আজ শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
১৪ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৬১%

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় চরম সংকটে গ্রামীণ চিকিৎসাসেবা

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:42:38 am, Friday, 30 October 2026
  • 23

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় চরম সংকটে গ্রামীণ চিকিৎসাসেবা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা চরম সংকটের মুখে পড়েছে। উপজেলার ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ২৭টির ভবনই এখন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে তিনটি ক্লিনিকের ভবন সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় বাধ্য হয়ে ভাড়া করা ঘরে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সরকারি সেবাকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও এসব ক্লিনিকের ঘরভাড়া, আয়ার বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে হচ্ছে সেবা নিতে আসা দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে টাকা তুলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভবানীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর বাজার, নাওগাঁও ইউনিয়ন এবং পৌরসভার লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বর্তমানে ভাড়ায় নেওয়া ছোট ছোট কক্ষে পরিচালিত হচ্ছে।

প্রতিদিন এসব ক্লিনিকে গড়ে ২৫-৪০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী এসব ক্লিনিকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও আয়ার বেতন, ঘরভাড়া, বিদ্যুতের বিল ও খাতা-কলমের খরচ জোগাতে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় এবং দরজা-জানালা না থাকায় ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

বর্তমানে পাশেই ফোরকানিয়া মাদ্রাসার ছোট কক্ষে মাত্র ৪০০ টাকা ভাড়ায় ক্লিনিকের কাজ চালানো হচ্ছে। সেখানে ওষুধ ও অন্যান্য সরঞ্জামের সঙ্গে গাদাগাদি করে বসেন কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারী। সেবা নিতে আসা সুমাইয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঘরভাড়া ও আয়ার বেতনের কথা বলে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে।

অথচ এই ক্লিনিকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাওয়ার কথা। একই অবস্থা মহেশপুর বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকেও। উপজেলা সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের এই ক্লিনিকে সেবা নেয় মহেশপুর, জয়পুর, উরপা, যমুনার পাড়, বড়ভিটাসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লিনিক প্রায় পাঁচ বছর আগে পরিত্যক্ত হয়। কিছুদিন একটি ভাড়া ঘরে চালানোর পর চুক্তি শেষ হলে বর্তমানে স্থানীয় এক ঘরের বারান্দায় টিনের ছাপড়া তুলে মাসিক ৬০০ টাকা ভাড়ায় ক্লিনিকটি চলছে।

এই ক্লিনিকে মাসে ১ হাজার টাকা বেতনে কাজ করা আয়ার বেতন এবং ঘরভাড়া রোগীদের কাছ থেকে তোলা টাকায় দেওয়া হয়। সিএইচসিপি নাজমুল কবীরের ভাষ্য, পরিত্যক্ত ভবনের আসবাবসহ সবকিছু চুরি হয়ে গেছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে ভাড়া করা ঘরে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। রোগীদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে নেওয়া হয়। তবে টাকা চাইলে অনেক রোগী আপত্তি করেন, এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।

অন্যদিকে নাওগাঁও কমিউনিটি ক্লিনিকটি গত বছরের নভেম্বরে পরিত্যক্ত হওয়ার পর ১ হাজার ১০০ টাকা ভাড়ায় চলছে, যার খরচও একইভাবে মেটানো হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এই তিনটিই নয়, উপজেলার আরও ২০টি ক্লিনিকের ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, ছাদের ঢালাই খসে রড বেরিয়ে এসেছে এবং দরজা-জানালা ভাঙা।

বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে মূল্যবান ওষুধ ও মালামাল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া দীর্ঘ সাত মাস বন্ধ থাকার পর গত জুন থেকে ২২ ধরনের ওষুধের মধ্যে ২০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ শুরু হলেও জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে রোগীরা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসানুল হোসাইন জানান, উপজেলার তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক ভাড়ার ঘরে চলছে।

তার দাবি, সেবা নিতে আসা সচ্ছল ব্যক্তিরা চাইলে স্বেচ্ছায় দুই টাকা দিতে পারেন। তবে জরাজীর্ণ অবস্থা দূর করতে ৫৩টি ক্লিনিকের মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি এবং সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ সাতটি ভবন সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় চরম সংকটে গ্রামীণ চিকিৎসাসেবা

Update Time : 07:42:38 am, Friday, 30 October 2026

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা চরম সংকটের মুখে পড়েছে। উপজেলার ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ২৭টির ভবনই এখন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে তিনটি ক্লিনিকের ভবন সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় বাধ্য হয়ে ভাড়া করা ঘরে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সরকারি সেবাকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও এসব ক্লিনিকের ঘরভাড়া, আয়ার বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে হচ্ছে সেবা নিতে আসা দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে টাকা তুলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভবানীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর বাজার, নাওগাঁও ইউনিয়ন এবং পৌরসভার লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বর্তমানে ভাড়ায় নেওয়া ছোট ছোট কক্ষে পরিচালিত হচ্ছে।

প্রতিদিন এসব ক্লিনিকে গড়ে ২৫-৪০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী এসব ক্লিনিকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও আয়ার বেতন, ঘরভাড়া, বিদ্যুতের বিল ও খাতা-কলমের খরচ জোগাতে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় এবং দরজা-জানালা না থাকায় ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

বর্তমানে পাশেই ফোরকানিয়া মাদ্রাসার ছোট কক্ষে মাত্র ৪০০ টাকা ভাড়ায় ক্লিনিকের কাজ চালানো হচ্ছে। সেখানে ওষুধ ও অন্যান্য সরঞ্জামের সঙ্গে গাদাগাদি করে বসেন কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারী। সেবা নিতে আসা সুমাইয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঘরভাড়া ও আয়ার বেতনের কথা বলে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে।

অথচ এই ক্লিনিকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাওয়ার কথা। একই অবস্থা মহেশপুর বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকেও। উপজেলা সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের এই ক্লিনিকে সেবা নেয় মহেশপুর, জয়পুর, উরপা, যমুনার পাড়, বড়ভিটাসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লিনিক প্রায় পাঁচ বছর আগে পরিত্যক্ত হয়। কিছুদিন একটি ভাড়া ঘরে চালানোর পর চুক্তি শেষ হলে বর্তমানে স্থানীয় এক ঘরের বারান্দায় টিনের ছাপড়া তুলে মাসিক ৬০০ টাকা ভাড়ায় ক্লিনিকটি চলছে।

এই ক্লিনিকে মাসে ১ হাজার টাকা বেতনে কাজ করা আয়ার বেতন এবং ঘরভাড়া রোগীদের কাছ থেকে তোলা টাকায় দেওয়া হয়। সিএইচসিপি নাজমুল কবীরের ভাষ্য, পরিত্যক্ত ভবনের আসবাবসহ সবকিছু চুরি হয়ে গেছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে ভাড়া করা ঘরে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। রোগীদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে নেওয়া হয়। তবে টাকা চাইলে অনেক রোগী আপত্তি করেন, এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।

অন্যদিকে নাওগাঁও কমিউনিটি ক্লিনিকটি গত বছরের নভেম্বরে পরিত্যক্ত হওয়ার পর ১ হাজার ১০০ টাকা ভাড়ায় চলছে, যার খরচও একইভাবে মেটানো হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এই তিনটিই নয়, উপজেলার আরও ২০টি ক্লিনিকের ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, ছাদের ঢালাই খসে রড বেরিয়ে এসেছে এবং দরজা-জানালা ভাঙা।

বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে মূল্যবান ওষুধ ও মালামাল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া দীর্ঘ সাত মাস বন্ধ থাকার পর গত জুন থেকে ২২ ধরনের ওষুধের মধ্যে ২০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ শুরু হলেও জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে রোগীরা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসানুল হোসাইন জানান, উপজেলার তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক ভাড়ার ঘরে চলছে।

তার দাবি, সেবা নিতে আসা সচ্ছল ব্যক্তিরা চাইলে স্বেচ্ছায় দুই টাকা দিতে পারেন। তবে জরাজীর্ণ অবস্থা দূর করতে ৫৩টি ক্লিনিকের মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি এবং সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ সাতটি ভবন সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে।