ইলিশ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মাছ হলেও ধরা পড়ছে এখন উত্তরের নদ-নদীতে। এই অঞ্চলের জন্য দুর্লভ এই মাছ পেয়ে জেলেরা খুশি হলেও রয়েছে নানা সংকট। মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, মাঝেমধ্যেই উত্তরের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় মিলছে ইলিশ।
তবে নদীগুলোর নাব্য সংকট বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাছ ধরার ক্ষেত্রে। এ ছাড়া কারিগরি সহায়তার সংকট থাকায় তেমনভাবে মাছ ধরতে পারছেন না জেলেরা। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ। মৎস্য বিভাগ জানায়, রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ১১টি উপজেলায় ধরা পড়ছে ইলিশ।
গত মৌসুমে এ অঞ্চলে ৪৮ টন ইলিশ ধরা পড়েছে। গত ২৯ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। তবে নৌকা সংকটে অনেক জেলে নদীতে যেতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে পারলে রংপুর অঞ্চলের নদ-নদীগুলো ইলিশের অভয়াশ্রম হতে পারে। ইলিশ ঘিরে মৎস্য খাতে দেখা দিতে পারে নতুন সম্ভাবনা।
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, একসময় ইলিশকে মনে করা হতো দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মাছ। এ ধারণা পাল্টে দিয়ে লালমনিরহাটের একটি, কুড়িগ্রামের ছয়টি ও গাইবান্ধার চারটি উপজেলায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। তথ্য অনুসারে, কুড়িগ্রামের সদর, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর এবং গাইবান্ধা জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা এবং লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তায় ইলিশ মিলছে।
অবশ্য দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় পরিমাণে কম। প্রতি বছর এই তিন জেলায় ৫০ থেকে ৬০ টন ইলিশ পাওয়া যায়। সারা দেশের মতো গত ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই তিন জেলায়ও ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল। সে সময় ১ হাজার ৬০০ জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, পাঁচ-সাত বছর আগেও তিস্তার গঙ্গাচড়া মহিপুর এলাকায় ইলিশ পাওয়া যেত।
কিন্তু এখন তিস্তায় ইলিশ তেমন একটা পাওয়া যায় না। কারণ হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত মৎস্য জরিপ কর্মকর্তা জুবায়ের আলী বলেন, ইলিশ মূলত সাগরের মাছ। যেসব নদীর সঙ্গে সাগরের যোগ আছে, সেই সব নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়। রংপুর অঞ্চলে বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্র খরস্রোতা হয়ে ওঠে। তাই সে সময় এই নদে ইলিশ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, একসময় তিস্তাও খরস্রোতা ছিল। সাগর থেকে তিস্তাতেও ইলিশ আসত ডিম পাড়তে।
এই অঞ্চলে ইলিশের আগমন ঘটাতে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। নদীগুলোকে খরস্রোতা করতে পারলেই দেশের অন্যান্য স্থানের মতো এখানকার নদীতেও ইলিশ পাওয়া যাবে। উলিপুরের মাঝিপাড়া এলাকার মৎস্যচাষি নয়ন চন্দ্র বলেন, চলতি মৌসুমে ইলিশ মাছ কম যাওয়া যাচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের এক কেজি ওজনের ইলিশ পাইকারি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন।
নিষেধাজ্ঞার সময় প্রণোদনা হিসেবে ২৫ কেজি চাল পেয়েছেন। কুড়িগ্রামের জেলে কাঞ্চন কুমার বলেন, জেলেদের মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা কমে গেছে। ফলে জেলেরা আগের মতো মাছ ধরতে যেতে পারেন না। তাদের কমপক্ষে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া নৌকা ভাড়া রয়েছে। যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যায় তা দিয়ে পোষায় না। ফলে অনেক সময় ইলিশ ধরা সম্ভব হয় না। ব্রহ্মপুত্রের আধা কেজির নিচের ইলিশ ৫০০-৬০০ টাকা, এরচেয়ে বড়গুলো ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কালীপূজা পর্যন্ত নদীতে ইলিশ পাওয়া যাবে। এরপর ইলিশের সংখ্যা কমে যাবে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপারের মাঝি আব্দুল গনি জানান, চলতি বছর তারা তিস্তা থেকে ১৫ কেজি ইলিশ ধরেছেন। নৌকা ও তিস্তার নাব্য সংকটের কারণে মাছ তেমন মিলছে না। কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সাহাদত হোসেন বলেন, রাজীবপুর ও রৌমারী উপজেলার চেয়ে নাগেশ্বরীতে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে।
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার ১১টি উপজেলায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের ইলিশ নিধন বন্ধ কার্যক্রমে ১ হাজার ৬০০ মৎস্যচাষিকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে পারলে এই অঞ্চলে ইলিশের অপার সম্ভাবনা দেখা দেবে। তিনি আরও বলেন, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের নাব্য সংকটের জন্য ইলিশসহ অন্যান্য মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে, শিগগির তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র খনন করার। সেটা হলে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের কোনো সমস্যা হবে না এই অঞ্চলে।





















