মৃত্যু মানেই হৃদয়ভাঙা শোক, কান্নার রোল। শেষবারের মতো প্রিয় মুখটি দেখার আকুতি। সেই মৃত্যুর চারপাশেই কোথাও কোথাও শুরু হয় নগদ টাকার হিসাব, বাণিজ্য। একজনের নিথর শরীর ঘিরে যখন শোকাহত স্বজনেরা, তখন কিছু সিন্ডিকেট ব্যস্ত হয়ে পড়ে মরদেহ ঘিরে কত টাকার বাণিজ্য হবে— সেই হিসাব-নিকাশে। হাসপাতালে একটি মৃত্যু মানে চিকিৎসার হিসাব থেমে যাওয়া।
অন্যদিকে শুরু হয় আরেক হিসাব। হাসপাতাল থেকে মরদেহ বের হওয়ার মুহূর্তে গাড়িভাড়া, প্রয়োজন হলে মরচুয়ারিতে রাখা ও ময়নাতদন্তের আনুষঙ্গিক খরচ, এরপর গোসল-কাফন, কবর খোঁড়া ও দাফনের ব্যয়। একটি মরদেহের শেষযাত্রার প্রতিটি ধাপেই জড়িয়ে থাকে অর্থ। কিছু খরচ হবে— সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে এই খরচের পরিমাণ এত বেশি বেড়ে যায় যে, সেটা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সময় নাভিশ্বাস ওঠে মৃতের স্বজনদের।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, এসব কারণে ঢাকার হাসপাতালগুলো ঘিরে জমজমাট লাশ-বাণিজ্য চলছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অনুসন্ধান করতে গিয়ে শুধু ঢামেক হাসপাতাল ও রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থান থেকে এসব সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা এবং তাদের নানামুখী বাণিজ্যের তথ্য উঠে এসেছে। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, সিন্ডিকেটের এই দর-কষাকষি ও বাণিজ্যের সময় শোকাহত পরিবার থাকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে।
সে সময় তাদের দরদাম করার বা বিকল্প খোঁজার মানসিকতা থাকে না। এদিকে এসব সেবার নির্ধারিত মূল্য জানারও সুযোগ নেই। পুরোটাই চলে ‘যেমন ইচ্ছে তেমন’ নিয়মে। মূলত প্রিয় মানুষটির শেষ বিদায়ে যখন ব্যস্ত স্বজনেরা, সে সময়টিকেই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নেয় সিন্ডিকেট। তারা সেবা ও প্রয়োজনকে পরিণত করেন ব্যবসায়। সূত্র আরও জানায়, মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের প্রথম লক্ষ্য থাকে মরদেহ বাড়িতে নেওয়া।
কিন্তু সে মুহূর্তে পরিবারের থাকে না কোনো প্রস্তুতি, থাকে না বাজার যাচাইয়ের মানসিকতা। দৃশ্যটা এমন দাঁড়ায়— একজন মরদেহের পাশে, একজন কাগজপত্র সামলাচ্ছেন, আরেকজন ফোন করছেন বাড়িতে। এর মধ্যেই সামনে আসে গাড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়ার দালাল। কোথায় গাড়ি পাওয়া যাবে, কত ভাড়া, কোন গাড়ি নিরাপদ— এসব জানার সুযোগ তখন থাকে না। সুতরাং নির্ভর করতে হয় দালালের ওপর।
পরিবার সাধারণত জানে না ওই গাড়ির প্রকৃত ভাড়া কত, কোনো নির্ধারিত তালিকা আছে কি না কিংবা একই দূরত্বে অন্য গাড়ি কত নিতে পারে। ফলে যে দালাল গাড়ি ঠিক করে দেয়, তার কথাই হয় শেষ কথা। এখানেই অ্যাম্বুলেন্স দালাল সিন্ডিকেট বা অর্থচক্রের প্রথম স্তর। এরপর মরদেহ ওঠে অ্যাম্বুলেন্সে বা লাশবাহী গাড়িতে। বাড়ি যদি ঢাকার বাইরে হয়, সামনে দীর্ঘ পথ।
রাত হলে বিকল্প আরও কমে যায়। গাড়ি এখনই দরকার, অপেক্ষার সুযোগ নেই। দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া কত, রাতে অতিরিক্ত ভাড়া আছে কি না, পথে অপেক্ষা করলে কত দিতে হবে, ফেরার খরচ কে বহন করবে— এসব প্রশ্নের উত্তর শোকাহত পরিবারের জানা থাকে না। অঙ্ক নির্ধারিত হয় পরিস্থিতি বুঝে। সব মৃত্যুই কিন্তু স্বাভাবিক নয়। হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা, অস্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যাসহ কিছু ঘটনা থাকে, যেখানে মরদেহ পাঠানো হয় ময়নাতদন্তের জন্য লাশকাটা ঘরে।
সেখানে আবার আরেক সিন্ডিকেট। সরকারি নীতিমালা অনুসারে, ময়নাতদন্ত করতে কোনো টাকা লাগে না। কিন্তু এর আনুষঙ্গিক খরচ আকাশছোঁয়া! এই কাজগুলোর জন্য অনেকেই সাহায্য নেন দালালচক্রের। সিরিয়াল ভেঙে আগে ময়নাতদন্ত করা, গোসল করানো, কাফন ও কফিনের ব্যবস্থা করা, আতর-গোলাপজল কেনা এবং লাশে যাতে পচন না ধরে, সে জন্য শরীরে ফরমালিন বা চা পাতা দেওয়ার জন্য দালালচক্রকে দিতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা।
