আজ বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
২৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২১%

রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্য ও অবহেলার কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:13:39 pm, Wednesday, 14 October 2026
  • 11

রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্য ও অবহেলার কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বাংলাদেশের উন্নয়নচিত্রে একদিকে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্যের গল্প; অন্যদিকে রয়েছে এমন কিছু অঞ্চল, যেখানে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং সীমিত নাগরিক সুবিধা মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তুলছে।

রংপুর বিভাগ সেই বৈপরীত্যের অন্যতম উদাহরণ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও উত্তরাঞ্চলের এই জনপদের মানুষের মনে উন্নয়নবঞ্চনার প্রশ্নটি রয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সম্পদ বণ্টনে রংপুর কেন এখনো পিছিয়ে? রংপুরের উন্নয়ন বৈষম্যকে শুধু অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পায়নের দুর্বলতা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগ অবকাঠামোর অসমতা, নীতিনির্ধারণে আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দুর্বলতা। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, সুষম বাজেট বণ্টন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার কার্যকর প্রয়োগ। দারিদ্র্যের বাস্তবতা ও পরিসংখ্যানের প্রশ্ন রংপুরের পিছিয়ে থাকার আলোচনায় দারিদ্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২১ সালের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সম্পদভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে রংপুর বিভাগের ৪৪ শতাংশের বেশি পরিবার দেশের দরিদ্রতম এক-পঞ্চমাংশের অন্তর্ভুক্ত। একই সূচকে ময়মনসিংহ বিভাগের অবস্থানও উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, ঢাকায় সবচেয়ে ধনী এক-পঞ্চমাংশের পরিবারের অনুপাত ছিল ২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি- সম্পদভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং আয় বা ভোগব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত দারিদ্র্যের হার এক নয়। সম্পদভিত্তিক সূচকে পরিবারের বাসস্থানের উপকরণ, পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা এবং টেলিভিশন, ফ্রিজের মতো সম্পদের মালিকানা বিবেচনা করা হয়। ফলে এ সূচক মানুষের আপেক্ষিক আর্থসামাজিক অবস্থান বোঝাতে সহায়ক হলেও একে সরাসরি আয়ভিত্তিক দারিদ্র্যের হার হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

তবে বিভিন্ন সূচকে রংপুরের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটায়, তাহলে সেই সুফল সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না কেন? কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, কিন্তু শিল্পায়ন কোথায়? রংপুর বিভাগের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে কৃষিনির্ভর। ধান, আলু, ভুট্টা, তামাক, শাকসবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু কৃষিতে উৎপাদন বাড়লেই কৃষকের আয় সমান হারে বাড়ে না। সংরক্ষণব্যবস্থার ঘাটতি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহন ব্যয় কৃষকের মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সুযোগ সীমিত থাকলে স্থানীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, আলু, ভুট্টা, ফল ও সবজি সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিযন্ত্র উৎপাদন এবং কৃষিভিত্তিক রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষক ও উদ্যোক্তা উভয়ের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, উন্নত সড়ক-রেল যোগাযোগ, গুদাম ও হিমাগার, সহজ ঋণ, দক্ষ শ্রমিক এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।

এসব সুবিধার সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করলেই শিল্পায়ন হবে না। রংপুরের উন্নয়নের জন্য তাই কৃষিকে শুধু উৎপাদনের খাত হিসেবে না দেখে শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। স্থানীয় কাঁচামালকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের আয় বাড়বে, তরুণদের কর্মসংস্থান হবে এবং ঢাকামুখী অভিবাসনের চাপও কমতে পারে। বাজেট বরাদ্দে বৈষম্য: প্রয়োজনভিত্তিক বণ্টন কতটা জরুরি?

রংপুরের উন্নয়নবঞ্চনার আলোচনায় বারবার উঠে আসে সরকারি বরাদ্দের প্রশ্ন। আলোচ্য তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রংপুর বিভাগের প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ ছিল মোট বরাদ্দের ১ শতাংশেরও কম। তবে এ পরিসংখ্যানের যথার্থতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের সরকারি বাজেট নথি, প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ এবং বিভাগভিত্তিক ব্যয়ের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো- বরাদ্দ কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং তা বাস্তবে কতটা ব্যয় হচ্ছে। জনসংখ্যা, দারিদ্র্যের মাত্রা, অবকাঠামোগত ঘাটতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার প্রয়োজন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত। উন্নত অঞ্চলের সঙ্গে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলকে একই পরিমাণ অর্থ দেওয়া সব সময় ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করে না।

