আজ মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
১১ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১২%

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা: বৌদ্ধধর্মের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবের তাৎপর্য

  • MIT ERP
  • Update Time : 04:13:33 am, Monday, 26 October 2026
  • 31

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা: বৌদ্ধধর্মের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবের তাৎপর্য

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা হলো বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। চন্দ্রমাস অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাতিথিতে এটি উদযাপিত হয় বলে একে আশ্বিনী পূর্ণিমাও বলা হয়।

প্রবারণা শব্দের অর্থ হলো, নিজের ভুলত্রুটি স্বীকার করে আত্মশুদ্ধি লাভ করা, অশুভকে ত্যাগ করা এবং সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ করা। মূলত পূজনীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তিন মাসের বর্ষাবাস শেষ হওয়ার দিনটিতেই এই সমাপনী উৎসব পালিত হয়। আধ্যাত্মিক চেতনা, সাম্য, মৈত্রী ও অহিংসার বাণীতে উজ্জ্বল প্রবারণা পূর্ণিমার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে অপরিসীম।

‘প্রবারণা’ শব্দের পালি রূপ হলো ‘পবারণা’। এর আভিধানিক অর্থ আহ্বান, মিনতি, বরণ করা কিংবা সন্তুষ্টি বিধান। বৌদ্ধ দর্শনে ‘বরণ করা’ বলতে পবিত্র বিনয়াচারে নিজের জীবন পরিচালিত করার প্রতিজ্ঞা নেওয়াকে বোঝায়। অন্যদিকে, এর ব্যাবহারিক বা ধর্মীয় প্রায়োগিক দিক হলোÑ নিজেকে ধর্মের পরিপন্থী সব খারাপ কাজ ও চিন্তা থেকে দূরে রাখা বা সেগুলো বর্জন করা।

‘প্রবারণা’ শব্দের মাধ্যমে আশার তৃপ্তি, অভিলাষপূরণ, ধ্যান বা শিক্ষা সমাপ্তিও বোঝানো হয়। পাশাপাশি, একে আত্মশুদ্ধি বা আত্মসমালোচনার উৎসবও বলা হয়ে থাকে। বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা পূর্ণিমার দিনে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আত্মশুদ্ধির জন্য তাদের দোষ-ত্রুটি অন্যান্য ভিক্ষুর কাছে খুলে বলেন এবং প্রতিকার বা প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহ্বান জানান।

তা ছাড়া, নিজের অজান্তে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে এবং তা অন্য কোনো ভিক্ষু দেখে থাকলে, শুনে থাকলে বা সন্দেহ করে থাকলে, তার জন্যও ক্ষমাপ্রার্থনা করে তারা নিজেদের শুদ্ধ করেন। প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল উৎসব নয়, এটি কঠোর আত্মসমালোচনার দিন। ত্রৈমাসিক বর্ষাবাসের সময়ে ভিক্ষুদের মধ্যে কোনো ভুলত্রুটি বা বিবাদ হলে, এই দিনে তারা একে অপরের সামনে করজোড়ে দাঁড়ান।

তারা একে অপরকে অনুরোধ করেন, ‘বন্ধু, আমার কোনো আচরণে যদি ভুল বা অপরাধ দেখে থাকেন বা শুনে থাকেন, দয়া করে আমাকে জানান, আমি নিজেকে সংশোধন করব ও ক্ষমা চাইব। ’ এই উদার মানসিকতা সমাজে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে শেখায়। এসবই হচ্ছে শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার মূল তাৎপর্য।

প্রবারণা পূর্ণিমার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে: এক. আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরদিন থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা (প্রবারণা পূর্ণিমা) পর্যন্ত এই তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নির্দিষ্ট বিহারে অবস্থান করে বর্ষাবাস যাপনের অধিষ্ঠান করেন। মূলত এই বর্ষাবাস চলাকালে তিন মাস ভিক্ষুরা সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বিহারের বাইরে রাত্রিযাপন করা থেকে বিরত থাকেন।

অতীব জরুরি প্রয়োজনে বিনয়বিধি মেনে সর্বোচ্চ সাত দিনের জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও, মূলত বিহারকেন্দ্রিক সাধনাতেই তারা নিমগ্ন থাকেন। অবশেষে আশ্বিনী পূর্ণিমা তথা প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের মাধ্যমেই পূজনীয় ভিক্ষুসংঘের এই তিন মাসের কঠোর ব্রতযাপনের সমাপ্তি ঘটে। দুই. রাজকুমার সিদ্ধার্থ (পরবর্তীকালে গৌতম বুদ্ধ) সংসার ত্যাগ করেছিলেন শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে।

