সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আবারও ঘনিষ্ঠতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুই দেশ তাদের মধ্যকার পুরোনো দূরত্ব কাটিয়ে উঠে পুনরায় অভিন্ন স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার দিকে ঝুঁকছে।
গত মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সৌদি পক্ষের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির মহাসচিব আলী আল শামসি, ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি, ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান আলী আল নেয়াদি এবং আরও কয়েকজন কর্মকর্তা।
আমিরাতের প্রধান জাতীয় দৈনিক ‘দ্য ন্যাশনাল’ বৈঠকটিকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা—তিন ক্ষেত্রেই রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে সহযোগিতা রয়েছে। উপসাগরীয় কূটনীতির অংশ হিসেবে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়মিত সফর ও পারস্পরিক আলোচনা হয়ে থাকে, যার উদ্দেশ্য অভিন্ন স্বার্থের বিষয়ে অবস্থান সমন্বয় করা।
বাহ্যিকভাবে দুই দেশকে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইয়েমেন সংকট। ইয়েমেন ঘিরে তৈরি হয়েছিল দূরত্ব ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে আবদুর রাব্বু মনসুর হাদি সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একসময় ইয়েমেনে একই শিবিরে ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশ ইয়েমেনের ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করতে শুরু করে। সৌদি আরব ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন অব্যাহত রাখলেও আমিরাত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ বা এসটিসির পাশে দাঁড়ায়। দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে হোদেইদাহ বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হওয়ার পর আবুধাবি ইয়েমেনের যুদ্ধ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
বিপরীতে রিয়াদের লক্ষ্য ছিল হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুরো ইয়েমেনকে মুক্ত করা। ইয়েমেনের বাইরে সুদান, ইরান ও অর্থনৈতিক নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়েও তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় আমিরাত।
ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও দুই দেশের অবস্থান এক ছিল না। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রথম আরব দেশগুলোর অন্যতম ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। সৌদি আরব অবশ্য এখন পর্যন্ত একই পথে আনুষ্ঠানিকভাবে এগোয়নি। বরং সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে রিয়াদ পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
অভিন্ন হুমকি কি বদলে দিচ্ছে সমীকরণ? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো সময়ের মিল। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরের পরদিনই সৌদি আরব সফরে যান মনসুর বিন জায়েদ। সরকারিভাবে সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা। তবে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বৈঠকে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ইরান ও হুথিদের মতো অভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব বারবার আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। ইরানের পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া ও ইয়েমেনের হুথিদের কর্মকাণ্ডও রিয়াদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের চাপ কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা সেটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি উপসাগরীয় অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সময়ে হুথিরা সৌদি জাহাজ ও তেল পরিবহন অবকাঠামোর মতো কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইয়েমেনে দীর্ঘ এক দশকের সংঘাতের পর ২০২২ সালে সৌদি আরব পরিস্থিতি থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু পুরোনো হুমকির পুনরাবির্ভাব রিয়াদকে আবারও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। একের পর এক নিরাপত্তা উদ্যোগ চলতি বছরের শুরুতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর লক্ষ্য ছিল সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক নৌপথে অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে সমুদ্রপথের ব্যবহার ঠেকানো।
তবে এই উদ্যোগ হুথিদের কার্যক্রম পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি। এরপর সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ করে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে হুথিদের তৎপরতা সেই নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে।
এরপর রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চায়। ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ের বিষয়ে সহযোগিতায় সম্মত হলেও হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। সৌদি আরব পরে চীনের কাছেও যায়। ইরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে হুথিদের ওপর প্রভাব বিস্তারে চীনের সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা করে রিয়াদ। জিসিসিকে আরও সক্রিয় করার চেষ্টা এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব সম্ভবত উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয়কে নতুন করে গুরুত্ব দিতে চাইছে।
গত বুধবার সৌদি শুরা কাউন্সিলে দেওয়া বক্তব্যে মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ওপর হামলা প্রমাণ করেছে যে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা, কৌশলগত সমন্বয়, অর্থনৈতিক সংহতি এবং যৌথ কার্যক্রম আরও জোরদারের কথা বলেন।
এই প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। অতীতে মুসলিম ব্রাদারহুড, আধুনিকায়ন, সিরিয়া, কাতার ও তুরস্কসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে সৌদি আরব ও আমিরাতের নীতিগত অবস্থানের মধ্যে মিল ছিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ইসলামপন্থি রাজনীতি নিয়ে আবুধাবির সংশয় থাকলেও রিয়াদ মক্কা চুক্তির মাধ্যমে আঙ্কারাকে নিজেদের আঞ্চলিক বলয়ের কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেছিল।
একই সময়ে মোহাম্মদ বিন জায়েদকে একসময় মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা বা মেন্টর হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। এমনকি একপর্যায়ে সৌদি আরবও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। সম্পর্ক মেরামতের ইঙ্গিত আগেও মিলেছে সৌদি-আমিরাত সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত অবশ্য সাম্প্রতিক বৈঠকেই প্রথম দেখা যায়নি। গত জুলাইয়ে সৌদি আরবের ন্যাশনাল মিডিয়া অথরিটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল্লাহ আল হামেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দুই দেশের সম্পর্ককে অভিন্ন ইতিহাস ও দুই ভ্রাতৃপ্রতিম জনগোষ্ঠীর গভীর বন্ধনের সঙ্গে তুলনা করেন।
এরপর আগস্টে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সৌদি বাদশাহ সালমানের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের পানিবিষয়ক সম্মেলনে সৌদি বাদশাহকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান যুক্তরাষ্ট্র সফর করছিলেন।
সব মিলিয়ে রিয়াদের অবস্থান থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে যাওয়ার পরিবর্তে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার দিকেই তারা বেশি মনোযোগী। এর মাধ্যমে ইরানের মিত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোর সক্ষমতা কমানোর চেষ্টা থাকতে পারে। পুরোনো জোটে নতুন করে গুরুত্ব ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অভিন্ন নীতির জন্য গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জিসিসির দেশগুলো একটি অভিন্ন ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। বরং ইরান ও হুথিদের কর্মকাণ্ড উপসাগরীয় দেশগুলোর বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা দেখিয়েছে, আর হুথিদের তৎপরতা সৌদি নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগগুলোর সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করেছে।
এই বাস্তবতায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর যৌক্তিকতা তৈরি হয়েছে। জিসিসির সম্মিলিত অবস্থান থেকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের দাবি এককভাবে রিয়াদ বা আবুধাবির দাবির তুলনায় বেশি প্রভাব তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিয়েও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বা নজরদারির মতো ক্ষেত্রে ইসরাইলের সহযোগিতা প্রয়োজন মনে করে, সে ক্ষেত্রে আমিরাত একটি মধ্যস্থতাকারী বা সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অভিন্ন হুমকির বাস্তবতা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আবারও কাছাকাছি আনছে—এমন ইঙ্গিত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে স্পষ্ট। তবে এই সম্পর্ক কতটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতায় রূপ নেয়, তা নির্ভর করবে ইয়েমেন, ইরান, অর্থনীতি এবং বৃহত্তর উপসাগরীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে দুই দেশের ভবিষ্যৎ নীতির ওপর।






