কারণ, যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো ও শিল্পায়নের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করতেই তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে রংপুরের জন্য বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণের দাবি যৌক্তিকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে সেই বরাদ্দ যেন রাজনৈতিক আনুকূল্য বা লোকদেখানো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকল্প নির্বাচন, অর্থ ছাড়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সুফলভোগীর সংখ্যা—সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

যোগাযোগ অবকাঠামো: দূরত্ব কমলেই কি উন্নয়ন হবে? রংপুর বিভাগের উন্নয়নের পথে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন, ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সড়ক ও সেতুর উন্নয়ন এবং ঢাকার সঙ্গে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। আলোচ্য তথ্যে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় রেলপথে যাতায়াতের দীর্ঘ সময় এবং ব্রহ্মপুত্রের ওপর সেতু নির্মাণের সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছে।

এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন জরুরি। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা পণ্য পরিবহনের খরচ কমাতে পারে, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শুধু সড়ক, রেললাইন কিংবা সেতু নির্মাণ করলেই দারিদ্র্য দূর হবে না।

যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন, বাজার, শিল্পায়ন এবং দক্ষতা উন্নয়নের সংযোগ তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ, অবকাঠামো হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহায়ক শক্তি; নিজেই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিনিয়োগের পরিবেশ শিল্পায়নের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর বিভাগে গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণের দাবি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ, জমি এবং পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন। তবে গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য শিল্পচাহিদা, পাইপলাইন নির্মাণের ব্যয়, জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি প্রাপ্যতা এবং বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনাও বিবেচনা করা দরকার।

একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। রংপুরে বিনিয়োগ বাড়াতে স্থানীয় ও জাতীয় উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্পপার্ক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণসুবিধা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমানো প্রয়োজন। বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে; আর কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় ও স্থানীয় বাজারের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের অদৃশ্য ক্ষতি রংপুর বিভাগের উন্নয়ন আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বন্যা, নদীভাঙন, খরা, শৈত্যপ্রবাহ, তাপদাহ ও অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে নদীভাঙনে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারানো পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়ে।

উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আলোচ্য গবেষণার তথ্যে কুড়িগ্রামের ছয়টি ইউনিয়নের ২৭৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত গবেষণার কথা বলা হয়েছে। সেখানে গত এক দশকে বিভিন্ন দুর্যোগে অবকাঠামো, ফসল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও গবাদিপশুর ক্ষতির পাশাপাশি যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং পানি ও স্যানিটেশনসংক্রান্ত সমস্যার কথা উঠে এসেছে।

গবেষণায় উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭২ শতাংশ যোগাযোগব্যবস্থা, ৬১ শতাংশ শিক্ষা, ৫৮ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা, ৪৭ শতাংশ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং ৪৯ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন খাতে ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। এসব হার সংশ্লিষ্ট গবেষণার নমুনা ও পদ্ধতির আলোকে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন; এগুলোকে পুরো রংপুর বিভাগের সব মানুষের অভিজ্ঞতার পরিসংখ্যান হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।

এখানে মূল বিষয় হলো, দুর্যোগের ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি বা ফসল নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হওয়া, চিকিৎসা না পাওয়া, নিরাপদ পানির সংকট, মানসিক চাপ এবং জীবিকা হারানোর মতো অ-অর্থনৈতিক ক্ষতিও মানুষের জীবনমানকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করে। তাই রংপুরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নদীভাঙন প্রতিরোধ, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি বিমা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি কোনো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর সক্ষমতা, শিক্ষকসংকট, গবেষণা, চিকিৎসাসেবা এবং কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বিশেষ করে স্থানীয় অর্থনীতির চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সংযোগ তৈরি করা জরুরি। কৃষি প্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, যন্ত্র প্রকৌশল, নার্সিং, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে স্থানীয় শিল্প ও সেবা খাত উপকৃত হবে। একইভাবে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা গেলে জটিল চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।

তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল, যন্ত্রপাতি, অর্থায়ন ও সেবার মান উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কর্মসংস্থান ও প্রবাসী শ্রমবাজার রংপুরের উন্নয়নবৈষম্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কর্মসংস্থান। স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাজের সুযোগ না থাকলে তরুণদের অন্য বিভাগে কিংবা বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়।

