7:39 am, Sunday, 2 August 2026

অন্ধকার পেরিয়ে আলোর অভিসার

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:01:41 am, Saturday, 1 August 2026
  • 7
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মানবজীবনের গতিপথ সরলরেখায় চলে না। আলো ও অন্ধকারের নিরন্তন আবর্তনে সুখ, সংকট, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার নানা ঝোড়ো হাওয়া আমাদের প্রশান্ত মনকে তোলপাড় করে দেয়। এমন অস্থিতিশীল মুহূর্তে মানুষের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জীবনের চরম প্রতিকূলতায় অবিচল থাকার আধ্যাত্মিক হাতিয়ার হলো তাওয়াক্কুল বা মহান আল্লাহর ওপর পরম ভরসা। ইসলামের পরিভাষায় তাওয়াক্কুল কেবল একটি নিঃসঙ্গ গুণ নয়, বরং এটি মানববিশ্বাসের অর্ধাংশ এবং ইমানের পরম পরিণতি। সুরা ফাতিহার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের হৃদয়কে এই বাণীতে পুনরুজ্জীবিত করতে শিখিয়েছেন ‘আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’ আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি ‘একমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্য চাওয়া’কে পূর্ণতা দেওয়াই হলো তাওয়াক্কুলের প্রকৃত সারমর্ম। তাওয়াক্কুল হলো শারীরিক সক্রিয়তা ও আত্মিক নির্ভরতার এমন এক অপূর্ব মেলবন্ধন, যা মানুষকে জাগতিক নিখিল থেকে মুক্ত করে পরম রবের সঙ্গে সংযুক্ত করে। পবিত্র কোরআনের অগণিত আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাওয়াক্কুলকে ইমান ও ইসলামের অপরিহার্য সত্য হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। হজরত মুসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে সংকট মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর ওপর ইমান এনে থাকো, তবে তার ওপরই তাওয়াক্কুল করো; যদি তোমরা প্রকৃতই মুসলিম হয়ে থাকো।’ অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অনুগত বান্দাদের মর্যাদা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ সুতরাং, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখা কেবল কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি অন্তরের ইমানের অস্তিত্বের প্রধান প্রমাণ। জীবনের চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার মুহূর্তে যখন সমস্ত জাগতিক মাধ্যম নিষ্ফলা প্রমাণিত হয়, তখন কেবল তাওয়াক্কুলে পরিপূর্ণ একটি হৃদয়ই পারে পর্বতের মতো অবিচল থেকে পরম রবের ওপর নিশ্চিন্ত ভরসা রাখতে। নবী ও রাসুলগণের পবিত্র জীবনীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ ও পরম রূপটি তাঁদের জীবনেই প্রতিফলিত হয়েছিল। তাওয়াক্কুল তাঁদের কেবল মানসিক শক্তি দেয়নি, বরং বিশ্বনিয়ন্তার অলৌকিক সাহায্যকেও তাঁদের কাছে টেনে এনেছে। যখন ইবরাহিমকে (আ.) নমরুদের তৈরি অগ্নিকু-ে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর বাঁচার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু তাঁর অন্তরে ছিল তাওয়াক্কুলের প্রজ্বলিত দীপশিখা। তিনি কোনো মানুষের সাহায্য না চেয়ে উচ্চারণ করেছিলেন ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল’ (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম অভিভাবক)। আর এই পরম তাওয়াক্কুলের প্রতিদান হিসেবে মহান আল্লাহ সেই প্রচ- আগুনকে হজরত ইবরাহিমের (আ.) জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক বানিয়ে দিয়েছিলেন। একইভাবে ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় মুহূর্তে হজরত মুসা (আ.) যখন একপাশে ফেরাউনের বিশাল ও পরাক্রমশালী সেনাবাহিনী আর অন্যপাশে উত্তাল লোহিত সাগরের মাঝখানে আটকা পড়েছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গীরা দিশেহারা হয়ে আকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠেছিল, ‘আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেলাম!’ কিন্তু হজরত মুসা (আ.)-এর হৃদয়ে ছিল মহান রবের ওপর অটুট ও অবিচল আস্থা। তিনি মুহূর্তের জন্যও বিচলিত না হয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন, ‘কখনোই নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন, তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন।’ আর ঠিক তার পরমুহূর্তেই সাগরের বুক চিরে অলৌকিক পথ তৈরি হয়ে যায়। এই যে জাগতিক কোনো উপায় না থাকা সত্ত্বেও ভেতরের এই অকল্পনীয় স্থিরতা, এটিই হলো তাওয়াক্কুলের আসল মহিমা। হাদিসের পাতায় ও নবুয়তের ইতিহাসে এই তাওয়াক্কুলের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখতে পাই সাইয়্যিদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জীবনে। হিজরতের সেই সংকটময় মুহূর্তে, ছওর গুহার নিভৃত প্রকোষ্ঠে যখন নবীজি (সা.) এবং তাঁর পরম বিশ্বস্ত সাথী হজরত আবু বকর (রা.) আত্মগোপন করে ছিলেন, তখন বাইরে শত্রুর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। হজরত আবু বকর (রা.) ব্যাকুল ও শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন এই ভেবে যে, শত্রুরা একটু নিচু হয়ে তাকালেই তাদের দেখে ফেলবে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) পরম শান্ত ও সৌম্য কণ্ঠে তাঁকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ এই আত্মবিশ্বাস ও প্রশান্তি কোনো বাহ্যিক সেনাবাহিনী বা অস্ত্রের শক্তিতে আসেনি; এটি এসেছিল তাওয়াক্কুলে পরিপূর্ণ ঐশী হৃদয় থেকে, যা মহান আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতিকে অনুধাবন করতে পারছিল। তবে তাওয়াক্কুলের ধারণা নিয়ে সমাজে বিরাট ভুল বোঝাবুঝি বা বিভ্রান্তি বিরাজমান। অনেকেই মনে করেন, তাওয়াক্কুল মানে হলো নিজের চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং ফয়সালার অপেক্ষা করা। ইসলামে তাওয়াক্কুলের এটি সম্পূর্ণ ভুল ও বিকৃত রূপ। তাওয়াক্কুল হলো মানুষের মানসিকতার ও চিন্তার এক বিশেষ ফ্রেম বা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি। পবিত্র কোরআনে এটি অত্যন্ত সংক্ষেপে ফুটে উঠেছে ‘আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন, তা ব্যতীত আমাদের সঙ্গে অন্য কিছুই ঘটবে না; তিনিই আমাদের অভিভাবক।’ এর অর্থ হলো, আপনার শরীর ও হাত-পা বাহ্যিক জাগতিক চেষ্টা চালিয়ে যাবে, কিন্তু আপনার অন্তর আটকে থাকবে কেবল আল্লাহর সঙ্গে। মানুষের কাজ হলো উপায় অবলম্বন করা, আর ফলাফলের জন্য নির্ভর করা আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর। এই ভারসাম্যপূর্ণ দর্শনের বাস্তব উদাহরণ আমরা মহানবী (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিসটিতে দেখতে পাই। এক বেদুইন এসে নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে তার উটটি বাঁধবে নাকি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে ছেড়ে দেবে? জবাবে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘আগে তোমার উটটি বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।’ অর্থাৎ, সাধ্যের মধ্যে থাকা সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বা মাধ্যম গ্রহণ করাটা ইসলামেরই নির্দেশ। যেমন, আপনি অসুস্থ হলে অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাবেন, সঠিক চিকিৎসা নেবেন, ওষুধ খাবেন; এগুলো সবই শরীর ও বাহ্যিক চেষ্টার অংশ। কিন্তু আপনার পরম বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল ডাক্তারের অভিজ্ঞতা বা ওষুধের ওপর থাকবে না; তা থাকবে নিরাময়কারী মহান আল্লাহর ওপর। একইভাবে একজন কৃষক একটি উন্নত খামার বা ফসল ফলাতে চাইলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, জমি চাষ করবে, বীজ রোপণ করবে এবং সময়মতো সেচ দেবে। কিন্তু সে বিশ্বাস রাখবে যে, ফসলে জীবন দেওয়া, বাতাস ও বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ফলন দান করা একমাত্র আল্লাহর কাজ; নিজের চেষ্টার বাহাদুরি নয়। সুতরাং তাওয়াক্কুল মানুষকে অলস বা নিষ্ক্রিয় করে না, বরং এটি মানুষকে দায়িত্বশীল ও কর্মঠ করার সঙ্গে সঙ্গে ফলের অনিশ্চয়তাজনিত মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়। যখন একজন মানুষ তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়, তখন সফলতা এলেও সে অহংকারী হয় না, আবার ব্যর্থতা এলেও সে হতাশায় ভেঙে পড়ে না। যেকোনো পরিবর্তন ও আত্মিক বিপ্লবের সূচনা হয় মানুষের চিন্তার জগত থেকে। বর্তমানে মানসিক অস্থিরতা, হতাশা ও চরম দুশ্চিন্তার অন্যতম মূল কারণ হলো আমাদের অন্তরের সঙ্গে জাগতিক মাধ্যমের অতিরিক্ত জোড়াসোড়া। আমরা ফলাফলকে নিজেদের ক্ষুদ্র চেষ্টার ওপর শতভাগ নির্ভরশীল মনে করি, যার ফলে ব্যর্থতায় আমাদের হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। আমরা যদি সুরা ফাতিহার সেই শাশ্বত শিক্ষার আলোকে নিজেদের জীবন পুনর্গঠন করতে পারি এবং ইবাদতের পাশাপাশি ‘একমাত্র আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা’ অর্থাৎ তাওয়াক্কুলকে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে ধারণ করতে পারি, তবেই আমাদের অন্তর লাভ করবে পরম স্থিরতা। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে জাগতিক সাধ্যমতো চেষ্টা করার পর ফলাফলের ক্ষেত্রে তাঁর সুমহান সত্তার ওপর পূর্ণাঙ্গ তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

অন্ধকার পেরিয়ে আলোর অভিসার

Update Time : 03:01:41 am, Saturday, 1 August 2026

মানবজীবনের গতিপথ সরলরেখায় চলে না। আলো ও অন্ধকারের নিরন্তন আবর্তনে সুখ, সংকট, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার নানা ঝোড়ো হাওয়া আমাদের প্রশান্ত মনকে তোলপাড় করে দেয়। এমন অস্থিতিশীল মুহূর্তে মানুষের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জীবনের চরম প্রতিকূলতায় অবিচল থাকার আধ্যাত্মিক হাতিয়ার হলো তাওয়াক্কুল বা মহান আল্লাহর ওপর পরম ভরসা। ইসলামের পরিভাষায় তাওয়াক্কুল কেবল একটি নিঃসঙ্গ গুণ নয়, বরং এটি মানববিশ্বাসের অর্ধাংশ এবং ইমানের পরম পরিণতি। সুরা ফাতিহার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের হৃদয়কে এই বাণীতে পুনরুজ্জীবিত করতে শিখিয়েছেন ‘আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’ আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি ‘একমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্য চাওয়া’কে পূর্ণতা দেওয়াই হলো তাওয়াক্কুলের প্রকৃত সারমর্ম। তাওয়াক্কুল হলো শারীরিক সক্রিয়তা ও আত্মিক নির্ভরতার এমন এক অপূর্ব মেলবন্ধন, যা মানুষকে জাগতিক নিখিল থেকে মুক্ত করে পরম রবের সঙ্গে সংযুক্ত করে। পবিত্র কোরআনের অগণিত আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাওয়াক্কুলকে ইমান ও ইসলামের অপরিহার্য সত্য হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। হজরত মুসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে সংকট মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর ওপর ইমান এনে থাকো, তবে তার ওপরই তাওয়াক্কুল করো; যদি তোমরা প্রকৃতই মুসলিম হয়ে থাকো।’ অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অনুগত বান্দাদের মর্যাদা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ সুতরাং, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখা কেবল কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি অন্তরের ইমানের অস্তিত্বের প্রধান প্রমাণ। জীবনের চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার মুহূর্তে যখন সমস্ত জাগতিক মাধ্যম নিষ্ফলা প্রমাণিত হয়, তখন কেবল তাওয়াক্কুলে পরিপূর্ণ একটি হৃদয়ই পারে পর্বতের মতো অবিচল থেকে পরম রবের ওপর নিশ্চিন্ত ভরসা রাখতে। নবী ও রাসুলগণের পবিত্র জীবনীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ ও পরম রূপটি তাঁদের জীবনেই প্রতিফলিত হয়েছিল। তাওয়াক্কুল তাঁদের কেবল মানসিক শক্তি দেয়নি, বরং বিশ্বনিয়ন্তার অলৌকিক সাহায্যকেও তাঁদের কাছে টেনে এনেছে। যখন ইবরাহিমকে (আ.) নমরুদের তৈরি অগ্নিকু-ে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর বাঁচার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু তাঁর অন্তরে ছিল তাওয়াক্কুলের প্রজ্বলিত দীপশিখা। তিনি কোনো মানুষের সাহায্য না চেয়ে উচ্চারণ করেছিলেন ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল’ (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম অভিভাবক)। আর এই পরম তাওয়াক্কুলের প্রতিদান হিসেবে মহান আল্লাহ সেই প্রচ- আগুনকে হজরত ইবরাহিমের (আ.) জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক বানিয়ে দিয়েছিলেন। একইভাবে ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় মুহূর্তে হজরত মুসা (আ.) যখন একপাশে ফেরাউনের বিশাল ও পরাক্রমশালী সেনাবাহিনী আর অন্যপাশে উত্তাল লোহিত সাগরের মাঝখানে আটকা পড়েছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গীরা দিশেহারা হয়ে আকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠেছিল, ‘আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেলাম!’ কিন্তু হজরত মুসা (আ.)-এর হৃদয়ে ছিল মহান রবের ওপর অটুট ও অবিচল আস্থা। তিনি মুহূর্তের জন্যও বিচলিত না হয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন, ‘কখনোই নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন, তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন।’ আর ঠিক তার পরমুহূর্তেই সাগরের বুক চিরে অলৌকিক পথ তৈরি হয়ে যায়। এই যে জাগতিক কোনো উপায় না থাকা সত্ত্বেও ভেতরের এই অকল্পনীয় স্থিরতা, এটিই হলো তাওয়াক্কুলের আসল মহিমা। হাদিসের পাতায় ও নবুয়তের ইতিহাসে এই তাওয়াক্কুলের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখতে পাই সাইয়্যিদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জীবনে। হিজরতের সেই সংকটময় মুহূর্তে, ছওর গুহার নিভৃত প্রকোষ্ঠে যখন নবীজি (সা.) এবং তাঁর পরম বিশ্বস্ত সাথী হজরত আবু বকর (রা.) আত্মগোপন করে ছিলেন, তখন বাইরে শত্রুর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। হজরত আবু বকর (রা.) ব্যাকুল ও শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন এই ভেবে যে, শত্রুরা একটু নিচু হয়ে তাকালেই তাদের দেখে ফেলবে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) পরম শান্ত ও সৌম্য কণ্ঠে তাঁকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ এই আত্মবিশ্বাস ও প্রশান্তি কোনো বাহ্যিক সেনাবাহিনী বা অস্ত্রের শক্তিতে আসেনি; এটি এসেছিল তাওয়াক্কুলে পরিপূর্ণ ঐশী হৃদয় থেকে, যা মহান আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতিকে অনুধাবন করতে পারছিল। তবে তাওয়াক্কুলের ধারণা নিয়ে সমাজে বিরাট ভুল বোঝাবুঝি বা বিভ্রান্তি