গত পাঁচ দশকে বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পৃথিবীতে নজরদারিতে থাকা বন্যপ্রাণী ও মেরুদণ্ডী প্রাণীর গড় উপস্থিতি গড়ে ৭৩ শতাংশ কমে গেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ) এবং জুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন (জেডএসএল)-এর যৌথ পর্যালোচনায় তৈরি লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্টে এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী ধ্বংসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রাকৃতিক আবাসস্থলের বিনাশ ও অবক্ষয়।
এর পাশাপাশি অতিরিক্ত মাত্রায় প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, রোগব্যাধি এবং আক্রমণাত্মক প্রজাতির আক্রমণ বন্যপ্রাণীগুলোর জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। সেই সঙ্গে মানুষের অব্যাহত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য এখন চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী ৫ হাজার ৭৯০টি প্রজাতির প্রায় ৩৫ হাজার ৮০৩টি মেরুদণ্ডী প্রাণীর (স্তন্যপায়ী, পাখি, মাছ, সরীসৃপ ও উভচর) পপুলেশন ট্র্যাক (পর্যবেক্ষণ) করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
আঞ্চলিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ধস নেমেছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে; সেখানে গত ৫০ বছরে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি কমেছে সর্বোচ্চ ৯৫ শতাংশ। একইভাবে আফ্রিকা মহাদেশে এই হ্রাসের হার দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশে এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তা ৫৫ শতাংশ। বিশেষ করে কঙ্গো অববাহিকার মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যগুলোতে কৃষিজমির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্যিক চোরাচালানের কারণে হাতিসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতি দ্রুত বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ডব্লিউডব্লিউএফের তথ্য মতে, হাতির দাঁতের লোভে অবৈধ শিকার এবং আবাসস্থল হারানোর কারণে আফ্রিকার বনাঞ্চলের হাতির সংখ্যা গত কয়েক দশকে ৬০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। গবেষকদের মতে, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষের তৈরি পরিবেশগত চাপ। মানুষের বসতি স্থাপন ও খনি খননের কারণে প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস, বুনো প্রাণী অনিয়ন্ত্রিতভাবে শিকার ও পাচার, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দূষণ এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও দাবানল বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।
ডব্লিউডব্লিউএফের মহাপরিচালক কার্স্টেন শুয়েট এই পরিসংখ্যানকে প্রকৃতির করুণ চিৎকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি আমাদের চরম সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের এই গণহারে পতন কেবল অন্য প্রজাতির বিলুপ্তি নয়, এটি মানব জাতির টিকে থাকা, আমাদের স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির ওপর সরাসরি মারাত্মক আঘাত হানছে।
’ প্রতিবেদনটির প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং জুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের কনজারভেশন ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ড. অ্যান্ড্রু টেরির মতে, বিশ্ব এক বিপজ্জনক অলঙ্ঘনীয় সীমার (টিপিং পয়েন্ট) খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অ্যামাজন রেইনফরেস্ট বা প্রবাল প্রাচীরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রগুলো যদি একবারে ভেঙে পড়ে, তবে তা পৃথিবীর জলবায়ু ও খাদ্য শৃঙ্খলকে এমন এক বিপর্যয়ে ফেলবে যা থেকে মানবজাতির আর ফিরে আসার কোনো পথ থাকবে না।
’ তবে এই চরম অন্ধকার চিত্রের মধ্যেও আশার আলো দেখা গেছে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব স্থানে স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সরাসরি বন্যপ্রাণী ও বনাঞ্চল সংরক্ষণে নেতৃত্বের জায়গায় আনা হয়েছে, সেখানে বেশ কিছু বিপন্ন প্রজাতির সংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটি উদাহরণ দেখা যায় দক্ষিণ আফ্রিকায়।
দেশটিতে সাভানা হাতি বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় থাকলেও এবং অনেক এলাকায় তাদের সংখ্যা কমলেও যেসব অঞ্চলে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো সরাসরি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এবং এর সুফল ভোগ করে, সেখানে এই হাতিগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে চোরাচালানবিরোধী ব্যবস্থা, বিচারিক সংস্কার এবং দুর্নীতি হ্রাসের উদ্যোগ এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
কঙ্গো অববাহিকা অঞ্চলের ডব্লিউডব্লিউএফ পরিচালক নাদেজ ঞ্জোয়েম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সংরক্ষণের এই ধারাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রতিটি দেশের সরকার, নাগরিক সমাজ এবং অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক ছাতার নিচে আসতে হবে। যার মূল কেন্দ্রে রাখতে হবে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়কে, কারণ তারাই যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির সবচেয়ে বড় রক্ষক।
’ পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি অভয়ারণ্য রক্ষা করে এই সার্বিক পতন থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য বিশ্বের পুরো খাদ্য ও শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অর্থায়ন কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। জাতিসংঘের ‘কুনমিং-মন্ট্রেল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের স্থলভাগ ও জলভাগের অন্তত ৩০ শতাংশ এলাকাকে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত অঞ্চলে রূপান্তর করতে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন বিশ্ব বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (WWF) ও জুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন (ZSL) কর্তৃক প্রকাশিত ‘লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট’।






















