আজ বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
১৩ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৭১%

পাশাপাশি চার কবরে চিরনিদ্রায় একই পরিবারের চার সদস্য

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:26:03 pm, Wednesday, 28 October 2026
  • 24

পাশাপাশি চার কবরে চিরনিদ্রায় একই পরিবারের চার সদস্য

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

পাশাপাশি চারটি কবর। চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন একই পরিবারের চারজন। বাবা, মা আর তাদের দুই ছোট্ট মেয়ে। যে দুই শিশুর হাসি-খেলায় মুখর থাকার কথা ছিল বাড়ি, সেই বাড়িতেই এখন শুধুই কান্না আর হাহাকার।

যে বাবা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আনন্দের ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন কক্সবাজারে, ফিরলেন লাশ হয়ে। সঙ্গে ফিরল তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের নিথর দেহ। একসঙ্গে চারটি প্রাণের এমন মর্মান্তিক বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামে। কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তার স্ত্রী আফসানা তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানাকে বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাঁধাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শেষবিদায়ের মুহূর্তে স্বজনদের বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা, শোকে স্তব্ধ হয়ে যান উপস্থিত এলাকাবাসী। দীর্ঘ ১১ দিন অপেক্ষার পর বুধবার সকাল ৭টার দিকে চারজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শেষবারের মতো তাদের দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন শত শত মানুষ।

কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি, কেউ নির্বাক দাঁড়িয়ে দেখেছেন প্রিয়জনদের শেষবারের মতো। যে বাড়ি একসময় দুই শিশুর হাসি-খেলায় মুখর থাকত, সেই বাড়িতেই এখন শুধুই কান্না, হাহাকার আর স্বজন হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা। সকাল থেকেই পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়ার কাজ শুরু হয়। একে একে চারটি কবর তৈরি হতে দেখে শোকে ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ।

নাহিদের মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় নাহিদুর, তার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে। পাশাপাশি খোঁড়া চারটি কবর যেন এক নিমেষে থামিয়ে দিল একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, সব আয়োজন, সব ভবিষ্যৎ। একই পরিবারের চারজনকে পাশাপাশি দাফনের দৃশ্য দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব রবিউল ইসলাম। মোহনপুরের পশ্চিমপাড়ার এই বাসিন্দা বলেন, ‘এত দিন শুধু শুনেছি, একসঙ্গে একাধিক মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে।

এবার চোখের সামনে দেখছি। পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়েছে। একই পরিবারের চারজনকে কবর দেওয়া হবে। এর আগে আমাদের গ্রামে এমন দৃশ্য দেখিনি। ’ ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে একসঙ্গে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান। ১০ বছর আগে স্ত্রীকে হারিয়েছেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে এখন একাই থাকেন। জীবনের শেষ সময়ে যাদের ঘিরে থাকার কথা ছিল তার পৃথিবী, সেই ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিই চলে গেলেন চিরতরে।

চারটি কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এই বৃদ্ধ বাবার শোক বোঝানোর ভাষা যেন কারও জানা নেই। ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি এখন বারবার ফিরে আসছে তার মনে। আগুনে পুড়ে মৃত্যুর আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে কথা হয়েছিল বাবার। তখনও কি জানতেন, সেটিই হবে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা? যে ছেলে বাবাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন চিন্তা না করতে, সেই ছেলেই যে আর কখনো ফিরে আসবেন না এ নির্মম সত্য এখন তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আগুনে পোড়ার আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে শেষ কথা হয়। তখন সে আমাকে বলে, বাবা তুমি চিন্তা করো না। তোমার নাতনিরা সি-বিচে আছে, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরব। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেয়ো। ওই শেষ কথা, আর কথা হবে না। ’ নাতনিদের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ছুটিতে গ্রামে এলে নাতনিরা বাড়ি মাতিয়ে রাখত।

তাদের সঙ্গে কত খেলা করতেন। এখন আর কিছুই হবে না। ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুরাও আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার সোনার মানিকেরা কতটা কষ্ট পেয়েছে, সেই ভাবনাও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। গত ১৫ অক্টোবর পূজার ছুটিতে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান নাহিদুর রহমান ও তার পরিবার। ১৬ অক্টোবর তারা ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের চার সদস্যসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়।