এতে পরিবারগুলো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে উপকৃত হলেও অঞ্চলটি দক্ষ ও কর্মক্ষম মানুষের একটি অংশ হারায়। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সহজ শর্তে ঋণ ও উদ্যোক্তা সহায়তার মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়াতে হবে। রংপুরের তরুণদের জন্য স্থানীয় শিল্পে চাকরি, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়া, ডিজিটাল সেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং দক্ষতাভিত্তিক পেশার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে আঞ্চলিক অর্থনীতি আরও গতিশীল হতে পারে।

শুধু সরকারি চাকরি বা বিদেশে যাওয়ার ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী কর্মসংস্থানব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে টেকসই পথ। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্ন রংপুরের উন্নয়নবঞ্চনা নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে প্রায়ই বিশেষ বরাদ্দ, অবকাঠামো নির্মাণ ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি উঠে আসে।

রংপুর বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরামের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম তিস্তা মহাপরিকল্পনা, রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উন্নয়ন, গ্যাস সরবরাহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন বলে আলোচ্য তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এসব দাবি আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনলেও বাস্তবায়নের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক বক্তব্য, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে ব্যবধান কমাতে হলে প্রতিটি দাবির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থায়নের উৎস, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। রংপুরের উন্নয়ন কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক বিষয় নয়। সরকার, বিরোধী দল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মূল্য কেবল কোনো অঞ্চলের মানুষ মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হলেন কি না, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং তাঁদের অংশগ্রহণে অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন কতটা নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হলো, বরাদ্দ কতটা বাড়ল এবং বাস্তবে কী পরিবর্তন এল—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা: সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রংপুর বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন আলোচনায় তিস্তা নদী ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, কৃষি উৎপাদন, নদীভাঙন মোকাবিলা এবং স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ জড়িত। তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না।

এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সীমান্তপারের পানিপ্রবাহ ও আন্তদেশীয় সমন্বয়ের বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। রংপুরের উন্নয়নে কী করা প্রয়োজন? রংপুরের উন্নয়নবৈষম্য কমাতে কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, বিভাগভিত্তিক দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও জলবায়ু ঝুঁকির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য প্রয়োজনভিত্তিক বাজেট বণ্টনের নীতি গ্রহণ করতে হবে। বরাদ্দের পাশাপাশি অর্থ ছাড়, বাস্তব ব্যয় এবং প্রকল্পের সুফল যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ সহজ করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়নকে শিল্প, কৃষি ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। যেসব প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর ও জনস্বার্থে প্রয়োজনীয়, সেগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে তথ্য ও সমীক্ষার ভিত্তিতে। পঞ্চমত, নদীভাঙন, বন্যা, খরা ও শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

ষষ্ঠত, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় শ্রমবাজারের উপযোগী জনশক্তি তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ বিদেশগমন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে সহায়তা বাড়াতে হবে। সপ্তমত, রংপুরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও গণমাধ্যমকে যুক্ত করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, সময়সীমা এবং অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করলে জবাবদিহি বাড়বে।

সমান উন্নয়ন নয়, প্রয়োজন ন্যায্য উন্নয়ন রংপুর বিভাগ কেন অবহেলিত- এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে খুঁজলে চলবে না। বর্তমানের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট বণ্টন, শিল্পায়নের কৌশল এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের মধ্যেও এর উত্তর খুঁজতে হবে। কোনো অঞ্চল দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকলে তাকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে একই জায়গায় দাঁড় করানোর জন্য কখনো কখনো তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ ও বিশেষ কর্মসূচির প্রয়োজন হয়।

এটিকে বাড়তি সুবিধা নয়, বরং উন্নয়নের ব্যবধান কমানোর ন্যায্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। রংপুরের মানুষের দাবি কেবল নতুন সড়ক, সেতু, রেললাইন, বিশ্ববিদ্যালয় বা শিল্পকারখানা নয়; তাঁদের দাবি কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল রাজধানী ও বড় শহরের গণ্ডি পেরিয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর মানুষের জীবনেও দৃশ্যমান হবে।

রংপুরের উন্নয়ন তাই কেবল উত্তরাঞ্চলের দাবি নয়; এটি বাংলাদেশের সুষম অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশ্ন। প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান কাজ। আর সেই কাজের ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, ন্যায্য বরাদ্দ, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

