আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের ৩১তম বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১। বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবে জর্জরিত বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকির শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্যতম দেশ হিসেবে এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ও সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরতে বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত ও কৌশলগত ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি সরকারের নীতিনির্ধারক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনদের এক যৌথ বৈঠকে সম্মেলনের মূল এজেন্ডাগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে জলবায়ু সংকটকে অন্যতম প্রধান জাতীয় ও বৈশ্বিক এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি কিংবা কার্বন নিঃসরণে নগণ্য অবদান রাখা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব ভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। বাংলাদেশ আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, টেকসই জলবায়ু অর্থায়ন এবং কার্যকর অভিযোজন সহায়তার বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও দৃঢ় ও দৃশ্যমান বৈশ্বিক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে।
’ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান শিকার। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা ও জলবায়ু সূচক অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম স্থানে রয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, জলবায়ুর কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম।
প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক বিপর্যয়ও এখানে চরম আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের বিশ্ব তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম। বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে বাংলাদেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের আবাদি জমি, লবণাক্ততার আগ্রাসন ও লোকালয় চিরতরে তলিয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই নির্মম বাস্তবতা সামনে রেখেই বাংলাদেশ এবারের কপ-৩১ সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছে। আসন্ন সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রধানত তিনটি মৌলিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। প্রথমত, টেকসই জলবায়ু নিশ্চিতকরণ। উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর যে পরিমাণ জলবায়ু তহবিল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশ এবার ঋণ নয়, বরং অনুদানভিত্তিক এবং সরাসরি ছাড়যোগ্য টেকসই জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানাবে। এরপর রয়েছে, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন। পূর্ববর্তী সম্মেলনগুলোতে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ (ক্ষয়ক্ষতি) ফান্ড গঠন করা হলেও এর অর্থায়ন এবং বণ্টন প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি কার্যকর ও সহজলভ্য হয়নি।
বাংলাদেশ এই ফান্ডের দ্রুত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত বাস্তবায়ন চাইবে, যাতে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় মানুষ ও লবণাক্ততায় আক্রান্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরাসরি সুফল পায়। আরও আছে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে উন্নত দেশগুলোকে তাদের গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর জাতীয় প্রতিশ্রুতি (এনডিসি) কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উন্নত বিশ্বকে বাধ্য করার তাগিদ দেবে। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘জলবায়ু অর্থায়ন কোনো করুণা বা দান নয়, এটি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ন্যায্য অধিকার। উন্নত দেশগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণের দায় স্বীকার করে প্রতিশ্রুত প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে।
’ কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশ শুধু জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবই তুলে ধরবে না, বরং বৈশ্বিক পরিবেশ রক্ষায় একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধানের রূপরেখাও বিশ্বদরবারে পেশ করবে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ সোনালি আঁশখ্যাত পাটের বহুমুখী সম্ভাবনা এবং পরিবেশ রক্ষায় এর অসামান্য অবদান জোরালোভাবে তুলে ধরবে।
প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, বায়ো-ডিগ্রেডেবল পণ্য এবং পাটজাত বিভিন্ন উদ্ভাবন কীভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে, তা এই আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শন করা হবে। এটি একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষায় বৈশ্বিক অবদান রাখবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এই কূটনৈতিক কৌশল সম্পর্কে বলেছেন, ‘বিশ্বমঞ্চে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের বহুমুখী সুফল তুলে ধরতে বাংলাদেশ কপ-৩১ সম্মেলন সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাবে। আমরা আমাদের দেশীয় পরিবেশবান্ধব সম্পদ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
’ পরিবেশবিদ এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কার্বন ট্যাক্স বা পরিবেশ রক্ষার নানাবিধ অজুহাতে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ তৈরি করছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো বিকাশমান অর্থনীতির দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশ কপ-৩১ সম্মেলনকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করবে, যেখানে এই অন্যায্য বাণিজ্যিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞাগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটের জন্য ঐতিহাসিক ও প্রধান দায় মূলত উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর। অথচ এর চরম খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তাই উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং উন্নত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগত সহায়তা আদায়ে বাংলাদেশকে অত্যন্ত দূরদর্শী হতে হবে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ একা লড়াই না করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য সমমনা ও স্বল্পোন্নত দেশকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে শক্তিশালী যৌথ জলবায়ু কূটনীতি পরিচালনা করবে।
আনতালিয়ার কপ-৩১ সম্মেলন হোক বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার আদায়ের এবং দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।





















