আজ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১৬%

নীরব বিপর্যয়ের মুখে উপকূল থেকে ঢাকা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:47:14 pm, Monday, 2 November 2026
  • 19

নীরব বিপর্যয়ের মুখে উপকূল থেকে ঢাকা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দূষণ-দখলের সঙ্গে অপরিকল্পিত পানি উত্তোলনে ভয়াবহ সংকটের মুখে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। খাল-নদী ও জলাশয়গুলো দ্রুত হারাচ্ছে পানিধারণ সক্ষমতা। তথ্য বলছে, ঢাকা শহর প্রায় ৯৮ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।

ফলে আশঙ্কাজনকভাবে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, বাড়ছে ভূমিধস ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি। একই চিত্র দেখা গেছে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে। সমুদ্রের লোনা পানি অনুপ্রবেশ, আর্সেনিক ও ভারী ধাতুর দূষণে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে রাজধানী থেকে উপকূল পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি বিপন্ন হবে জনজীবন ও পরিবেশ।

গবেষকদের মতে, বিশুদ্ধ পানির সংকট শুধু তৃষ্ণা মেটানোর লড়াই নয়, রাজধানীসহ দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামার সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয়, কৃষিতে অনিশ্চয়তা এবং নগরজীবনে ভয়াবহ ঝুঁকি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে লবণাক্ততার আগ্রাসনে সুপেয় পানির সংকট, উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে আর্সেনিক দূষণের আশঙ্কা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সেচব্যবস্থা আরও চাপে পড়বে।

শুধু রাজধানীতেই প্রতিদিন প্রায় ৩১ লাখ ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে বলে জানায় ঢাকা ওয়াসা। প্রসঙ্গত, ১ লাখ ঘনমিটার সমান ১০ কোটি লিটার। ফলে নগরীর পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বড় বিপর্যয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর প্রায় তিন মিটার বা ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ঢাকার জলাশয় সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই। তবেই বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সমৃদ্ধ হবে। বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৯৮ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে এই নির্ভরতা কমাতে এখন থেকেই জলাশয় সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব আচরণ ছোটবেলা থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শেখাতে হবে। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার মতো পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের অভ্যাস শৈশব থেকেই গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকার জন্য পরিকল্পনার অভাব নেই; বরং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তদারকির ঘাটতি রয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০৩৫ পর্যন্ত মেয়াদের কাঠামোগত পরিকল্পনায় জলাশয় ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু পরিকল্পনা অনুমোদন, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে পরিকল্পনাবিদদের পক্ষে এককভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, রাজউক ও ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকার চারপাশে নদী থাকলেও অতিমাত্রায় দূষণের কারণে সেখান থেকে সরাসরি পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্যমতে, নগরের মাটির নিচে একটি বড় বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। কয়েক দশক আগেই ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল পাউবো এবং গবেষকরা। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় পানির স্তর ছিল ২৫ মিটারে, যা ২০০৫ সালে ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ৬০ মিটার এবং ২০২৩ সালে এসে ৭৫ মিটারে নেমেছে।

২০৫০ সালের মধ্যে এটি নেমে যেতে পারে ১২০ মিটারে। ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালে প্রতিদিন ৪৩ লাখ ঘনমিটার এবং ২০৩৫ সালে প্রতিদিন ৫২ লাখ ঘনমিটার পানির চাহিদা থাকবে ঢাকায়। পরিসংখ্যানবিষয়ক জার্মান প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুসারে, কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়েও ঢাকার জনঘনত্ব বেশি। কুতুপালংয়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করেন ২৯ হাজার, যেখানে ঢাকায় এই সংখ্যা ৩২ হাজারের বেশি।

অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে পাউবোর পরিসংখ্যানে। ১৯৭০ সালেও ঢাকা শহরে ৬ মিটার বা প্রায় ২০ ফুট মাটির নিচে পানি পাওয়া যেত। কিন্তু ২০২৩ সালে ৭৩ মিটার বা প্রায় ২৪০ ফুটের আগে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত নামছে পানির স্তর : ঢাকার কেন্দ্রে ভূগর্ভস্থ পানি স্তর নেমে যাওয়ায় একটি শূন্যস্থান চিহ্নিত করেছেন ভূবিজ্ঞানীরা।

