আজ বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৪%

অনুমোদনহীন স্লিপার বাস সড়কে নামল কীভাবে

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:59:48 pm, Wednesday, 9 September 2026
  • 19

অনুমোদনহীন স্লিপার বাস সড়কে নামল কীভাবে

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ঝকঝকে রং, বিলাসবহুল অভ্যন্তর, আলাদা কেবিন ও শোয়ার ব্যবস্থা। দূরপাল্লার যাত্রায় আরামের নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্লিপার কোচ। বাড়তি ভাড়া দিয়েও এসব বাসে উঠছেন যাত্রীরা। কিন্তু সেই আরামের আড়ালেই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। আদালতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, দেশের সড়কে চলছে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস।

সংস্থাটির দাবি, কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমোদন তারা দেয়নি। এ অবস্থায় বুধবার হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া মহাসড়কে স্লিপার বাস চলতে পারবে না। এদিন দুপুরে বিআরটিএর পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এতে বলা হয়, কোনো স্লিপার বাসের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চলাচলরত বাসের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আদালতকে জানিয়েছে সংস্থাটি।

শুনানি শেষে আদালত বলেছেন, বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া কোনো স্লিপার বাস সড়কে চলাচলের সুযোগ নেই। অনুমোদন না থাকলে এসব স্লিপার বাস সড়কে নামল কীভাবে? সাধারণ বাস হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে থাকলে পরে সেগুলোর কাঠামো পরিবর্তন করা হলো কীভাবে? পরিবর্তিত কাঠামো নিয়ে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট নবায়নই বা হলো কীভাবে— এমন প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা অনেক চেসিস মূলত একতলা বাস তৈরির উপযোগী। পরে স্থানীয় গ্যারেজ বা বডি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ওই চেসিসের ওপর পরিবর্তিত কাঠামো বসিয়ে তৈরি করা হচ্ছে স্লিপার কিংবা ডাবল ডেকার কোচ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি বাসের উচ্চতা, প্রস্থ, মোট ওজন, আসনসংখ্যা ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা হলে এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে কারিগরি অনুমোদন ও নিরাপত্তা।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশা ও কাঠামোর বাইরে গিয়ে অনেক বাসকে রূপান্তর করা হয়েছে। কোথাও একতলা বাসের ওপর বসানো হয়েছে দোতলা কাঠামো। কোথাও সাধারণ আসন খুলে তৈরি করা হয়েছে শোয়ার বার্থ। এতে একই চেসিসে বদলে যাচ্ছে বাসের উচ্চতা, ওজন, ভারসাম্য ও যাত্রী ধারণক্ষমতা। পরিবহন এবং দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামানের মতে, কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে চেসিস, সাসপেনশন ও ব্রেকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

ফলে বিষয়টি শুধু কাগজপত্রের বৈধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তিনি বলেন, গ্যারেজে যদি অনুমোদনহীনভাবে বাসের কাঠামো পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে সড়কে ওঠার আগেই সেগুলো শনাক্ত করা গেল না কেন? সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার, মানিকনগর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি ও পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক অভিযানে এর কিছু বাস্তব চিত্রও সামনে এসেছে। ১৯ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর সামির মৃধা জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি, বাসের কাঠামো পরিবর্তন এবং অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনার অভিযোগে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগের দিন গাবতলী, আমিনবাজার ও মানিকনগরের প্রায় ১০ থেকে ১২টি গ্যারেজ পরিদর্শন করে চারটিকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

আটটি গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠানো এবং দুটি স্লিপার বাস জব্দ করা হয়। একটি গ্যারেজ সিলগালাও করা হয়েছে। কক্সবাজারেও জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ ও পুলিশের যৌথ অভিযানে কয়েকটি দূরপাল্লার বাসের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে। বিআরটিএর বক্তব্য, তারা কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমোদন দেয়নি। সংস্থাটির ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক মো. শহিদুল্লাহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনেক বাস প্রথমে সাধারণ একতলা বাস হিসেবেই নিবন্ধিত হয়েছিল।

