চলতি অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের জন্য ১৯ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন বা পেট্রোবাংলা। জাতীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই কার্গোগুলো আমদানির পরিকল্পনা করা হলেও দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট বজায় থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক-দুটি নয়, ১৯টি কার্গো দিয়েও চাহিদার সিকি অংশও পূরণ হবে না বলে মত তাদের। পেট্রোবাংলা বলছে, প্রতিটি কার্গোতে গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ এলএনজি থাকলে দুই মাসে দেশে আসবে প্রায় ৬০ দশমিক ৮ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ। সংস্থাটির মতে, এই সরবরাহের কারণে অক্টোবর-নভেম্বরে এলএনজি ঘাটতির আশঙ্কা নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। গত সেপ্টেম্বরে মাসে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু ওপরে ছিল। ১৫ সেপ্টেম্বর পেট্রোবাংলার হিসাবে সরবরাহ ছিল ২,৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট; এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১,৬১৫ এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৯৯১ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদা-সরবরাহের ব্যবধান তখনো প্রায় ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট।
তাই ১৯ কার্গো এলএনজি আমদানি নিশ্চিত হলেও এ গ্যাসের সংকট এ রকমই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে শিল্প-কারখানাসহ আবাসিক খাতের গ্রাহকদের আবারও পোহাতে হবে দুর্ভোগ। পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো এবং আমদানীকৃত এলএনজির মাধ্যমে কমবেশি ৩ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
যে চাহিদা আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে গিয়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৭৬১ মিলিয়ন ঘনফুটে। কিন্তু সে তুলনায় দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন প্রতিদিন নামছে তলানিতে। এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদিত গ্যাসের পরিমাণ ছিল ৮২২ মিলিয়ন ঘনফুট। যা পরের অর্থবছরে গিয়ে দাঁড়ায় ৭৮৩-তে। এর পরের অর্থবছরে— অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে উৎপাদিত হয় ১ দশমিক ১১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
পরবর্তীতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসে। যদিও সরকার বলছে কূপ খনন কার্যক্রমে জোর দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বর্তমান সরকারের ৮ মাসে মাত্র একটি কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া গেছে। অন্য কূপগুলোতে খনন কার্যক্রম জোরদার করার কথা বলা হলেও কার্যত স্থবিরই রয়েছে দাবি করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এখানে বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে।
যেমন ভোলায় আমাদের পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে। কিন্তু আমদানি জটিলতায় এটি জাতীয় গ্রিডে যোগ করা যাচ্ছে না। আবার সিলেটে একটি কূপে গ্যাস পাওয়া গেলেও অন্য কূপগুলোতে এখনো শুরু হয়নি খননকাজ। এ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে যে খননকাজ শুরু করার কথা ছিল, তারও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। হয়তো আগামী বছরের শুরুতে এসব কাজ জোরদার করা হবে। কিন্তু শীত এলে গ্যাসের একটা সংকট তৈরি হয়, এটা আমাদের সবার জানা।
তাই সরকারের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল। শুধু অক্টোবর বা নভেম্বর নয়, ডিসেম্বর-জানুয়ারি ধরে পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি কেনার ব্যবস্থা হচ্ছে, কিন্তু দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে দেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। একদিকে আমদানির জন্য শত শত কোটি, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়।
অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমা, টার্মিনালনির্ভরতা বাড়া এবং গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের চাপ নিয়ে অভিযোগ। পেট্রোবাংলা বলছে, অক্টোবরের ১০টি কার্গোর মধ্যে তিনটি স্পট মার্কেট থেকে, দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং পাঁচটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে আসবে। নভেম্বরে ৯টি কার্গোর মধ্যে ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এবং তিনটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির।
এসব কার্গোর উৎসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলার মতো দেশ রয়েছে। অর্থাৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশকে এখন একই সঙ্গে তিন ধরনের বাজারে থাকতে হচ্ছে— দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট মার্কেট। এতে তাৎক্ষণিক সরবরাহের ঝুঁকি কমলেও মূল্যঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিশেষ করে স্পট মার্কেটের এলএনজি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির সংকটের সময় এই ঝুঁকি আরও প্রকট হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে কাতার ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার এনার্জি বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ কমিয়ে দেয়। বলা যায়, কাতার থেকে পরিকল্পিত সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কাতারের সরবরাহ ঘাটতি পূরণ করতে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত কার্গো কিনতে শুরু করেছে।
