জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনীতির পরবর্তী বড় পরীক্ষা স্থানীয় সরকার নির্বাচন। কিন্তু সেই পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যেখানে ২০২৭ সালের প্রথম দিকে দেশের সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল, সেখানে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার, সীমানা-সংক্রান্ত মামলা ও ভোটার তালিকার কাজ শেষ না হওয়ায় জুনের আগে নির্বাচন আয়োজন কঠিন।
কমিশনের অবস্থান অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট জুলাইয়ের দিকে গড়াতে পারে। এতে শুধু সরকারের নির্বাচনি পরিকল্পনাই নয়, জাতীয় নির্বাচনের পর তৃণমূলের ক্ষমতার সমীকরণ নতুন করে সাজানোর প্রস্তুতিও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে ভোটের আকাশে জমেছে কালো মেঘ। কমিশন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাদের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা।
দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৩৩১টি পৌরসভার সীমানা নির্ধারণ এবং ওয়ার্ড পুনর্গঠন নিয়ে উচ্চ আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন। এসব মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচনি সীমানা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। পাশাপাশি ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নির্বাচনি প্রস্তুতির কারিগরি কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের অবস্থানও স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, আইনি সংস্কার ও মামলাজনিত জটিলতা নিষ্পত্তি না করে তড়িঘড়ি করে তপশিল ঘোষণা করা হবে না। ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ জুনের আগে শেষ করা সম্ভব না হলে তার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনও কঠিন। ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রশাসনিক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে কমিশনের মূল মনোযোগ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের দিকে থাকলেও জুনের আগে সেই প্রক্রিয়া শুরু করা কঠিন হতে পারে। ফলে নির্বাচনের সময় নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও নির্বাচন কমিশনের বাস্তব মূল্যায়নের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সময়ের এই ব্যবধান একদিকে বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ, অন্যদিকে মাঠের নিয়ন্ত্রণ ও প্রার্থী বাছাই নিয়ে অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায়।
পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচন, সময়সূচি নিয়ে সংশয় : আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছর পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের কথা ছিল। প্রস্তাবিত সময়সূচিতে রোজার আগে ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপ ও ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপের ভোটের কথা বলা হয়েছিল। রোজার পরে ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম ধাপে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল।
নির্বাচনের অন্তত ছয় সপ্তাহ আগে তপশিল ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে নির্বাচনি প্রস্তুতিও চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা ছিল। এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানিয়েছিলেন, আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে সব ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করতে চায় কমিশন।
কিন্তু ভোটার তালিকা হালনাগাদ, আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির সময়সীমা নিয়ে নতুন করে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তাতে আগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইসি সচিব আখতার আহমেদের ভাষায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন আমাদের প্রত্যাশার একটি বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছে, স্থানীয় নির্বাচনে আমরা সেই মানদণ্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে চাই।
কমিশনের এই বক্তব্যে নির্বাচনের মান ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে অর্জিত মানদণ্ড স্থানীয় পর্যায়েও বজায় রাখতে হলে ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্র, নির্বাচনি পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কত দিনের প্রস্তুতি প্রয়োজন, কোন কোন আইনি জটিলতা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় এবং পাঁচ ধাপের আগের সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে কি না— এসব বিষয়ে কমিশনের স্পষ্ট ঘোষণা প্রয়োজন।
আইনি জটিলতা ও সীমানা নিয়ে বড় বাধা : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সীমানা নির্ধারণ ও ওয়ার্ড পুনর্গঠন নিছক প্রশাসনিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে ভোটারদের নির্বাচনি এলাকার অন্তর্ভুক্তি, প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র এবং নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্ন জড়িত। কোনো এলাকার সীমানা নিয়ে বিরোধ আদালতে বিচারাধীন থাকলে কমিশনকে সংশ্লিষ্ট আইনি অবস্থান বিবেচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হয়।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনটি সিটি করপোরেশন ও ৩৩১টি পৌরসভার ক্ষেত্রে সীমানা ও ওয়ার্ড পুনর্গঠন নিয়ে মামলা থাকায় নির্বাচনি প্রস্তুতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে কমিশন সূত্রের দাবি। তবে কোন প্রতিষ্ঠানে কতটি মামলা রয়েছে, কতটি মামলায় নির্বাচন আয়োজনের ওপর সরাসরি বাধা রয়েছে এবং কোন মামলার নিষ্পত্তি কবে হতে পারে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ হলে বিলম্বের প্রকৃত কারণ আরও পরিষ্কার হবে।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সীমানা-সংক্রান্ত মামলা নেই বা আইনি বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, সেসব প্রতিষ্ঠানে কি আগে নির্বাচন আয়োজন করা যাবে? নাকি সব স্তরের নির্বাচন একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে চায় কমিশন? এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্বাচনের সামগ্রিক সময়সূচি অনেকটাই নির্ভর করবে।