পরে মালিকপক্ষ কাঠামো পরিবর্তন করে সেগুলো স্লিপার কোচে রূপান্তর করেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সভাপতি আফতাব উদ্দিন মাসুদ বলেন, বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই না করে ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব বাসের নিবন্ধন ও রুট পারমিট দিয়েছেন। বিআরটিএ আমার বাসের নাম্বারও দিয়েছে। তারা ম্যানেজ হয়েই এসব গাড়ি রাস্তায় চলতে দিয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নিবন্ধনের সময় বাস একতলা ছিল। পরে কাঠামো বদলে গেলে ফিটনেস পরীক্ষায় সেটি ধরা পড়ল না কেন? পরিবর্তিত কাঠামো নিয়ে রুট পারমিট নবায়ন হলো কীভাবে? বছরের পর বছর মহাসড়কে চলাচল, পুলিশের চেকপোস্ট অতিক্রম এবং যাত্রী পরিবহনের পরও বিষয়টি নজরে এলো না কেন? অর্থাৎ, অবৈধ কাঠামো যদি নিবন্ধনের পর তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শনাক্ত করার সরকারি ব্যবস্থার কার্যকারিতাও এখন প্রশ্নের মুখে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি বাসের নিবন্ধনের সময় প্রকৃত কাঠামো কী ছিল, পরে কাঠামো পরিবর্তনের কোনো আবেদন করা হয়েছিল কি না, হলে কে অনুমোদন দিয়েছেন, ফিটনেস পরীক্ষায় কী উল্লেখ ছিল এবং রুট পারমিটের নথিতে কী তথ্য রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ একদিকে মালিক সমিতির অভিযোগ, অন্যদিকে বিআরটিএ বলছে তারা স্লিপার বাসের অনুমোদনই দেয়নি।

এ দুই বক্তব্যের মাঝখানে রয়েছে ৮২৯টি বাস এবং সেসব বাসে চলাচলকারী অসংখ্য যাত্রী। বাংলাদেশ অটোমোবাইল বডি ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, বিদেশ থেকে আমদানি করা দোতলা বাস যদি চলাচল করতে পারে, তাহলে দেশীয়ভাবে তৈরি বা পরিবর্তিত বাসকে অবৈধ বলা হবে কেন? তাদের প্রশ্ন, এত দিন যখন এসব বাসের কাঠামো গ্যারেজে তৈরি বা পরিবর্তন হয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোথায় ছিল?

জানা গেছে, স্লিপার কোচের বৈধতা নিয়ে ২০২৫ সালে হাইকোর্টে রিট হয়। রিটকারী আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খানের মামলায় বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। চলতি বছরের ২০ আগস্ট শুনানিতে বিআরটিএ আদালতকে জানায়, দেশের সড়কে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস চলাচল করছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্যও আদালতকে জানানো হয়। রিটকারী আইনজীবীর বক্তব্য, বিআরটিএ যখন আদালতেই বলেছে তারা স্লিপার বাস চলাচলের অনুমোদন দেয়নি।

তখন এসব বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনি বাধা থাকার কথা নয়। তবে আদালতে ৮২৯টি বাসের তথ্য প্রকাশের পর বরং আরও বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে— যে বাসগুলো এখন অবৈধ বলা হচ্ছে, সেগুলো এত দিন রাষ্ট্রের চোখের সামনে কীভাবে চলল? স্লিপার কোচ নিয়ে বিতর্ক শুধু অনুমোদন ও কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনার পর এসব বাসের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে কাঠবোঝাই ট্রাকের পেছনে স্লিপার কোচের ধাক্কায় তিন যাত্রী নিহত ও অন্তত পাঁচজন আহত হন। দুর্ঘটনায় বাসটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। মার্চে দিনাজপুরের বিরামপুরে দাঁড়িয়ে থাকা বালুবাহী ট্রাকে স্লিপার বাসের ধাক্কায় দুজন নিহত ও ছয়জন আহত হন। ১৭ আগস্ট কুমিল্লার দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জে সামনে থাকা একটি গাড়িতে ধাক্কার পর রয়েল কক্স পরিবহনের স্লিপার কোচে আগুন ধরে যায়।

বাসটি পুরোপুরি পুড়ে গেলেও যাত্রীরা দ্রুত বের হয়ে যাওয়ায় প্রাণহানি হয়নি। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কুয়াকাটাগামী আইকনিক পরিবহনের একটি ডাবল ডেকার স্লিপার বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের পুকুরে পড়ে যায়। এতে ১৫ জন আহত হন। দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর আগস্টে স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে দৃশ্যমানভাবে কঠোর অবস্থান নেয় বিআরটিএ।

এদিকে ২৯ আগস্ট তেজগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান বলেন, রুল ইস্যু হওয়ার পরে বিআরটিএ আদালতকে জানিয়েছে, তারা কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমতি দেয়নি। যে স্লিপার বাসগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের রাস্তায় চলাচল করছে, সবগুলো অবৈধভাবে চলাচল করছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া স্লিপার বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এর আগে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, স্লিপার কোচ নামে যে কোনো যান আছে, তা তিনি জানতেনই না। তবে গতকাল যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া মোটরযানের নির্ধারিত অবয়ব, কাঠামো, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা কিংবা আসনবিন্যাস পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

