অপরিচিত কারো মুখে হঠাৎ এমন সালাম শুনলে স্বাভাবিকভাবেই থমকে দাঁড়ান অনেকে। কেউ ভাবেন, হয়তো পরিচিত কেউ। কেউ আবার সৌজন্যবশত সালামের জবাব দেন। আর সেই কয়েক সেকেন্ডের বিরতিকেই কাজে লাগায় একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র।
মুহূর্তেই আগে থেকে ওত পেতে থাকা চক্রের অন্য সদস্যরা এসে টার্গেট ব্যক্তিকে ঘিরে ধরে অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষায় এই চক্রের নাম ‘সালাম পার্টি’। পুরোনো এই চক্র বেশ কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও সম্প্রতি রাজধানীতে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ বনশ্রী এলাকায় এক ব্যবসায়ীর চার লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পুলিশ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তারও করেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, একেকটি দলে তারা ছয় থেকে সাতজন থাকেন। ব্যাংক কিংবা এটিএম বুথ থেকে বের হওয়া গ্রাহকদেরই মূলত তারা টার্গেট করেন। প্রথমে একজন টার্গেট ব্যক্তিকে সালাম দিয়ে থামান। পরিচিত হওয়ার ভান করে কথাবার্তা শুরু করেন। এরই মধ্যে আশপাশ থেকে এগিয়ে আসেন আরও কয়েকজন। কেউ সামনে, কেউ পেছনে, কেউ অবস্থান নেন দুই পাশে।
মুহূর্তেই তৈরি হয় জটলা। এরপর অস্ত্র দেখিয়ে কিংবা প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে কেড়ে নেওয়া হয় ওই ব্যক্তির সঙ্গে থাকা টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে ব্যাংক কিংবা এটিএম বুথ থেকে টাকা নিয়ে বের হওয়া ব্যক্তিদের টার্গেট করেই তারা ছিনতাইয়ের সুযোগ খোঁজেন। গত ১ অক্টোবর দুপুরে রামপুরা থানাধীন বনশ্রীতে এটিএম বুথ থেকে চার লাখ টাকা তুলে ফিরছিলেন ষাটোর্ধ্ব ব্যবসায়ী রুহুল আমিন।
রিকশায় করে কিছুদূর যাওয়ার পর এক ব্যক্তি তাকে সালাম দিয়ে থামান। এরপর পরিচিত হওয়ার ভান করে জানতে চান, তিনি তাকে চিনতে পারছেন কি না। এর মধ্যেই আরও তিন-চারজন এসে তাকে ঘিরে ফেলেন। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা দিয়ে দিতে বলা হয়। প্রাণভয়ে রুহুল আমিন সঙ্গে থাকা চার লাখ টাকা তাদের হাতে তুলে দেন। এরপর দ্রুত রিকশায় করে ঘটনাস্থল থেকে সরে যান তারা।
এ ঘটনায় ৩ অক্টোবর রুহুল আমিনের ছেলে তাইফুর আমিন রামপুরা থানায় মামলা করেন। তদন্তে নেমে ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। সেখান থেকেই সামনে আসে একটি অটোরিকশার গতিবিধি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. শাহরিন হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ছিল না। এ কারণে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়।
একটি ফুটেজে দ্রুতগতিতে তিনটি অটোরিকশাকে উল্টোপথে যেতে দেখা যায়। এর মধ্যে একটি অটোরিকশার পেছনে লেখা একটি অক্ষর ও মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু হয়। তবে নম্বরটির কয়েকটি সংখ্যা অস্পষ্ট থাকায় সরাসরি মালিকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে প্রায় ৪০টি নম্বর যাচাই করে অটোরিকশাটির মালিকের সন্ধান পান তদন্তকারীরা। উলন এলাকার ওই মালিকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাতিরঝিল এলাকা থেকে রিকশাচালকের ছদ্মবেশে থাকা সালাম পার্টির সদস্য হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রটির হোতা পিন্টু এবং তার সহযোগী বোরহান ও শাহীনকে। তাদের কাছ থেকে ৩৪ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। তিনি জানান, এই চক্রে সাতজন সদস্য রয়েছেন। তারা রামপুরা, মতিঝিল, পল্টন, ওয়ারী, শাহবাগ, বাংলামটর, আগারওগাঁও, ফার্মগেট, মিরপুর, গাবতলী ও উত্তরা এলাকায় সালাম দিয়ে ছিনতাই করে আসছেন। তাদের মধ্যে চক্রটির অন্যতম হোতা সজলসহ আরও কয়েকজন এখনো পলাতক।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির আরও সদস্য ও কর্মকৌশল সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, চক্রটির সদস্যরা সবাই একসঙ্গে টার্গেট ব্যক্তির কাছে যান না। কয়েকজন কিছুটা দূরে অবস্থান করেন। কেউ পিছু নেন। এরপর একজন এগিয়ে গিয়ে সালাম দেন। শুরু হয় কথাবার্তা।
কখনো পরিচিত হওয়ার ভান করা হয়, কখনো হ্যান্ডশেকের চেষ্টা। উদ্দেশ্য একটাই, টার্গেটকে কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে রাখা। সেই সুযোগে অন্য সদস্যরা দ্রুত কাছে এসে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। এরপর অস্ত্র দেখিয়ে বা প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। রামপুরা থানার ওসি জাহাঙ্গীর হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সালাম’ আসলে তাদের অস্ত্র নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।