আগুনে মরদেহগুলো এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে সহজে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। নাহিদের চাচাতো ভাই খালিদ হোসেন জানান, আগুনে মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে দেখে চেনার উপায় ছিল না। পরিচয় নিশ্চিত করতে নাহিদের বাবা মতিয়ার রহমান ঢাকায় ডিএনএ নমুনা দেন।

পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর বুধবার সকালে সেগুলো গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। নাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা ছিলেন। চাকরির সুবাদে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি।

পরিবারের সঙ্গে আনন্দের কিছুটা সময় কাটানোর আশায় কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভ্রমণই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল পুরো পরিবারকে। এই মর্মান্তিক প্রাণহানির পর রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা। তাদের দাবি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

পাশাপাশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। নিহত নাহিদের ফুফা আব্দুল লতিফ বলেন, কর্মজীবী মানুষ একটু অবসর পেলেই পরিবার নিয়ে বিনোদনের জন্য রিসোর্টে যান। কিন্তু সেখানে যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। ক্ষোভ ও বেদনা নিয়ে তিনি বলেন, এই অব্যবস্থাপনার কারণে তাজা প্রাণগুলো যে অকালে ঝরে গেল, এর দায়ভার কে নেবে?

আমাদের তো একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল; এখন তো আর ফিরে পাব না। তবে এসব অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে এবং জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বুধবার বিকেলে পাশাপাশি চারটি কবরে দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় একই পরিবারের চারজনের শেষযাত্রা। মাটির নিচে চিরতরে শুয়ে পড়লেন নাহিদুর, তার স্ত্রী আফসানা ও তাদের দুই ছোট্ট মেয়ে। আর মাটির ওপরে রয়ে গেলেন বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান বুকভরা স্মৃতি, অসংখ্য প্রশ্ন আর এমন এক শূন্যতা নিয়ে, যা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়।

মোহনপুরের আকাশে-বাতাসে এখনো যেন ভাসছে স্বজনদের কান্না। পাশাপাশি চারটি কবর নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের, যে আগুন শুধু চারটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, এক বৃদ্ধ বাবার পৃথিবীটাকেও মুহূর্তে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যুবদল এবং পল্টন ট্র্যাজেডির বিচারের দাবিতে জামায়াতের কর্মসূচি

পাশাপাশি চার কবরে চিরনিদ্রায় একই পরিবারের চার সদস্য

Update Time : 10:26:03 pm, Wednesday, 28 October 2026

পাশাপাশি চারটি কবর। চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন একই পরিবারের চারজন। বাবা, মা আর তাদের দুই ছোট্ট মেয়ে। যে দুই শিশুর হাসি-খেলায় মুখর থাকার কথা ছিল বাড়ি, সেই বাড়িতেই এখন শুধুই কান্না আর হাহাকার।

যে বাবা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আনন্দের ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন কক্সবাজারে, ফিরলেন লাশ হয়ে। সঙ্গে ফিরল তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের নিথর দেহ। একসঙ্গে চারটি প্রাণের এমন মর্মান্তিক বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামে। কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তার স্ত্রী আফসানা তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানাকে বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাঁধাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শেষবিদায়ের মুহূর্তে স্বজনদের বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা, শোকে স্তব্ধ হয়ে যান উপস্থিত এলাকাবাসী। দীর্ঘ ১১ দিন অপেক্ষার পর বুধবার সকাল ৭টার দিকে চারজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শেষবারের মতো তাদের দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন শত শত মানুষ।

কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি, কেউ নির্বাক দাঁড়িয়ে দেখেছেন প্রিয়জনদের শেষবারের মতো। যে বাড়ি একসময় দুই শিশুর হাসি-খেলায় মুখর থাকত, সেই বাড়িতেই এখন শুধুই কান্না, হাহাকার আর স্বজন হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা। সকাল থেকেই পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়ার কাজ শুরু হয়। একে একে চারটি কবর তৈরি হতে দেখে শোকে ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ।

নাহিদের মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় নাহিদুর, তার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে। পাশাপাশি খোঁড়া চারটি কবর যেন এক নিমেষে থামিয়ে দিল একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, সব আয়োজন, সব ভবিষ্যৎ। একই পরিবারের চারজনকে পাশাপাশি দাফনের দৃশ্য দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব রবিউল ইসলাম। মোহনপুরের পশ্চিমপাড়ার এই বাসিন্দা বলেন, ‘এত দিন শুধু শুনেছি, একসঙ্গে একাধিক মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে।

