আজ আন্তর্জাতিক ক্ষমা দিবস। প্রতিবছর আগস্ট মাসের প্রথম রোববার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়। ক্ষমাশীলতার চর্চা, পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ দিবসের সূচনা। মানুষের মনে জমে থাকা রাগ, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও মানবিকতার চর্চাকে উৎসাহিত করাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। আন্তর্জাতিক ক্ষমা দিবসের ধারণা দেন রবার্ট ডব্লিউ. প্লাথ। তিনি ‘বিশ্বব্যাপী ক্ষমা জোট’ নামে একটি অলাভজনক শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সংস্থাটির লক্ষ্য ছিল এমন একটি আন্তর্জাতিক দিবস প্রতিষ্ঠা করা, যা মানুষের হৃদয়, পরিবার ও সমাজে ক্ষমার নিরাময়কারী পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছর আগস্ট মাসের প্রথম রোববার দিবসটি পালন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরসহ বিশ্বের নানা দেশে এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ‘ক্ষমার বীর’ হিসেবে সেই সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মান জানানো, যারা ক্ষমা, সহমর্মিতা ও অহিংসার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। এই দিনটি উদযাপনের সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হলো—যিনি আপনাকে কষ্ট দিয়েছেন, তাকে আন্তরিকভাবে ক্ষমা করার চেষ্টা করা। একই সঙ্গে নিজের পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে ভুলের জন্য প্রতিশোধ নয়, বরং সংশোধন ও ক্ষমাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোথাও এ উপলক্ষে কোনো অনুষ্ঠান বা আলোচনা হলে তাতেও অংশ নেওয়া যেতে পারে। ইংরেজ কবি আলেকজান্ডার পোপ বলেছেন, ‘ভুল করা মানুষের স্বভাব, আর ক্ষমা করা ঐশ্বরিক গুণ।’ অভিধান অনুযায়ী, ক্ষমা হলো— কোনো ব্যক্তি অন্যায় করার পর তাঁর প্রতি বিদ্বেষ, ক্ষোভ বা প্রতিশোধের মনোভাব ত্যাগ করা। বিশ্বের প্রায় সব প্রধান ধর্মেই ক্ষমার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা রয়েছে। এসব শিক্ষা মানুষকে ঘৃণা ও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহমর্মিতা, ভালোবাসা এবং মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমাশীলতা কেবল সম্পর্ককে সুন্দর করে না, এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও বাড়ায়। ২০০৮ সালে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, যারা সহজে ক্ষমা করতে পারেন, তাঁদের হৃৎস্পন্দন তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকে। দীর্ঘদিন রাগ ও ক্ষোভ পুষে রাখলে হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমাশীল মানুষের রক্তচাপ তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকে। ফলে উচ্চ রক্তচাপজনিত নানা ঝুঁকিও কমে। ছেষট্টি বছরের বেশি বয়সী মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা সহজে ক্ষমা করতে পারেন, তাঁদের শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বেশি। দীর্ঘদিনের কোমরব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ক্ষমা করতে সক্ষম, তাঁদের ব্যথার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমাশীল মানুষের শরীরে মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের পরিমাণ কম থাকে। ফলে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও মানসিক চাপও কম অনুভূত হয়। সব আঘাত সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। অনেক সময় এমন কিছু ঘটে, যা ক্ষমা করা অত্যন্ত কঠিন। তবে ক্ষমা মানেই অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। ক্ষমা মানে নিজের ভেতরে জমে থাকা রাগ, ঘৃণা ও প্রতিশোধের অনুভূতি থেকে মুক্ত হওয়া। কখনো কখনো অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন না করেও মানুষ নিজের মানসিক ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারে। অতীতের কষ্ট হয়তো পুরোপুরি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু সেই কষ্টকে সারাজীবনের বোঝা বানিয়ে রাখাও প্রয়োজন নেই। নিজের মানসিক শান্তির জন্যই একসময় রাগ ও বিদ্বেষকে বিদায় জানাতে হয়। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, ‘রাগ ধরে রাখা অনেকটা জ্বলন্ত কয়লা হাতে নিয়ে অন্যের দিকে ছুড়ে মারতে চাওয়ার মতো। এতে শেষ পর্যন্ত আপনিই পুড়ে যান।’ এই কথার অর্থ হলো, বিদ্বেষ ও ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে সেই মানুষটির, যিনি তা বয়ে বেড়ান। তাই অন্যকে শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছায় নিজের জীবনকে বিষিয়ে তোলার কোনো অর্থ নেই। ক্ষমা চর্চার একটি সুপরিচিত পদ্ধতিতে চারটি বাক্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়—‘আমি দুঃখিত’, ‘অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করুন’, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, ‘তোমাকে ধন্যবাদ’। এই চারটি বাক্য মানুষকে নিজের ভুল স্বীকার করতে, ক্ষমা চাইতে, ভালোবাসা প্রকাশ করতে এবং কৃতজ্ঞতা জানাতে শেখায়। ফলে সম্পর্কের দূরত্ব কমে এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।
7:19 pm, Sunday, 2 August 2026
শিরোনাম :


























