আজ বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৪%

ফেসবুক ও টেলিগ্রামে প্রলোভন: যেভাবে ছড়াচ্ছে অনলাইন জুয়ার অদৃশ্য সাম্রাজ্য

  • MIT ERP
  • Update Time : 12:02:49 am, Thursday, 10 September 2026
  • 15

ফেসবুক ও টেলিগ্রামে প্রলোভন: যেভাবে ছড়াচ্ছে অনলাইন জুয়ার অদৃশ্য সাম্রাজ্য

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ফেসবুক পোস্ট, টেলিগ্রাম লিংক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার সূত্র ধরে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্যবহারকারীরা যুক্ত হচ্ছেন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে। সেখানে বড় অঙ্কের মুনাফার লোভ দেখিয়ে শুরু হচ্ছে বাজি ধরার খেলা।

প্রথমে ছোট অঙ্কের জয়, এরপর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ শেষে নিঃস্ব হওয়ার গল্প অনেক ভুক্তভোগীর। কিন্তু এর পেছনে শুধু একটি ওয়েবসাইট বা অ্যাপ নেই; রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, ইনফ্লুয়েন্সার প্রচার, অ্যাফিলিয়েট কমিশন, ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেল এবং বিদেশভিত্তিক অপারেটরদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারীরা দেশের বাইরে অবস্থান করলেও ব্যবহারকারী সংগ্রহ, প্রচার এবং অর্থ লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ থেকেই।

অর্থ কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়, কারা এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে এবং অভিযান চালিয়েও কেন নতুন নামে ফিরে আসে এসব প্ল্যাটফর্ম— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে রূপালী বাংলাদেশ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়ার এই নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি, প্রচার ও অর্থের অবৈধ প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়ার প্রচার এখন শুধু বেটিং সাইটের বিজ্ঞাপনে সীমাবদ্ধ নেই।

ফেসবুক পেজ, রিলস, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া ‘আর্নিং প্রুফ’, জয়ের স্ক্রিনশট, তারকার ছবি ও ‘নিশ্চিত আয়ের’ গল্প দেখিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গ্রাহক সংগ্রহের ফাঁদ। অনুসন্ধানে ‘বাদশা ভাই’, ‘বাবু ভাই’, ‘বেটবাজ ২৪৭’ ও ‘অনলাইন আইডি’ মেকারের মতো এজেন্টভিত্তিক পেজের পাশাপাশি বিভিন্ন ছদ্মবেশী শত শত প্রচারণার সন্ধান মিলেছে।

কৌশলটি আরও গভীরে। বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলেই অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে সরাসরি বেটিং সাইটে না নিয়ে নেওয়া হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম গ্রুপে। সেখানে বোনাস, ‘নিশ্চিত প্রেডিকশন’, ভুয়া জয়ের গল্প ও সাজানো কথোপকথনের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে আস্থা। কখনো বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ, কখনো ‘বিশেষ বিনিয়োগ’ বা ‘স্কিল-বেসড গেম’-এর নামে ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বেটিংয়ের দিকে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, এই প্রচারণার পেছনে শুধু বিজ্ঞাপনদাতা নয়, রয়েছে এজেন্টভিত্তিক একটি কাঠামো। নতুন ব্যবহারকারী সংগ্রহ, অ্যাকাউন্ট খোলা এবং তার জমা করা অর্থের ওপর কমিশনের মাধ্যমে চলছে এই নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ, বিজ্ঞাপনটি শুধু প্রলোভন তৈরি করছে না, এটি ব্যবহারকারীকে একটি নির্দিষ্ট লেনদেনের চ্যানেলে পৌঁছে দেওয়ার প্রথম ধাপ।

একটি পেজ বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেলেই থেমে যাচ্ছে না প্রচারণা। নতুন নামে নতুন পেজ, ডোমেইন বা অ্যাকাউন্ট খুলে একই কনটেন্ট আবার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এটি কোনো একক ওয়েবসাইটের ব্যবসা নয়; বিজ্ঞাপন, এজেন্ট, চ্যাট প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল লেনদেনকে যুক্ত করে গড়ে ওঠা একটি চলমান নেটওয়ার্ক। মেহেরপুরের তরুণ ফ্রিল্যান্সার রাশেদুল ইসলাম ফেসবুকে ১০০ টাকা বাজিতে ২০ হাজার টাকা জয়ের বিজ্ঞাপন দেখে অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খোলেন।

