অনিয়মের আঁতুরঘরে পরিণত হয়েছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের প্রশাসন। হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমার ২৫ দিন পরও প্রকাশ করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডে বিকল হওয়া লিফট মাস পেরোলেও মেরামত হয়নি।
চোরাই পথে বাইরে যাচ্ছে হাসপাতালের হাজার হাজার কেনোলা, সিরিঞ্জ, স্যালাইন। এ নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে কোনো প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি হাসপাতাল প্রশাসনের কাছে। চোরাই পথে বাইরে যাচ্ছে হাসপাতালের হাজার হাজার কেনোলা, সিরিঞ্জ, স্যালাইন : বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলা থেকে মমেক হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসে বিপুলসংখ্যক মানুষ।
রোগীদের অভিযোগ, ওষুধ চাইলে দুর্ব্যবহার করেন নার্স-চিকিৎসকেরা। অথচ গত বুধবার পাচার হওয়া হাসপাতালের হাজার হাজার সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া গেছে শম্ভুগঞ্জের একটি ময়লার গুদামে। এসব সামগ্রীর মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত। এসব সামগ্রী হাসপাতালের বাইরে এলো কীভাবে, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। ময়লা সংগ্রহের কাজে যুক্ত শ্রমিকদের দাবি, এসব সামগ্রী আবার হাসপাতালে ফেরত দেওয়া হবে।
ময়লা সংগ্রহের কাজে যুক্ত শ্রমিক জুবেদা খাতুন বলেন, ‘ময়লা সংগ্রহ এবং যাচাই-বাছাই কাজে আমরা ১১ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছি। চারজন মমেক হাসপাতাল থেকে ময়লা সংগ্রহ করে। বাকি সাতজন ময়লার গুদামে এগুলো প্রক্রিয়া করি। ময়লার সঙ্গে প্রতিদিন নতুন নতুন সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন চলে আসে। এগুলো আমরা আলাদা বস্তায় রেখে দেই। ১০ থেকে ১২ দিন পর তিন থেকে চার বস্তা সরঞ্জাম হলে এগুলো হাসপাতালে ফেরত দেই।
বাকিগুলো পাইকারি দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ’ হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী কীভাবে ময়লার গুদামে গেল, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সংগঠন ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ। তার মতে, এসব সামগ্রী হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার বাইরে যাওয়ার ঘটনায় কর্তৃপক্ষের দায় ও তদারকির বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।
এ বিষয়ে ঠিকাদার আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা. ঝন্টু সরকার এ বিষয়ে বলেন, ‘অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ চিকিৎসাসামগ্রী হাসপাতালের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু এসব সামগ্রী হাসপাতালের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সেহেতু তারা কীভাবে ফেরত দেবে? ছুটি শেষ হলে তাদের ডেকে জবাব চাওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ৩৫ থেকে ৪০ ভ্যানগাড়ি ময়লা সরানো হয়। আর ময়লা থেকে প্রতি সপ্তাহে তিনের অধিক বস্তা অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া যায়।
মাস পেরোলেও বিকল লিফটে ভোগান্তি রোগীদের : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড ও লিফট দুর্ঘটনার ৩৮ দিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এত দিনেও ক্ষতিগ্রস্ত লিফটগুলোর মেরামতকাজ শুরু হয়নি। এমনকি লিফটগুলো সচল করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে নিয়মিত ডিউটি করছেন না লিফট অপারেটররা। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
গত বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পুরো হাসপাতালের পরিবেশ নাজুক। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নতুন ভবনের ১১ নম্বর লিফটটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। আগুন লাগার পর যেভাবে ছিল, ঠিক সেই অবস্থাতেই রয়েছে। মেরামতের কোনো লক্ষণ চোখে পড়েনি। ৯ ও ১০ নম্বর লিফটের সামনে প্রায় ৫০-৬০ জনের জটলা দেখা যায়। নতুন ভবনের লিফটগুলো অচল থাকায় এবং সচল লিফটগুলোর ওপর চাপ বাড়ায় রোগীদের প্রচণ্ড ভিড় দেখা গেছে।
এদিকে লিফট ধীরগতিতে ওঠানামা করায় সাধারণ মানুষ ও রোগীরা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও উঠতে পারছেন না। নতুন ভবনের চারতলায় এক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন ষাটোর্ধ্ব রোমেলা খাতুন। তার ছেলে জানান, অতিরিক্ত ভিড় এবং যেকোনো মুহূর্তে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় তারা ভয়ে লিফট ব্যবহার করেন না। সিঁড়ি দিয়েই ওঠানামা করেন। গত শনিবার লিফটে চড়ার সময় হঠাৎ করে সেটি মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি প্রায় সাত-আট মিনিট ভেতরে আটকা পড়েছিলেন।
