পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন চায় সরকার। পুঁজিবাজারে প্রবল তারল্য সংকটের অবসান ঘটাতে নুতন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দেশের স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্তিতে আইনগত বিধিনিষেধ ছিল।
সেই বিধিনিষেধ সোমবার (৫ অক্টোবর) প্রত্যাহার করেছে সরকার। ফলে সরকারি ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পুঁজিবাজারে আসার পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করেছে। যার রেশ ধরেই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে। ’ ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জারি করা স্মারকের আলোকে পুঁজিবাজারে সরাসরি কোম্পানি তালিকাভুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
১৫ বছর পরে সোমবার (৫ অক্টোবর) বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সব বিধিবিধান অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সরাসরি তালিকাভুক্তিতে সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (পুঁজিবাজার-১ শাখা) জারি করা এক চিঠিতে এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) খরা কাটতে যাচ্ছে।
অবশেষে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন কোম্পানি। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং’ বা সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. মামুনুর রশীদ স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনার অনুলিপি গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে জানানো হয়, ‘বিএসইসি চেয়ারম্যানের গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখের একটি আধা-সরকারি পত্রের (ডিও পত্র নম্বর: বিএসইসি/চেয়ারম্যান/ডিও/০৬-১৫) পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ’ এর আগে গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে জারি করা স্মারকের (নম্বর: অম/ব্যাআপাবি/নীতিশাখা-৫/এসইসি-৮৫/২০০৫ (অংশ-৪)/৩২) মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
দেশের পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সেই পুরনো বিধিনিষেধ নির্দেশক্রমে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হলো। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত ও প্রসারিত করতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে।
আমরা সামগ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি। ইনশা-আল্লাহ, আগামী এক বছরের মধ্যে আপনারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত চেহারা দেখতে পাবেন। ’ তার আগে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগ আমলের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘অল্প সময়ের মধ্যে সরকারি ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পুঁজিবাজারে না ছাড়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগ করতে হবে।
’ নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার আগে থেকেই সরকারি সেই ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার তালিকাভুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার সূত্র ধরে সম্ভাবনার পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে বলে মনে করেন পুঁজিবাজারের অনেক বিনিয়োগকারী। জানতে চাইলে ফাস্ট ক্যাপিটালের সাধারণ বিনিয়োগকারী মুশফিকুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন কোম্পানির অন্তর্ভুক্তিতে তারল্য সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি মুনাফার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
আর সরকারি-বেসরকারি লাভজনক কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হবে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগের পথও উন্মোচিত হবে, যা বাজারের জন্য হবে অর্থবহ পদক্ষেপ। ’ সচিবালয়ে ঢাকা চেম্বারের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বাজারে আসছে না।
এতে আমি হতাশ। অল্প সময়ের মধ্যে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার যদি বাজারে না আসে, তবে ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগ করতে হবে। ’ যদিও পরে তা হয়নি এবং সরাসরি তালিকভুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জারি করা স্মারকের আলোকে সরাসরি তালিকভুক্তিতে আইনগত বিধিনিষেধ ছিল, সোমবার (৫ অক্টোবর) তা প্রত্যাহার করেছে সরকার।
যার কারণে নতুন করে পুঁজিবাজার প্রথমবারের মতো প্রশস্ত হতে শুরু করেছে। পুঁজিবাজারের প্রসার সম্পর্কে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত ও প্রসারিত করতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে। সামগ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি।
ইনশাআল্লাহ, আগামী এক বছরের মধ্যে আপনারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত চেহারা দেখতে পাবেন। ’ রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অডিটোরিয়ামে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে সরকার ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অটোমেশন, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
আমরা যদি পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে কোম্পানির কোনো অভাব নেই। তারা অপেক্ষা করছে। ’ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। বিএসইসির একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারী লাভজনক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে।
তাদের মধ্যে— কনফিডেন্স পাওয়ার, টিকে স্টিল, র‌্যাংকস পেট্রোলিয়াম, র‌্যানকম মোটরবাইক লিমিটেড, ফাইবার অ্যাট হোমসহ ডজনখানেক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জানতে চাইলে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, পুঁজিবাজার বর্তমানে ‘নন-ফাংশনাল মার্কেট’ বা অকার্যকর বাজারে পরিণত হয়েছে ২০১০ সালের পর থেকে।
এখানে মূলত সুশাসনের অভাব। তবে নতুন কমিশন ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভালো দিক। এতে বাজারে দীর্ঘদিনের খরা কাটবে আর আস্থা বাড়বে’ বলেন তিনি। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে পাবলিক ইস্যু রুল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন করে বিধিমালার সংশোধনীতে সরাসরি কোম্পানি তালিকাভুক্তি বাড়বে।






