শুরুতে ৫০০ টাকা জমা দিয়ে কয়েকবার জেতা ও অর্থ তুলতে পারায় তার আস্থা বাড়ে। পরে মায়ের চিকিৎসার জন্য রাখা ডিপিএস ভেঙে ও ধার করে ‘এভিয়েটর’ গেমে এক রাতে প্রায় ৪ লাখ টাকা বাজি ধরেন। সব হারিয়ে একপর্যায়ে ঋণের চাপে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, কুড়িগ্রামের চিলমারীর দিনমজুর রহিম মিয়া সরকারি ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় এক দালালের কাছে এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য দেন।

পরে তার নামে একাধিক সিম তুলে সেগুলো জুয়া চক্রের লেনদেনে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তার নামে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় মানি লন্ডারিং মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন খেলোয়াড়কে ধরে রাখার কৌশল শুরু হয় ছোট জয়ের প্রলোভন দিয়ে। এরপর তার বাজির ধরন, জমার পরিমাণ ও হারার পর পুনরায় খেলার প্রবণতা বিশ্লেষণ করে দেওয়া হয় বোনাস ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক অফার।

লোকসান শুরু হলে ‘হারানো টাকা ফেরত’ পাওয়ার আশায় অনেকে আরও অর্থ ঢালেন। টাকা তুলতে গেলে আবার ভুয়া কেওয়াইসি, ‘ক্লিয়ারেন্স ফি’, ‘ট্যাক্স’ বা অতিরিক্ত ডিপোজিটের শর্ত দেখিয়ে অর্থ আটকে রাখা হয়। অর্থাৎ, ছোট জয় দিয়ে আস্থা তৈরি, বড় বাজিতে টেনে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত টাকা আটকে দেওয়া— এটাই প্রতারণার মূল কৌশল।

এই চক্রের আরেক ভুক্তভোগী সাজ্জাদ হোসেন। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ফেসবুক রিলসে পরিচিত বিনোদন তারকাদের ডিপফেক ভিডিও ব্যবহার করে প্রচার করা একটি বেটিং অ্যাপের বিজ্ঞাপন দেখে তিনি প্রথমে ১ হাজার টাকা জমা দেন। প্রথম দিনেই ২ হাজার টাকা জেতার পর এক সপ্তাহের মধ্যে নিজের ব্যবসার অর্থ ও মা-বাবার সঞ্চয় থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা জমা করেন।

মাত্র তিন দিনে পুরো অর্থ হারিয়ে পাওনাদারের চাপে তিনিও বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রাণে বাঁচলেও সাজ্জাদ এখন স্থায়ী শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। কিন্তু তার হারানো অর্থের একটি বড় অংশ একাধিক ডিজিটাল লেনদেনের স্তর পেরিয়ে চলে গেছে দেশের বাইরে। কারা চালায় নেটওয়ার্ক অনলাইন জুয়া ও পকেট ক্যাসিনোর এই আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক কোনো একক ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন হ্যাকার দলের হাতে নয়; এর পেছনে রয়েছে দেশি-বিদেশি অপরাধী ও সহযোগীদের বহুস্তরীয় কাঠামো।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওপরের স্তরে রয়েছে বিদেশভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম অপারেটর ও নিয়ন্ত্রকেরা। এই নিয়ন্ত্রণে চীন, রাশিয়া, কম্বোডিয়া ও দুবাইভিত্তিক বিভিন্ন চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে জুয়ার প্ল্যাটফর্ম, সার্ভার, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং অর্থের প্রবাহ। এর পরের স্তরে রয়েছে বাংলাদেশি রিজিওনাল এজেন্ট ও সমন্বয়কারীরা।

স্থানীয়ভাবে পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সচল রাখা, প্রচারক ও এজেন্টদের পরিচালনা এবং বিদেশি অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করে তারা। আরও নিচে রয়েছে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারকেরা, যারা ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করে কমিশন নেয়। মাঠপর্যায়ে থাকে পেমেন্ট কালেক্টর ও মিউল অ্যাকাউন্টধারীরা।

