আজ বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
১৪ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৫°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৪°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৮৬%

টাকার বিনিময়ে মিলছে ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চাকরির সনদ

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:27:57 pm, Thursday, 29 October 2026
  • 16

টাকার বিনিময়ে মিলছে ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চাকরির সনদ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, থাকলেও কোথাও আবেদন করার মতো রেজাল্ট নেই— কোনো সমস্যা নেই। শুধু থাকতে হবে টাকা। টাকা দিলেই মিলবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ, বিসিএস সনদ, মার্কশিট, শিক্ষক নিবন্ধনের কাগজ কিংবা বিদেশযাত্রার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স।

এখানেই শেষ নয়, টাকা হলে মিলতে পারে এমবিবিএস পাসের আসল সার্টিফিকেটও। কোনোটি কম্পিউটারে নকল করে তৈরি, কোনোটি আবার এমনভাবে সাজানো যে কিউআর কোড স্ক্যান করলেও দেখা যাবে, ভেরিফায়েড। টাকার অঙ্ক বেশি হলে সরাসরি অরিজিনালটাই পেয়ে যাবেন। সুযোগ পাবেন সরকারি শিক্ষা বোর্ডের ডেটাবেইসে তথ্য ঢোকানোরও। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, বহু বছর ধরেই এই অসৎ সিন্ডিকেট তাদের ব্যবসা চালিয়ে আসছে।

কিন্তু সম্প্রতি তাদের তৎপরতা আরও ব্যাপক আকারে বেড়েছে। সব মিলিয়ে সার্টিফিকেটের বাণিজ্য এখন জমজমাট। সম্প্রতি জাল সার্টিফিকেট নিয়ে প্রশাসনের টনক নড়েছে বেশ জোরালোভাবে। ৩৮তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ক্যাডার পদ বাগিয়ে নেওয়া দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কঠোর পদক্ষেপের পর নড়েচড়ে বসেছে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল।

বিশেষ করে শিক্ষক নিবন্ধনের সনদ জালিয়াতি শুধু নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা, প্রশ্নের মুখে পড়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। এ ধরনের ঘটনায় শুধু সার্টিফিকেট ব্যবহারকারীর ভূমিকা নয়, সার্টিফিকেটটি কোথা থেকে এসেছে, কে তৈরি করেছে এবং নিয়োগের সময় কীভাবে তা যাচাই করা হয়েছে— সেসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।

আর ভুয়া এমবিবিএস সার্টিফিকেটধারী চিকিৎসকের কাছ থেকে রোগীরা সেবার নামে কী পাচ্ছেন, সেটাও আতঙ্কের বিষয়। দুদকের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ৩৮তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের দুই কর্মকর্তা সঞ্জয় দাস ও আবু সালেহ মোহাম্মদ মুসার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন আদালত। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অসৎ উদ্দেশ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে জাল শিক্ষাগত সার্টিফিকেট বা ট্রান্সক্রিপ্ট প্রস্তুত করেন।

এগুলোকে বৈধ দলিল হিসেবে ব্যবহার করে তারা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনকে (বিপিএসসি) বিভ্রান্ত করেন এবং যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও মেধাতালিকায় স্থান করে নেন। পরে চাকরিতে যোগ দিয়ে তারা নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তদন্তের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন— এই আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিদেশযাত্রা রোধে আদালতে আবেদন জানানো হয়।

যমুনা টিভির সিনিয়র সাংবাদিক হাসান মিসবাহ ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে কর্মরত থাকা অবস্থায় জাল সনদ নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময় প্রমাণ দাঁড় করাতে গিয়ে ভুয়া এমবিবিএস সার্টিফিকেট তৈরি করান। জাল হলেও এটি এতটাই নিখুঁত প্রক্রিয়ায় করা হয় যে খোদ সরকারি বা স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তেও তা আসল বলে চিহ্নিত হয়। হাসান মিসবাহ এই অনুসন্ধানকাজের জন্য টিআইবি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ফেলোশিপ পুরস্কারও লাভ করেন।

