্ট থটের মতিয়ার ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে। পুলিশ যখন অভিযানে যায়, তার মাত্র আধা ঘণ্টা পরেই অস্ট্রেলিয়ার ফ্লাইটে তার পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।’ ভুক্তভোগী, শিক্ষার্থী ও স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে পত্র-পত্রিকা ও ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন, শিক্ষামেলা, প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ করা সাব-এজেন্ট ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত পরিচয় সূত্রে। শিক্ষার্থী সংগ্রহের ওপর কমিশনের ভিত্তিতে সাব-এজেন্টরা কাজ করে থাকেন। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ডের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি না থাকায় ‘যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে কাজ করছে’ প্রতিষ্ঠানগুলো। বিদেশের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও নামসর্বস্ব প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করে বলে অভিযোগ করে সূত্র জানায়, মাল্টার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক টিউশন ফির টাকা না নিয়েও ‘পেইড’ লিখে দেয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা টাকা দিয়েছে বলে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে নেয়। ভিসা হলে কোনো সমস্যা হয় না, ভিসা না হলেই জটিলতা বাড়ে। সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা ও স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন ফ্যাড-ক্যাবের প্রেসিডেন্ট মো. জুলফিকার আলী জুয়েল। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘কিছু প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো ট্রেড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে একটি বিশাল অঙ্কের রেমিটেন্স দেশে আলেও এই খাত গুরুত্ব না পাওয়ায় অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক উভয়ভাবে দেশের ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতারণা ঠেকানোর বিষয়ে ফ্যাড-ক্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি এবং ডিসিপ্লিনারি কমিটির চেয়ারম্যান ও আইবিএম এডুকেশন সার্ভিসের প্রধান নির্বাহী মো. বশির আহমেদ বলেন, ‘ফ্যাড-ক্যাবের যারা সদস্য, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেই। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। তবে যারা সদস্য নয়, তাদের ক্ষেত্রে কিছু করার থাকে না।’ স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং নিয়ে এমন সমস্যার মধ্যেও নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ইউকেতে যেতে সাহায্য করা প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রভাংশু কুমার মজুমদার বলেন, ‘শিক্ষার্থীর সুরক্ষা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি।’ নিয়ন্ত্রণকাঠামো না থাকায় বাড়ছে অনিয়ম বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে বিদেশে শিক্ষা বাবদ বাংলাদেশ থেকে ব্যয় হওয়া অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে খরচ হয়েছে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ১০ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৪ টাকা হিসাবে)। অথচ বিদেশে পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে প্রথম থেকেই কার্যকর কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একাধিকবার এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ব্যবস্থাপনায় আনার পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনা থেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৩৫ নং আইন)-এর ধারা ৫০, ধারা ৩ ও ৩৯ অনুযায়ী বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা, ২০১৪, যা সংক্ষেপে সিবিএইচই (ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন) প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিমালা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ইউজিসির সাবেক একটি সূত্র জানায়, বিধিমালার প্রাথমিক খসড়ায় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার পরিচালনার পাশাপাশি স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি নিয়ন্ত্রণকাঠামো রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত করার সময় কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের স্বার্থে স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সিন্ডিকেট খসড়া বিধিমালায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করা থেকে বিরত থাকে। ফলে লাগামহীনভাবেই চলছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ বিষয়ে ইউজিসির সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, এ খাতের অরাজকতার কারণে একসময় শিক্ষামেলা আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে শিক্ষামেলা করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির অনুমোদন নিতে হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ম আর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে এখন প্রায় প্রতি মাসেই রাজধানীসহ সারা দেশে খ্যাত-অখ্যাত, ছোট-বড় অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করে কমিউনিটি সেন্টারে, নিজস্ব অফিস চত্বরে অথবা বড় কোনো হোটেলে শিক্ষামেলার আয়োজন করছে। অথচ সিবিএইচই বিধিমালার ১৮ নম্বর ধারায় ‘শিক্ষামেলা, সেমিনার ইত্যাদি আয়োজনে বিধিনিষেধ’ শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘এই বিধিমালার অধীন সাময়িক অনুমতিপত্র বা সনদপত্র পাওয়া শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য শিক্ষামেলা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদির আয়োজন কিংবা প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে কোনো ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করিতে পারবে না।’ তবে যেহেতু বিধিমালাটি শুধু বিদেশি বিশ^বিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টারের জন্য করা, তাই এর বিধান স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। যা বলছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী বলেন, ‘এদের ধরার বিষয়ে বর্তমানে কোনো “টুলস” নেই। এর জন্য ক্রসবর্ডার হায়ার এডুকেশনের বিষয়ে নতুন করে কৌশল প্রণয়ন ও নীতিমালা করে অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে। ইউজিসির মাধ্যমে এটি করার পরিকল্পনা রয়েছে।’ বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ইউজিসির মুখপাত্র ও সদস্য প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিষয়টি আমি কিছুটা জানি, তবে এখনো বিস্তারিত দেখিনি। তবে যেকোনো বিষয় নীতিমালা অনুযায়ী আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করাই বাঞ্ছনীয়।’ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার বিষয়টি তত্ত্বাবধান করে ইউজিসির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগ। এই বিভাগের পরিচালক মোছা. জেসমিন পারভীন কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর লাগামছাড়া কর্মকাণ্ডকে ‘ভয়াবহ অবস্থা’ মন্তব্য করে বলেন, ‘অবশ্যই নিয়মের মধ্যে আনা দরকার। এই মুহূর্তে ইউজিসির সেই এখতিয়ার নাই।’ তবে এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটাও ইউজিসির পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বলে জানান তিনি।
12:24 am, Sunday, 2 August 2026
শিরোনাম :

























