4:53 am, Friday, 31 July 2026

কাগজেই ডাক্তার, বাস্তবে শূন্য

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:56:07 am, Friday, 31 July 2026
  • 1
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

নামে আছে, কাজে নেই বাংলার এই প্রবাদটি যেন হুবহু মিলে গেছে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে। সরকারি নথিতে চিকিৎসকের পদায়ন থাকলেও বাস্তবে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। ফলে হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সারা বছর চিকিৎসকশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অনুমোদিত দুটি মেডিকেল অফিসারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় কেবল উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হুমায়ুন কবিরের ওপরই পুরো সেবার দায়িত্ব বর্তেছে। এর ওপর রয়েছে তীব্র জনবল, ওষুধ ও রক্ষণাবেক্ষণের সংকট। এই সংকট নিরসনে গত ৬ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. শাহেদুল আলম ভূঁইয়াকে এই উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদায়ন করে। তবে একই প্রজ্ঞাপনে তাকে আবার ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। এর ফলে কাগজে-কলমে তিনি শান্তিগঞ্জে কর্মরত থাকলেও বাস্তবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকায়। অথচ তার মূল বেতন-ভাতা উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই পশ্চিম পাগলা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে চিকিৎসক দেখিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এতে সংকট দূর হওয়ার পরিবর্তে উল্টো তা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় কৃষক মকবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ইউনিয়নে একটা ভালো চিকিৎসা পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। গরিব মানুষ সর্দি-কাশি বা একটু বেশি অসুস্থ হলেই এই উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দৌড়াই। কিন্তু ডাক্তার না থাকায় সবসময় শুধু হতাশা নিয়ে ফিরতে হয়। সরকার নাকি ডাক্তার দিছে, কিন্তু সেই ডাক্তার থাকে ঢাকায়! কাগজে ডাক্তার থাইকা আমাগো কী লাভ? গরিবের কি কোনো দাম নাই? আমরা দ্রুত এই এলাকায় স্থায়ী ডাক্তার চাই। গৃহবধূ সালমা বেগম বলেন, গত সপ্তাহে আমার ছোট মেয়ের প্রচ- জ্বর আসছিল। কোলে করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পর শুনি ডাক্তার নাই। শুধু একজন সহকারী ওষুধ দিয়া বিদায় করছে। শুনছি নাকি খাতায় কলমে ডাক্তার আছে, কিন্তু তিনি ঢাকায় চাকরি করেন। এটা কেমন বিচার? আমাগো গ্রামের মানুষের কি জীবন নাই? ঢাকায় বইসা ডাক্তার বেতন তুলব, আর আমরা বিনা চিকিৎসায় মরব এটা মানা যায় না। পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হায়দার বলেন, যেখানে দুজন চিকিৎসকের প্রয়োজন, সেখানে একজনকে পদায়ন দেখিয়ে ঢাকায় সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি গ্রামের মানুষের প্রতি এক ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ। দ্রুত তাকে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে হবে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আনছার উদ্দিন বলেন, আমাদের দাবির মুখে চিকিৎসক পদায়ন হলেও সংযুক্তির কারণে মানুষ সেবা পাচ্ছে না। যেখানকার বেতন-ভাতা ভোগ করবেন, দায়িত্বও সেখানেই পালন করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদায়ন দিয়ে অন্যত্র সংযুক্ত রাখার এই চর্চা বন্ধ না হলে গ্রামীণ জনপদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হাসান জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই পদায়নকৃত চিকিৎসক বর্তমানে ঢাকায় সংযুক্ত আছেন। ফলে উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এখনো কোনো মেডিকেল অফিসার নেই, যা জেলা সিভিল সার্জনকে জানানো হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, সংযুক্তি ব্যবস্থার কারণে কাগজে চিকিৎসক থাকলেও বাস্তবে তারা অন্যত্র দায়িত্ব পালন করেন। এতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়ে সংযুক্তি বাতিল করে চিকিৎসকদের মূল কর্মস্থলে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