ভূতত্ত্বের ভাষায় যাকে বলে ‘কম্পাউন্ড কোন অব ডিপ্রেশন’। এই ‘কম্পাউন্ড কোন অব ডিপ্রেশনে’র বিস্তার ঢাকার কেন্দ্র থেকে আশপাশের উপজেলা, যেমন— টঙ্গী, সাভার, ধামরাই, দোহার ও নবাবগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ফলে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও আশার ব্যাপার হলো, বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশের ভূগর্ভের বালির স্তরের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তা এখন পর্যন্ত বিপর্যয় ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ভূগর্ভস্থ জলাধারের ওপরের অংশের পুরু পলির স্তর বালির কণা পুনর্গঠন ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার চাপ সামলে নিতে পারছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ওয়াসা এবং অন্যরা গভীর নলকূপের সাহায্যে ৩০০ মিটার বা ৯৮৪ ফুট গভীর থেকে পানি উত্তোলন করতে শুরু করবে, যা হবে অপূরণীয় ক্ষতির কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও নগর বিশেজ্ঞ ড. মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, এই হারে পানি উত্তোলন চলতে থাকলে কয়েক দশকের মধ্যেই মিঠা পানির শূন্যতায় পড়তে পারে ঢাকা। ভূগর্ভস্থ পানির অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের ফলে জাকার্তা এখন বিশ্বের দ্রুততম ডুবন্ত মহানগর হিসেবে বিবেচিত। নগরে পানি সংকট ও ধসের আশঙ্কা : বিশ্বের অন্যতম জনঘনত্বপূর্ণ মহানগর ঢাকা ক্রমেই গভীর ভূগর্ভস্থ পানিসংকট ও ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে অভিমতন পরিবেশবিদদের।

নগরীর পানির চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হলেও কংক্রিটের বিস্তারের কারণে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে পানির স্তর পুনর্ভরণ করতে পারছে না। ফলে ঢাকার নানা এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৭৫ থেকে ৯০ মিটার গভীরে নেমে গেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পানি উত্তোলন ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির আধার থেকে অতিরিক্ত পানি তুলে নেওয়ায় মাটির ধারণক্ষমতা কমে ভূমি দেবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এতে ভবন, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর দূষিত পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার বর্জ্য ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দূষিত করার আশঙ্কাও বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বিপর্যয় : ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠাপানির সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় মাটির নিচে নোনা পানির অনুপ্রবেশ বাড়ছে। এতে সুপেয় পানির উৎসগুলো লবণাক্ত হয়ে পড়ছে এবং লাখ লাখ মানুষ নিরাপদ পানির সংকটে পড়ছেন। একই সঙ্গে লবণাক্ততার আগ্রাসনে কৃষিজমির উর্বরতা কমছে, ব্যাহত হচ্ছে ফসল উৎপাদন। অন্যদিকে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পানিতে প্রাকৃতিক আর্সেনিক এবং ভারী ধাতুর দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমিতে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সেচসংকট তীব্র হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে বোরো চাষ। এর প্রভাব পড়ছে খাদ্যনিরাপত্তায়। এভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় জনজীবন, কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিশ্বের নদীগুলোর পানিপ্রবাহ গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিশ্বের ৩৬ শতাংশ নদী অববাহিকায় পানিপ্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে কম। টানা গত সাত বছর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহসম্পন্ন নদী অববাহিকার সংখ্যা গড়ের তুলনায় কম। প্রতিবেদন বলছে, ২০১৪-১৬ সাল থেকে ভূগর্ভস্থ পানি, নদী-হ্রদ, মাটির আর্দ্রতা, তুষার ও বরফে সঞ্চিত পানিসহ বিশ্বের মোট স্থলভাগের পানির মজুত ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হিমবাহ গলে প্রায় ১ হাজার ৪০০ গিগাটন পানি হারিয়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্য বলছে, ভারতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে কমছে। দেশটির উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাসের বিষয়টি আগে থেকেই উদ্বেগের কারণ। ভূগর্ভস্থ পানি যে পরিমাণ উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই অনুপাতে পুনর্ভরণ হচ্ছে না। স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ ভূমিধসের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ৮৬ শতাংশই এশিয়ার। গবেষণায় দুই লাখের বেশি স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, বিশ্বের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ভূমির উচ্চতার পরিবর্তন ঘটছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানীর দখল হয়ে যাওয়া খাল, নদী ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠাপানির আধার সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির বিকল্প উৎস তৈরি এবং আর্সেনিক ও লবণাক্ততা পর্যবেক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন ও তদারকিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পানিসংকট, ভূমি দেবে যাওয়া ও পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়বে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন: তিন মামলায় আসামি চার হাজার

