রাজধানীর চিরচেনা মাদক স্পটগুলোতে জটলা এখন অনেকটাই কম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক নজরদারি, কর্ডন অ্যান্ড সার্চ এবং ব্লক রেইডের মুখে ঢাকার মাদক কারবারিরা বদলে ফেলেছে পুরো বিপণন কৌশল।
স্পটভিত্তিক বিক্রি কমিয়ে এখন তারা বেছে নিয়েছে মাদকের ‘হোম ডেলিভারি’ সার্ভিস। অভিজাত এলাকার উচ্চবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে কুরিয়ার সার্ভিস পদ্ধতিও আছে এই সিন্ডিকেটের। রাজধানীর এই সিন্ডিকেট ঢাকার বাইরে থেকে মাদক আনার রুট ও কৌশলও পাল্টে ফেলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা সবজির গাড়ি, রাইড শেয়ারিং ও জরুরি সেবার যানবাহনে চড়ে সরাসরি ক্রেতার ড্রয়িংরুমে পৌঁছে যাচ্ছে আইস, এলএসডি, কুশ বা ইয়াবার মতো দামি মাদক।
পাইকারি বা খুচরা ক্রেতা— সবার জন্যই উন্মুক্ত এই নতুন সার্ভিস। এই নতুন সরবরাহ চেইনের কারণে মাঠপর্যায়ে মাদক জব্দ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য। কয়েকজন মাদক কারবারির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন এই সিন্ডিকেট কোনো নির্দিষ্ট আস্তানায় পণ্য মজুত রাখে না। তারা ঢাকায় মালামাল আনেও নিত্যনতুন কৌশলে।
তাদের নেটওয়ার্ক মূলত তিনটি ছদ্মবেশী স্তরে কাজ করে। প্রথমত, কুরিয়ার ও পার্সেল ছদ্মবেশ। সীমান্ত এলাকা থেকে আসা কুরিয়ারের পার্সেলগুলোতে গৃহস্থালি পণ্য, আটা বা ফুড সাপ্লিমেন্টের কৌটার সুনিপুণ স্তরের নিচে লুকিয়ে পাঠানো হচ্ছে দামি মাদক। একমাত্র নিজেদের লোক কেউ ধরিয়ে না দিলে এই রুট সম্পূর্ণ গোপনই থাকে। আরেকটি হচ্ছে জরুরি সেবার বাহন।
মহাসড়কে তল্লাশি এড়াতে সবজি বা নিত্যপণ্যের গাড়ি কিংবা ভুয়া স্টিকারযুক্ত প্রাইভেট কারের গোপন চেম্বার ব্যবহার করে রাজধানীতে ঢুকছে বড় চালান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাইড শেয়ারিং ও ছদ্মবেশী ডেলিভারিম্যান। রাজধানীজুড়ে পণ্য সরবরাহে ব্যবহার করা হচ্ছে সাধারণ কুরিয়ারের ব্যাগ বা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মতো পোশাক। ফলে সাধারণ কোনো ডেলিভারিম্যান যখন কোনো অভিজাত ফ্ল্যাটের কড়া নাড়ছেন, তখন বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না যে, ভেতরে কোনো বিলাসবহুল ড্রাগের আদান-প্রদান ঘটছে।
তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও জানা গেছে, কোনো বিশেষ স্পটে একসঙ্গে মালামাল মজুত রাখা হয় না। এতে হারানোর ঝুঁকি বেশি। যারা খদ্দের এবং ডেরায় বা আস্তানায় এসে মাদক সংগ্রহ করে, তারা গোপনে অথবা সরাসরি যোগাযোগ করে তাদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে। এরপর ক্রেতা এসএমএস করে মাদক চেয়ে, ঠিকানা দিয়ে বিকাশে টাকা পাঠায়। তখন নিজের বিশ্বস্ত সদস্য অথবা রাইড শেয়ারের মাধ্যমে সেখানে মালামাল পৌঁছে দেওয়া হয়।
তাদের ক্রেতাদের মধ্যে অভিজাত শ্রেণির সন্তানই বেশি। কারণ পরিবেশগত কারণে তারা ডেরা বা মাদক আস্তানায় যেতে চান না বা ভয় পান। ফলে দাম একটু বেশি নিলেও তারা ‘হোম সার্ভিস’ পদ্ধতিকেই নিরাপদ মনে করেন। রাজধানীর গুলশান-বনানী, বারিধারা, উত্তরা, বসুবন্ধরা আবাসিক এলাকা, নিকেতন ও নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা, বারিধারা ডিওএইচএস এবং ধানমন্ডিতে তাদের ক্রেতা বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতেও তাদের ক্রেতা আছে। কিন্তু সেখানে অনেক সময় মারধর করে মালামাল কেড়ে নেয় এবং ছাত্রাবাসে আটকে রেখে আরও মালামাল দাবি করে, যার কোনো টাকা দেয় না। ফলে এখানে গ্রাহক থাকলেও তারা সরবরাহ করে কম। মাদক কারবারিরা আরও জানায়, তাদের সিন্ডিকেটে নারী সদস্যও আছে। কোনো ক্রেতার চাহিদা বেশি থাকলে তারা নারী সদস্যদের গার্মেন্টস কর্মীর বেশে তাদের হাতে থাকা টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে বা অন্য যেকোনো কৌশলে এই পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেওয়া করে।
