আজ মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩৭°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫১%

পাখির কলকাকলিতে মুখরিত নাটোরের চলনবিল

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:44:33 pm, Monday, 26 October 2026
  • 28

পাখির কলকাকলিতে মুখরিত নাটোরের চলনবিল

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

শীতের আগমনী বার্তায় নতুন রূপে সেজে উঠেছে নাটোরের চলনবিল। বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর নীল আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। এসব পাখি কখনো অগভীর পানিতে ডুব দিয়ে খাবার খুঁজছে, আবার কখনো বিলের পাড়ে দল বেঁধে বসে থাকছে।

পাখির কলকাকলি, ডানার ঝাপটানি আর জলরাশির মিতালিতে মুখর হয়ে উঠেছে বিলের প্রকৃতি। তবে এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে উদ্বেগ—অবৈধ পাখি শিকার, জলাভূমি সংকোচন ও পানির স্বল্পতা। সরেজমিনে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কোথাও সাদা বকের সারি, কোথাও পানকৌড়ির ডুবসাঁতার, আবার কোথাও বালিহাঁসের দল খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সাদাবক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, ডাহুক ও শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনায় বিলজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। পাখির এই বিচরণ দেখতে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীরা। মৎস্য ও শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত চলনবিল নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। বর্ষার পানি কমতে শুরু করলে বিলের বিভিন্ন স্থানে অগভীর জলাভূমি তৈরি হয়।

খাবারের সন্ধানে এসব স্থানে জড়ো হয় নানা প্রজাতির পাখি। তাদের বিচরণে প্রাণ ফিরে পায় বিলের প্রকৃতি। তবে পাখিদের এই অবাধ বিচরণ সব সময় নিরাপদ নয়। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির অসাধু শিকারি বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা ও খেজুরের ডালসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে পাখি ধরার ফাঁদ পেতে রাখেন। কোথাও কোথাও বিষটোপ প্রয়োগেরও অভিযোগ রয়েছে। খাবারের সন্ধানে বিলে আসা পাখিরা এভাবে শিকারিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

এর সঙ্গে জলাভূমি সংকোচন ও পানির স্বল্পতা যুক্ত হওয়ায় পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর এ সময়ে খাবারের সন্ধানে বক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি ও শামুকখোলসহ নানা প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে। পাখির বিচরণে বিলের প্রকৃতি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছু অসাধু শিকারি ফাঁদ পেতে এসব পাখি শিকার করেন।

পাখি রক্ষায় তাদের সংগঠন ২০১২ সাল থেকে চলনবিলের দুর্গম এলাকায় কাজ করছে। শিকারের খবর পেলে প্রশাসনকে অবহিত করার পাশাপাশি পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। স্থানীয় আব্দুস সামাদ, মোসলেম উদ্দিনসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, অতিথি পাখি প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ফসলের জমির বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

এসব পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে চলনবিলের উপযুক্ত এলাকায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো এবং জনসচেতনতা তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের অভিযানও চলছে। গত ৩ অক্টোবর নাটোরের সিংড়ায় অভিযান চালিয়ে তিন পাখি শিকারিকে আটক করা হয়। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা করে জরিমানা ও এক দিনের কারাদণ্ড দেন।

এর তিন দিন পর, ৬ অক্টোবর, আবারও অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৫০টি জবাই করা পাখি উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে তিনজনকে দুই মাস করে কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্য দুই সহযোগীর একজনকে সাত হাজার টাকা এবং অপরজনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপক ও পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, “চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সহযোগিতায় পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাখি শিকারের অপরাধে জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া পাখি শিকারের বিষয়ে কোনো তথ্য পেলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। ” নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ বলেন, চলনবিল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আধার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই জলাভূমিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এর পরিবেশ ও পাখি রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।

পাখি শিকার বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ ও পাখির নিরাপদ আবাসস্থল তৈরিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। চলনবিলের আকাশে পাখির ডানা মেলা আর জলরাশিতে তাদের অবাধ বিচরণ প্রকৃতির এক অনন্য সম্পদ। এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে শুধু পাখির আগমনে মুগ্ধ হলে চলবে না; তাদের নিরাপত্তা ও আবাসস্থল সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর অভিযান, জলাভূমি রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে চলনবিলের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

পাখির কলকাকলিতে মুখর এই বিল যেন শিকারিদের আতঙ্ক নয়, বরং নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে—এটাই এখন সময়ের দাবি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নেছারাবাদে মন্দিরের ৪২ শতাংশ জমি জবরদখলের অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি

পাখির কলকাকলিতে মুখরিত নাটোরের চলনবিল

Update Time : 03:44:33 pm, Monday, 26 October 2026

শীতের আগমনী বার্তায় নতুন রূপে সেজে উঠেছে নাটোরের চলনবিল। বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর নীল আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। এসব পাখি কখনো অগভীর পানিতে ডুব দিয়ে খাবার খুঁজছে, আবার কখনো বিলের পাড়ে দল বেঁধে বসে থাকছে।

পাখির কলকাকলি, ডানার ঝাপটানি আর জলরাশির মিতালিতে মুখর হয়ে উঠেছে বিলের প্রকৃতি। তবে এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে উদ্বেগ—অবৈধ পাখি শিকার, জলাভূমি সংকোচন ও পানির স্বল্পতা। সরেজমিনে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কোথাও সাদা বকের সারি, কোথাও পানকৌড়ির ডুবসাঁতার, আবার কোথাও বালিহাঁসের দল খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সাদাবক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, ডাহুক ও শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনায় বিলজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। পাখির এই বিচরণ দেখতে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীরা। মৎস্য ও শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত চলনবিল নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। বর্ষার পানি কমতে শুরু করলে বিলের বিভিন্ন স্থানে অগভীর জলাভূমি তৈরি হয়।

খাবারের সন্ধানে এসব স্থানে জড়ো হয় নানা প্রজাতির পাখি। তাদের বিচরণে প্রাণ ফিরে পায় বিলের প্রকৃতি। তবে পাখিদের এই অবাধ বিচরণ সব সময় নিরাপদ নয়। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির অসাধু শিকারি বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা ও খেজুরের ডালসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে পাখি ধরার ফাঁদ পেতে রাখেন। কোথাও কোথাও বিষটোপ প্রয়োগেরও অভিযোগ রয়েছে। খাবারের সন্ধানে বিলে আসা পাখিরা এভাবে শিকারিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

এর সঙ্গে জলাভূমি সংকোচন ও পানির স্বল্পতা যুক্ত হওয়ায় পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর এ সময়ে খাবারের সন্ধানে বক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি ও শামুকখোলসহ নানা প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে। পাখির বিচরণে বিলের প্রকৃতি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছু অসাধু শিকারি ফাঁদ পেতে এসব পাখি শিকার করেন।

পাখি রক্ষায় তাদের সংগঠন ২০১২ সাল থেকে চলনবিলের দুর্গম এলাকায় কাজ করছে। শিকারের খবর পেলে প্রশাসনকে অবহিত করার পাশাপাশি পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। স্থানীয় আব্দুস সামাদ, মোসলেম উদ্দিনসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, অতিথি পাখি প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ফসলের জমির বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

এসব পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে চলনবিলের উপযুক্ত এলাকায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো এবং জনসচেতনতা তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের অভিযানও চলছে। গত ৩ অক্টোবর নাটোরের সিংড়ায় অভিযান চালিয়ে তিন পাখি শিকারিকে আটক করা হয়। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা করে জরিমানা ও এক দিনের কারাদণ্ড দেন।

এর তিন দিন পর, ৬ অক্টোবর, আবারও অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৫০টি জবাই করা পাখি উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে তিনজনকে দুই মাস করে কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্য দুই সহযোগীর একজনকে সাত হাজার টাকা এবং অপরজনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপক ও পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, “চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সহযোগিতায় পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাখি শিকারের অপরাধে জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া পাখি শিকারের বিষয়ে কোনো তথ্য পেলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। ” নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ বলেন, চলনবিল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আধার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই জলাভূমিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এর পরিবেশ ও পাখি রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।

পাখি শিকার বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ ও পাখির নিরাপদ আবাসস্থল তৈরিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। চলনবিলের আকাশে পাখির ডানা মেলা আর জলরাশিতে তাদের অবাধ বিচরণ প্রকৃতির এক অনন্য সম্পদ। এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে শুধু পাখির আগমনে মুগ্ধ হলে চলবে না; তাদের নিরাপত্তা ও আবাসস্থল সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর অভিযান, জলাভূমি রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে চলনবিলের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

পাখির কলকাকলিতে মুখর এই বিল যেন শিকারিদের আতঙ্ক নয়, বরং নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে—এটাই এখন সময়ের দাবি।