মানুষের স্বাভাবিক সৌজন্যবোধকে কাজে লাগিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামিয়ে দেওয়াই তাদের কৌশলের প্রথম ধাপ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘সালাম পার্টি’ রাজধানীতে নতুন কোনো অপরাধী চক্র নয়। ২০১৮ সালেও এ ধরনের একটি চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তখন পুলিশের ভাষ্য ছিল, চক্রের সদস্যরা ভদ্রলোকের বেশ ধরে রিকশা ভাড়া করে ব্যাংক ও এটিএম বুথের আশপাশে অবস্থান করতেন।
কে কত টাকা নিয়ে বের হচ্ছেন, তা নজরে রাখার পর নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অনুসরণ করা হতো। মোবাইল ফোনে অন্য সদস্যদের জানানো হতো টার্গেটের অবস্থান। এরপর একই কায়দায় একজন গিয়ে সালাম দিয়ে ওই ব্যক্তির পথরোধ করতেন। পরে অন্যরা এগিয়ে গিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার অর্থকড়ি নিয়ে পালিয়ে যেতেন। ২০২২ সালের আগস্টে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একই ধরনের একটি চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ।
ডাক ভবনের সামনে এক ব্যক্তির ৮০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ধর্মীয় ও সামাজিক সৌজন্যবোধকে কাজে লাগিয়ে সালাম দিয়ে টার্গেট ব্যক্তিকে থামানো হতো। ২০২৩ সালের মার্চে মিরপুরে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতির সময় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকেও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তারাও একই কায়দায় ছিনতাই করতেন। সময় ও স্থান বদলালেও কৌশলটির মূল কাঠামো যে খুব একটা বদলায়নি, এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। সালাম পার্টির কর্মকৌশল বিশ্লেষণ করলে টার্গেট বাছাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুরোনো ঘটনাগুলোয় পুলিশের বক্তব্য ছিল, ব্যাংক ও এটিএম বুথের আশপাশে অবস্থান করে নগদ টাকা বহনকারী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতেন চক্রের সদস্যরা।
এরপর সুবিধাজনক সময় ও স্থানে তাদের অনুসরণ করা হতো। বনশ্রীর ঘটনায়ও এটিএম বুথ থেকে চার লাখ টাকা তোলার পর অল্প দূরেই ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন রুহুল আমিন। ফলে তাকে এটিএম বুথ থেকেই অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটিএম বুথের বাইরে কেউ নজর রাখছিল কি না, আশপাশের সিসিটিভিতে সন্দেহজনক কারও উপস্থিতি ছিল কি না কিংবা ভুক্তভোগীর গতিবিধি সম্পর্কে কেউ আগেই তথ্য পেয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বনশ্রীর ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির আরও কয়েকজন সদস্যের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, পিন্টু মিয়াকে চক্রের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে। কারো বিরুদ্ধে ছয়টি, আবার কারো বিরুদ্ধে ১৩টি পর্যন্ত মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
চক্রটির অন্যতম হোতা সজল পলাতক রয়েছেন। পুরোনো ঘটনাগুলোয় রিকশা বা অটোরিকশার ব্যবহারও বারবার সামনে এসেছে। এ ধরনের যানবাহনে টার্গেটকে অনুসরণ করা তুলনামূলক সহজ। প্রয়োজনে সামনে গিয়ে পথ আটকে দেওয়া যায়, আবার কয়েকজন সদস্য দ্রুত নেমে চারপাশে অবস্থান নিতে পারেন। বনশ্রীর ঘটনায়ও অটোরিকশার গতিবিধি থেকেই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছে পুলিশ।
ফলে যানবাহনটি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম ছিল, নাকি চক্রের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরিচিত কেউ হঠাৎ সালাম দিলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে কেউ যদি সালাম দিয়ে আপনাকে দাঁড় করাতে চায়, পরিচিত হওয়ার ভান করে, পথ আটকে দেয় অথবা একসঙ্গে কয়েকজন আপনার চারপাশে এসে দাঁড়ায়, তাহলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
বিশেষ করে ব্যাংক বা এটিএম বুথ থেকে বড় অঙ্কের টাকা তোলার পর আশপাশের মানুষের গতিবিধি খেয়াল রাখা দরকার। কেউ অনুসরণ করছে মনে হলে নির্জন পথে না গিয়ে জনবহুল ও নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া ভালো। বড় অঙ্কের টাকা বহনের ক্ষেত্রে পুলিশের মানিস্কট সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

























