যুক্তরাষ্ট্রে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Elections 2026)। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, দলীয় প্রচার এবং ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে আগামী দুই বছর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণের ভবিষ্যৎ। এটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের মাধ্যমে এই নির্বাচন হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রশাসনের কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের (House of Representatives) ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় ও আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে। তবে প্রতিনিধি পরিষদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সংকীর্ণ। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। অন্যদিকে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন।
ডেমোক্র্যাটদের প্রধান লক্ষ্য প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করছে দলটি। নির্বাচনী বিশ্লেষকদের নজর রয়েছে কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের দিকে, যেসব আসনের ফলাফল কংগ্রেসের ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তন করতে পারে। সিনেট নির্বাচনে ওহাইও, আইওয়া, টেক্সাস, আলাস্কা, মিশিগান ও মেইনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের লড়াই শেষ পর্যন্ত সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে সক্রিয় রয়েছেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি তার প্রশাসনের নীতির পক্ষে ভোটারদের সমর্থন চেয়েছেন।
তার প্রচারের কেন্দ্রে রয়েছে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ড এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রিপাবলিকানরা তার প্রশাসনের অর্জন তুলে ধরে ভোট চাইছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন নীতি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে নির্বাচনী প্রচারের প্রধান বিষয় হিসেবে সামনে আনছে।
নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ভোটারদের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেবে। বিশেষ করে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। এবারের নির্বাচনে অর্থনীতি অন্যতম প্রধান ইস্যু। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ নির্বাচনী প্রচারে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
গ্যালাপের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৫০ শতাংশ অর্থনীতিকে এবং সমানসংখ্যক ভোটার স্বাস্থ্যসেবাকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরান পরিস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন ৪৭ শতাংশ, আয় ও সম্পদের বৈষম্যকে ৪৪ শতাংশ এবং গ্যাসের দামকে ৪২ শতাংশ ভোটার। জরিপের ফলাফলে আরও দেখা গেছে, দুই দলের ভোটারদের অগ্রাধিকারে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা ও আয়বৈষম্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকান ভোটারদের কাছে অভিবাসন ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাননীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও এবারের নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। সামরিক ব্যয়, জাতীয় নিরাপত্তা, জ্বালানির বাজার এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
গ্যালাপের জরিপে ৪৭ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার ইরান পরিস্থিতিকে তাদের ভোটের সিদ্ধান্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও দুই দলের প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার এবং অভিবাসীদের বহিষ্কারের নীতি নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। রিপাবলিকানরা সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসীদের অধিকার, মানবিক বিবেচনা এবং আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে আনছে।
বিশেষ করে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-এর অভিযান এবং ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নির্বাচনের আগে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের আগে আগাম ভোট গ্রহণেও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ দেখা গেছে। আল জাজিরার ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত ৪ কোটি ৩০ লাখের বেশি মার্কিন নাগরিক আগাম ভোট দিয়েছেন। আগাম ভোটের পরিসংখ্যানে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের অংশগ্রহণ বেশি দেখা গেলেও তা দিয়ে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
কারণ রিপাবলিকান সমর্থকদের একটি বড় অংশ নির্বাচনের দিন সরাসরি ভোট দিতে অভ্যস্ত। তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটারদের অংশগ্রহণও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে এসব জনগোষ্ঠীর ভোটদানের হার এবং স্বাধীন ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনের আগে ভোটের নিরাপত্তা, ভোটারদের যোগ্যতা যাচাই, ব্যালট গণনা এবং ফলাফল প্রত্যয়ন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং ভোটকেন্দ্রে ফেডারেল সংস্থার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা চলছে। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ডাকযোগে আসা ব্যালট, আগাম ভোট এবং অন্যান্য ব্যালট গণনার কারণে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হতে পারে। ফলে নির্বাচনের রাতেই সব আসনের ফলাফল জানা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্প প্রশাসনের আগামী দুই বছরের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে সুবিধা বজায় থাকবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেসে তদন্ত, শুনানি এবং জবাবদিহির চাপ বাড়তে পারে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হলে বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে প্রেসিডেন্টের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ অনুমোদনেও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে।
দুই কক্ষেই রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আরও বাড়তে পারে। এতে বাজেট, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকাল থেকে অঙ্গরাজ্যভেদে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই প্রাথমিক ফলাফল আসতে শুরু করবে।
পশ্চিমাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে ভোটগ্রহণ শেষ হতে আরও কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, বুধবার ৪ নভেম্বর ভোর থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ভোট গণনা ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে চূড়ান্ত ফলাফল পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না, বরং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রস্তুতিকেও প্রভাবিত করবে।
নির্বাচনের ফলাফলের পর ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলই তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, নির্বাচনী কৌশল এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পুনর্মূল্যায়ন করবে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার, স্বাধীন ভোটার এবং শহরতলির ভোটারদের সমর্থন কোন দিকে যায়, তা দুই দলের ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে আগামীকালের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও তার প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ড ভোটারদের মূল্যায়নের কেন্দ্রে রয়েছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য এটি কংগ্রেসে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। শেষ পর্যন্ত কোন দল প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তা শুধু আগামী দুই বছরের ওয়াশিংটনের রাজনীতিই নয়, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশও অনেকাংশে নির্ধারণ করবে।





