কারণ এই পদ্ধতি পুলিশের নজরের বাইরে থাকে। এ ছাড়া মোটরসাইকেলের চেয়ে বাইসাইকেলকে তারা বাহন হিসেবে বেশি ব্যবহার করে। কারণ বাইসাইকেল সাধারণত পুলিশের তল্লাশিতে পড়ে না। মালামাল মজুত রাখার জন্য তাদের কিছু স্পট আছে, সেগুলো ভিআইপি আবাসিক এলাকায়। এসব এলাকায় বাসাভাড়া বেশি হলেও ভিআইপি খদ্দের বেশি থাকায় তাদের পুষিয়ে যায়। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কিছু হাইপ্রোফাইল অভিযানে এই অলিখিত হোম ডেলিভারি ও অভিনব পাচার প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
রুটিন দায়িত্ব পালন করাকালে নয়, বিশ্বস্ত গোপন সূত্রের মাধ্যমে কিছু ঘটনা ফাঁস হয়ে গেলে সেই চালান ধরা পড়ে। বিশেষ করে মাদক বাণিজ্য নিয়ে আধিপত্য বা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ হলেই শুধু প্রতিপক্ষ একে অপরকে ধরিয়ে দেয়। তবে সেটাও খুব কম। গত ১৪ মার্চ গাবতলী এলাকায় কাঁচামাল ও ফলের একটি ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় দুই কেজি উচ্চমূল্যের ক্রিস্টাল মেথ বা আইস জব্দ করা হয়।
টেকনাফ থেকে আসা এই চালানটি ফলের ঝুড়ির নিচে কাঁচা সবজির স্তরে এমনভাবে লুকানো ছিল, যা সাধারণ তল্লাশিতে ধরা অসম্ভব। এটি রাজধানীর গুলশান ও বনানীর নির্দিষ্ট কিছু কাস্টমারের বাসায় ডেলিভারির জন্য আনা হয়েছিল বলে জানা যায়। এরপর ২২ জুন ঢাকার একটি নামি অভ্যন্তরীণ কুরিয়ার সার্ভিসের দিলকুশা শাখা থেকে একটি বড় পার্সেল জব্দ করা হয়। নথিপত্র অনুসারে পার্সেলটিতে ‘জরুরি আইনি নথিপত্র ও বই’ থাকার কথা থাকলেও ভেতর থেকে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ এলএসডি ব্লট এবং ক্যালিফোর্নিয়ান কুশ।
ঢাকার উত্তরার কতিপয় উচ্চবিত্ত তরুণের ডোর-স্টেপ ডেলিভারির উদ্দেশ্যে এই চোরাচালান জালিয়াতি করা হয়েছিল বলে পরে জানা যায়। মাত্র ২২ বছর বয়সি মার্কিন প্রবাসী বাংলাদেশি তৌসিফ হাসান। উন্নত প্রযুক্তির চাষাবাদ শিখে এসে তিনি পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার একটি ফ্ল্যাটে সম্পূর্ণ রিমোট-কন্ট্রোলড ইনডোর ল্যাবরেটরিতে ‘কুশ’ (উচ্চমানের ক্যানাবিস) উৎপাদনের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
গত ৮ আগস্ট এই ল্যাবরেটরি আবিষ্কার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। প্রসঙ্গত, ল্যাবে উৎপাদিত এই হাইপ্রোফাইল মাদক বাইরে কোনো স্পটে নেওয়া হতো না। অর্ডারের ভিত্তিতে চলে যেত ক্রেতার কাছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ডেমরার সানারপাড় এলাকায় বিশেষ অপারেশন চালিয়ে ৮৩ কেজি গাঁজাসহ একটি সিন্ডিকেটকে আটক করে পুলিশ।
চক্রটি একটি বিলাসবহুল প্রাইভেট কারের পেছনের সিট ও স্পেয়ার টায়ারের ভেতরে বিশেষ চেম্বার তৈরি করে সেটিকে ঢাকার ভেতরে হোম ডেলিভারির একটি ভ্রাম্যমাণ মিনি-ডিপো হিসেবে ব্যবহার করছিল এবং ফোনে বা অ্যাপে অর্ডার আসা মাত্র গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিত। এ ছাড়া প্রথাগত স্পট বাদ দিয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে হাসপাতালকে বেছে নিয়েছিল একটি মাদকচক্র।