তখনো এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের একদফা টনক নড়েছিল। কিন্তু এখন আবার আগের অবস্থাতেই ফিরেছে সার্বিক পরিস্থিতি। সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবরের একটি ঘটনা। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে নিয়োগের অভিযোগে একটি দাখিল মাদ্রাসার সুপার গ্রেপ্তার হন। এর চার দিন আগে, ১৮ অক্টোবর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ (এপিইউবি) জাল শিক্ষাগত সনদ ও অ্যাকাডেমিক নথি তৈরির চক্রের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান চালানোর দাবি জানায়।

এর আগে চলতি বছর আগস্টে চট্টগ্রাম ও বাঁশখালীতে বিদেশগামীদের জন্য জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স তৈরির অভিযোগে চারজন গ্রেপ্তার হন। এপ্রিলে রাজশাহীতে ধরা পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সনদ তৈরির অভিযোগে দুজন। বিভিন্ন সময়ের এসব ঘটনা বলছে, জাল সার্টিফিকেটের কারবার এখন আর রাজধানীর কয়েকটি ছাপাখানা বা কম্পিউটারের দোকানে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

কোথাও শিক্ষাগত যোগ্যতা, কোথাও সরকারি নথি, আবার কোথাও শিক্ষক নিয়োগের সার্টিফিকেটকে কেন্দ্র করে চলছে প্রতারণা। এসব ঘটনায় একক কেন্দ্রীয় সিন্ডিকেটের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলাদা তদন্ত। তবে অপরাধের ধরন ও লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে উদ্বেগজনক মিল। গত ২২ অক্টোবর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কামাত আঙ্গারীয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে কামাত আঙ্গারীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার সাইদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

অভিযোগ, এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধনের ভুয়া ও জাল সনদ ব্যবহার করে মাদ্রাসায় অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগের সঙ্গে তিনি জড়িত। এপিইউবি সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট জাল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম। একই সঙ্গে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানও প্রতারিত হতে পারে। একজন চাকরিপ্রার্থী প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই ডিগ্রির সনদ দেখিয়ে চাকরি পেলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হন।

পেশাগত দায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা না থাকলে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। জাল সনদ তৈরির অভিযোগ মোকাবিলায় তাই শুধু জাল কাগজ উদ্ধার বা কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। সনদের তথ্য যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা, জালিয়াতির উৎস শনাক্ত করা এবং সনদ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

জাল হচ্ছে পুলিশ সনদও। গত ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর ও বাঁশখালী উপজেলায় দিনভর ও রাতে অভিযান চালায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিশেষ ও গোয়েন্দা শাখা। এ সময় আশরাফ আলী খান, নিশান, আবদুল্লাহ আল মামুন ও আবদুর রহমান নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, জাকির হোসেন নামের এক বিদেশগামী ব্যক্তি ওমানের ভিসার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে চক্রটির কাছ থেকে একটি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নেন।

সার্টিফিকেটটিতে পুলিশ সুপার ও থানার ওসির স্বাক্ষর-সিল এবং কিউআর কোড ছিল। প্রথম দেখায় সেটিকে আসল বলে মনে হলেও ট্রাভেল এজেন্সিতে জমা দেওয়ার পর জানা যায়, সেটি জাল। এরপর ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তার নির্দেশে গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। চক্রটির পারস্পরিক যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড ও কারিগরি তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

পরে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনায় জালিয়াতির নতুন মাত্রা সামনে আসে। শুধু নকল স্বাক্ষর, সিল কিংবা কাগজ নয়— কিউআর কোড ব্যবহার করেও নথিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। কোনো নথিতে কিউআর কোড থাকলেই সেটি আসল, এমন ধারণা বিপজ্জনক। কোডটি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্যটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানার কুমারপাড়া এলাকার ঘোষপাড়ার আলুপট্টি রোডে অভিযান চালায় এসআরবি। অভিযানে অভিজিৎ মন্ডল ও রায়হান আউয়াল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা কম্পিউটারের গ্রাফিকস ও সম্পাদনা সফটওয়্যার ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন নামী সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্সের জাল সনদ এবং মার্কশিট তৈরি করতেন।