সেই পুণ্যলগ্নে তিনি পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র, রাজ্য-রাজত্ব, ভোগ-বিলাস ও ধন-সম্পদের মোহ ত্যাগ করে জাগতিক সব দুঃখ থেকে মুক্তির অন্বেষণে গৃহত্যাগ করেন। অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে এবং সারথি ছন্দককে সঙ্গে নিয়ে তিনি অনোমা নদীর তীরে পৌঁছান। সেখানে রাজকীয় পোশাক ও অলংকার পরিহার করে তিনি সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন এবং নিজের তরবারি দিয়ে চুলের গোছা কেটে আকাশের দিকে ছুড়ে দেন।

তখন তিনি দৃঢ়সংকল্প করেছিলেন, ‘আমি যদি সত্যিই বুদ্ধত্বলাভের যোগ্য হই, তবে ঊর্ধ্বদিকে নিক্ষিপ্ত এই কেশগুচ্ছ মাটিতে না পড়ে আকাশেই স্থিত থাকুক। ’ অলৌকিকভাবে সেই কেশগুচ্ছ মাটিতে পড়ল না। তখন স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্র মহামূল্যবান হীরা, মণি ও মাণিক্যখচিত স্বর্ণপাত্রে সেই পবিত্র চুল (কেশধাতু) ধারণ করেন এবং তাবতিংস (ত্রায়স্ত্রিংশ) স্বর্গে নিয়ে গিয়ে সেখানে ‘চুলামণি চৈত্য’ নামে একটি পবিত্র স্তূপ বা চৈত্য নির্মাণ করেন।

স্বর্গের দেবতারা আজও সেই চুলামণি চৈত্যে কেশধাতুর পূজা করে থাকেন। রাজকুমার সিদ্ধার্থ আষাঢ়ী পূর্ণিমায় গৃহত্যাগ করে যে কেশধাতু আকাশে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং যা স্বর্গের চুলামণি চৈত্যে সংরক্ষিত হয়, সেই পবিত্র কেশধাতুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বন্দনা নিবেদনের উদ্দেশ্যে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর আশ্বিনী পূর্ণিমা বা শুভ প্রবারণা পূর্ণিমায় আকাশে রঙিন ফানুস উড়িয়ে থাকেন।

তিন. বুদ্ধত্বলাভের পর, ত্রিলোকপূজ্য গৌতম বুদ্ধ তার প্রয়াত মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনা করার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। সেখানে তিনি তিন মাসব্যাপী সপ্তম বর্ষাবাস যাপন ও অভিধর্ম দেশনা শেষে, শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে দেবগণের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে মর্ত্যরে ঐতিহাসিক সংকাস্য নগরে অবতরণ করেন। এই পূর্ণিমাতিথিতেই তথাগত বুদ্ধ তার শিষ্যদের সম্মুখে আধ্যাত্মিক শক্তির অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন করেছিলেন; তাই বৌদ্ধদের কাছে পবিত্র উৎসব হিসেবে এর গুরুত্ব ও অবস্থান অনন্য।

মর্ত্যে ভগবান বুদ্ধের এই মহিমান্বিত প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং সেই ঘটনার প্রতীক হিসেবেও বৌদ্ধরা আকাশে ফানুস উত্তোলন করেন। চার. বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে প্রবারণা পূর্ণিমাতিথিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বুদ্ধত্বলাভের পর প্রথম বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা পূর্ণিমাতিথিতেই মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ মানবজাতির সুখ, শান্তি ও কল্যাণে তার ৬০ জন অর্হৎ শিষ্যকে দিকে দিকে সদ্ধর্ম প্রচারের নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন, যাতে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সত্য ধর্ম প্রচার এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা যায়।

তিনি বলেছিলেন, ‘চরথ ভিক্খবে চারিকং বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’; অর্থাৎ, ‘হে ভিক্ষুগণ! তোমরা বহুজনের হিতের জন্য এবং বহুজনের সুখের জন্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ো। ’ প্রবারণা পূর্ণিমার দিনটি বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার বৌদ্ধদের মধ্যে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপিত হয়। বৌদ্ধ বিহারগুলোয় সকালে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, সমবেত প্রার্থনা, পুষ্পপূজা, বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, অষ্টপরিষ্কারদান, সংঘদান, বুদ্ধমূর্তিদান, পি-দান এবং পবিত্র ত্রিপিটক থেকে সূত্রপাঠ করা হয়।

