এক বিপজ্জনক নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে ওত পেতে আছে মৃত্যুঝুঁকি। এই স্থায়ী আতঙ্কের মধ্যেই প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে সাধারণ মানুষ। চোখের সামনে একাধিক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটে গেলেও বিন্দুমাত্র বদলায়নি নগরীর সামগ্রিক চিত্র।
আবাসিক ভবনের নিচে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, মাথার ওপর ঝুলন্ত তারের জট, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, গ্যাসলাইনে লিকেজ এবং প্রশাসনের চরম উদাসীনতা— সব মিলিয়ে এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর যেন দাঁড়িয়ে আছে এই মেগাসিটি। এই শহরে একটি নিরাপদ দিন কাটানোই এখন ‘অলৌকিক ঘটনা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিলোত্তমা এই শহরের কোনো এলাকায় আগুন লাগলেই সামনে আসে একই চিত্র— সরু গলি, দাহ্য পদার্থে ঠাসা গুদাম, পানির সংকট এবং ভবনে আটকে পড়া মানুষের বাঁচার আকুতি।
অগ্নিনির্বাপণ যান প্রবেশ করতে না পারা কিংবা পর্যাপ্ত পানি না থাকায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। পুরান ঢাকার নিমতলী, চুড়িহাট্টা, আরমানিটোলা, ইসলামবাগ এলাকার সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড— বারবার সামনে এনেছে একই ঝুঁকি। তবু আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানো এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। গত সোমবার পুরান ঢাকার ইসলামবাগে সরেজমিনে দেখা যায়, সরু গলির দুই পাশে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ভবন।
অনেক ভবনের নিচতলা ও দোতলায় রাসায়নিকের গুদাম ও প্লাস্টিক কারখানা; ওপরের তলায় বসবাস করে মানুষ। একটি গলির মোড়ে রাস্তার পাশে দুটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার। সেখান থেকে নেওয়া সংযোগ গেছে ভবনের খুব কাছ দিয়ে। কোথাও রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও পুরোনো পাইপের স্তূপের পাশেই চলছে পাইপ তৈরির কাজ। রাসেল নামে এক শ্রমিক জানান, দুই বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করছেন তিনি।
ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও জীবিকার প্রয়োজনে কাজ করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, রাসায়নিকের ধরন, মজুতের পরিমাণ, ভবনের কাঠামো, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমন পথের ওপর ঝুঁকি নির্ভর করে। আবাসিক ভবনের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকার্যক্রম থাকলে বিপদের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়ে। শুধু এ এলাকাই নয়, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাসায়নিক ও প্লাস্টিকের কাঁচামালে ঠাসা দোকান এবং গুদাম রয়েছে।
অনেক স্থানে দোকান ও গুদামের ওপর দিয়ে ঝুলে আছে এলোমেলো বৈদ্যুতিক তার। ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে এসব স্থাপনার নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ না হলে একটি দুর্ঘটনা দ্রুত আশপাশের ভবনেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের এক গবেষণা অনুযায়ী, পুরান ঢাকায় আনুমানিক ২৫ হাজার রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার আবাসিক বাসাবাড়িতে।
এসব গুদামে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোজ, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কিটোন, থিনার, আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল ও টলুইনের মতো রাসায়নিক রাখা হয়। রাসায়নিকের ধরন ও সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুযায়ী আগুন বা উত্তাপে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গত ১২ অক্টোবর চকবাজারের ছোট কাটরায় মঞ্জুর খান প্লাজা মার্কেটে আগুনের সূত্রপাত হয় সাততলা ভবনের ষষ্ঠতলার একটি গুদাম থেকে।
পরে ছাতা, প্রসাধনী ও আতরের গুদামে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। পুরোপুরি নেভাতে সময় লাগে প্রায় ৩৭ ঘণ্টা। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে অন্তত চার ফায়ার সার্ভিসকর্মী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, ভবনটির ষষ্ঠতলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গুদাম ছিল।
আশপাশে আরও তিন থেকে চারটি মার্কেট থাকায় আগুন নেভাতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভবনটি গত জানুয়ারিতে পরিদর্শন করে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি শনাক্ত করা হয়েছিল। সংশোধনের জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও জবাব পাওয়া যায়নি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ডিএসসিসির ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
রাজউক ও ডিএসসিসির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও রয়েছে। তার ভাষায়, পুরান ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে আমাদের অবশ্যই রাসায়নিক গোডাউন সরাতে এবং কারখানাগুলো বন্ধ করতে হবে। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী আনোয়ার চৌধুরী বলেন, নিমতলী ও চুড়িহাট্টার পর রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চল তৈরির আশ্বাস দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বাসিন্দারা বলছেন, একের পর এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে জানমালের ক্ষতি হলেও সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কর্ণপাত করছেন না।
সূত্রমতে, ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে আগুনে প্রাণ হারান ১২৪ জন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় মারা যান ৭১ জন। ২০২১ সালের ২৩ এপ্রিল আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানশনে আগুনে চারজনের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনার পর রাসায়নিকের গুদাম সরানো ও অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারের সুপারিশ এলেও বাস্তবায়ন এগোয়নি। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর দেওয়া হয়েছিল ১৭ দফা সুপারিশ।
অদ্যাবধি এসব সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৯ সালে ডিএসসিসি ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম উচ্ছেদে অভিযান শুরু করলেও পরে তা থেমে যায়। জানা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে রাসায়নিক, প্লাস্টিক, মুদ্রণ ও হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান শিল্পাঞ্চলে সরাতে সরকার চারটি প্রকল্প নেয়। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে একটি প্রকল্প সম্পন্ন হলেও অন্যগুলো জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে বিলম্বিত হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে ফায়ার সার্ভিস বিস্তারিত সুপারিশ দিয়েছিল। সেগুলো বাস্তবায়নে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম সরানোর কাজ সহজ হতো। এ জন্য সিটি করপোরেশন, রাজউক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। ঝুঁকি কমাতে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানার হালনাগাদ তালিকা তৈরি, অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই এবং নিয়মিত পরিদর্শন জরুরি।
পাশাপাশি সরু গলিতে জরুরি যান চলাচল, পানির উৎস, ভবনের বহির্গমনপথ ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। নিমতলী থেকে মঞ্জুর খান প্লাজা— একাধিক অগ্নিকাণ্ড দেখিয়েছে, দুর্ঘটনার পর অভিযান নয়, আগেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার জবাবদিহিই প্রাণহানি ঠেকানোর প্রধান উপায়। এদিকে শুধু পুরান ঢাকা নয়, মিরপুরসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক।
গত বছরের ১৪ অক্টোবর মিরপুরের রূপনগরের শিয়ালবাড়ীতে রাসায়নিকের গুদাম ও পোশাক কারখানায় আগুনে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় কারখানা ও গুদামের অবস্থান, অগ্নিনিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২০২৫ সালের পরিদর্শন তথ্যে দেখা যায়, সারা দেশে ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন ও স্থাপনা পরিদর্শন করে ৩ হাজার ৩১৬টিকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টিকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; অর্থাৎ পরিদর্শিত স্থাপনাগুলোর প্রায় ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি ছিল।
১ হাজার ৫৩৩টি পোশাক কারখানার মধ্যে ৫৯২টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৮৮টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। ১ হাজার ১৭১টি শপিং মলের মধ্যে ৩৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।





















