আজ বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
১৩ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩০°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৪৯%

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর দুই দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করবে

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:45:59 am, Thursday, 29 October 2026
  • 26

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর দুই দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করবে

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপান গেছেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যাবসায়িক আস্থা জোরদারে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা দেখছে টোকিও।

বিশেষ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়গুলো সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। ২০১৪ সালে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উদ্যোগে সূচিত বিগ-বি (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) মহাপরিকল্পনা চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড় করিয়ে হালনাগাদ করা হচ্ছে।

এই রূপরেখা দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে প্রতিফলিত হবে বলে আশা করা যায়। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে তিনি জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন এবং চিবার ফুতসুতে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পাশাপাশি টয়োটা কারখানা ও জেরার এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শনে যাবেন তিনি।

এই সফরের সময় বঙ্গোপসাগর ঘিরে জাপানের নতুন করে সাজানো ‘বিগ-বি’ পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে ওই পরিকল্পনা হালনাগাদ করা বিগ-বিতে বিনিয়োগ, জ¦ালানি, সমুদ্র নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি একসুতায় বাঁধা পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে ঘিরে দুদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে শুরু থেকেই জাপান অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল জাপানের সহায়তায় করাÑ মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। টোকিওর ভূমিকা এতদিন মূলত ঋণনির্ভর সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন জোর দেওয়া হচ্ছে, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব ও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে (পিপিপি)।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন (বর্তমান রূপান্তর হারে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরি করছে জাপানের বেসরকারি খাত। এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার বড় অংশ উৎপাদন ও জ¦ালানি খাতে। জাপানি গাড়ি নির্মাতা টয়োটা প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে বাংলাদেশে অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট করার পরিকল্পনা করছে।

দেশীয় সরবরাহকারীরা যদি যন্ত্রাংশ ও কেব্‌ল তৈরির কাজ পায়, তাহলে শক্তিশালী ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ শিল্প গড়ে উঠতে পারে। আর তরুণ প্রকৌশলীদের জন্য তৈরি হবে কর্মসংস্থান। শিল্প খাতের গ্যাস-সংকট বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির বড় বাধা। এ সংকট কাটাতে জাপানের বৃহত্তম জ¦ালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জেরা মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় এলএনজি টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।

এটি বাস্তবায়িত হলে, শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাপ কমতে পারে। তবে বৈশ্বিক জ¦ালানি বাজারের অস্থিরতা ও ডলারের দাম বড় চ্যালেঞ্জ থেকে যাবে। ২০১৪ সালের বিগ-বি পরিকল্পনা প্রধানত মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্প ও বন্দর গড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় এটি এখন চার স্তম্ভে হালনাগাদ হচ্ছে।

প্রথমত, আঞ্চলিক সংযোগ ও সমন্বিত লজিস্টিকসকে প্রাধান্য দিয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও এলএনজি অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করা। যার লক্ষ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সুবিধা তৈরি। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি মোকাবিলা ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক সংঘাত বা সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ হলে বাংলাদেশকে বিকল্প সামুদ্রিক পথ হিসেবে প্রস্তুত রাখা যায়।

তৃতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও ব্যবসার আধুনিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের ‘নিয়মভিত্তিক’ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো যায়। চতুর্থত, আঞ্চলিক শান্তি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, যার লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরে মুক্ত ও নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা। জাপান ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌযান হস্তান্তর করেছে।

এই সফরে কোস্টগার্ডকে ৩৫ মিটার দীর্ঘ একটি আধুনিক টহল জাহাজ দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিগ-বির মূল নির্যাস লুকিয়ে আছে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থানে। বঙ্গোপসাগর শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যুক্ত করার প্রধান সামুদ্রিক পথও। একদিকে চীন অঞ্চল ও পথের উদ্যোগের (বিআরআই) মাধ্যমে এ অঞ্চলে অবকাঠামোগত উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়াচ্ছে।