বিরাজমান। অনেকেই মনে করেন, তাওয়াক্কুল মানে হলো নিজের চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং ফয়সালার অপেক্ষা করা। ইসলামে তাওয়াক্কুলের এটি সম্পূর্ণ ভুল ও বিকৃত রূপ। তাওয়াক্কুল হলো মানুষের মানসিকতার ও চিন্তার এক বিশেষ ফ্রেম বা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি। পবিত্র কোরআনে এটি অত্যন্ত সংক্ষেপে ফুটে উঠেছে ‘আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন, তা ব্যতীত আমাদের সঙ্গে অন্য কিছুই ঘটবে না; তিনিই আমাদের অভিভাবক।’ এর অর্থ হলো, আপনার শরীর ও হাত-পা বাহ্যিক জাগতিক চেষ্টা চালিয়ে যাবে, কিন্তু আপনার অন্তর আটকে থাকবে কেবল আল্লাহর সঙ্গে। মানুষের কাজ হলো উপায় অবলম্বন করা, আর ফলাফলের জন্য নির্ভর করা আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর। এই ভারসাম্যপূর্ণ দর্শনের বাস্তব উদাহরণ আমরা মহানবী (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিসটিতে দেখতে পাই। এক বেদুইন এসে নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে তার উটটি বাঁধবে নাকি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে ছেড়ে দেবে? জবাবে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘আগে তোমার উটটি বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।’ অর্থাৎ, সাধ্যের মধ্যে থাকা সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বা মাধ্যম গ্রহণ করাটা ইসলামেরই নির্দেশ। যেমন, আপনি অসুস্থ হলে অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাবেন, সঠিক চিকিৎসা নেবেন, ওষুধ খাবেন; এগুলো সবই শরীর ও বাহ্যিক চেষ্টার অংশ। কিন্তু আপনার পরম বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল ডাক্তারের অভিজ্ঞতা বা ওষুধের ওপর থাকবে না; তা থাকবে নিরাময়কারী মহান আল্লাহর ওপর। একইভাবে একজন কৃষক একটি উন্নত খামার বা ফসল ফলাতে চাইলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, জমি চাষ করবে, বীজ রোপণ করবে এবং সময়মতো সেচ দেবে। কিন্তু সে বিশ্বাস রাখবে যে, ফসলে জীবন দেওয়া, বাতাস ও বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ফলন দান করা একমাত্র আল্লাহর কাজ; নিজের চেষ্টার বাহাদুরি নয়। সুতরাং তাওয়াক্কুল মানুষকে অলস বা নিষ্ক্রিয় করে না, বরং এটি মানুষকে দায়িত্বশীল ও কর্মঠ করার সঙ্গে সঙ্গে ফলের অনিশ্চয়তাজনিত মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়। যখন একজন মানুষ তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়, তখন সফলতা এলেও সে অহংকারী হয় না, আবার ব্যর্থতা এলেও সে হতাশায় ভেঙে পড়ে না। যেকোনো পরিবর্তন ও আত্মিক বিপ্লবের সূচনা হয় মানুষের চিন্তার জগত থেকে। বর্তমানে মানসিক অস্থিরতা, হতাশা ও চরম দুশ্চিন্তার অন্যতম মূল কারণ হলো আমাদের অন্তরের সঙ্গে জাগতিক মাধ্যমের অতিরিক্ত জোড়াসোড়া। আমরা ফলাফলকে নিজেদের ক্ষুদ্র চেষ্টার ওপর শতভাগ নির্ভরশীল মনে করি, যার ফলে ব্যর্থতায় আমাদের হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। আমরা যদি সুরা ফাতিহার সেই শাশ্বত শিক্ষার আলোকে নিজেদের জীবন পুনর্গঠন করতে পারি এবং ইবাদতের পাশাপাশি ‘একমাত্র আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা’ অর্থাৎ তাওয়াক্কুলকে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে ধারণ করতে পারি, তবেই আমাদের অন্তর লাভ করবে পরম স্থিরতা। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে জাগতিক সাধ্যমতো চেষ্টা করার পর ফলাফলের ক্ষেত্রে তাঁর সুমহান সত্তার ওপর পূর্ণাঙ্গ তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখার তৌফিক দান করুন। আমিন।