তাদের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ ও একাধিক স্তরে তা স্থানান্তর করা হয়। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সামনের সারির এজেন্ট বা মিউল অ্যাকাউন্টধারী শনাক্ত হলেও নেপথ্যের মূল নিয়ন্ত্রকেরা অনেক সময় অধরাই থেকে যায়। ফলে একটি অ্যাপ, ফেসবুক পেজ বা পেমেন্ট নম্বর বন্ধ করলেও থেমে থাকে না পুরো চক্র; কিছুদিন পর নতুন নামে, নতুন লিংকে কিংবা নতুন পেমেন্ট চ্যানেলে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে একই নেটওয়ার্ক।

জুয়ার বিস্তারে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গার এজেন্ট নেটওয়ার্ক অনলাইন জুয়ায় খেলোয়াড়দের বড় অংশ সর্বস্বান্ত হলেও এর পেছনের এজেন্টরা লাভবান হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুয়ার প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা ১ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এজেন্ট অ্যাকাউন্ট নিয়ে অবৈধ কারেন্সি বিক্রি ও নতুন খেলোয়াড় যুক্ত করার কাজ করছে।

এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুয়ার এজেন্টদের উপস্থিতি মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় তুলনামূলক বেশি। এরপর কক্সবাজার, কুমিল্লা ও জামালপুরের কয়েকটি এলাকার নামও এসেছে। তবে গুগলের তথ্য অনুসারে, রংপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি মানুষ অনলাইন জুয়ার একাধিক সাইট গুগলে খুঁজেছেন। সারা দেশের তুলনায় এখানকার সার্চের হার সবচেয়ে বেশি রংপুর বিভাগ থেকে, যার স্কোর ১০০-এর মধ্যে ১০০।

রাজশাহী বিভাগ রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে, যার স্কোর ১০০-তে ৪৬। এরপর চট্টগ্রাম (৪১), খুলনা ও বরিশালের স্কোর (৩৬)। তথ্যমতে, ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সি তরুণেরাই অনলাইন ক্যাসিনোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, তরুণ কর্মজীবী এবং বেকার যুবকদের মধ্যে এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। টাকা কীভাবে ঢোকে, কোথায় যায় যিনি অনলাইনে জুয়া খেলেন, তিনি মনে করেন, একটি বিদেশি বেটিং প্ল্যাটফর্মে টাকা জমা দিচ্ছেন।

কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেই অর্থ অনেক ক্ষেত্রে প্রথমেই ঢোকে বাংলাদেশের স্থানীয় আর্থিক নেটওয়ার্কে। বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস), ব্যক্তিগত ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট কিংবা বিভিন্ন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি ডিপোজিটের জন্য আলাদা নম্বর বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়, যাতে একই হিসাবে বড় অঙ্কের লেনদেন জমে নজরদারিতে না আসে।

টাকা জমা হওয়ার পর তা দীর্ঘ সময় কোনো একটি হিসাবে রাখা হয় না; দ্রুত একাধিক ব্যক্তিগত, মিউল ও ব্যাবসায়িক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের মাধ্যমে তৈরি করা হয় লেনদেনের একাধিক স্তর। এতে অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য আড়াল করা সহজ হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে হুন্ডি ও অন্যান্য অবৈধ আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়; কোথাও কোথাও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের পথও ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

ফলে একজন খেলোয়াড়ের কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সেই অর্থ দেশীয় সংগ্রাহক, মিউল ও লেনদেনের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে বিদেশি অপারেটরদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে। এমনকি একজনের হারানো অর্থই পরবর্তী সময়ে নতুন ডোমেইন, অ্যাপ ও প্রচারণার মাধ্যমে নতুন খেলোয়াড় তৈরির অর্থের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