এদিকে ১০ নম্বর লিফটের সামনে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা এক শিশুর মা সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘প্রতিটি লিফটে ওঠার জন্য রোগীদের ১৫-২০ মিনিট লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ধাক্কাধাক্কি ও হুড়োহুড়ি করতে হয়। অনেক সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে লিফটে জায়গা না পেয়ে রোগীরা হতাশ হয়ে পড়েন। রোগী ও প্রবীণ ব্যক্তিরা সাত-আটতলা পর্যন্ত হেঁটে উঠতে গিয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
’ এদিকে হাসপাতালে আগুন লাগার এক সপ্তাহ পর থেকে নিয়মমাফিক ডিউটি করতেও দেখা যাচ্ছে না লিফট অপারেটরদের। গত বুধবার দুপুর ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত নতুন ও পুরোনো ভবনের বিভিন্ন লিফটের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনো লিফট অপারেটরের দেখা মেলেনি। দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নাইমা এন্টারপ্রাইজের লোগোযুক্ত জার্সি পরা ফারুক নামে এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়।
তিনি নিজেকে লিফট অপারেটর বলে পরিচয় দেন। বর্তমানে নতুন ও পুরোনো ভবনে কতজন অপারেটর দায়িত্ব পালন করছেন— এমন প্রশ্নে তিনি একেক সময় একেক রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি লিফটের জন্য শিফটভেদে তিনজন করে অপারেটর থাকার কথা। এদিকে লিফট অপারেটররা ডিউটি না করলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঠিকই বিল তুলে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা মেসার্স নাইমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইব্রাহিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার মোবাইল ফোনে কল দিলেও ধরেননি। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত লিফটটি মেরামত করার আর কোনো সুযোগ বা উপায় নেই। নতুন লিফট সংযোজন করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।
সচল লিফটগুলো প্রায়ই মাঝপথে আটকে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ’ অপারেটররা ঠিকমতো ডিউটি না করেও কোম্পানির পক্ষ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বেতন তুলে নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানান, নতুন লিফট সংযোজনের বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
যে কজন অপারেটর আছেন, তারা ঠিকভাবে ডিউটি করেন কি না, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ঠিকাদারকে চাপ দেওয়া হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবদেন প্রকাশ হয়নি ২৫ দিনেও : হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড, অগ্নি আতঙ্কে হতাহত ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ২৫ দিন পেরোলেও তা প্রকাশ করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে নাগরিক সংগঠন ময়মনসিংহ মঞ্চ।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে ময়মনসিংহ মঞ্চ। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুই প্রকৌশলীকে রাখায় সমালোচনা হলে সেটি বাতিল করা হয়। পরদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছয় সদস্যের নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করে।
নতুন কমিটির প্রধান করা হয় হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ, এতে কারও গাফিলতি ছিল কি না, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ দিতে বলা হয় কমিটিকে। প্রথম দফায় পাঁচ কার্যদিবস এবং দ্বিতীয় দফায় আরও তিন কার্যদিবস সময় বাড়িয়ে তদন্তকাজ শেষে ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।
অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে যা বলছে হাসপাতাল প্রশাসন : হাসপাতালে এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে মমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলামের নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে মমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের কোনো বিষয় নয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে যা যা সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ’ কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি মোবাইল ফোনে এসব তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি অনলাইনে একটা মিটিংয়ে আছি। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে বলতে পারেন। আমি উত্তর দেব। অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলা যাবে না।
’ প্রসঙ্গত, গত ১৪ সেপ্টেম্বর মমেক হাসপাতালের আটতলা ভবনের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে। পরে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে হুড়োহুড়ির সৃষ্টি হয়। অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে।






