অন্যদিকে জাপান ও তার মিত্ররা সামনে এনেছে অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের (এফওআইপি) ধারণা। বঙ্গোপসাগরে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হলে জাপানের কাছে বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এই কৌশলের কেন্দ্রে আছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী। গভীর সমুদ্রবন্দর ও জ¦ালানি-হাব পুরোদমে চালু হলে তা শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিই বাড়াবে না, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হতে পারে।

তাতে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খলের নতুন রূপরেখা তৈরি হবে। আর বাংলাদেশ হতে পারে আঞ্চলিক ‘লজিস্টিকস হাব’। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়ন দুই দেশের অভিন্ন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে থাকবে।

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ ৭৭ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা (১ ডলার ১২২ টাকা ধরে)। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের জন্য এই অর্থের সংস্থান করতে রাজি হয়েছে জাপান সরকার। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই বিনিয়োগের বিষয়টি ঘোষণা করা হবে।

এই ঘোষণার প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং এশীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব হ্রাস করা। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করা। জাপানের এই বিনিয়োগ বাংলাদেশে অটোমোবাইল, অন্যান্য উৎপাদন শিল্প এবং বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে জাপানি ট্রেডিং হাউস সুমিতোমো করপোরেশনসহ অন্য অংশীদারদের উদ্যোগে গড়ে তোলা ‘বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন’-এ জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের আলোচনা হবে। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয়ে জাপানের সঙ্গে আটটির মতো সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন-চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, পরিবেশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন, গবেষণা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। এ ধারাকে আরও এগিয়ে নিতে বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা, অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

জাপানের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর আলোচনা ও সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করবে। সাড়ে পাঁচ দশকের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফরে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার বা ২ ট্রিলিয়ন ইয়েনের সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব দেবেন।

২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল মেয়াদে প্রস্তাবিত এ প্যাকেজে থাকবে স্বল্প সুদের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি)। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ১২টি খাতকে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির (ইপিএ) পূর্ণ বাস্তবায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি পাঠানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়ে আসছে জাপান। এবার সেই সম্পর্ককে অবকাঠামোকেন্দ্রিক সহযোগিতা থেকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির বৃহত্তর অংশীদারিতে রূপ দিতে চায় বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব অনুযায়ী, যোগাযোগ অবকাঠামো, মাতারবাড়ী হাব, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল শিল্পে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ সহায়তা চাওয়া হবে। পাশাপাশি জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণেও উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থ সরাসরি বিনিয়োগ হিসেবে আসবে না; এর মধ্যে ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও পিপিপির অর্থায়ন থাকবে।

জাপানের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, সুশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। সহযোগিতা প্যাকেজের ঘোষণা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও ততটাই জরুরি। জাপানের বেসরকারি খাত তখনই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে, যখন এখানে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে।

এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি করা গেলে জাপানসহ অন্যান্য দেশ থেকেও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে সংস্কার, আইনের শাসন, সুশাসন এবং সরকারি সেবার নিয়ন্ত্রণ সহজ করার বিষয়ে জাপানের প্রত্যাশা রয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এসব সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

জাপান আলোচনায় পেশাদারি দেখাবে; বাংলাদেশকেও একই ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোতে হবে। প্রকল্প নির্বাচন, ঋণ নিয়ে আলোচনা এবং উপযুক্ত আর্থিক প্যাকেজ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অর্থায়নের পরিমাণের দিকে নজর না দিয়ে প্রকল্পের উপযোগিতা, অর্থনৈতিক সুফল এবং আর্থিক শর্তগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

এতে সহযোগিতা প্যাকেজের কার্যকারিতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা সহজ হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণেও জাপান গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে জাপানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি ডলারের পণ্য।

এ বাণিজ্য আরও বাড়াতে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন পণ্য ও শিল্প খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।

এ ছাড়া জাপানে বছরে ১ লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও পাঠানোর ক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাপান সফরে বাংলাদেশের লক্ষ্য কেবল বড় অঙ্কের অর্থায়ন নিশ্চিত করা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারির ভিত্তি শক্তিশালী করা।