নিরুপায় মানুষের তখন এই চক্রের সহযোগিতা নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। অনেক সময় মরদেহ নিতে দেরি হলে সেটা রাখা হয় লাশকাটা ঘরের হিমাগারে। এ জন্যও গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। শুরু হয় নতুন হিসাব। কত ঘণ্টার জন্য কত টাকা, এক দিনের খরচ কত, অতিরিক্ত সময়ের মূল্য কত— এসব তথ্য অধিকাংশ পরিবার মৃত্যুর আগে কখনো জানে না। তারা শুধু চায়, মরদেহটি নিরাপদে থাকুক।
ফলে প্রয়োজনের মুহূর্তে এই দালালদের ওপরই নির্ভর করতে হয়। সময় যত বাড়ে, সংশ্লিষ্ট সেবার মূল্য তত বাড়ে। এখানেও মূল প্রশ্ন, সেবা থাকবে কি থাকবে না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেবার মূল্য কত? শোকাহত মানুষ সেবার জন্য কোনো স্বাভাবিক ক্রেতা নন। তারা তখন এমন অবস্থায় থাকেন, যেখানে সেবা নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প থাকে না। ঢামেকের ইন্টার্ন চিকিৎসক আহমেদ ইমতিয়াজ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, চিকিৎসার জন্য এসে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখে মানুষ।
কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে সে স্বপ্ন মুছে যায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। কোনো রোগীর মৃত্যুর পর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়; বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনা বা আইনি জটিলতা থাকলে ময়নাতদন্তের নামে ভোগান্তির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। মৃত্যুর ঠিক পরপরই শুরু হয় স্বজনদের এক দীর্ঘ লড়াই। একদিকে প্রিয়জন হারানোর তীব্র শোক, অন্যদিকে মরদেহ বুঝে পাওয়া, ডেথ সার্টিফিকেট (মৃত্যুর সনদ) সংগ্রহ এবং অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা নিয়ে তৈরি হয় এক পৈশাচিক পরিবেশ।
তিনি বলেন, হাসপাতাল ও মর্গ ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালালচক্র, যারা মরদেহ নিয়ে শুরু করে নির্মম বাণিজ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢামেক হাসপাতালের শল্য বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ ও সামগ্রিক দালাল সিন্ডিকেট দেশের অন্যতম বৃহত্তম একটি অপরাধী চক্র। এরা বছরের পর বছর ধরে শোকগ্রস্ত পরিবার এবং অসহায় রোগীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছে।
ঢামেক হাসপাতালের দুটি মর্গের (জরুরি বিভাগ ও ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ) আশপাশে এই চক্রের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। মর্গের দালালদের প্রধান অপতৎপরতা হচ্ছে, লাশ আটকে রেখে টাকা আদায়। সড়ক দুর্ঘটনা বা যেকোনো অপমৃত্যুর পর লাশ যখন মর্গে পাঠানো হয়, তখন থেকেই দালালদের দৌরাত্ম্য শুরু হয়। ময়নাতদন্তের কাগজ দ্রুত প্রস্তুত করা, সুরতহাল রিপোর্টের প্রক্রিয়া এগিয়ে দেওয়া এবং লাশ দ্রুত হস্তান্তরের নামে তারা স্বজনদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়।
টাকা না দিলে লাশ আটকে রাখা বা ময়নাতদন্তে দেরি করানোর ভয় দেখায়। এসবের সঙ্গে যোগ হয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের জিম্মিদশা। মর্গের সামনে নির্দিষ্ট একটি শক্তিশালী অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট সক্রিয়। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ যখন গ্রামের বাড়ি বা গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তখন বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্সকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না।
সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্সগুলো স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়া দাবি করে এবং স্বজনেরা তা দিতে বাধ্য হন। মর্গের কিছু অসাধু ডোম ও এই দালালচক্রের সঙ্গে হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারীর রয়েছে যোগাযোগ। লাশের সিরিয়াল আগে দেওয়া কিংবা কাটা-ছেঁড়ার নামে স্বজনদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে দালালেরা। তিনি আরও জানান, হাসপাতালগুলোয় ওত পেতে থাকা দালালচক্রের মূল নজর থাকে মরদেহ পরিবহনের ওপর।
বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্সকে হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিতে দেওয়া হয় না। কোনো স্বজন যদি কম খরচে বাইরের গাড়ি আনতে চান, তবে সিন্ডিকেটের সদস্যরা চড়াও হন, এমনকি চালককে মারধরের ঘটনাও ঘটে। সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্সচালকেরা স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়া দাবি করেন। শোকগ্রস্ত পরিবারের সেই মুহূর্তে দরদাম করার মতো মানসিক অবস্থা থাকে না।
তাই তারা যা চাওয়া হয়, তা দিতেই বাধ্য হন। এরপর আসে শেষ ঠিকানা— কবরস্থান। ঢাকার ভেতরে সাধারণত এ জন্য প্রথমেই আসে আজিমপুর কবরস্থানের নাম। এখানেও কিন্তু খরচ কম নয়। গোসল, কাফন, কবর খোঁড়া, কবরের জায়গা নির্ধারণ, বাঁশ-চাটাই কেনা, দাফনের আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা— একটির পর একটি প্রয়োজন সামনে আসে। গ্রামে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা এসব কাজ স্বেচ্ছায় করে দেন।
কিন্তু শহরের অপরিচিত পরিবেশে একটি পরিবারকে প্রায় প্রতিটি কাজের জন্য নির্ভর করতে হয় অন্যদের ওপর। কোথাও কবরের জন্য নির্ধারিত ফি আছে, কোথাও কবর খননের আলাদা খরচ, কোথাও গোসল বা অন্যান্য সেবার জন্য অর্থ দিতে হয়। কিন্তু কোনটি নির্ধারিত, কোনটি সেবার মূল্য আর কোনটি অতিরিক্ত— তা অনেক পরিবার জানে না। এই বাস্তবতায় আজিমপুরে আসা শোকাহত পরিবার তখন কবরের জায়গা নিয়েও দরদাম করতে চান না।
তারা শুধু চান, দ্রুত দাফন সম্পন্ন হোক। প্রিয় মানুষটির শেষ ঠিকানা নিয়ে দর-কষাকষি করতে অনেকেরই মন সায় দেয় না। সুতরাং আবারও দালালের পোয়াবারো। তথ্য অনুসারে, আজিমপুর কবরস্থানেও আছে ২০ থেকে ২৫ সদস্যের একটি সিন্ডিকেট। আজিমপুর কবরস্থানে নামফলক বা মিনি সাইনবোর্ড লেখেন আজমল। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, একটি পরিবার হয়তো জীবিত অবস্থায় চিকিৎসার বিল নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে।
ওষুধের দাম নিয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু মরদেহ সামনে রেখে কবরের জায়গার দাম নিয়ে দর-কষাকষি করতে গেলে যে মানসিক শক্তি প্রয়োজন, শোকের মুহূর্তে অনেকেরই তা থাকে না। আর এই সুযোগটাই নেয় দালাল সিন্ডিকেট। তাদের কাছে কোনো মানবিকতা আশা করা যায় না। মানুষের অসহায়ত্বই তাদের বড় পুঁজি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও সদিচ্ছার অভাবে এই চক্রগুলো বছরের পর বছর ধরে সক্রিয়।
মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে কিছু দালালকে জরিমানা বা কারাদণ্ড দিলেও, তারা চলে গেলেই পরিস্থিতি আবার আগের রূপ নেয়। হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে এই দালালদের গোপন আঁতাত থাকে বলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আশরাফুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, হাসপাতাল থেকে মরদেহ পরিবহনে দালালনির্ভরতা কমাতে, অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ির ভাড়ায় স্বচ্ছতা আনতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পুরো হাসপাতালকে দালালমুক্ত রাখতে প্রায়ই অভিযান চালানো হয়। অনেককে আটকও করা হয়েছে। দালাল উৎখাতে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি। ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, মৃত্যুর মুহূর্তে একজন মানুষ কোনো স্বাভাবিক ক্রেতা নন। তিনি একজন ভেঙেপড়া স্বজন। তার চোখে তখন টাকার অঙ্ক নেই, আছে প্রিয় মানুষের মুখ।
অথচ সেই সময়েই কারো চোখে যদি শুধু নগদপ্রাপ্তির হিসাব ভেসে ওঠে, সেটি আর নিছক ব্যবসার প্রশ্ন থাকে না; সেটি মানবিকতার প্রশ্ন। আর এই অমানবিক কাজে লিপ্তদের এই হাসপাতালে ঠাঁই দেওয়া হবে না। চারপাশে যখন কান্নার রোল, তখন একশ্রেণির মানুষের মুখে যদি দেখা যায় নগদপ্রাপ্তির হাসি, সেই হাসির পেছনের চক্রটিকে খুঁজে দেখা দরকার। এই দালালদের যেকোনো প্রক্রিয়াতেই হোক উৎখাত করতে হবে।