সাজেকে প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণা

রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্য ও অবহেলার কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ

Update Time : 02:13:39 pm, Wednesday, 14 October 2026

বাংলাদেশের উন্নয়নচিত্রে একদিকে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্যের গল্প; অন্যদিকে রয়েছে এমন কিছু অঞ্চল, যেখানে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং সীমিত নাগরিক সুবিধা মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তুলছে।

রংপুর বিভাগ সেই বৈপরীত্যের অন্যতম উদাহরণ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও উত্তরাঞ্চলের এই জনপদের মানুষের মনে উন্নয়নবঞ্চনার প্রশ্নটি রয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সম্পদ বণ্টনে রংপুর কেন এখনো পিছিয়ে? রংপুরের উন্নয়ন বৈষম্যকে শুধু অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পায়নের দুর্বলতা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগ অবকাঠামোর অসমতা, নীতিনির্ধারণে আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দুর্বলতা। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, সুষম বাজেট বণ্টন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার কার্যকর প্রয়োগ। দারিদ্র্যের বাস্তবতা ও পরিসংখ্যানের প্রশ্ন রংপুরের পিছিয়ে থাকার আলোচনায় দারিদ্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২১ সালের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সম্পদভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে রংপুর বিভাগের ৪৪ শতাংশের বেশি পরিবার দেশের দরিদ্রতম এক-পঞ্চমাংশের অন্তর্ভুক্ত। একই সূচকে ময়মনসিংহ বিভাগের অবস্থানও উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, ঢাকায় সবচেয়ে ধনী এক-পঞ্চমাংশের পরিবারের অনুপাত ছিল ২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি- সম্পদভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং আয় বা ভোগব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত দারিদ্র্যের হার এক নয়। সম্পদভিত্তিক সূচকে পরিবারের বাসস্থানের উপকরণ, পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা এবং টেলিভিশন, ফ্রিজের মতো সম্পদের মালিকানা বিবেচনা করা হয়। ফলে এ সূচক মানুষের আপেক্ষিক আর্থসামাজিক অবস্থান বোঝাতে সহায়ক হলেও একে সরাসরি আয়ভিত্তিক দারিদ্র্যের হার হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

তবে বিভিন্ন সূচকে রংপুরের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটায়, তাহলে সেই সুফল সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না কেন? কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, কিন্তু শিল্পায়ন কোথায়? রংপুর বিভাগের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে কৃষিনির্ভর। ধান, আলু, ভুট্টা, তামাক, শাকসবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু কৃষিতে উৎপাদন বাড়লেই কৃষকের আয় সমান হারে বাড়ে না। সংরক্ষণব্যবস্থার ঘাটতি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহন ব্যয় কৃষকের মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সুযোগ সীমিত থাকলে স্থানীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, আলু, ভুট্টা, ফল ও সবজি সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিযন্ত্র উৎপাদন এবং কৃষিভিত্তিক রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষক ও উদ্যোক্তা উভয়ের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, উন্নত সড়ক-রেল যোগাযোগ, গুদাম ও হিমাগার, সহজ ঋণ, দক্ষ শ্রমিক এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।

এসব সুবিধার সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করলেই শিল্পায়ন হবে না। রংপুরের উন্নয়নের জন্য তাই কৃষিকে শুধু উৎপাদনের খাত হিসেবে না দেখে শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। স্থানীয় কাঁচামালকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের আয় বাড়বে, তরুণদের কর্মসংস্থান হবে এবং ঢাকামুখী অভিবাসনের চাপও কমতে পারে। বাজেট বরাদ্দে বৈষম্য: প্রয়োজনভিত্তিক বণ্টন কতটা জরুরি?

রংপুরের উন্নয়নবঞ্চনার আলোচনায় বারবার উঠে আসে সরকারি বরাদ্দের প্রশ্ন। আলোচ্য তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রংপুর বিভাগের প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ ছিল মোট বরাদ্দের ১ শতাংশেরও কম। তবে এ পরিসংখ্যানের যথার্থতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের সরকারি বাজেট নথি, প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ এবং বিভাগভিত্তিক ব্যয়ের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো- বরাদ্দ কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং তা বাস্তবে কতটা ব্যয় হচ্ছে। জনসংখ্যা, দারিদ্র্যের মাত্রা, অবকাঠামোগত ঘাটতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার প্রয়োজন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত। উন্নত অঞ্চলের সঙ্গে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলকে একই পরিমাণ অর্থ দেওয়া সব সময় ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করে না।

