বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অর্জন অর্জিত হয়েছে। টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩৯তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে রুবাইয়াৎ হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। উৎসবটির প্রায় চার দশকের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র মূল প্রতিযোগিতায় স্থান পেল। বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার টোকিওর স্পাইরাল হলে উৎসবের পূর্ণাঙ্গ আয়োজন ও প্রতিযোগিতা বিভাগের চলচ্চিত্রের নাম ঘোষণা করা হয়। এ সময় জানানো হয়, ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে উৎসবের ৩৯তম আসর। এবারের আয়োজনে ২০৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে, যা গত বছরের ১৮৪টির তুলনায় বেশি।
রুবাইয়াৎ হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এ উঠে এসেছে ঢাকার এক হবু কনের গল্প। বিয়ের প্রস্তুতি, সৌন্দর্যচর্চা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক নিয়মের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক নারীর শরীর ও মনের জটিল অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্ন, ভয়, স্মৃতি ও অলৌকিকতার মিশেলে এতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে নারীর শরীর, ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সৌন্দর্যবোধ এবং বিয়েকে ঘিরে প্রচলিত বৈষম্যমূলক সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে। এর আগে ভেনিস ও টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও অংশ নিয়েছে ছবিটি।
মূল প্রতিযোগিতায় ১৫টি চলচ্চিত্র
এবারের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে ৩১টি দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী ১৫টি চলচ্চিত্র। ১১২টি দেশ ও অঞ্চল থেকে জমা পড়া ১ হাজার ৮৯২টি ছবির মধ্য থেকে এগুলো বাছাই করা হয়েছে।
প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর পাশাপাশি থাকছে চীনের (হংকং) কিউ জিওংজিওংয়ের ‘ফুকশি: ফোর টেলস অব ফিস্টিং’ ও ওয়াং জিয়াংইয়ংয়ের ‘দ্য নাইট দ্যাট বাইন্ডস আস’, ইন্দোনেশিয়ার গারিন নুগ্রোহোর ‘রেড বিফোর ডন’ এবং উত্তর মেসিডোনিয়ার মিলচো মানচেভস্কির ‘সিস্টার ব্রাদার ম্যানহোল কভার’।
এ ছাড়া এশীয় প্রিমিয়ার হবে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো আলোনসোর ‘ডাবল ফ্রিডম’, রোমানিয়ার তেওডোরা আনা মিহাইয়ের ‘হেইসেল ৮৫’, ইতালির সামুয়েলে রোসির ‘ইভেন ইফ হেল কেইম’, সিঙ্গাপুরের সুন শুনের ‘ম্যাজিক অ্যাটলাস’, পর্তুগালের সের্জিও গ্রাসিয়ানোর ‘মেমোরিজ অব প্রিজন’, ইরানের বাহমান ঘোবাডির ‘ট্রিজ আর ওয়াচিং’ এবং সার্বিয়ার ইয়েলেনা মাক্সিমোভিচের ‘আনটিল দ্য ডে এন্ডস’।
প্রতিযোগিতা বিভাগের চলচ্চিত্রগুলো সম্পর্কে উৎসবের প্রোগ্রামিং ডিরেক্টর ইচিয়ামা শোজো বলেন, মেরুকরণ ও সংকটের এই সময়ে অনেক নির্মাতাই অতীতের দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন। তবে সেই ফিরে দেখা কেবল নস্টালজিয়ার জন্য নয়; বরং ইতিহাসের আলোকে বর্তমানকে বোঝার চেষ্টা।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরির নেতৃত্ব দেবেন অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়াভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা রলফ ডি হিয়ার। চার দশকের বেশি সময় ধরে লেখক, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করা এই নির্মাতার সঙ্গে জুরিতে থাকবেন টোকিও ও নিউইয়র্কভিত্তিক প্রযোজক অ্যালেক্স লো, কোরীয় প্রযোজক ওহ জংওয়ান, ডিআই কালারিস্ট ইয়োভ মুর এবং জাপানি অভিনেত্রী ওয়াতানাবে মাকিকো।
সব মিলিয়ে, এবারের টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্যও তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর নির্বাচন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক যাত্রায় উল্লেখযোগ্য সংযোজন।