এতে করে সরকারের কোষাগার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে। যার খেসারত সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদে দিতে হবে। ফলে সংকটের সময় গ্যাস পাওয়া গেলেও তার দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞরা আরও দাবি করছেন, দেশের বর্তমান এলএনজি নির্ভরতার মূল কারণ শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি পতন।
চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন চার বছরে ৮৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। একই সময়ে ১৫০ কূপ খনন কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন উৎপাদন যোগ হলেও পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমার হার নতুন উৎপাদনকে ছাড়িয়ে গেছে। পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক তথ্যেও দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।
তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান জানান, আমরা এলএনজি-নির্ভরতা কমাতে কাজ করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বেগমগঞ্জ-৫, বেগমগঞ্জ-৬ এবং সুনেত্রা-২ কূপ খননে ৭২৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এখন চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে।
অন্যদিকে দেশীয় অনুসন্ধানেও বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু নতুন কূপ থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে সময় লাগে। ফলে তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণে এলএনজিই প্রধান ভরসা হয়ে থাকছে। তবে দেশের এলএনজি অবকাঠামো মূলত মোহেশখালীকেন্দ্রিক। বর্তমানে দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ রয়েছে। একটি সামিটের এবং অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেটর কোম্পানির।
দুই টার্মিনালের সম্মিলিত সর্বোচ্চ রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক। কিন্তু চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে একটি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা বাংলাদেশের এলএনজি-নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে এনে দিয়েছে উল্লেখ করে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ওই সময় দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
আগস্টের শুরুতে আংশিকভাবে টার্মিনালটি চালু হলেও প্রথম পর্যায়ে মাত্র প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যোগ হচ্ছিল। এরপর আগস্টের মাঝামাঝি আবার টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে এক্সিলারেটরের এফএসআরইউতে এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় সেটি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তখন সামিটের টার্মিনাল প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এক্সিলারেটরের প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করছিল।
ফলে দেশজুড়ে যে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয় তা দেশীয় উৎসের উৎপাদন কমার কারণেই তৈরি হয়। এর জন্য সরকারকে সঠিক পরিকল্পার মাধ্যমে দেশীয় কূপগুলো খননে জোর দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে। বিশ্বব্যাংকের জ্বালানি খাতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের সবচেয়ে বড় অংশ যায় বিদ্যুৎ খাতে— প্রায় ৪২ শতাংশ।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫৯ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল ওই বিশ্লেষণে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার প্রায় ১৯ শতাংশ এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারের প্রায় ১৭ শতাংশ। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে একসঙ্গে কয়েকটি জায়গায় চাপ পড়ে। গ্যাস কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে, শিল্পে বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয়, সর্বোপরি অর্থনীতিতে চাপ পড়ে।
সবচেয়ে বড় চাপ ভর্তুকিতে। এলএনজি আমদানির সংকটকে শুধু সরবরাহের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর বাড়তি চাপ। তবে সরকার দ্রুততম সময়ে সব চাপ কাটিয়ে উঠবে দাবি করে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার এই খাতটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
যার খেসারত এখন আমাদের দিতে হচ্ছে। তার ওপর যোগ হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা। তবে সরকার গ্রাহক ভোগান্তি কমাতে যা যা করণীয় সব করছে। দেশীয় কূপ খননের কাজও ত্বরান্বিত হচ্ছে খুব শিগগিরই। যেহেতু এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া তাই এই মুহূর্তে আমদানির বিকল্প নেই। পেট্রোবাংলার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস— জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এলএনজি আমদানিতে সরকার ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
শুধু তিন মাসেই এই পরিমাণ আগের অর্থবছরের পুরো এলএনজি ভর্তুকির ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ। যা ২০২৫-২৬ এর পুরো অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকি ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।





