অভিযানে জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ধরনের জালিয়াতিতে সনদের বাহ্যিক অবয়ব নকল করা হয়। কাগজ, লোগো, স্বাক্ষর ও নম্বরপত্রের বিন্যাস দেখে অনেক সময় সাধারণ মানুষের পক্ষে জাল সনদ শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। ফলে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিজস্ব যাচাইব্যবস্থা না থাকলে প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয়।

রাজধানীতে এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় আখড়া হচ্ছে নীলক্ষেত ও উত্তরা। এসব এলাকায় জাল সনদ তৈরির অভিযোগে অভিযান চালানো হয়। আটকও হয়। কিন্তু ব্যবসা বন্ধ না হয়ে ক্রমে বাড়তে বা বিস্তার পেতেই থাকে। জাল সনদ তৈরির কারবারের উদ্বেগজনক আরেকটি দিক সামনে এসেছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের জাল সনদ তৈরি। বেশ কিছুদিন আগে রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বোর্ডের কম্পিউটার সেলের সিস্টেম অ্যানালিস্ট এ কে এম শামসুজ্জামান ও তার সহযোগী ফয়সালকে গ্রেপ্তার করলেও এই সিন্ডিকেট আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

পুলিশের তদন্তে বোর্ডের সার্ভারে অননুমোদিতভাবে তথ্য প্রবেশ করিয়ে সনদ তৈরির অভিযোগ উঠে আসে। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে, নথিতে প্রায় পাঁচ হাজার জাল সনদের তথ্য সরকারি সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনায় বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান আলী আকবর খানের স্ত্রী সেহেলা পারভীনকে গ্রেপ্তার এবং পরে চেয়ারম্যানকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে যারা সরকারি সিল, স্বাক্ষর বা কিউআর কোড নকল করে ভুয়া নথি তৈরি করছে, তাদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বা যেকোনো সরকারি সনদ জালিয়াতি সরাসরি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। এই অপরাধী চক্রগুলোকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

সিলেটের রায়হান হত্যা মামলা: এসআই আকবরের মৃত্যুদণ্ড, দুই কনস্টেবলের যাবজ্জীবন

টাকার বিনিময়ে মিলছে ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চাকরির সনদ

Update Time : 10:27:57 pm, Thursday, 29 October 2026

শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, থাকলেও কোথাও আবেদন করার মতো রেজাল্ট নেই— কোনো সমস্যা নেই। শুধু থাকতে হবে টাকা। টাকা দিলেই মিলবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ, বিসিএস সনদ, মার্কশিট, শিক্ষক নিবন্ধনের কাগজ কিংবা বিদেশযাত্রার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স।

এখানেই শেষ নয়, টাকা হলে মিলতে পারে এমবিবিএস পাসের আসল সার্টিফিকেটও। কোনোটি কম্পিউটারে নকল করে তৈরি, কোনোটি আবার এমনভাবে সাজানো যে কিউআর কোড স্ক্যান করলেও দেখা যাবে, ভেরিফায়েড। টাকার অঙ্ক বেশি হলে সরাসরি অরিজিনালটাই পেয়ে যাবেন। সুযোগ পাবেন সরকারি শিক্ষা বোর্ডের ডেটাবেইসে তথ্য ঢোকানোরও। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, বহু বছর ধরেই এই অসৎ সিন্ডিকেট তাদের ব্যবসা চালিয়ে আসছে।

কিন্তু সম্প্রতি তাদের তৎপরতা আরও ব্যাপক আকারে বেড়েছে। সব মিলিয়ে সার্টিফিকেটের বাণিজ্য এখন জমজমাট। সম্প্রতি জাল সার্টিফিকেট নিয়ে প্রশাসনের টনক নড়েছে বেশ জোরালোভাবে। ৩৮তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ক্যাডার পদ বাগিয়ে নেওয়া দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কঠোর পদক্ষেপের পর নড়েচড়ে বসেছে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল।