দুপুরবেলায় শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে ধর্মীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূজনীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এ বিষয়ে বিশদভাবে ধর্মদেশনা করে থাকেন। সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালিয়ে এবং মাটির পাত্রে তেল ও সলতে দিয়ে হাজার প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে প্রদীপ পূজা করা হয়। এ সময়ে বিহারে ধ্যান, দেশ ও দেশবাসীর মঙ্গল এবং বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

সন্ধ্যার পর বৌদ্ধ বিহারগুলোয় রঙবেরঙের বাতি জ্বালিয়ে প্রতিটি বিহার ও আশপাশের এলাকা আলোকসজ্জা করা হয়। এরপর উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয় আকাশে রঙিন ফানুস ওড়ানো। এই পবিত্র দিনে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে বিভিন্ন রঙের কাগজ দিয়ে তৈরি ফানুস, ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে আকাশ-প্রদীপ হিসেবে ওড়ানো হয়। পূজনীয় ভিক্ষুসংঘের সূত্রপাঠের পর নিচ থেকে ফানুস আকাশের দিকে ওঠার সময়ে সবার সমস্বরে ‘সাধু, সাধু, সাধু’ ধ্বনিতে চারদিকে এক অপূর্ব ও স্বর্গীয় শান্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

আকাশজুড়ে তখন শত শত ফানুস তারার মতো এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করে, যা মূলত মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষের অন্ধকার দূর করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। প্রবারণা পূর্ণিমা শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই বৌদ্ধবিহারগুলোয় শুরু হয় মাসব্যাপী ‘দানশ্রেষ্ঠ শুভ কঠিন চীবর দান’ উৎসব। এটি বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দান উৎসব।

প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি মানবপ্রেম ও অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার দিন। ফানুসের আলো যেমন রাতের আকাশকে উজ্জ্বল করে তোলে, তেমনি এই উৎসবের শিক্ষা মানুষের মন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার দূর করে চারপাশকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করুকÑ এটাই হোক এই শুভ প্রবারণা পূর্ণিমাতিথির প্রার্থনা। ‘সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু’Ñ জগতের সব প্রাণী সুখী হোক।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

মাদারীপুরে জামায়াত নেতার ভিডিও ভাইরাল, চিকিৎসার নামে অপকর্মের অভিযোগ

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা: বৌদ্ধধর্মের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবের তাৎপর্য

Update Time : 04:13:33 am, Monday, 26 October 2026

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা হলো বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। চন্দ্রমাস অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাতিথিতে এটি উদযাপিত হয় বলে একে আশ্বিনী পূর্ণিমাও বলা হয়।

প্রবারণা শব্দের অর্থ হলো, নিজের ভুলত্রুটি স্বীকার করে আত্মশুদ্ধি লাভ করা, অশুভকে ত্যাগ করা এবং সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ করা। মূলত পূজনীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তিন মাসের বর্ষাবাস শেষ হওয়ার দিনটিতেই এই সমাপনী উৎসব পালিত হয়। আধ্যাত্মিক চেতনা, সাম্য, মৈত্রী ও অহিংসার বাণীতে উজ্জ্বল প্রবারণা পূর্ণিমার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে অপরিসীম।

‘প্রবারণা’ শব্দের পালি রূপ হলো ‘পবারণা’। এর আভিধানিক অর্থ আহ্বান, মিনতি, বরণ করা কিংবা সন্তুষ্টি বিধান। বৌদ্ধ দর্শনে ‘বরণ করা’ বলতে পবিত্র বিনয়াচারে নিজের জীবন পরিচালিত করার প্রতিজ্ঞা নেওয়াকে বোঝায়। অন্যদিকে, এর ব্যাবহারিক বা ধর্মীয় প্রায়োগিক দিক হলোÑ নিজেকে ধর্মের পরিপন্থী সব খারাপ কাজ ও চিন্তা থেকে দূরে রাখা বা সেগুলো বর্জন করা।

‘প্রবারণা’ শব্দের মাধ্যমে আশার তৃপ্তি, অভিলাষপূরণ, ধ্যান বা শিক্ষা সমাপ্তিও বোঝানো হয়। পাশাপাশি, একে আত্মশুদ্ধি বা আত্মসমালোচনার উৎসবও বলা হয়ে থাকে। বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা পূর্ণিমার দিনে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আত্মশুদ্ধির জন্য তাদের দোষ-ত্রুটি অন্যান্য ভিক্ষুর কাছে খুলে বলেন এবং প্রতিকার বা প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহ্বান জানান।