ফেসবুক ও টেলিগ্রামে প্রলোভন: যেভাবে ছড়াচ্ছে অনলাইন জুয়ার অদৃশ্য সাম্রাজ্য

অনুমোদনহীন স্লিপার বাস সড়কে নামল কীভাবে

Update Time : 11:59:48 pm, Wednesday, 9 September 2026

ঝকঝকে রং, বিলাসবহুল অভ্যন্তর, আলাদা কেবিন ও শোয়ার ব্যবস্থা। দূরপাল্লার যাত্রায় আরামের নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্লিপার কোচ। বাড়তি ভাড়া দিয়েও এসব বাসে উঠছেন যাত্রীরা। কিন্তু সেই আরামের আড়ালেই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। আদালতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, দেশের সড়কে চলছে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস।

সংস্থাটির দাবি, কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমোদন তারা দেয়নি। এ অবস্থায় বুধবার হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া মহাসড়কে স্লিপার বাস চলতে পারবে না। এদিন দুপুরে বিআরটিএর পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এতে বলা হয়, কোনো স্লিপার বাসের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চলাচলরত বাসের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আদালতকে জানিয়েছে সংস্থাটি।

শুনানি শেষে আদালত বলেছেন, বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া কোনো স্লিপার বাস সড়কে চলাচলের সুযোগ নেই। অনুমোদন না থাকলে এসব স্লিপার বাস সড়কে নামল কীভাবে? সাধারণ বাস হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে থাকলে পরে সেগুলোর কাঠামো পরিবর্তন করা হলো কীভাবে? পরিবর্তিত কাঠামো নিয়ে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট নবায়নই বা হলো কীভাবে— এমন প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা অনেক চেসিস মূলত একতলা বাস তৈরির উপযোগী। পরে স্থানীয় গ্যারেজ বা বডি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ওই চেসিসের ওপর পরিবর্তিত কাঠামো বসিয়ে তৈরি করা হচ্ছে স্লিপার কিংবা ডাবল ডেকার কোচ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি বাসের উচ্চতা, প্রস্থ, মোট ওজন, আসনসংখ্যা ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা হলে এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে কারিগরি অনুমোদন ও নিরাপত্তা।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশা ও কাঠামোর বাইরে গিয়ে অনেক বাসকে রূপান্তর করা হয়েছে। কোথাও একতলা বাসের ওপর বসানো হয়েছে দোতলা কাঠামো। কোথাও সাধারণ আসন খুলে তৈরি করা হয়েছে শোয়ার বার্থ। এতে একই চেসিসে বদলে যাচ্ছে বাসের উচ্চতা, ওজন, ভারসাম্য ও যাত্রী ধারণক্ষমতা। পরিবহন এবং দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামানের মতে, কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে চেসিস, সাসপেনশন ও ব্রেকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

ফলে বিষয়টি শুধু কাগজপত্রের বৈধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তিনি বলেন, গ্যারেজে যদি অনুমোদনহীনভাবে বাসের কাঠামো পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে সড়কে ওঠার আগেই সেগুলো শনাক্ত করা গেল না কেন? সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার, মানিকনগর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি ও পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক অভিযানে এর কিছু বাস্তব চিত্রও সামনে এসেছে। ১৯ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর সামির মৃধা জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি, বাসের কাঠামো পরিবর্তন এবং অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনার অভিযোগে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগের দিন গাবতলী, আমিনবাজার ও মানিকনগরের প্রায় ১০ থেকে ১২টি গ্যারেজ পরিদর্শন করে চারটিকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

আটটি গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠানো এবং দুটি স্লিপার বাস জব্দ করা হয়। একটি গ্যারেজ সিলগালাও করা হয়েছে। কক্সবাজারেও জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ ও পুলিশের যৌথ অভিযানে কয়েকটি দূরপাল্লার বাসের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে। বিআরটিএর বক্তব্য, তারা কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমোদন দেয়নি। সংস্থাটির ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক মো. শহিদুল্লাহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনেক বাস প্রথমে সাধারণ একতলা বাস হিসেবেই নিবন্ধিত হয়েছিল।