প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোই হবে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

তুরাগ নদী থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর দুই দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করবে

Update Time : 07:45:59 am, Thursday, 29 October 2026

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপান গেছেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যাবসায়িক আস্থা জোরদারে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা দেখছে টোকিও।

বিশেষ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়গুলো সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। ২০১৪ সালে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উদ্যোগে সূচিত বিগ-বি (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) মহাপরিকল্পনা চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড় করিয়ে হালনাগাদ করা হচ্ছে।

এই রূপরেখা দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে প্রতিফলিত হবে বলে আশা করা যায়। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে তিনি জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন এবং চিবার ফুতসুতে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পাশাপাশি টয়োটা কারখানা ও জেরার এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শনে যাবেন তিনি।

এই সফরের সময় বঙ্গোপসাগর ঘিরে জাপানের নতুন করে সাজানো ‘বিগ-বি’ পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে ওই পরিকল্পনা হালনাগাদ করা বিগ-বিতে বিনিয়োগ, জ¦ালানি, সমুদ্র নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি একসুতায় বাঁধা পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে ঘিরে দুদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে শুরু থেকেই জাপান অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল জাপানের সহায়তায় করাÑ মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। টোকিওর ভূমিকা এতদিন মূলত ঋণনির্ভর সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন জোর দেওয়া হচ্ছে, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব ও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে (পিপিপি)।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন (বর্তমান রূপান্তর হারে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরি করছে জাপানের বেসরকারি খাত। এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার বড় অংশ উৎপাদন ও জ¦ালানি খাতে। জাপানি গাড়ি নির্মাতা টয়োটা প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে বাংলাদেশে অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট করার পরিকল্পনা করছে।

দেশীয় সরবরাহকারীরা যদি যন্ত্রাংশ ও কেব্‌ল তৈরির কাজ পায়, তাহলে শক্তিশালী ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ শিল্প গড়ে উঠতে পারে। আর তরুণ প্রকৌশলীদের জন্য তৈরি হবে কর্মসংস্থান। শিল্প খাতের গ্যাস-সংকট বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির বড় বাধা। এ সংকট কাটাতে জাপানের বৃহত্তম জ¦ালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জেরা মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় এলএনজি টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।

এটি বাস্তবায়িত হলে, শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাপ কমতে পারে। তবে বৈশ্বিক জ¦ালানি বাজারের অস্থিরতা ও ডলারের দাম বড় চ্যালেঞ্জ থেকে যাবে। ২০১৪ সালের বিগ-বি পরিকল্পনা প্রধানত মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্প ও বন্দর গড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় এটি এখন চার স্তম্ভে হালনাগাদ হচ্ছে।

প্রথমত, আঞ্চলিক সংযোগ ও সমন্বিত লজিস্টিকসকে প্রাধান্য দিয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও এলএনজি অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করা। যার লক্ষ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সুবিধা তৈরি। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি মোকাবিলা ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক সংঘাত বা সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ হলে বাংলাদেশকে বিকল্প সামুদ্রিক পথ হিসেবে প্রস্তুত রাখা যায়।

তৃতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও ব্যবসার আধুনিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের ‘নিয়মভিত্তিক’ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো যায়। চতুর্থত, আঞ্চলিক শান্তি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, যার লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরে মুক্ত ও নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা। জাপান ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌযান হস্তান্তর করেছে।

এই সফরে কোস্টগার্ডকে ৩৫ মিটার দীর্ঘ একটি আধুনিক টহল জাহাজ দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিগ-বির মূল নির্যাস লুকিয়ে আছে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থানে। বঙ্গোপসাগর শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যুক্ত করার প্রধান সামুদ্রিক পথও। একদিকে চীন অঞ্চল ও পথের উদ্যোগের (বিআরআই) মাধ্যমে এ অঞ্চলে অবকাঠামোগত উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়াচ্ছে।