নীরব বিপর্যয়ের মুখে উপকূল থেকে ঢাকা

Update Time : 10:47:14 pm, Monday, 2 November 2026

দূষণ-দখলের সঙ্গে অপরিকল্পিত পানি উত্তোলনে ভয়াবহ সংকটের মুখে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। খাল-নদী ও জলাশয়গুলো দ্রুত হারাচ্ছে পানিধারণ সক্ষমতা। তথ্য বলছে, ঢাকা শহর প্রায় ৯৮ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।

ফলে আশঙ্কাজনকভাবে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, বাড়ছে ভূমিধস ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি। একই চিত্র দেখা গেছে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে। সমুদ্রের লোনা পানি অনুপ্রবেশ, আর্সেনিক ও ভারী ধাতুর দূষণে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে রাজধানী থেকে উপকূল পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি বিপন্ন হবে জনজীবন ও পরিবেশ।

গবেষকদের মতে, বিশুদ্ধ পানির সংকট শুধু তৃষ্ণা মেটানোর লড়াই নয়, রাজধানীসহ দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামার সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয়, কৃষিতে অনিশ্চয়তা এবং নগরজীবনে ভয়াবহ ঝুঁকি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে লবণাক্ততার আগ্রাসনে সুপেয় পানির সংকট, উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে আর্সেনিক দূষণের আশঙ্কা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সেচব্যবস্থা আরও চাপে পড়বে।

শুধু রাজধানীতেই প্রতিদিন প্রায় ৩১ লাখ ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে বলে জানায় ঢাকা ওয়াসা। প্রসঙ্গত, ১ লাখ ঘনমিটার সমান ১০ কোটি লিটার। ফলে নগরীর পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বড় বিপর্যয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর প্রায় তিন মিটার বা ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ঢাকার জলাশয় সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই। তবেই বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সমৃদ্ধ হবে। বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৯৮ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে এই নির্ভরতা কমাতে এখন থেকেই জলাশয় সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব আচরণ ছোটবেলা থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শেখাতে হবে। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার মতো পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের অভ্যাস শৈশব থেকেই গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকার জন্য পরিকল্পনার অভাব নেই; বরং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তদারকির ঘাটতি রয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০৩৫ পর্যন্ত মেয়াদের কাঠামোগত পরিকল্পনায় জলাশয় ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু পরিকল্পনা অনুমোদন, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে পরিকল্পনাবিদদের পক্ষে এককভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, রাজউক ও ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকার চারপাশে নদী থাকলেও অতিমাত্রায় দূষণের কারণে সেখান থেকে সরাসরি পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্যমতে, নগরের মাটির নিচে একটি বড় বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। কয়েক দশক আগেই ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল পাউবো এবং গবেষকরা। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় পানির স্তর ছিল ২৫ মিটারে, যা ২০০৫ সালে ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ৬০ মিটার এবং ২০২৩ সালে এসে ৭৫ মিটারে নেমেছে।

২০৫০ সালের মধ্যে এটি নেমে যেতে পারে ১২০ মিটারে। ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালে প্রতিদিন ৪৩ লাখ ঘনমিটার এবং ২০৩৫ সালে প্রতিদিন ৫২ লাখ ঘনমিটার পানির চাহিদা থাকবে ঢাকায়। পরিসংখ্যানবিষয়ক জার্মান প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুসারে, কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়েও ঢাকার জনঘনত্ব বেশি। কুতুপালংয়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করেন ২৯ হাজার, যেখানে ঢাকায় এই সংখ্যা ৩২ হাজারের বেশি।

অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে পাউবোর পরিসংখ্যানে। ১৯৭০ সালেও ঢাকা শহরে ৬ মিটার বা প্রায় ২০ ফুট মাটির নিচে পানি পাওয়া যেত। কিন্তু ২০২৩ সালে ৭৩ মিটার বা প্রায় ২৪০ ফুটের আগে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত নামছে পানির স্তর : ঢাকার কেন্দ্রে ভূগর্ভস্থ পানি স্তর নেমে যাওয়ায় একটি শূন্যস্থান চিহ্নিত করেছেন ভূবিজ্ঞানীরা।

