লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার ফজুমিয়ারহাট মাতাব্বরনগর দারুচ্ছুনাত ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আলী হোছাইনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও বেপরোয়া বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিন গিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসী, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ অধ্যক্ষ যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তখন সেই দলের লেজুড়বৃত্তিক হয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাদ্রাসার আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষ ভাড়া দেওয়াসহ নানান অনিয়ম করে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সময়ে ওলামালীগ নেতা পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সে জামায়াতে যোগ দেয়। তার অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা দিতে উপজেলা জামায়াত নেতাদের দিয়ে বিভিন্নভাবে গণমাধ্যমকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও অভিযোগ রয়েছে। জামায়াত নেতারা তার অনিয়ম ও বাণিজ্যকে বৈধতা দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। সরেজমিন গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদরাসার অনুপস্থিত থাকলে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ১০ টাকা করে জরিমানা দিতে হয়।
এ জরিমানা আদায়ের জন্য আলাদা রসিদ ছাপান অধ্যক্ষ। সপ্তম শ্রেণিতে ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ৭২ জন। অনুপস্থিত ৬৩ জন। জরিমানা আসে ৬৩০ টাকা। অষ্টম শ্রেণিতে ১১৭ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ৫৫ জন। ওই দিন ৬২ জন অনুপস্থিতির জরিমানা ৬২০ টাকা। অন্য ক্লাসগুলো অবস্থাও একই চিত্র। এভাবে প্রতিটি ক্লাসে অনুপস্থিতির সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি থাকে।
গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি জরিমানা আদায় হয়। মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার করে বছরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি জরিমানার টাকার কোন হিসেবে দেখানো হয়নি। অষ্টম শ্রেণির ৩ জন শিক্ষার্থী জানান, পরিক্ষার ফি বাবত তাদের কাছ থেকে ৪৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। কিন্তু হিসাবের খাতায় ৪০০ টাকা দেখান। এছাড়া প্রত্যেক শ্রেণির শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সর্বনিম্ন ২০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা পর্যন্ত মাসিক বেতন আদায় করা হচ্ছে।
এর মধ্যে-সেশন ফি বাবত ৩০০ থেকে ১ হাজার, ভর্তি ফি ৫০০ থেকে ১ হাজার, পরিক্ষা ফি ১৩০ থেকে ৫৫০ টাকা, সনদপত্র ফি ২৫০ থেকে ৮০০ টাকা, মার্কশীট ১৫০ থেকে ৬০০ টাকা, প্রসংশাপত্র ১০০ থেকে ৫০০ টাকা ও ছাড়পত্র বাবত ৫০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলেও এসব খাতের কোন হিসাব নেই। গেল মাসে এ অধ্যক্ষের অনিয়ম দুর্নীতি, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও পাঠদানে চরম অবহেলাসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে স্থানীয় এলাকাবাসী বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতি নিলে এলাকার গন্যমান্যদের দিয়ে বিক্ষোভটি না করতে অধ্যক্ষের বিশেষ অনুরোধে সেটি স্থগিত করা হয়।
এদিকে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অধ্যক্ষের দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপারে ইউএনও ও শিক্ষা কর্মকর্তার নিরবতাকে ম্যানেজ হিসেবে আখ্যায়িত করে তারা বলেন, প্রশাসন এব্যাপারে দেখেও না দেখার ভান ধরেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরবতা প্রমাণ করে তারা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অধ্যক্ষের পক্ষে সাফাই গাইছেন। আবার মাদরাসার আরবি প্রভাষক মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ মাস ধরে নিয়মিত ক্লাস না করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে অধ্যক্ষের সঙ্গে আঁতাত করে ওই শিক্ষক এ অনিয়ম করে যাচ্ছে। ঘটনাটি অধ্যক্ষ নিজেই স্বীকার করেছেন এ প্রতিবেদকের কাছে। সুত্র জানায়, ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি মেঘনা নদীর ভাঙনের মুখে পড়ে মাতাব্বরহাট এলাকা থেকে ২০১৩ সালে ফজুমিয়ারহাটে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে ২৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী ও আট শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে মাদ্রাসাটিতে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ছয়টি শ্রেণিকক্ষসহ মোট নয়টি কক্ষ মাসিক তিন হাজার টাকা হারে ভাড়া দেন অধ্যক্ষ। তখন অফিস কক্ষের ছাদের ওপর টিনের ছাপড়ায় শিক্ষার্থীদের ঠাসাঠাসি করে বসিয়ে পাঠদানের অভিযোগ উঠে এ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। বিষয়টি দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের শিরোনাম হলেও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ইউএনও বিষয়টি নিয়ে তেমন ব্যবস্থা নেননি।
স্থানীয়রা প্রতিকার চেয়ে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ভুঁইয়া সরেজমিন পরিদর্শন করে এসব অনিয়মের সত্যতা পেয়েও সম্পুর্ন নিরবতা পালন করছেন বলে জানান অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সম্রাট খীসা আছেন ঘুমিয়ে। তাকে অধ্যক্ষের এসব বিষয়ে জানালে সে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েও কোন খরব নেননি। এতে এলাকাবাসী তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা গেছে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ৩ জন শিক্ষক জানান, শিক্ষকদের সাথে কোন আলোচনা চাড়াই অধ্যক্ষ তার মনমতো প্রতিষ্ঠান চালান।
তার অনুগত কিছু শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না করেও বেতন নিচ্ছেন। তার খামখেয়ালিপনার কারণে মাদরাসাটি বার বার পত্রপত্রিকার শিরোনাম হয়। এসব অভিযোগ স্বীকার করে অধ্যক্ষ আলী হোছাইন বলেন, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য আমরা এসব খাতে টাকা নিয়ে থাকি। তবে কী কী উন্নয়ন করেছেন-এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, ইতিমধ্যে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে শোকজ করা হয়েছে।
শোকজের জবাব পেলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সম্রাট খীসার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।






