তা ছাড়া, নিজের অজান্তে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে এবং তা অন্য কোনো ভিক্ষু দেখে থাকলে, শুনে থাকলে বা সন্দেহ করে থাকলে, তার জন্যও ক্ষমাপ্রার্থনা করে তারা নিজেদের শুদ্ধ করেন। প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল উৎসব নয়, এটি কঠোর আত্মসমালোচনার দিন। ত্রৈমাসিক বর্ষাবাসের সময়ে ভিক্ষুদের মধ্যে কোনো ভুলত্রুটি বা বিবাদ হলে, এই দিনে তারা একে অপরের সামনে করজোড়ে দাঁড়ান।

তারা একে অপরকে অনুরোধ করেন, ‘বন্ধু, আমার কোনো আচরণে যদি ভুল বা অপরাধ দেখে থাকেন বা শুনে থাকেন, দয়া করে আমাকে জানান, আমি নিজেকে সংশোধন করব ও ক্ষমা চাইব। ’ এই উদার মানসিকতা সমাজে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে শেখায়। এসবই হচ্ছে শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার মূল তাৎপর্য।

প্রবারণা পূর্ণিমার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে: এক. আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরদিন থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা (প্রবারণা পূর্ণিমা) পর্যন্ত এই তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নির্দিষ্ট বিহারে অবস্থান করে বর্ষাবাস যাপনের অধিষ্ঠান করেন। মূলত এই বর্ষাবাস চলাকালে তিন মাস ভিক্ষুরা সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বিহারের বাইরে রাত্রিযাপন করা থেকে বিরত থাকেন।

অতীব জরুরি প্রয়োজনে বিনয়বিধি মেনে সর্বোচ্চ সাত দিনের জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও, মূলত বিহারকেন্দ্রিক সাধনাতেই তারা নিমগ্ন থাকেন। অবশেষে আশ্বিনী পূর্ণিমা তথা প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের মাধ্যমেই পূজনীয় ভিক্ষুসংঘের এই তিন মাসের কঠোর ব্রতযাপনের সমাপ্তি ঘটে। দুই. রাজকুমার সিদ্ধার্থ (পরবর্তীকালে গৌতম বুদ্ধ) সংসার ত্যাগ করেছিলেন শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে।

সেই পুণ্যলগ্নে তিনি পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র, রাজ্য-রাজত্ব, ভোগ-বিলাস ও ধন-সম্পদের মোহ ত্যাগ করে জাগতিক সব দুঃখ থেকে মুক্তির অন্বেষণে গৃহত্যাগ করেন। অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে এবং সারথি ছন্দককে সঙ্গে নিয়ে তিনি অনোমা নদীর তীরে পৌঁছান। সেখানে রাজকীয় পোশাক ও অলংকার পরিহার করে তিনি সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন এবং নিজের তরবারি দিয়ে চুলের গোছা কেটে আকাশের দিকে ছুড়ে দেন।

তখন তিনি দৃঢ়সংকল্প করেছিলেন, ‘আমি যদি সত্যিই বুদ্ধত্বলাভের যোগ্য হই, তবে ঊর্ধ্বদিকে নিক্ষিপ্ত এই কেশগুচ্ছ মাটিতে না পড়ে আকাশেই স্থিত থাকুক। ’ অলৌকিকভাবে সেই কেশগুচ্ছ মাটিতে পড়ল না। তখন স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্র মহামূল্যবান হীরা, মণি ও মাণিক্যখচিত স্বর্ণপাত্রে সেই পবিত্র চুল (কেশধাতু) ধারণ করেন এবং তাবতিংস (ত্রায়স্ত্রিংশ) স্বর্গে নিয়ে গিয়ে সেখানে ‘চুলামণি চৈত্য’ নামে একটি পবিত্র স্তূপ বা চৈত্য নির্মাণ করেন।

স্বর্গের দেবতারা আজও সেই চুলামণি চৈত্যে কেশধাতুর পূজা করে থাকেন। রাজকুমার সিদ্ধার্থ আষাঢ়ী পূর্ণিমায় গৃহত্যাগ করে যে কেশধাতু আকাশে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং যা স্বর্গের চুলামণি চৈত্যে সংরক্ষিত হয়, সেই পবিত্র কেশধাতুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বন্দনা নিবেদনের উদ্দেশ্যে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর আশ্বিনী পূর্ণিমা বা শুভ প্রবারণা পূর্ণিমায় আকাশে রঙিন ফানুস উড়িয়ে থাকেন।