বিশেষ করে শিক্ষক নিবন্ধনের সনদ জালিয়াতি শুধু নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা, প্রশ্নের মুখে পড়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। এ ধরনের ঘটনায় শুধু সার্টিফিকেট ব্যবহারকারীর ভূমিকা নয়, সার্টিফিকেটটি কোথা থেকে এসেছে, কে তৈরি করেছে এবং নিয়োগের সময় কীভাবে তা যাচাই করা হয়েছে— সেসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।

আর ভুয়া এমবিবিএস সার্টিফিকেটধারী চিকিৎসকের কাছ থেকে রোগীরা সেবার নামে কী পাচ্ছেন, সেটাও আতঙ্কের বিষয়। দুদকের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ৩৮তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের দুই কর্মকর্তা সঞ্জয় দাস ও আবু সালেহ মোহাম্মদ মুসার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন আদালত। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অসৎ উদ্দেশ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে জাল শিক্ষাগত সার্টিফিকেট বা ট্রান্সক্রিপ্ট প্রস্তুত করেন।

এগুলোকে বৈধ দলিল হিসেবে ব্যবহার করে তারা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনকে (বিপিএসসি) বিভ্রান্ত করেন এবং যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও মেধাতালিকায় স্থান করে নেন। পরে চাকরিতে যোগ দিয়ে তারা নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তদন্তের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন— এই আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিদেশযাত্রা রোধে আদালতে আবেদন জানানো হয়।

যমুনা টিভির সিনিয়র সাংবাদিক হাসান মিসবাহ ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে কর্মরত থাকা অবস্থায় জাল সনদ নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময় প্রমাণ দাঁড় করাতে গিয়ে ভুয়া এমবিবিএস সার্টিফিকেট তৈরি করান। জাল হলেও এটি এতটাই নিখুঁত প্রক্রিয়ায় করা হয় যে খোদ সরকারি বা স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তেও তা আসল বলে চিহ্নিত হয়। হাসান মিসবাহ এই অনুসন্ধানকাজের জন্য টিআইবি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ফেলোশিপ পুরস্কারও লাভ করেন।

তখনো এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের একদফা টনক নড়েছিল। কিন্তু এখন আবার আগের অবস্থাতেই ফিরেছে সার্বিক পরিস্থিতি। সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবরের একটি ঘটনা। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে নিয়োগের অভিযোগে একটি দাখিল মাদ্রাসার সুপার গ্রেপ্তার হন। এর চার দিন আগে, ১৮ অক্টোবর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ (এপিইউবি) জাল শিক্ষাগত সনদ ও অ্যাকাডেমিক নথি তৈরির চক্রের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান চালানোর দাবি জানায়।

এর আগে চলতি বছর আগস্টে চট্টগ্রাম ও বাঁশখালীতে বিদেশগামীদের জন্য জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স তৈরির অভিযোগে চারজন গ্রেপ্তার হন। এপ্রিলে রাজশাহীতে ধরা পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সনদ তৈরির অভিযোগে দুজন। বিভিন্ন সময়ের এসব ঘটনা বলছে, জাল সার্টিফিকেটের কারবার এখন আর রাজধানীর কয়েকটি ছাপাখানা বা কম্পিউটারের দোকানে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

কোথাও শিক্ষাগত যোগ্যতা, কোথাও সরকারি নথি, আবার কোথাও শিক্ষক নিয়োগের সার্টিফিকেটকে কেন্দ্র করে চলছে প্রতারণা। এসব ঘটনায় একক কেন্দ্রীয় সিন্ডিকেটের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলাদা তদন্ত। তবে অপরাধের ধরন ও লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে উদ্বেগজনক মিল। গত ২২ অক্টোবর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কামাত আঙ্গারীয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে কামাত আঙ্গারীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার সাইদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

অভিযোগ, এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধনের ভুয়া ও জাল সনদ ব্যবহার করে মাদ্রাসায় অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগের সঙ্গে তিনি জড়িত। এপিইউবি সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট জাল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম। একই সঙ্গে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানও প্রতারিত হতে পারে। একজন চাকরিপ্রার্থী প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই ডিগ্রির সনদ দেখিয়ে চাকরি পেলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হন।