কারণ, যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো ও শিল্পায়নের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করতেই তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে রংপুরের জন্য বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণের দাবি যৌক্তিকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে সেই বরাদ্দ যেন রাজনৈতিক আনুকূল্য বা লোকদেখানো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকল্প নির্বাচন, অর্থ ছাড়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সুফলভোগীর সংখ্যা—সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

যোগাযোগ অবকাঠামো: দূরত্ব কমলেই কি উন্নয়ন হবে? রংপুর বিভাগের উন্নয়নের পথে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন, ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সড়ক ও সেতুর উন্নয়ন এবং ঢাকার সঙ্গে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। আলোচ্য তথ্যে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় রেলপথে যাতায়াতের দীর্ঘ সময় এবং ব্রহ্মপুত্রের ওপর সেতু নির্মাণের সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছে।

এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন জরুরি। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা পণ্য পরিবহনের খরচ কমাতে পারে, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শুধু সড়ক, রেললাইন কিংবা সেতু নির্মাণ করলেই দারিদ্র্য দূর হবে না।

যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন, বাজার, শিল্পায়ন এবং দক্ষতা উন্নয়নের সংযোগ তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ, অবকাঠামো হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহায়ক শক্তি; নিজেই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিনিয়োগের পরিবেশ শিল্পায়নের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর বিভাগে গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণের দাবি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ, জমি এবং পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন। তবে গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য শিল্পচাহিদা, পাইপলাইন নির্মাণের ব্যয়, জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি প্রাপ্যতা এবং বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনাও বিবেচনা করা দরকার।

একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। রংপুরে বিনিয়োগ বাড়াতে স্থানীয় ও জাতীয় উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্পপার্ক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণসুবিধা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমানো প্রয়োজন। বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে; আর কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় ও স্থানীয় বাজারের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের অদৃশ্য ক্ষতি রংপুর বিভাগের উন্নয়ন আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বন্যা, নদীভাঙন, খরা, শৈত্যপ্রবাহ, তাপদাহ ও অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে নদীভাঙনে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারানো পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়ে।

উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আলোচ্য গবেষণার তথ্যে কুড়িগ্রামের ছয়টি ইউনিয়নের ২৭৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত গবেষণার কথা বলা হয়েছে। সেখানে গত এক দশকে বিভিন্ন দুর্যোগে অবকাঠামো, ফসল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও গবাদিপশুর ক্ষতির পাশাপাশি যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং পানি ও স্যানিটেশনসংক্রান্ত সমস্যার কথা উঠে এসেছে।

গবেষণায় উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭২ শতাংশ যোগাযোগব্যবস্থা, ৬১ শতাংশ শিক্ষা, ৫৮ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা, ৪৭ শতাংশ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং ৪৯ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন খাতে ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। এসব হার সংশ্লিষ্ট গবেষণার নমুনা ও পদ্ধতির আলোকে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন; এগুলোকে পুরো রংপুর বিভাগের সব মানুষের অভিজ্ঞতার পরিসংখ্যান হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।

এখানে মূল বিষয় হলো, দুর্যোগের ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি বা ফসল নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হওয়া, চিকিৎসা না পাওয়া, নিরাপদ পানির সংকট, মানসিক চাপ এবং জীবিকা হারানোর মতো অ-অর্থনৈতিক ক্ষতিও মানুষের জীবনমানকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করে। তাই রংপুরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নদীভাঙন প্রতিরোধ, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি বিমা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি কোনো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর সক্ষমতা, শিক্ষকসংকট, গবেষণা, চিকিৎসাসেবা এবং কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বিশেষ করে স্থানীয় অর্থনীতির চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সংযোগ তৈরি করা জরুরি। কৃষি প্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, যন্ত্র প্রকৌশল, নার্সিং, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে স্থানীয় শিল্প ও সেবা খাত উপকৃত হবে। একইভাবে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা গেলে জটিল চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।

তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল, যন্ত্রপাতি, অর্থায়ন ও সেবার মান উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কর্মসংস্থান ও প্রবাসী শ্রমবাজার রংপুরের উন্নয়নবৈষম্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কর্মসংস্থান। স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাজের সুযোগ না থাকলে তরুণদের অন্য বিভাগে কিংবা বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়।