কাগজেই ডাক্তার, বাস্তবে শূন্য

Update Time : 03:56:07 am, Friday, 31 July 2026

নামে আছে, কাজে নেই বাংলার এই প্রবাদটি যেন হুবহু মিলে গেছে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে। সরকারি নথিতে চিকিৎসকের পদায়ন থাকলেও বাস্তবে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। ফলে হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সারা বছর চিকিৎসকশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অনুমোদিত দুটি মেডিকেল অফিসারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় কেবল উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হুমায়ুন কবিরের ওপরই পুরো সেবার দায়িত্ব বর্তেছে। এর ওপর রয়েছে তীব্র জনবল, ওষুধ ও রক্ষণাবেক্ষণের সংকট। এই সংকট নিরসনে গত ৬ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. শাহেদুল আলম ভূঁইয়াকে এই উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদায়ন করে। তবে একই প্রজ্ঞাপনে তাকে আবার ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। এর ফলে কাগজে-কলমে তিনি শান্তিগঞ্জে কর্মরত থাকলেও বাস্তবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকায়। অথচ তার মূল বেতন-ভাতা উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই পশ্চিম পাগলা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে চিকিৎসক দেখিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এতে সংকট দূর হওয়ার পরিবর্তে উল্টো তা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় কৃষক মকবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ইউনিয়নে একটা ভালো চিকিৎসা পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। গরিব মানুষ সর্দি-কাশি বা একটু বেশি অসুস্থ হলেই এই উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দৌড়াই। কিন্তু ডাক্তার না থাকায় সবসময় শুধু হতাশা নিয়ে ফিরতে হয়। সরকার নাকি ডাক্তার দিছে, কিন্তু সেই ডাক্তার থাকে ঢাকায়! কাগজে ডাক্তার থাইকা আমাগো কী লাভ? গরিবের কি কোনো দাম নাই? আমরা দ্রুত এই এলাকায় স্থায়ী ডাক্তার চাই। গৃহবধূ সালমা বেগম বলেন, গত সপ্তাহে আমার ছোট মেয়ের প্রচ- জ্বর আসছিল। কোলে করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পর শুনি ডাক্তার নাই। শুধু একজন সহকারী ওষুধ দিয়া বিদায় করছে। শুনছি নাকি খাতায় কলমে ডাক্তার আছে, কিন্তু তিনি ঢাকায় চাকরি করেন। এটা কেমন বিচার? আমাগো গ্রামের মানুষের কি জীবন নাই? ঢাকায় বইসা ডাক্তার বেতন তুলব, আর আমরা বিনা চিকিৎসায় মরব এটা মানা যায় না। পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হায়দার বলেন, যেখানে দুজন চিকিৎসকের প্রয়োজন, সেখানে একজনকে পদায়ন দেখিয়ে ঢাকায় সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি গ্রামের মানুষের প্রতি এক ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ। দ্রুত তাকে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে হবে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আনছার উদ্দিন বলেন, আমাদের দাবির মুখে চিকিৎসক পদায়ন হলেও সংযুক্তির কারণে মানুষ সেবা পাচ্ছে না। যেখানকার বেতন-ভাতা ভোগ করবেন, দায়িত্বও সেখানেই পালন করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদায়ন দিয়ে অন্যত্র সংযুক্ত রাখার এই চর্চা বন্ধ না হলে গ্রামীণ জনপদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হাসান জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই পদায়নকৃত চিকিৎসক বর্তমানে ঢাকায় সংযুক্ত আছেন। ফলে উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এখনো কোনো মেডিকেল অফিসার নেই, যা জেলা সিভিল সার্জনকে জানানো হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, সংযুক্তি ব্যবস্থার কারণে কাগজে চিকিৎসক থাকলেও বাস্তবে তারা অন্যত্র দায়িত্ব পালন করেন। এতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়ে সংযুক্তি বাতিল করে চিকিৎসকদের মূল কর্মস্থলে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।