আইন আছে, কিন্তু থামছে না জুয়ার সাম্রাজ্য ২০২৬ সালে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ-ফিক্সিং ও জুয়ার বিজ্ঞাপনকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ করা হয়েছে। এতে জুয়া প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা এবং সাধারণ জুয়াড়ির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর ২০ ধারায়ও সাইবার স্পেসে জুয়া পরিচালনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু আইন ও অভিযান চললেও থামছে না নেটওয়ার্ক। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, এ ধরনের অপরাধে প্রায় ৪ হাজার জিডি ও ২৫০টির বেশি মামলা তদন্তাধীন।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, জুয়া, বাজি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গত মাসে ২০ হাজারের বেশি এমএফএস হিসাব শনাক্ত করে বন্ধ করা হয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধ ঠেকাতে কাজ করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনও (বিটিআরসি)। এই সংস্থার চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অবৈধ সিম শনাক্তে সিম বক্স ডিটেকশন সিস্টেম ও এআইভিত্তিক সিগন্যাল প্যাটার্ন অ্যানালিসিস ব্যবহার করা হচ্ছে।

একটি এনআইডির বিপরীতে অস্বাভাবিক সংখ্যক সিম, সন্দেহজনক ব্যবহার বা অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নম্বর, আইএমইআই ও এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিএফআইইউকে দেওয়া হচ্ছে। জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপের লিংকও নিয়মিত ব্লক করা হচ্ছে। তবে একটি ডোমেইন বন্ধ হওয়ার পর নতুন ডোমেইন বা মিরর সাইট চালু হওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত নতুন লিংক ছড়িয়ে পড়ায় পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, অফলাইন জুয়ায় সামাজিক লোকলজ্জা, আইনি ভয় এবং সশরীরে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু অনলাইন জুয়া বা বেটিং প্ল্যাটফর্মগুলো স্মার্টফোনের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের হাতের মুঠোয়, এমনকি শোবার ঘরেও পৌঁছে গেছে। ড. তৌহিদুল হক এই মহামারি থেকে সমাজকে মুক্তির জন্য সমন্বিত আইনি, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন।

তার মতে, কেবল গ্রেপ্তার বা শাস্তি দিয়ে এই নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অনলাইন জুয়া বন্ধে কেবল প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়, যদি আমরা আর্থিক লেনদেনের উৎসগুলো, অর্থাৎ এজেন্ট নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারি। তিনি বলেন, প্রযুক্তির সঙ্গে কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং আর্থিক খাতের নজরদারি— এই তিনের সমন্বয়ই হতে পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একমাত্র কার্যকর উপায়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

ফেসবুক ও টেলিগ্রামে প্রলোভন: যেভাবে ছড়াচ্ছে অনলাইন জুয়ার অদৃশ্য সাম্রাজ্য

ফেসবুক ও টেলিগ্রামে প্রলোভন: যেভাবে ছড়াচ্ছে অনলাইন জুয়ার অদৃশ্য সাম্রাজ্য

Update Time : 12:02:49 am, Thursday, 10 September 2026

ফেসবুক পোস্ট, টেলিগ্রাম লিংক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার সূত্র ধরে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্যবহারকারীরা যুক্ত হচ্ছেন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে। সেখানে বড় অঙ্কের মুনাফার লোভ দেখিয়ে শুরু হচ্ছে বাজি ধরার খেলা।

প্রথমে ছোট অঙ্কের জয়, এরপর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ শেষে নিঃস্ব হওয়ার গল্প অনেক ভুক্তভোগীর। কিন্তু এর পেছনে শুধু একটি ওয়েবসাইট বা অ্যাপ নেই; রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, ইনফ্লুয়েন্সার প্রচার, অ্যাফিলিয়েট কমিশন, ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেল এবং বিদেশভিত্তিক অপারেটরদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারীরা দেশের বাইরে অবস্থান করলেও ব্যবহারকারী সংগ্রহ, প্রচার এবং অর্থ লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ থেকেই।

অর্থ কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়, কারা এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে এবং অভিযান চালিয়েও কেন নতুন নামে ফিরে আসে এসব প্ল্যাটফর্ম— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে রূপালী বাংলাদেশ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়ার এই নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি, প্রচার ও অর্থের অবৈধ প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়ার প্রচার এখন শুধু বেটিং সাইটের বিজ্ঞাপনে সীমাবদ্ধ নেই।