অন্যদিকে জাপান ও তার মিত্ররা সামনে এনেছে অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের (এফওআইপি) ধারণা। বঙ্গোপসাগরে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হলে জাপানের কাছে বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এই কৌশলের কেন্দ্রে আছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী। গভীর সমুদ্রবন্দর ও জ¦ালানি-হাব পুরোদমে চালু হলে তা শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিই বাড়াবে না, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হতে পারে।

তাতে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খলের নতুন রূপরেখা তৈরি হবে। আর বাংলাদেশ হতে পারে আঞ্চলিক ‘লজিস্টিকস হাব’। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়ন দুই দেশের অভিন্ন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে থাকবে।

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ ৭৭ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা (১ ডলার ১২২ টাকা ধরে)। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের জন্য এই অর্থের সংস্থান করতে রাজি হয়েছে জাপান সরকার। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই বিনিয়োগের বিষয়টি ঘোষণা করা হবে।

এই ঘোষণার প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং এশীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব হ্রাস করা। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করা। জাপানের এই বিনিয়োগ বাংলাদেশে অটোমোবাইল, অন্যান্য উৎপাদন শিল্প এবং বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে জাপানি ট্রেডিং হাউস সুমিতোমো করপোরেশনসহ অন্য অংশীদারদের উদ্যোগে গড়ে তোলা ‘বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন’-এ জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের আলোচনা হবে। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয়ে জাপানের সঙ্গে আটটির মতো সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন-চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, পরিবেশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন, গবেষণা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। এ ধারাকে আরও এগিয়ে নিতে বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা, অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

জাপানের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর আলোচনা ও সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করবে। সাড়ে পাঁচ দশকের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফরে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার বা ২ ট্রিলিয়ন ইয়েনের সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব দেবেন।

২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল মেয়াদে প্রস্তাবিত এ প্যাকেজে থাকবে স্বল্প সুদের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি)। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ১২টি খাতকে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির (ইপিএ) পূর্ণ বাস্তবায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি পাঠানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়ে আসছে জাপান। এবার সেই সম্পর্ককে অবকাঠামোকেন্দ্রিক সহযোগিতা থেকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির বৃহত্তর অংশীদারিতে রূপ দিতে চায় বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব অনুযায়ী, যোগাযোগ অবকাঠামো, মাতারবাড়ী হাব, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল শিল্পে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ সহায়তা চাওয়া হবে। পাশাপাশি জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণেও উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থ সরাসরি বিনিয়োগ হিসেবে আসবে না; এর মধ্যে ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও পিপিপির অর্থায়ন থাকবে।

জাপানের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, সুশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। সহযোগিতা প্যাকেজের ঘোষণা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও ততটাই জরুরি। জাপানের বেসরকারি খাত তখনই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে, যখন এখানে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে।

এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি করা গেলে জাপানসহ অন্যান্য দেশ থেকেও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে সংস্কার, আইনের শাসন, সুশাসন এবং সরকারি সেবার নিয়ন্ত্রণ সহজ করার বিষয়ে জাপানের প্রত্যাশা রয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এসব সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

জাপান আলোচনায় পেশাদারি দেখাবে; বাংলাদেশকেও একই ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোতে হবে। প্রকল্প নির্বাচন, ঋণ নিয়ে আলোচনা এবং উপযুক্ত আর্থিক প্যাকেজ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অর্থায়নের পরিমাণের দিকে নজর না দিয়ে প্রকল্পের উপযোগিতা, অর্থনৈতিক সুফল এবং আর্থিক শর্তগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

এতে সহযোগিতা প্যাকেজের কার্যকারিতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা সহজ হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণেও জাপান গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে জাপানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি ডলারের পণ্য।

এ বাণিজ্য আরও বাড়াতে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন পণ্য ও শিল্প খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।

এ ছাড়া জাপানে বছরে ১ লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও পাঠানোর ক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাপান সফরে বাংলাদেশের লক্ষ্য কেবল বড় অঙ্কের অর্থায়ন নিশ্চিত করা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারির ভিত্তি শক্তিশালী করা।

প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোই হবে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।