তিন. বুদ্ধত্বলাভের পর, ত্রিলোকপূজ্য গৌতম বুদ্ধ তার প্রয়াত মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনা করার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। সেখানে তিনি তিন মাসব্যাপী সপ্তম বর্ষাবাস যাপন ও অভিধর্ম দেশনা শেষে, শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে দেবগণের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে মর্ত্যরে ঐতিহাসিক সংকাস্য নগরে অবতরণ করেন। এই পূর্ণিমাতিথিতেই তথাগত বুদ্ধ তার শিষ্যদের সম্মুখে আধ্যাত্মিক শক্তির অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন করেছিলেন; তাই বৌদ্ধদের কাছে পবিত্র উৎসব হিসেবে এর গুরুত্ব ও অবস্থান অনন্য।

মর্ত্যে ভগবান বুদ্ধের এই মহিমান্বিত প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং সেই ঘটনার প্রতীক হিসেবেও বৌদ্ধরা আকাশে ফানুস উত্তোলন করেন। চার. বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে প্রবারণা পূর্ণিমাতিথিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বুদ্ধত্বলাভের পর প্রথম বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা পূর্ণিমাতিথিতেই মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ মানবজাতির সুখ, শান্তি ও কল্যাণে তার ৬০ জন অর্হৎ শিষ্যকে দিকে দিকে সদ্ধর্ম প্রচারের নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন, যাতে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সত্য ধর্ম প্রচার এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা যায়।

তিনি বলেছিলেন, ‘চরথ ভিক্খবে চারিকং বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’; অর্থাৎ, ‘হে ভিক্ষুগণ! তোমরা বহুজনের হিতের জন্য এবং বহুজনের সুখের জন্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ো। ’ প্রবারণা পূর্ণিমার দিনটি বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার বৌদ্ধদের মধ্যে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপিত হয়। বৌদ্ধ বিহারগুলোয় সকালে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, সমবেত প্রার্থনা, পুষ্পপূজা, বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, অষ্টপরিষ্কারদান, সংঘদান, বুদ্ধমূর্তিদান, পি-দান এবং পবিত্র ত্রিপিটক থেকে সূত্রপাঠ করা হয়।

দুপুরবেলায় শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে ধর্মীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূজনীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এ বিষয়ে বিশদভাবে ধর্মদেশনা করে থাকেন। সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালিয়ে এবং মাটির পাত্রে তেল ও সলতে দিয়ে হাজার প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে প্রদীপ পূজা করা হয়। এ সময়ে বিহারে ধ্যান, দেশ ও দেশবাসীর মঙ্গল এবং বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

সন্ধ্যার পর বৌদ্ধ বিহারগুলোয় রঙবেরঙের বাতি জ্বালিয়ে প্রতিটি বিহার ও আশপাশের এলাকা আলোকসজ্জা করা হয়। এরপর উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয় আকাশে রঙিন ফানুস ওড়ানো। এই পবিত্র দিনে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে বিভিন্ন রঙের কাগজ দিয়ে তৈরি ফানুস, ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে আকাশ-প্রদীপ হিসেবে ওড়ানো হয়। পূজনীয় ভিক্ষুসংঘের সূত্রপাঠের পর নিচ থেকে ফানুস আকাশের দিকে ওঠার সময়ে সবার সমস্বরে ‘সাধু, সাধু, সাধু’ ধ্বনিতে চারদিকে এক অপূর্ব ও স্বর্গীয় শান্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

আকাশজুড়ে তখন শত শত ফানুস তারার মতো এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করে, যা মূলত মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষের অন্ধকার দূর করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। প্রবারণা পূর্ণিমা শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই বৌদ্ধবিহারগুলোয় শুরু হয় মাসব্যাপী ‘দানশ্রেষ্ঠ শুভ কঠিন চীবর দান’ উৎসব। এটি বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দান উৎসব।

প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি মানবপ্রেম ও অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার দিন। ফানুসের আলো যেমন রাতের আকাশকে উজ্জ্বল করে তোলে, তেমনি এই উৎসবের শিক্ষা মানুষের মন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার দূর করে চারপাশকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করুকÑ এটাই হোক এই শুভ প্রবারণা পূর্ণিমাতিথির প্রার্থনা। ‘সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু’Ñ জগতের সব প্রাণী সুখী হোক।