স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণে আরও তিন বছর সময়ের অনুমোদন দিয়েছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশের টেকসই এই উত্তরণ নিশ্চিত করতে জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য বাড়তি তিন বছরকে শুধু সময় বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখতে চায় না সরকার; বরং এই সময়কে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরিতে কাজে লাগাতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর গতকাল রোববার সচিবালয়ে এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন।
অন্যদিকে গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত ব্যতিক্রমী। তাই আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে। এত দিন যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে এখন কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকার ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এ লক্ষ্য অর্জনে ‘গ্র্যাজুয়েশন থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’তে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। তবে এই রূপান্তর হতে হবে টেকসই। তিতুমীর বলেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় অর্থনীতি।
তাই অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে উপদেষ্টা বলেন, সরকার এ সময়কে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো— উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতির কারণে অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে সৃষ্ট বাহ্যিক চাপ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগে থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার কাজ শুরু করেছে। তবে সরকার শুরু থেকেই এলডিসি উত্তরণের পক্ষে। সংস্কারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, বিনিয়োগের নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানিপণ্যের তালিকা সম্প্রসারণে কাজ করা হবে।
এলডিসি উত্তরণের পর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সুবিধা কমে যাওয়ার প্রভাব সামাল দিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগও নেওয়া হবে। তিতুমীর বলেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা বা কম্প্যাক্ট গড়ে তুলতে পারলে এসব লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। এলডিসি উত্তরণ নিয়ে প্রতিটি আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা সরকারের ‘থ্রি আর’ কৌশলেরও অংশ। সরকারের এই উদ্যোগে পাঁচ পক্ষকে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। এগুলো হলো— বাংলাদেশের জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা। তার মতে, এ ধরনের সর্বসম্মত অংশীদারত্ব আগে দেখা যায়নি। জাতিসংঘের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাবে জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে কারিগরি সহায়তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক। সরকারের চিহ্নিত অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)। তিতুমীর বলেন, আইএমএফের চলমান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে এসব সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা এই উদ্যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অতীতে কোনো সংস্কার কার্যক্রমে দেশের মানুষকে এভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি। পাঁচ পক্ষের অংশগ্রহণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থা বাড়াবে বলে তিনি মনে করেন। টেকসই শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিতুমীর।
এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত তিন বছর, ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে : স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তবে তিনি মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত ব্যতিক্রমী। তাই আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে।
এত দিন যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে এখন কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে আমরা এটাকে দেখছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা মনে করিয়ে দিচ্ছি, এই সিদ্ধান্তটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন আমাদের ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের সময় দেশের রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
ফলে আগামী দিনে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হবে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এত দিন যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এসেছে, সেগুলো থেকে কীভাবে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসা হবে, তার একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেন তিনি। আগামী বাজেটে কোন কোন খাতে এসব সুবিধা বা সহায়তা কতটা কমানো হবে এবং পরবর্তী সময়ে কোন খাতে আরও বেশি সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিষ্কার করতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘আমরা যে সংস্কারের কর্মসূচি নিয়েছি, সেটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে মানুষের কাছে আনতে হবে। ’ পরিকল্পনায় সমন্বয়ের তাগিদ : এলডিসি উত্তরণ সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, সরকারের অ্যাকশন প্ল্যান, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ত্রিবার্ষিক বাজেটারি কাঠামো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।
এসব পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। ড. দেবপ্রিয় বলেন, এলডিসি উত্তরণের পুরো প্রক্রিয়ার মালিকানা শুধু কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি পুরো সরকারের এবং দেশের। এ কাজে বেসরকারি খাত, বিদেশি সহযোগী গোষ্ঠী, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এই জিনিসের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এগুলোকে যুক্ত করার মতো একটি জাতীয় কর্তব্য আমাদের সামনে এসেছে। ’ কথার চেয়ে কাজে গুরুত্ব : এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো। তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। আমরা কথা বলাতে যতখানি পারদর্শী, কাজ করার ক্ষেত্রে ততখানি পারদর্শী— এমন যেন না হয়।
’ আগামী তিন বছর কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা আগামী তিন বছর এই ভরসা করতে চাই। এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া অতিরিক্ত সময়কে শুধু কারিগরি বা প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে জনমানুষের স্বার্থ জড়িত। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ’ সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এর ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ ও ২০২১ সালের পরপর দুই ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এলডিসি উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই নির্ধারিত সীমার চেয়ে যথেষ্ট ব্যবধানে পূরণ করেছিল বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব বিবেচনায় দেশটিকে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি পর্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে প্রস্তুতি পর্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি)।











