4:47 am, Sunday, 2 August 2026

লজিস্টিকস খাতে বিদেশি কোম্পানির বাড়তি সুবিধা প্রত্যাহারের দাবি

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:16:57 am, Sunday, 2 August 2026
  • 6
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

খসড়া ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালায় বিদেশি মালিকানার সীমা ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করার প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও গবেষকরা। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) আয়োজিত ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ দাবি ওঠে। প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। গোলটেবিলে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার। তিনি বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, কাস্টম এজেন্ট ও কুরিয়ার-এক্সপ্রেস, এই উপখাতগুলোতে ব্যবসা পরিচালনায় বড় স্থায়ী মূলধন লাগে না। ফলে বিদেশি মালিকানার প্রবেশাধিকার অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হলে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। তার ভাষ্য, এটি প্রকৃত লাইসেন্সভিত্তিক সেবা খাত, যেখানে বিদ্যমান পদ্ধতিতে ব্যাবসায়িক নেটওয়ার্কই মূল সম্পদ; তাই বাজারে যা ঘটছে তা প্রকৃত প্রতিযোগিতা নয়, বরং নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করছে। ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ প্রতিবছর আনুমানিক ৯ বিলিয়ন ডলার ফ্রেইট বাবদ ব্যয় করে, যার মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ দেশীয় জাহাজের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। দেশীয় অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার দেশে রাখা সম্ভব। পতাকাবাহী জাহাজ (সংরক্ষণ) আইন, ২০১৯ কার্যকর হওয়ার পর দেশীয় সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ৪৮ থেকে ৮০টিতে উন্নীত হয়েছে। একইভাবে সিভিল এভিয়েশন আইন-২০১৭ এর ধারা ৯(৪) অনুযায়ী বিদেশি এয়ারলাইন্সের এজেন্টকে শতভাগ বাংলাদেশি মালিকানাধীন হওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের ফলে দেশে শক্তিশালী দেশীয় জিএসএ শিল্প গড়ে উঠেছে। সাকিব আনোয়ার বলেন, শতভাগ বিদেশি মালিকানার অনেক প্রতিষ্ঠান দেশে থাকলেও তারা কোনো দেশীয় জাহাজ বা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেনি। তিনি আরও বলেন, শিপিং এজেন্ট ও সি-অ্যান্ড-এফ এজেন্ট বিধিমালা দুটিতে ৬০/৪০ কাঠামো কমিয়ে ৫১/৪৯ করা হয়েছে। চলতি বাজেটে আইসিডি ও অফ-ডকের ৪৯ শতাংশ সীমাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। কুরিয়ার খাতে কোনো সীমা নেই। ফলে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে ৬০/৪০ কাঠামোই এখন দেশীয় মালিকানার সর্বশেষ মানদ-. এ ছাড়া শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রিট পিটিশন নং ১২৪৮৯/২০১৯-এর হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন একটি মামলাও রয়েছে। বিধিমালা সংশোধন হলে ওই বিচারপ্রক্রিয়ার ফল কার্যকারিতা হারাতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে লজিস্টিকস খাতের সংযোগের বিষয়টি তুলে ধরে নবগঠিত এনসিপির সদস্য ফজলে হুদা বলেন, অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান দৃশ্যমান অবকাঠামো ছাড়াই কেবল বিল অব লেডিংসহ বিভিন্ন নথির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধী নই; তবে সেই বিনিয়োগ হতে হবে রেলপথ, কোল্ড চেইন, আধুনিক ট্রাক ও কৃষিভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থার মতো অবকাঠামোগত খাতে। শ্রীলঙ্কা ও ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বাণিজ্য, বন্দর ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকসের মতো খাত কৌশলগতভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং পেশাদার আইনজীবী বা পরামর্শকের মাধ্যমে নামসর্বস্ব মালিকানার আড়ালে ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, অতিরিক্ত বিদেশি অংশগ্রহণের ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ খাতে যে লুকোচুরি চলছে তা নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এ টি এম আজিজুল আতিক ডেভিড বলেন, কার্যকর সুদের হার ২৩ থেকে ২৪ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তারা ব্যবসা থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, অথচ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে। গোলটেবিল থেকে চার দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়। আলোচনায় আরও অংশ নেন সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, আইসিবির সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হোসাইন এফসিএ, ব্যারিস্টার এম সাইফুজ্জামান, ঢাকা স্টকের কমপ্লায়েন্স অডিটর হাসান মামুন এবং বিপিএসএন লজিস্টিকসের হেড অব ফিন্যান্স কামরুজ্জামান। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকরা উত্থাপিত সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

