ময়মনসিংহের গৌরীপুরে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ থেকে রূপান্তরিত ‘ঝলমল সিনেমা হল’, বেশ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, একটি আসবাবপত্র তৈরির কারখানা ও এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের গোডাউন পুড়ে গেছে।
মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) দিবাগত রাত ২টার পর এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি গৌরীপুরের জমিদার বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত জমিদারবাড়ির নাট্যমঞ্চ। শতবর্ষের পুরোনো এই সাংস্কৃতিক স্থাপনা আগুনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
গৌরীপুর ফায়ার স্টেশনের ইন্সপেক্টর মো. কবিরুল আলম জানান, রাত ২টার পর অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে গৌরীপুর ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। রাত ২টা ২০ মিনিটে তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। পরে ঈশ্বরগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের একটি ইউনিট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফায়ার স্টেশনের একটি ইউনিট এবং ময়মনসিংহ ফায়ার স্টেশনের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যোগ দেয়।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দীর নেতৃত্বে পাঁচটি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে আগুন পুরোপুরি নির্বাপিত ঘোষণার প্রায় এক ঘণ্টা পর আবারও আগুনের শিখা দেখা দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ফের ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেন। ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, তাৎক্ষণিকভাবে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তের পর আগুন লাগার প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে। গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র সন্তান এবং রাজবাড়ির পঞ্চম পুরুষ বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন সংগীত ও নাট্যচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগী। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে তিনি গৌরীপুরে এই অনন্য নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতায় পড়াশোনার সময় সেখানকার ঐতিহ্যবাহী স্টার থিয়েটারের স্থাপত্যশৈলী ও কাঠামো দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি গৌরীপুরে এই থিয়েটার হল নির্মাণ করেন।
প্রতিষ্ঠার পর এই মঞ্চে ঐতিহাসিক ‘শাহজাহান’ নাটকটি প্রথম নাটক হিসেবে মঞ্চস্থ হয়। নাটকটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরবর্তী সময়ে দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পী ও গুণীজনদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছিল এই নাট্যমঞ্চ। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর পাকিস্তান আমলে স্থাপনাটি সরকারের মালিকানায় চলে যায়। পরে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য এটি লিজ বা ভাড়া দেওয়া হয়।
প্রথম দিকে ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে পরিচিত ছিল এটি। পরে নাম পরিবর্তন করে ‘প্রতিমা সিনেমা হল’ এবং সর্বশেষ ‘ঝলমল সিনেমা হল’ নাম দেওয়া হয়। বর্তমানে মহব্বত আলী চৌধুরীসহ ১৮ জনের নামে সিনেমা হলটি লিজ দেওয়া রয়েছে। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় সম্প্রতি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি প্রতিনিধি দল গৌরীপুর উপজেলার রাজবাড়িগুলোর এলাকা জরিপ করে।
এর মধ্যে এই ঐতিহ্যবাহী নাট্যশালাটিও ছিল। অগ্নিকাণ্ডে সিনেমা হলের ভেতরে থাকা একটি আসবাবপত্র তৈরির কারখানা ও একটি গ্যাস সিলিন্ডারের গোডাউনও পুড়ে গেছে। ভবনের সামনের অংশে থাকা ড্রাইভার শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ও আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। আসবাবপত্র তৈরির কারখানার মালিক তাজ উদ্দিন ভুট্টো জানান, আগুন লাগার প্রায় ৩০ মিনিট পর তিনি অগ্নিকাণ্ডের খবর পান।
আগুনে তার কাঠ, নির্মাণাধীন আসবাবপত্র ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পুড়ে গেছে। তানভীর এলপিজি স্টোরের মালিক তানভীর আহমেদ জানান, আগের রাতে তার গোডাউনে ২৫০টি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডারের একটি চালান এসেছিল। সব সিলিন্ডার গোডাউনে রাখা হয়েছিল। আগুনে সেগুলোসহ গোডাউনের সবকিছু পুড়ে গেছে। এতে তার প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ড্রাইভার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. মজনু মিয়া জানান, সিনেমা হলের মূল ভবনের সামনে তাদের কার্যালয় ছিল।
অগ্নিকাণ্ডে কার্যালয়টি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। এতে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আলোসজ্জার দোকানের মালিক বকুল মিয়া জানান, দুটি জেনারেটরসহ প্রায় আট লাখ টাকার তার, লাইট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পুড়ে গেছে। এ ছাড়া আগুনে আশপাশের আরও কয়েকটি দোকান পুড়ে ও ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমিন পাপ্পা জানান, ‘ঝলমল সিনেমা হল’ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি।
সিনেমা হল পরিচালনার জন্য সরকার এটি লিজ দিয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।






