পরে মালিকপক্ষ কাঠামো পরিবর্তন করে সেগুলো স্লিপার কোচে রূপান্তর করেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সভাপতি আফতাব উদ্দিন মাসুদ বলেন, বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই না করে ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব বাসের নিবন্ধন ও রুট পারমিট দিয়েছেন। বিআরটিএ আমার বাসের নাম্বারও দিয়েছে। তারা ম্যানেজ হয়েই এসব গাড়ি রাস্তায় চলতে দিয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নিবন্ধনের সময় বাস একতলা ছিল। পরে কাঠামো বদলে গেলে ফিটনেস পরীক্ষায় সেটি ধরা পড়ল না কেন? পরিবর্তিত কাঠামো নিয়ে রুট পারমিট নবায়ন হলো কীভাবে? বছরের পর বছর মহাসড়কে চলাচল, পুলিশের চেকপোস্ট অতিক্রম এবং যাত্রী পরিবহনের পরও বিষয়টি নজরে এলো না কেন? অর্থাৎ, অবৈধ কাঠামো যদি নিবন্ধনের পর তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শনাক্ত করার সরকারি ব্যবস্থার কার্যকারিতাও এখন প্রশ্নের মুখে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি বাসের নিবন্ধনের সময় প্রকৃত কাঠামো কী ছিল, পরে কাঠামো পরিবর্তনের কোনো আবেদন করা হয়েছিল কি না, হলে কে অনুমোদন দিয়েছেন, ফিটনেস পরীক্ষায় কী উল্লেখ ছিল এবং রুট পারমিটের নথিতে কী তথ্য রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ একদিকে মালিক সমিতির অভিযোগ, অন্যদিকে বিআরটিএ বলছে তারা স্লিপার বাসের অনুমোদনই দেয়নি।

এ দুই বক্তব্যের মাঝখানে রয়েছে ৮২৯টি বাস এবং সেসব বাসে চলাচলকারী অসংখ্য যাত্রী। বাংলাদেশ অটোমোবাইল বডি ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, বিদেশ থেকে আমদানি করা দোতলা বাস যদি চলাচল করতে পারে, তাহলে দেশীয়ভাবে তৈরি বা পরিবর্তিত বাসকে অবৈধ বলা হবে কেন? তাদের প্রশ্ন, এত দিন যখন এসব বাসের কাঠামো গ্যারেজে তৈরি বা পরিবর্তন হয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোথায় ছিল?

জানা গেছে, স্লিপার কোচের বৈধতা নিয়ে ২০২৫ সালে হাইকোর্টে রিট হয়। রিটকারী আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খানের মামলায় বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। চলতি বছরের ২০ আগস্ট শুনানিতে বিআরটিএ আদালতকে জানায়, দেশের সড়কে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস চলাচল করছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্যও আদালতকে জানানো হয়। রিটকারী আইনজীবীর বক্তব্য, বিআরটিএ যখন আদালতেই বলেছে তারা স্লিপার বাস চলাচলের অনুমোদন দেয়নি।

তখন এসব বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনি বাধা থাকার কথা নয়। তবে আদালতে ৮২৯টি বাসের তথ্য প্রকাশের পর বরং আরও বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে— যে বাসগুলো এখন অবৈধ বলা হচ্ছে, সেগুলো এত দিন রাষ্ট্রের চোখের সামনে কীভাবে চলল? স্লিপার কোচ নিয়ে বিতর্ক শুধু অনুমোদন ও কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনার পর এসব বাসের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে কাঠবোঝাই ট্রাকের পেছনে স্লিপার কোচের ধাক্কায় তিন যাত্রী নিহত ও অন্তত পাঁচজন আহত হন। দুর্ঘটনায় বাসটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। মার্চে দিনাজপুরের বিরামপুরে দাঁড়িয়ে থাকা বালুবাহী ট্রাকে স্লিপার বাসের ধাক্কায় দুজন নিহত ও ছয়জন আহত হন। ১৭ আগস্ট কুমিল্লার দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জে সামনে থাকা একটি গাড়িতে ধাক্কার পর রয়েল কক্স পরিবহনের স্লিপার কোচে আগুন ধরে যায়।

বাসটি পুরোপুরি পুড়ে গেলেও যাত্রীরা দ্রুত বের হয়ে যাওয়ায় প্রাণহানি হয়নি। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কুয়াকাটাগামী আইকনিক পরিবহনের একটি ডাবল ডেকার স্লিপার বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের পুকুরে পড়ে যায়। এতে ১৫ জন আহত হন। দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর আগস্টে স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে দৃশ্যমানভাবে কঠোর অবস্থান নেয় বিআরটিএ।

এদিকে ২৯ আগস্ট তেজগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান বলেন, রুল ইস্যু হওয়ার পরে বিআরটিএ আদালতকে জানিয়েছে, তারা কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমতি দেয়নি। যে স্লিপার বাসগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের রাস্তায় চলাচল করছে, সবগুলো অবৈধভাবে চলাচল করছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া স্লিপার বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এর আগে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, স্লিপার কোচ নামে যে কোনো যান আছে, তা তিনি জানতেনই না। তবে গতকাল যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া মোটরযানের নির্ধারিত অবয়ব, কাঠামো, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা কিংবা আসনবিন্যাস পরিবর্তনের সুযোগ নেই।