গত ১৫ অক্টোবর ডিবি পুলিশের একটি দল মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছদ্মবেশে অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ কক্সবাজার ও রামুর দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে। তারা রোগী বা সাধারণ ভিজিটর সেজে সরাসরি নির্দিষ্ট গ্রাহকের হাতে মাদক পৌঁছে দিতে এসেছিল বলে জানা যায়। এই অদৃশ্য মাদক চেইনের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা।
অপরাধবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদক কারবারিরা এখন করপোরেট চেইনের মতো কাজ করছে। স্পটে গিয়ে মাদক কেনার যে সামাজিক ঝুঁকি বা আইনি ভয় ছিল, হোম ডেলিভারি মডেল তা দূর করে দিয়েছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই পক্ষই নিরাপদ বোধ করছে। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ছদ্মবেশী অপরাধের আধুনিকায়ন’। এই চক্র ভাঙতে হলে প্রথাগত টহলের চেয়ে ‘আন্ডারকভার সোর্স’ এবং পার্সেল লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো-দক্ষিণের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন এ বিষয়ে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রথাগত আস্তানাগুলোতে তারা যখনই অভিযান পরিচালনা করছেন, ভাসমান মাদক কারবারিরা স্থান পরিবর্তন করছে। মাদক কারবারিরা মনে করছে, কুরিয়ার কিংবা পার্সেল ডেলিভারির আড়ালে নজর এড়াতে পারবে। কিন্তু ডিএনসির গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এখন সম্পূর্ণ আধুনিক।
কুরিয়ার বুকিং ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরের দরজায় মাদক পৌঁছানোর আগেই মূল হোতাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এই অভিনব সরবরাহ চেইনের প্রতিটি রুট ধ্বংস করতে ডিএনসির আন্ডারকভার টিম কাজ করে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, মাদকাসক্তদের সংখ্যা এবং এই মরণনেশার জাল আমাদের তরুণসমাজে যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কুরিয়ার ও হোম ডেলিভারির অদৃশ্য নেটওয়ার্ক তরুণদের জন্য মাদকপ্রাপ্তি সহজ করে দিয়েছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অধিকাংশ বড় অপরাধের মূলে রয়েছে এই মাদক সিন্ডিকেট। মাদক কারবারিরা তাদের রুট এবং ডেলিভারির মাধ্যম যতই বদলাক না কেন, পুলিশ ও গোয়েন্দা টিমগুলো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
কোনো কোনো চক্র রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে পার্সেল কিংবা ছদ্মবেশী পরিবহনের আড়ালে মাদক বাণিজ্যের চেষ্টা করছে; কিন্তু মাদকের গডফাদারদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও পেশাদার ডেলিভারি লজিস্টিকসের মিশ্রণে তৈরি নতুন মাদক সিন্ডিকেট রাজধানীর তরুণসমাজকে এক নীরব ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিদিন গড়ে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করলেও মূল সরবরাহ চেইনের আড়ালে থাকা গডফাদাররা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল বদলাচ্ছে। ঢাকাকে মাদকমুক্ত করতে হলে এখন শুধু রাস্তায় রাস্তায় প্রথাগত তল্লাশি নয়, বরং প্রতিটি কুরিয়ার পার্সেল, আন্তর্জাতিক কার্গো ও ডোর-স্টেপ লজিস্টিকসের ওপর সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা জাল বিছানোই সময়ের দাবি।





