মাঠে ত্রিমুখী সমীকরণ : নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাজনৈতিক দলগুলোকে তৃণমূল গোছানোর বাড়তি সময় দিচ্ছে। এই নির্বাচনকে কোনোভাবেই ফাঁকা মাঠের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বাস্তবতায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে।
বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, বড় পৌরসভা এবং গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন হবে দলগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনি মাঠে এখন মূল লড়াই হবে অন্য প্রধান দলগুলোর মধ্যে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি নিজেদের তৃণমূল সংগঠন গুছিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে।
দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থানীয় নির্বাচনে পকেট প্রার্থী বা পৈতৃক সূত্রে মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ না রেখে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অধ্যাপক ইমতিয়াজের মতে, বিএনপির ভেতরেও প্রার্থী বাছাইসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ রয়েছে, যা অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও কমবেশি দেখা যায়। তবে তারেক রহমানের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহর সফর দলটির সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করতে এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ সামাল দিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির তৃণমূল পর্যায়ের তৎপরতা বিএনপির জন্য নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। তার মূল্যায়নে, জামায়াত ও এনসিপি দুই দলই স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের শক্তি দেখাতে আগ্রহী। তবে সম্ভাব্য নির্বাচনি সমঝোতা ও আসন ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে। পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আলোচনা থাকলেও কোনো কোনো এলাকায় সমঝোতা বা জোটের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং বড় পৌরসভাগুলোতে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন এই বিশ্লেষক। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনসিপির প্রভাবশালী মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকার দুই সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভোটার এলাকা স্থানান্তর করেছেন।
জামায়াতও বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থী প্রস্তুত রাখার চেষ্টা করছে বলে তার দাবি। তবে এসব প্রস্তুতি ও প্রার্থিতার বিষয়ে দলগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং ভোটার এলাকা স্থানান্তরের নথি যাচাই করা প্রয়োজন। মাঠের পরিবেশ নিয়ে জামায়াত-এনসিপির সংশয় : নির্বাচনের সময় পিছিয়ে গেলে দলগুলোর সাংগঠনিক প্রস্তুতির সুযোগ বাড়বে। কিন্তু নির্বাচনি পরিবেশ কেমন থাকবে, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো প্রচারে সমান সুযোগ পাবে কি না— এসব প্রশ্নও সামনে আসছে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে, কোনো একটি দল স্থানীয় নির্বাচনে একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে কিংবা প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও জাতীয় নির্বাচনের পর তৃণমূলের অবস্থানকে ঘিরে অন্য দলগুলোর মধ্যে সতর্কতা রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। স্বচ্ছ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত না হলে আন্দোলনের পথে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছে জামায়াত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে সংশয় দূর করার দায়িত্ব কমিশনের ওপর বর্তায়। প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা, প্রচারের সমান সুযোগ, আচরণবিধি বাস্তবায়ন এবং দলীয় সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে নির্বাচন ঘিরে বিরোধ বাড়তে পারে। সময় বাড়লেও রাজনৈতিক পরীক্ষা কঠিন : সময় বাড়লেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহজ হবে, বিষয়টি এমন নয়।
জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় পর্যায়ে দলের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা, জনপ্রিয় প্রার্থী খুঁজে বের করা এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ন্ত্রণ করা, সবই দলগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় পর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তিকে স্থানীয় ভোটে রূপান্তর করা এবং মনোনয়ন ঘিরে সম্ভাব্য বিরোধ সামাল দেওয়া। জামায়াতের সামনে থাকবে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তিকে নির্বাচনি সাফল্যে রূপ দেওয়ার প্রশ্ন।
আর এনসিপির জন্য পরীক্ষা হবে নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি ও নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা। রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আহমেদ শরিফ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটাতে কমিশন ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। কোন আইনি সংস্কার বাকি, সীমানা-সংক্রান্ত মামলাগুলোর অবস্থা কী, ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ কখন শেষ হবে এবং কোন স্তরের নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে— এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কমিশনকে আইনি বৈধতা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকেও অভিযোগ-অনুযোগের বাইরে এসে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্বাচনি অনিয়মের প্রশ্ন তুলতে হবে।





