ভূতত্ত্বের ভাষায় যাকে বলে ‘কম্পাউন্ড কোন অব ডিপ্রেশন’। এই ‘কম্পাউন্ড কোন অব ডিপ্রেশনে’র বিস্তার ঢাকার কেন্দ্র থেকে আশপাশের উপজেলা, যেমন— টঙ্গী, সাভার, ধামরাই, দোহার ও নবাবগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ফলে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও আশার ব্যাপার হলো, বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশের ভূগর্ভের বালির স্তরের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তা এখন পর্যন্ত বিপর্যয় ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ভূগর্ভস্থ জলাধারের ওপরের অংশের পুরু পলির স্তর বালির কণা পুনর্গঠন ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার চাপ সামলে নিতে পারছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ওয়াসা এবং অন্যরা গভীর নলকূপের সাহায্যে ৩০০ মিটার বা ৯৮৪ ফুট গভীর থেকে পানি উত্তোলন করতে শুরু করবে, যা হবে অপূরণীয় ক্ষতির কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও নগর বিশেজ্ঞ ড. মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, এই হারে পানি উত্তোলন চলতে থাকলে কয়েক দশকের মধ্যেই মিঠা পানির শূন্যতায় পড়তে পারে ঢাকা। ভূগর্ভস্থ পানির অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের ফলে জাকার্তা এখন বিশ্বের দ্রুততম ডুবন্ত মহানগর হিসেবে বিবেচিত। নগরে পানি সংকট ও ধসের আশঙ্কা : বিশ্বের অন্যতম জনঘনত্বপূর্ণ মহানগর ঢাকা ক্রমেই গভীর ভূগর্ভস্থ পানিসংকট ও ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে অভিমতন পরিবেশবিদদের।

নগরীর পানির চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হলেও কংক্রিটের বিস্তারের কারণে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশ করে পানির স্তর পুনর্ভরণ করতে পারছে না। ফলে ঢাকার নানা এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৭৫ থেকে ৯০ মিটার গভীরে নেমে গেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পানি উত্তোলন ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির আধার থেকে অতিরিক্ত পানি তুলে নেওয়ায় মাটির ধারণক্ষমতা কমে ভূমি দেবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এতে ভবন, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর দূষিত পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার বর্জ্য ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দূষিত করার আশঙ্কাও বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বিপর্যয় : ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠাপানির সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় মাটির নিচে নোনা পানির অনুপ্রবেশ বাড়ছে। এতে সুপেয় পানির উৎসগুলো লবণাক্ত হয়ে পড়ছে এবং লাখ লাখ মানুষ নিরাপদ পানির সংকটে পড়ছেন। একই সঙ্গে লবণাক্ততার আগ্রাসনে কৃষিজমির উর্বরতা কমছে, ব্যাহত হচ্ছে ফসল উৎপাদন। অন্যদিকে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পানিতে প্রাকৃতিক আর্সেনিক এবং ভারী ধাতুর দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমিতে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সেচসংকট তীব্র হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে বোরো চাষ। এর প্রভাব পড়ছে খাদ্যনিরাপত্তায়। এভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় জনজীবন, কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিশ্বের নদীগুলোর পানিপ্রবাহ গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিশ্বের ৩৬ শতাংশ নদী অববাহিকায় পানিপ্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে কম। টানা গত সাত বছর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহসম্পন্ন নদী অববাহিকার সংখ্যা গড়ের তুলনায় কম। প্রতিবেদন বলছে, ২০১৪-১৬ সাল থেকে ভূগর্ভস্থ পানি, নদী-হ্রদ, মাটির আর্দ্রতা, তুষার ও বরফে সঞ্চিত পানিসহ বিশ্বের মোট স্থলভাগের পানির মজুত ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হিমবাহ গলে প্রায় ১ হাজার ৪০০ গিগাটন পানি হারিয়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্য বলছে, ভারতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে কমছে। দেশটির উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাসের বিষয়টি আগে থেকেই উদ্বেগের কারণ। ভূগর্ভস্থ পানি যে পরিমাণ উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই অনুপাতে পুনর্ভরণ হচ্ছে না। স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ ভূমিধসের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ৮৬ শতাংশই এশিয়ার। গবেষণায় দুই লাখের বেশি স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, বিশ্বের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ভূমির উচ্চতার পরিবর্তন ঘটছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানীর দখল হয়ে যাওয়া খাল, নদী ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠাপানির আধার সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির বিকল্প উৎস তৈরি এবং আর্সেনিক ও লবণাক্ততা পর্যবেক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন ও তদারকিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পানিসংকট, ভূমি দেবে যাওয়া ও পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়বে।