ফেসবুক পেজ, রিলস, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া ‘আর্নিং প্রুফ’, জয়ের স্ক্রিনশট, তারকার ছবি ও ‘নিশ্চিত আয়ের’ গল্প দেখিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গ্রাহক সংগ্রহের ফাঁদ। অনুসন্ধানে ‘বাদশা ভাই’, ‘বাবু ভাই’, ‘বেটবাজ ২৪৭’ ও ‘অনলাইন আইডি’ মেকারের মতো এজেন্টভিত্তিক পেজের পাশাপাশি বিভিন্ন ছদ্মবেশী শত শত প্রচারণার সন্ধান মিলেছে।

কৌশলটি আরও গভীরে। বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলেই অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে সরাসরি বেটিং সাইটে না নিয়ে নেওয়া হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম গ্রুপে। সেখানে বোনাস, ‘নিশ্চিত প্রেডিকশন’, ভুয়া জয়ের গল্প ও সাজানো কথোপকথনের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে আস্থা। কখনো বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ, কখনো ‘বিশেষ বিনিয়োগ’ বা ‘স্কিল-বেসড গেম’-এর নামে ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বেটিংয়ের দিকে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, এই প্রচারণার পেছনে শুধু বিজ্ঞাপনদাতা নয়, রয়েছে এজেন্টভিত্তিক একটি কাঠামো। নতুন ব্যবহারকারী সংগ্রহ, অ্যাকাউন্ট খোলা এবং তার জমা করা অর্থের ওপর কমিশনের মাধ্যমে চলছে এই নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ, বিজ্ঞাপনটি শুধু প্রলোভন তৈরি করছে না, এটি ব্যবহারকারীকে একটি নির্দিষ্ট লেনদেনের চ্যানেলে পৌঁছে দেওয়ার প্রথম ধাপ।

একটি পেজ বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেলেই থেমে যাচ্ছে না প্রচারণা। নতুন নামে নতুন পেজ, ডোমেইন বা অ্যাকাউন্ট খুলে একই কনটেন্ট আবার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এটি কোনো একক ওয়েবসাইটের ব্যবসা নয়; বিজ্ঞাপন, এজেন্ট, চ্যাট প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল লেনদেনকে যুক্ত করে গড়ে ওঠা একটি চলমান নেটওয়ার্ক। মেহেরপুরের তরুণ ফ্রিল্যান্সার রাশেদুল ইসলাম ফেসবুকে ১০০ টাকা বাজিতে ২০ হাজার টাকা জয়ের বিজ্ঞাপন দেখে অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খোলেন।

শুরুতে ৫০০ টাকা জমা দিয়ে কয়েকবার জেতা ও অর্থ তুলতে পারায় তার আস্থা বাড়ে। পরে মায়ের চিকিৎসার জন্য রাখা ডিপিএস ভেঙে ও ধার করে ‘এভিয়েটর’ গেমে এক রাতে প্রায় ৪ লাখ টাকা বাজি ধরেন। সব হারিয়ে একপর্যায়ে ঋণের চাপে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, কুড়িগ্রামের চিলমারীর দিনমজুর রহিম মিয়া সরকারি ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় এক দালালের কাছে এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য দেন।

পরে তার নামে একাধিক সিম তুলে সেগুলো জুয়া চক্রের লেনদেনে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তার নামে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় মানি লন্ডারিং মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন খেলোয়াড়কে ধরে রাখার কৌশল শুরু হয় ছোট জয়ের প্রলোভন দিয়ে। এরপর তার বাজির ধরন, জমার পরিমাণ ও হারার পর পুনরায় খেলার প্রবণতা বিশ্লেষণ করে দেওয়া হয় বোনাস ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক অফার।

লোকসান শুরু হলে ‘হারানো টাকা ফেরত’ পাওয়ার আশায় অনেকে আরও অর্থ ঢালেন। টাকা তুলতে গেলে আবার ভুয়া কেওয়াইসি, ‘ক্লিয়ারেন্স ফি’, ‘ট্যাক্স’ বা অতিরিক্ত ডিপোজিটের শর্ত দেখিয়ে অর্থ আটকে রাখা হয়। অর্থাৎ, ছোট জয় দিয়ে আস্থা তৈরি, বড় বাজিতে টেনে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত টাকা আটকে দেওয়া— এটাই প্রতারণার মূল কৌশল।