এবার চোখের সামনে দেখছি। পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়েছে। একই পরিবারের চারজনকে কবর দেওয়া হবে। এর আগে আমাদের গ্রামে এমন দৃশ্য দেখিনি। ’ ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে একসঙ্গে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান। ১০ বছর আগে স্ত্রীকে হারিয়েছেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে এখন একাই থাকেন। জীবনের শেষ সময়ে যাদের ঘিরে থাকার কথা ছিল তার পৃথিবী, সেই ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিই চলে গেলেন চিরতরে।

চারটি কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এই বৃদ্ধ বাবার শোক বোঝানোর ভাষা যেন কারও জানা নেই। ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি এখন বারবার ফিরে আসছে তার মনে। আগুনে পুড়ে মৃত্যুর আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে কথা হয়েছিল বাবার। তখনও কি জানতেন, সেটিই হবে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা? যে ছেলে বাবাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন চিন্তা না করতে, সেই ছেলেই যে আর কখনো ফিরে আসবেন না এ নির্মম সত্য এখন তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আগুনে পোড়ার আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে শেষ কথা হয়। তখন সে আমাকে বলে, বাবা তুমি চিন্তা করো না। তোমার নাতনিরা সি-বিচে আছে, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরব। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেয়ো। ওই শেষ কথা, আর কথা হবে না। ’ নাতনিদের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ছুটিতে গ্রামে এলে নাতনিরা বাড়ি মাতিয়ে রাখত।

তাদের সঙ্গে কত খেলা করতেন। এখন আর কিছুই হবে না। ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুরাও আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার সোনার মানিকেরা কতটা কষ্ট পেয়েছে, সেই ভাবনাও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। গত ১৫ অক্টোবর পূজার ছুটিতে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান নাহিদুর রহমান ও তার পরিবার। ১৬ অক্টোবর তারা ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের চার সদস্যসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়।

আগুনে মরদেহগুলো এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে সহজে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। নাহিদের চাচাতো ভাই খালিদ হোসেন জানান, আগুনে মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে দেখে চেনার উপায় ছিল না। পরিচয় নিশ্চিত করতে নাহিদের বাবা মতিয়ার রহমান ঢাকায় ডিএনএ নমুনা দেন।

পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর বুধবার সকালে সেগুলো গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। নাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা ছিলেন। চাকরির সুবাদে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি।

পরিবারের সঙ্গে আনন্দের কিছুটা সময় কাটানোর আশায় কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভ্রমণই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল পুরো পরিবারকে। এই মর্মান্তিক প্রাণহানির পর রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা। তাদের দাবি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

পাশাপাশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। নিহত নাহিদের ফুফা আব্দুল লতিফ বলেন, কর্মজীবী মানুষ একটু অবসর পেলেই পরিবার নিয়ে বিনোদনের জন্য রিসোর্টে যান। কিন্তু সেখানে যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। ক্ষোভ ও বেদনা নিয়ে তিনি বলেন, এই অব্যবস্থাপনার কারণে তাজা প্রাণগুলো যে অকালে ঝরে গেল, এর দায়ভার কে নেবে?

আমাদের তো একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল; এখন তো আর ফিরে পাব না। তবে এসব অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে এবং জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বুধবার বিকেলে পাশাপাশি চারটি কবরে দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় একই পরিবারের চারজনের শেষযাত্রা। মাটির নিচে চিরতরে শুয়ে পড়লেন নাহিদুর, তার স্ত্রী আফসানা ও তাদের দুই ছোট্ট মেয়ে। আর মাটির ওপরে রয়ে গেলেন বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান বুকভরা স্মৃতি, অসংখ্য প্রশ্ন আর এমন এক শূন্যতা নিয়ে, যা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়।

মোহনপুরের আকাশে-বাতাসে এখনো যেন ভাসছে স্বজনদের কান্না। পাশাপাশি চারটি কবর নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের, যে আগুন শুধু চারটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, এক বৃদ্ধ বাবার পৃথিবীটাকেও মুহূর্তে নিঃস্ব করে দিয়েছে।