চারবার নৌকাডুবির কবল থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে ফিরেছেন জাহেরা বেগম। কিন্তু চতুর্থবারের সেই বেঁচে ফেরাও তার জীবনে বয়ে এনেছে সবচেয়ে বড় শোক। পদ্মা নদী এবার কেড়ে নিয়েছে তার স্বামী ও একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর পর জীবিকার আশায় যে নদীকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন, সেই পদ্মাই মুহূর্তে ভেঙে দিয়েছে তার পুরো পরিবার। নদীকেন্দ্রিক জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য আর একের পর এক নির্মম বাস্তবতার এই গল্প যেন পদ্মাপাড়ের হাজারো মানুষের জীবনচিত্রের প্রতিচ্ছবি। পদ্মা নদীর সঙ্গে জাহেরা বেগমের সম্পর্ক শুধুই বসবাসের নয়; এটি তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর জোয়ার-ভাটা, ঝড়-তুফান আর ভাঙনের মধ্যেই কেটেছে তার ৫৫ বছরের জীবন। কিন্তু যে নদী একসময় জীবিকার উৎস ছিল, সেই নদীই আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় শোকের কারণ। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজশাহী মহানগরসংলগ্ন পদ্মা নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ডুবে যায়। নৌকায় থাকা জাহেরা বেগম প্রাণে বেঁচে ফিরলেও নিখোঁজ হন তার স্বামী কাওসার আলী (৬০) ও ছেলে জিয়ারুল ইসলাম (৩০)। দুই দিন পর পৃথক স্থানে ভেসে ওঠে তাদের মরদেহ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম দুই সদস্যকে হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। এক পরিবারের ওপর নেমে এলো শোকের ছায়া : শুক্রবার কাটাখালী থানার শ্যামপুর বালুঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িজুড়ে শোকের মাতম। স্বামী ও শ্বশুরকে একসঙ্গে হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন জিয়ারুলের স্ত্রী সায়েরা খাতুন। পাশে দুই সন্তান—১১ বছরের তামিম ও ৭ বছরের তাসমিরা—নীরবে তাকিয়ে আছে বড়দের কান্নার দিকে। সায়েরা বলেন, “আমার স্বামী আর শ্বশুর দুজনেই চলে গেলেন। সংসারে উপার্জনের আর কেউ রইল না। ছোট ছোট দুই সন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচব জানি না। সরকারের কাছে আমাদের একটাই আবেদন—আমাদের পরিবারটির পাশে দাঁড়ান।” চারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা: জাহেরা বেগমের জীবনে নৌকাডুবি নতুন নয়। এর আগেও তিনবার তিনি নদীতে ডুবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। প্রতিবারই সাঁতার কেটে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। এবারও নিজের জীবন রক্ষা করতে পারলেও চোখের সামনে স্বামী ও ছেলেকে নদীর স্রোতে হারিয়ে ফেলেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আগেও তিনবার গাঙে ডুবেছি, মরতে মরতে বেঁচেছি। এবারও বেঁচে গেলাম, কিন্তু নিজের চোখে স্বামী আর ছেলেকে ডুবে যেতে দেখলাম। আল্লাহ আমাকে না নিয়ে তাদের কেন নিয়ে গেল?” নদীভাঙন থেকে নৌকাডুবি—সংগ্রামের শেষ অধ্যায় : প্রায় এক দশক আগে ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন চর খিদিরপুরে ছিল তাদের বসতভিটা। পদ্মার ভাঙনে সেই বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সব হারিয়ে তারা চলে আসেন বর্তমান ঠিকানায়। এরপরও নদী ছেড়ে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে চরের ঝাউগাছ কেটে বিক্রি করেই চলছিল সংসার। এই কাজের সুবিধার্থে এক বছর আগে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা কেনেন কাওসার আলী। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধ করেই সংসার চালাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই নৌকাই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে মৃত্যুর ফাঁদ। যেভাবে ঘটেছিল দুর্ঘটনা : মঙ্গলবার দুপুরে ঝাউগাছ কেটে ফেরার পথে বড়কুঠির সামনে পদ্মার মাঝনদীতে আকস্মিক দমকা হাওয়ায় নদী উত্তাল হয়ে ওঠে। মুহূর্তেই নৌকাটি ডুবে যায়। জাহেরাসহ ছয়জন সাঁতরে অথবা অন্য নৌকার সহায়তায় তীরে উঠতে সক্ষম হলেও কাওসার আলী ও জিয়ারুল ইসলাম স্রোতের তোড়ে নিখোঁজ হন। দুই দিনব্যাপী অনুসন্ধানের পর বৃহস্পতিবার সকালে কুষ্টিয়ার পাকশী সেতু সংলগ্ন বাংলাবাজার এলাকায় কাওসার আলীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন দুপুরে রাজশাহীর পবা উপজেলার সাতবাড়িয়া চর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় ছেলে জিয়ারুল ইসলামের মরদেহ। উদ্ধার অভিযানে নজরদারি : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের রাজশাহী সদর স্টেশনের উপপরিচালক মনজিল হক জানান, দুর্ঘটনার পর থেকেই রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত পদ্মার বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালায়। নদীর তীব্র স্রোতের কারণে মরদেহ দুটি দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে ভেসে যায়। খবর পাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পদ্মাপাড়ের মানুষের অনিশ্চিত জীবন: জাহেরা বেগমের গল্প কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি পদ্মাপাড়ের হাজারো মানুষের বাস্তবতা। নদীভাঙনে ঘর হারানো, ঋণের বোঝা, জীবিকার অনিশ্চয়তা আর প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে নদীতে নামা—এসবই তাদের নিত্যসঙ্গী। জাহেরার পরিবার আজ স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। স্থানীয়দের দাবি, এমন দুর্ঘটনা এড়াতে নদীপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
5:26 pm, Friday, 31 July 2026
শিরোনাম :
চারবার মৃত্যুকে হারিয়েও নিঃস্ব জাহেরা, পদ্মা কেড়ে নিল স্বামী-সন্তান
-
MIT ERP
- Update Time : 04:20:51 pm, Friday, 31 July 2026
- 2
Tag :
Popular Post





