এই চক্রের আরেক ভুক্তভোগী সাজ্জাদ হোসেন। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ফেসবুক রিলসে পরিচিত বিনোদন তারকাদের ডিপফেক ভিডিও ব্যবহার করে প্রচার করা একটি বেটিং অ্যাপের বিজ্ঞাপন দেখে তিনি প্রথমে ১ হাজার টাকা জমা দেন। প্রথম দিনেই ২ হাজার টাকা জেতার পর এক সপ্তাহের মধ্যে নিজের ব্যবসার অর্থ ও মা-বাবার সঞ্চয় থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা জমা করেন।

মাত্র তিন দিনে পুরো অর্থ হারিয়ে পাওনাদারের চাপে তিনিও বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রাণে বাঁচলেও সাজ্জাদ এখন স্থায়ী শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। কিন্তু তার হারানো অর্থের একটি বড় অংশ একাধিক ডিজিটাল লেনদেনের স্তর পেরিয়ে চলে গেছে দেশের বাইরে। কারা চালায় নেটওয়ার্ক অনলাইন জুয়া ও পকেট ক্যাসিনোর এই আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক কোনো একক ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন হ্যাকার দলের হাতে নয়; এর পেছনে রয়েছে দেশি-বিদেশি অপরাধী ও সহযোগীদের বহুস্তরীয় কাঠামো।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওপরের স্তরে রয়েছে বিদেশভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম অপারেটর ও নিয়ন্ত্রকেরা। এই নিয়ন্ত্রণে চীন, রাশিয়া, কম্বোডিয়া ও দুবাইভিত্তিক বিভিন্ন চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে জুয়ার প্ল্যাটফর্ম, সার্ভার, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং অর্থের প্রবাহ। এর পরের স্তরে রয়েছে বাংলাদেশি রিজিওনাল এজেন্ট ও সমন্বয়কারীরা।

স্থানীয়ভাবে পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সচল রাখা, প্রচারক ও এজেন্টদের পরিচালনা এবং বিদেশি অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করে তারা। আরও নিচে রয়েছে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারকেরা, যারা ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করে কমিশন নেয়। মাঠপর্যায়ে থাকে পেমেন্ট কালেক্টর ও মিউল অ্যাকাউন্টধারীরা।

তাদের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ ও একাধিক স্তরে তা স্থানান্তর করা হয়। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সামনের সারির এজেন্ট বা মিউল অ্যাকাউন্টধারী শনাক্ত হলেও নেপথ্যের মূল নিয়ন্ত্রকেরা অনেক সময় অধরাই থেকে যায়। ফলে একটি অ্যাপ, ফেসবুক পেজ বা পেমেন্ট নম্বর বন্ধ করলেও থেমে থাকে না পুরো চক্র; কিছুদিন পর নতুন নামে, নতুন লিংকে কিংবা নতুন পেমেন্ট চ্যানেলে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে একই নেটওয়ার্ক।

জুয়ার বিস্তারে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গার এজেন্ট নেটওয়ার্ক অনলাইন জুয়ায় খেলোয়াড়দের বড় অংশ সর্বস্বান্ত হলেও এর পেছনের এজেন্টরা লাভবান হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুয়ার প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা ১ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এজেন্ট অ্যাকাউন্ট নিয়ে অবৈধ কারেন্সি বিক্রি ও নতুন খেলোয়াড় যুক্ত করার কাজ করছে।

এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুয়ার এজেন্টদের উপস্থিতি মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় তুলনামূলক বেশি। এরপর কক্সবাজার, কুমিল্লা ও জামালপুরের কয়েকটি এলাকার নামও এসেছে। তবে গুগলের তথ্য অনুসারে, রংপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি মানুষ অনলাইন জুয়ার একাধিক সাইট গুগলে খুঁজেছেন। সারা দেশের তুলনায় এখানকার সার্চের হার সবচেয়ে বেশি রংপুর বিভাগ থেকে, যার স্কোর ১০০-এর মধ্যে ১০০।

রাজশাহী বিভাগ রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে, যার স্কোর ১০০-তে ৪৬। এরপর চট্টগ্রাম (৪১), খুলনা ও বরিশালের স্কোর (৩৬)। তথ্যমতে, ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সি তরুণেরাই অনলাইন ক্যাসিনোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, তরুণ কর্মজীবী এবং বেকার যুবকদের মধ্যে এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। টাকা কীভাবে ঢোকে, কোথায় যায় যিনি অনলাইনে জুয়া খেলেন, তিনি মনে করেন, একটি বিদেশি বেটিং প্ল্যাটফর্মে টাকা জমা দিচ্ছেন।

কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেই অর্থ অনেক ক্ষেত্রে প্রথমেই ঢোকে বাংলাদেশের স্থানীয় আর্থিক নেটওয়ার্কে। বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস), ব্যক্তিগত ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট কিংবা বিভিন্ন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি ডিপোজিটের জন্য আলাদা নম্বর বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়, যাতে একই হিসাবে বড় অঙ্কের লেনদেন জমে নজরদারিতে না আসে।

টাকা জমা হওয়ার পর তা দীর্ঘ সময় কোনো একটি হিসাবে রাখা হয় না; দ্রুত একাধিক ব্যক্তিগত, মিউল ও ব্যাবসায়িক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের মাধ্যমে তৈরি করা হয় লেনদেনের একাধিক স্তর। এতে অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য আড়াল করা সহজ হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে হুন্ডি ও অন্যান্য অবৈধ আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়; কোথাও কোথাও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের পথও ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

ফলে একজন খেলোয়াড়ের কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সেই অর্থ দেশীয় সংগ্রাহক, মিউল ও লেনদেনের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে বিদেশি অপারেটরদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে। এমনকি একজনের হারানো অর্থই পরবর্তী সময়ে নতুন ডোমেইন, অ্যাপ ও প্রচারণার মাধ্যমে নতুন খেলোয়াড় তৈরির অর্থের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

আইন আছে, কিন্তু থামছে না জুয়ার সাম্রাজ্য ২০২৬ সালে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ-ফিক্সিং ও জুয়ার বিজ্ঞাপনকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ করা হয়েছে। এতে জুয়া প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা এবং সাধারণ জুয়াড়ির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর ২০ ধারায়ও সাইবার স্পেসে জুয়া পরিচালনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু আইন ও অভিযান চললেও থামছে না নেটওয়ার্ক। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, এ ধরনের অপরাধে প্রায় ৪ হাজার জিডি ও ২৫০টির বেশি মামলা তদন্তাধীন।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, জুয়া, বাজি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গত মাসে ২০ হাজারের বেশি এমএফএস হিসাব শনাক্ত করে বন্ধ করা হয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধ ঠেকাতে কাজ করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনও (বিটিআরসি)। এই সংস্থার চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অবৈধ সিম শনাক্তে সিম বক্স ডিটেকশন সিস্টেম ও এআইভিত্তিক সিগন্যাল প্যাটার্ন অ্যানালিসিস ব্যবহার করা হচ্ছে।

একটি এনআইডির বিপরীতে অস্বাভাবিক সংখ্যক সিম, সন্দেহজনক ব্যবহার বা অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নম্বর, আইএমইআই ও এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিএফআইইউকে দেওয়া হচ্ছে। জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপের লিংকও নিয়মিত ব্লক করা হচ্ছে। তবে একটি ডোমেইন বন্ধ হওয়ার পর নতুন ডোমেইন বা মিরর সাইট চালু হওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত নতুন লিংক ছড়িয়ে পড়ায় পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, অফলাইন জুয়ায় সামাজিক লোকলজ্জা, আইনি ভয় এবং সশরীরে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু অনলাইন জুয়া বা বেটিং প্ল্যাটফর্মগুলো স্মার্টফোনের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের হাতের মুঠোয়, এমনকি শোবার ঘরেও পৌঁছে গেছে। ড. তৌহিদুল হক এই মহামারি থেকে সমাজকে মুক্তির জন্য সমন্বিত আইনি, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন।

তার মতে, কেবল গ্রেপ্তার বা শাস্তি দিয়ে এই নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অনলাইন জুয়া বন্ধে কেবল প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়, যদি আমরা আর্থিক লেনদেনের উৎসগুলো, অর্থাৎ এজেন্ট নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারি। তিনি বলেন, প্রযুক্তির সঙ্গে কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং আর্থিক খাতের নজরদারি— এই তিনের সমন্বয়ই হতে পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একমাত্র কার্যকর উপায়।