পেশাগত দায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা না থাকলে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। জাল সনদ তৈরির অভিযোগ মোকাবিলায় তাই শুধু জাল কাগজ উদ্ধার বা কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। সনদের তথ্য যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা, জালিয়াতির উৎস শনাক্ত করা এবং সনদ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

জাল হচ্ছে পুলিশ সনদও। গত ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর ও বাঁশখালী উপজেলায় দিনভর ও রাতে অভিযান চালায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিশেষ ও গোয়েন্দা শাখা। এ সময় আশরাফ আলী খান, নিশান, আবদুল্লাহ আল মামুন ও আবদুর রহমান নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, জাকির হোসেন নামের এক বিদেশগামী ব্যক্তি ওমানের ভিসার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে চক্রটির কাছ থেকে একটি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নেন।

সার্টিফিকেটটিতে পুলিশ সুপার ও থানার ওসির স্বাক্ষর-সিল এবং কিউআর কোড ছিল। প্রথম দেখায় সেটিকে আসল বলে মনে হলেও ট্রাভেল এজেন্সিতে জমা দেওয়ার পর জানা যায়, সেটি জাল। এরপর ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তার নির্দেশে গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। চক্রটির পারস্পরিক যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড ও কারিগরি তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

পরে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনায় জালিয়াতির নতুন মাত্রা সামনে আসে। শুধু নকল স্বাক্ষর, সিল কিংবা কাগজ নয়— কিউআর কোড ব্যবহার করেও নথিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। কোনো নথিতে কিউআর কোড থাকলেই সেটি আসল, এমন ধারণা বিপজ্জনক। কোডটি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্যটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানার কুমারপাড়া এলাকার ঘোষপাড়ার আলুপট্টি রোডে অভিযান চালায় এসআরবি। অভিযানে অভিজিৎ মন্ডল ও রায়হান আউয়াল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা কম্পিউটারের গ্রাফিকস ও সম্পাদনা সফটওয়্যার ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন নামী সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্সের জাল সনদ এবং মার্কশিট তৈরি করতেন।

অভিযানে জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ধরনের জালিয়াতিতে সনদের বাহ্যিক অবয়ব নকল করা হয়। কাগজ, লোগো, স্বাক্ষর ও নম্বরপত্রের বিন্যাস দেখে অনেক সময় সাধারণ মানুষের পক্ষে জাল সনদ শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। ফলে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিজস্ব যাচাইব্যবস্থা না থাকলে প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয়।

রাজধানীতে এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় আখড়া হচ্ছে নীলক্ষেত ও উত্তরা। এসব এলাকায় জাল সনদ তৈরির অভিযোগে অভিযান চালানো হয়। আটকও হয়। কিন্তু ব্যবসা বন্ধ না হয়ে ক্রমে বাড়তে বা বিস্তার পেতেই থাকে। জাল সনদ তৈরির কারবারের উদ্বেগজনক আরেকটি দিক সামনে এসেছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের জাল সনদ তৈরি। বেশ কিছুদিন আগে রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বোর্ডের কম্পিউটার সেলের সিস্টেম অ্যানালিস্ট এ কে এম শামসুজ্জামান ও তার সহযোগী ফয়সালকে গ্রেপ্তার করলেও এই সিন্ডিকেট আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

পুলিশের তদন্তে বোর্ডের সার্ভারে অননুমোদিতভাবে তথ্য প্রবেশ করিয়ে সনদ তৈরির অভিযোগ উঠে আসে। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে, নথিতে প্রায় পাঁচ হাজার জাল সনদের তথ্য সরকারি সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনায় বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান আলী আকবর খানের স্ত্রী সেহেলা পারভীনকে গ্রেপ্তার এবং পরে চেয়ারম্যানকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে যারা সরকারি সিল, স্বাক্ষর বা কিউআর কোড নকল করে ভুয়া নথি তৈরি করছে, তাদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বা যেকোনো সরকারি সনদ জালিয়াতি সরাসরি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। এই অপরাধী চক্রগুলোকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।