লজিস্টিকস খাতে বিদেশি কোম্পানির বাড়তি সুবিধা প্রত্যাহারের দাবি

Update Time : 02:16:57 am, Sunday, 2 August 2026

খসড়া ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালায় বিদেশি মালিকানার সীমা ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করার প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও গবেষকরা। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) আয়োজিত ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ দাবি ওঠে। প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। গোলটেবিলে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার। তিনি বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, কাস্টম এজেন্ট ও কুরিয়ার-এক্সপ্রেস, এই উপখাতগুলোতে ব্যবসা পরিচালনায় বড় স্থায়ী মূলধন লাগে না। ফলে বিদেশি মালিকানার প্রবেশাধিকার অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হলে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। তার ভাষ্য, এটি প্রকৃত লাইসেন্সভিত্তিক সেবা খাত, যেখানে বিদ্যমান পদ্ধতিতে ব্যাবসায়িক নেটওয়ার্কই মূল সম্পদ; তাই বাজারে যা ঘটছে তা প্রকৃত প্রতিযোগিতা নয়, বরং নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করছে। ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ প্রতিবছর আনুমানিক ৯ বিলিয়ন ডলার ফ্রেইট বাবদ ব্যয় করে, যার মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ দেশীয় জাহাজের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। দেশীয় অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার দেশে রাখা সম্ভব। পতাকাবাহী জাহাজ (সংরক্ষণ) আইন, ২০১৯ কার্যকর হওয়ার পর দেশীয় সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ৪৮ থেকে ৮০টিতে উন্নীত হয়েছে। একইভাবে সিভিল এভিয়েশন আইন-২০১৭ এর ধারা ৯(৪) অনুযায়ী বিদেশি এয়ারলাইন্সের এজেন্টকে শতভাগ বাংলাদেশি মালিকানাধীন হওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের ফলে দেশে শক্তিশালী দেশীয় জিএসএ শিল্প গড়ে উঠেছে। সাকিব আনোয়ার বলেন, শতভাগ বিদেশি মালিকানার অনেক প্রতিষ্ঠান দেশে থাকলেও তারা কোনো দেশীয় জাহাজ বা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেনি। তিনি আরও বলেন, শিপিং এজেন্ট ও সি-অ্যান্ড-এফ এজেন্ট বিধিমালা দুটিতে ৬০/৪০ কাঠামো কমিয়ে ৫১/৪৯ করা হয়েছে। চলতি বাজেটে আইসিডি ও অফ-ডকের ৪৯ শতাংশ সীমাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। কুরিয়ার খাতে কোনো সীমা নেই। ফলে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে ৬০/৪০ কাঠামোই এখন দেশীয় মালিকানার সর্বশেষ মানদ-. এ ছাড়া শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রিট পিটিশন নং ১২৪৮৯/২০১৯-এর হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন একটি মামলাও রয়েছে। বিধিমালা সংশোধন হলে ওই বিচারপ্রক্রিয়ার ফল কার্যকারিতা হারাতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে লজিস্টিকস খাতের সংযোগের বিষয়টি তুলে ধরে নবগঠিত এনসিপির সদস্য ফজলে হুদা বলেন, অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান দৃশ্যমান অবকাঠামো ছাড়াই কেবল বিল অব লেডিংসহ বিভিন্ন নথির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধী নই; তবে সেই বিনিয়োগ হতে হবে রেলপথ, কোল্ড চেইন, আধুনিক ট্রাক ও কৃষিভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থার মতো অবকাঠামোগত খাতে। শ্রীলঙ্কা ও ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বাণিজ্য, বন্দর ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকসের মতো খাত কৌশলগতভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং পেশাদার আইনজীবী বা পরামর্শকের মাধ্যমে নামসর্বস্ব মালিকানার আড়ালে ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, অতিরিক্ত বিদেশি অংশগ্রহণের ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ খাতে যে লুকোচুরি চলছে তা নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এ টি এম আজিজুল আতিক ডেভিড বলেন, কার্যকর সুদের হার ২৩ থেকে ২৪ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তারা ব্যবসা থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, অথচ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে। গোলটেবিল থেকে চার দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়। আলোচনায় আরও অংশ নেন সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, আইসিবির সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হোসাইন এফসিএ, ব্যারিস্টার এম সাইফুজ্জামান, ঢাকা স্টকের কমপ্লায়েন্স অডিটর হাসান মামুন এবং বিপিএসএন লজিস্টিকসের হেড অব ফিন্যান্স কামরুজ্জামান। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকরা উত্থাপিত সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।