এতে পরিবারগুলো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে উপকৃত হলেও অঞ্চলটি দক্ষ ও কর্মক্ষম মানুষের একটি অংশ হারায়। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সহজ শর্তে ঋণ ও উদ্যোক্তা সহায়তার মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়াতে হবে। রংপুরের তরুণদের জন্য স্থানীয় শিল্পে চাকরি, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়া, ডিজিটাল সেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং দক্ষতাভিত্তিক পেশার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে আঞ্চলিক অর্থনীতি আরও গতিশীল হতে পারে।

শুধু সরকারি চাকরি বা বিদেশে যাওয়ার ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী কর্মসংস্থানব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে টেকসই পথ। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্ন রংপুরের উন্নয়নবঞ্চনা নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে প্রায়ই বিশেষ বরাদ্দ, অবকাঠামো নির্মাণ ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি উঠে আসে।

রংপুর বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরামের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম তিস্তা মহাপরিকল্পনা, রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উন্নয়ন, গ্যাস সরবরাহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন বলে আলোচ্য তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এসব দাবি আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনলেও বাস্তবায়নের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক বক্তব্য, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে ব্যবধান কমাতে হলে প্রতিটি দাবির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থায়নের উৎস, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। রংপুরের উন্নয়ন কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক বিষয় নয়। সরকার, বিরোধী দল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মূল্য কেবল কোনো অঞ্চলের মানুষ মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হলেন কি না, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং তাঁদের অংশগ্রহণে অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন কতটা নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হলো, বরাদ্দ কতটা বাড়ল এবং বাস্তবে কী পরিবর্তন এল—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা: সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রংপুর বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন আলোচনায় তিস্তা নদী ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, কৃষি উৎপাদন, নদীভাঙন মোকাবিলা এবং স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ জড়িত। তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না।

এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সীমান্তপারের পানিপ্রবাহ ও আন্তদেশীয় সমন্বয়ের বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। রংপুরের উন্নয়নে কী করা প্রয়োজন? রংপুরের উন্নয়নবৈষম্য কমাতে কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, বিভাগভিত্তিক দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও জলবায়ু ঝুঁকির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য প্রয়োজনভিত্তিক বাজেট বণ্টনের নীতি গ্রহণ করতে হবে। বরাদ্দের পাশাপাশি অর্থ ছাড়, বাস্তব ব্যয় এবং প্রকল্পের সুফল যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ সহজ করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়নকে শিল্প, কৃষি ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। যেসব প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর ও জনস্বার্থে প্রয়োজনীয়, সেগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে তথ্য ও সমীক্ষার ভিত্তিতে। পঞ্চমত, নদীভাঙন, বন্যা, খরা ও শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

ষষ্ঠত, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় শ্রমবাজারের উপযোগী জনশক্তি তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ বিদেশগমন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে সহায়তা বাড়াতে হবে। সপ্তমত, রংপুরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও গণমাধ্যমকে যুক্ত করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, সময়সীমা এবং অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করলে জবাবদিহি বাড়বে।

সমান উন্নয়ন নয়, প্রয়োজন ন্যায্য উন্নয়ন রংপুর বিভাগ কেন অবহেলিত- এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে খুঁজলে চলবে না। বর্তমানের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট বণ্টন, শিল্পায়নের কৌশল এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের মধ্যেও এর উত্তর খুঁজতে হবে। কোনো অঞ্চল দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকলে তাকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে একই জায়গায় দাঁড় করানোর জন্য কখনো কখনো তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ ও বিশেষ কর্মসূচির প্রয়োজন হয়।

এটিকে বাড়তি সুবিধা নয়, বরং উন্নয়নের ব্যবধান কমানোর ন্যায্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। রংপুরের মানুষের দাবি কেবল নতুন সড়ক, সেতু, রেললাইন, বিশ্ববিদ্যালয় বা শিল্পকারখানা নয়; তাঁদের দাবি কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল রাজধানী ও বড় শহরের গণ্ডি পেরিয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর মানুষের জীবনেও দৃশ্যমান হবে।

রংপুরের উন্নয়ন তাই কেবল উত্তরাঞ্চলের দাবি নয়; এটি বাংলাদেশের সুষম অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশ্ন। প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান কাজ। আর সেই কাজের ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, ন্যায্য বরাদ্দ, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি।