দেশে আমদানিযোগ্য সব ধরনের জ্বালানি উপকরণের চাহিদা এখন শীর্ষে রয়েছে। এর ফলে সরকার শিল্প খাতে সৌরচুল্লির ব্যবহার ও উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান করছে। এর অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ আমদানির পর্যায়ে শুল্ক ও কর রেওয়াত সুবিধা দিচ্ছে।
উৎপাদন, সরবরাহ এবং পণ্য আমদানিতে সুবিধা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে প্রথম ১০ বছর শতভাগ এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে রেওয়াত সুবিধা কমিয়ে আনবে সরকার। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান তার ব্যবহৃত সৌর বিদ্যুতের বিলের ৫% পরিমাণ কর রেয়াত পাবেন, জানিয়েছে এনবিআর। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি জানায়, সৌরপ্ল্যান্ট স্থাপনের প্রয়োজনীয় সব পণ্য আমদানিতে ১ শতাংশ কাস্টম ডিউটি রেওয়াত সুবিধা পাবেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহ ব্যবসায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান আগামী ৩০ জুন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হবে না বলে জানিয়েছে এনবিআর। আমদানি পর্যায়ে প্রদত্ত শুল্ক-কর সুবিধা : যেকোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নিমিত্তে সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন করতে চাইলে প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেবলমাত্র ১% কাস্টম ডিউটি প্রদান করে খালাস করতে পারবেন।
সোলার প্যানেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সোলার প্যানেল তৈরির যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও উপকরণ আমদানিতে কোনো প্রকার কাস্টম ডিউটি, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক প্রদান করতে হবে না। বাণিজ্যিক আমদানিকারকগণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সোলার প্যানেল ফটোভলটেনিক জেনারেটর, সোলার ইনভার্টার, ব্যাটারি থার্মাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ বিভিন্ন পণ্যে ১% কাস্টম ডিউটি প্রদান করবে এনবিআর।
যা আগে ক্ষেত্র হিসেবে ২৮.৭৩% থেকে ৮৬.১০% পর্যন্ত ছিল।
আমদানি পর্যায়ে প্রদত্ত শুল্ক-কর সুবিধা : যেকোনো নবায়নযোগ্য শক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রিউঅ্যানাবল এনার্জি সার্ভিস কোম্পানি (আরইএসসিও) এবং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনসট্রাকশন (ইপিসি) প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সোলার ইনভার্টার, ব্যাটারি প্যাক হাউজিং, লিথিয়াম সেল, লিথিয়াম আইওএন ব্যাটারি, লিথিয়াম আইওএন ব্যাটারি প্যাক, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস), সোলার প্যানেল ফটোভলটেনিক প্যানেল, ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, এসসিএডিএ/প্ল্যান্ট মনিটরিং অথবা কন্ট্রোল প্যানেলসহ ইত্যাদি পণ্যে ১% কাস্টম ডিউটি খালাস পারেন।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও উপকরণ আমদানিতে শুল্ক মাত্র ১%। উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ে শুল্ক-কর সুবিধা : জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করলে প্রথম ১০ বছর আয়ের ১০০% করমুক্ত থাকবে। এর পরবর্তী ৩ বছর আয়ের ৫০% করমুক্ত এবং পরবর্তী ২ বছর আয়ের ২৫% করমুক্ত থাকবে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবসায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে আগামী ৩০ জুন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হবে না। সোলার ব্যাটারি (৬০ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন পর্যায়ে কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান তার ব্যবহৃত সৌর বিদ্যুতের বিলের ৫% পরিমাণ কর রেয়াত পাবেন। জানতে চাইলে এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল আমিন শেখ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকার জীবাস্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে চায়।
সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৃদ্ধি করতে চায়। ’ বর্তমানে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণে বড় ধরনের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ উপলক্ষে গতকাল ঢাকায় প্রথমবার আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’ এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারের গৃহীত মূল পরিকল্পনা ও উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্য। স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০২৭ সালের গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকট সহনীয় পর্যায়ে রাখতেই এই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বা গ্রিন এনার্জি (মূলত সৌরবিদ্যুৎ) থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি খাস জমিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। ১৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ও ঋণ : সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ ও অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১,৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল বরাদ্দ করেছে। এই তহবিলের মাধ্যমে ইডকল, বিআইএফএফএল এবং পিকেএসএফের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৬% সুদে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
রুফ-টপ সোলার : ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই’ স্লোগানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকার কাজ করছে। সে লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি অফিস, কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজের বাসভবনেও সৌর প্যানেল স্থাপন করে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছেন বলে জানিয়েছেন।
আকর্ষণীয় নেট-মিটারিং সুবিধা : বাসাবাড়ি বা কারখানার ছাদে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর যে অংশ উদ্বৃত্ত থাকবে, তা নেট-মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রি করা যাবে।


























