আজ শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২৪%

সড়ক নিরাপত্তায় নতুন পথ দেখাতে পারে প্রযুক্তি

  • MIT ERP
  • Update Time : 04:44:15 am, Saturday, 3 October 2026
  • 16

সড়ক নিরাপত্তায় নতুন পথ দেখাতে পারে প্রযুক্তি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বাংলাদেশে প্রতিদিনের সাধারণ বাসযাত্রা, অফিসে যাতায়াত, স্কুলফেরত শিশুর হেঁটে চলা কিংবা পণ্য পরিবহনের মতো সাধারণ বিষয়গুলোও অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিতে রূপ নেয়।

সড়ক দুর্ঘটনা এখানে শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ এবং অনেক মানুষের দীর্ঘস্থায়ী শোক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৭,৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬,৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩,০২৯টি দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল জড়িত ছিল এবং এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২,৬৭১ জন, যা মোট মৃত্যুর ৩৬.২৯ শতাংশ।

পথচারী নিহত হয়েছেন আরও ১,৫৬৪ জন, অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ২১.২৫ শতাংশ। সমস্যাটির আরেকটি দিক আরও গভীর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে সরকারি রিপোর্টে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫,০৮৪। দুই হিসাবের এই বিশাল ব্যবধান নিজেই একটি বড় নীতিগত সমস্যা নির্দেশ করে।

বাংলাদেশের সরকারি পক্ষ অতীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই অনুমান নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছে। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার জন্য শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, রিপোর্টিং এবং যাচাই ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাই সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রথম আলোচনাটি শুধু নতুন প্রযুক্তির খরচ নিয়ে হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, বর্তমান ব্যবস্থার মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য আমরা কতদিন বহন করতে পারব।

এখানেই স্মার্ট সড়ক এবং স্বচালিত যানবাহনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে। একটি স্বচালিত গাড়ি নিজে থেকে একটি অনিরাপদ সড়ককে নিরাপদ বানাতে পারে না। যেখানে লেনচিহ্ন মুছে যায়, যেখানে পথচারী যেকোনো জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হন, রাস্তার পাশে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ থাকে, ধীরগতির যানবাহন দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে একই জায়গায় চলে এবং যেখানে ওভারটেকিং নিয়মের বদলে অভ্যাসে পরিণত হয়, সেখানে সবচেয়ে উন্নত সেন্সরযুক্ত গাড়িকেও অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে স্বচালিত গাড়িকে শুরু হিসেবে দেখার চেয়ে স্মার্ট সড়ককে ভিত্তি হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক। স্মার্ট সড়ক মানে শুধু রাস্তার পাশে কয়েকটি ক্যামেরা বসানো নয়। এর অর্থ হলোÑ এমন একটি অবকাঠামো, যা নিজের পরিবেশকে বুঝতে পারে, তথ্য বিনিময় করতে পারে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।

ক্যামেরা, রাডার, যান গণনার ব্যবস্থা, গতি পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতা সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় আইন প্রয়োগ, পরিবর্তনশীল বার্তা প্রদর্শন এবং একটি কেন্দ্রীয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র একসঙ্গে কাজ করলে একটি সড়ক কেবল চলাচলের পথ থাকে না, এটি একটি তথ্যনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিণত হয়। ভেহিকল টু এভরিথিং বা ভি২এক্স যোগাযোগ যুক্ত হলে গাড়ি ও রাস্তার অবকাঠামো পরস্পরের কাছে এমন তথ্য পাঠাতে পারে, যা চালকের চোখে তাৎক্ষণিকভাবে ধরা নাও পড়তে পারে।

সামনে হঠাৎ ব্রেক, অন্ধ মোড়, সড়কের কাজ, পথচারী বা মোটরসাইকেল আরোহীর উপস্থিতি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দুর্ঘটনা প্রতিরোধের নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পথ একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সময়কালের জাতীয় ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম মহাপরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমে বুদ্ধিমান পরিবহন প্রযুক্তি বিস্তারের কথা বলা হয়েছে।

সেখানে ভেহিকল টু ভেহিকল এবং ভেহিকল টু ইনফ্রাস্ট্রাকচার যোগাযোগ, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক গণনা, যাত্রাসময় তথ্য, স্মার্ট ওয়ার্ক জোন এবং স্বচালিত যানবাহনকে সহায়তা করতে পারে এমন ব্যবস্থার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরিকল্পনাটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের কাঠামোও নির্ধারণ করেছে, যার প্রথম ধাপ ২০২৫ থেকে ২০২৭, দ্বিতীয় ধাপ ২০২৮ থেকে ২০৩০ এবং তৃতীয় ধাপ ২০৩১ থেকে ২০৩৪।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরীক্ষাগার হতে পারে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী মহাসড়ক। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নথিতে যাত্রাবাড়ী থেকে চট্টগ্রাম অংশটি প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার। এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াত ও বাণিজ্যিক করিডর। ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট এই মহাসড়কে এআইভিত্তিক অটো ফাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়। টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৯০টি পিলারে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যেগুলো অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, ভুল পাশে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক সংকেত বা নির্দেশ অমান্য এবং অবৈধ পার্কিং শনাক্ত করতে পারে।

লঙ্ঘনের তথ্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ডেটাবেজে পাঠানো এবং নিবন্ধিত মালিকের মোবাইলে জরিমানার তথ্য পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থার প্রাথমিক ফলও চিন্তার মতো। সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, চালুর প্রথম দিনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৪৪৬টি ট্রাফিক লঙ্ঘন ধরা পড়েছিল, দশম দিনে তা ৩৪টিতে নেমে আসে। অর্থাৎ লঙ্ঘন প্রায় ৯২.৩ শতাংশ কমেছে।

কিন্তু এখানেও পরিসংখ্যানের ভাষা সঠিক রাখা জরুরি। এর অর্থ দুর্ঘটনা ৯২ শতাংশ কমে গেছে এমন নয়। এটি দেখায় যে আইন প্রয়োগ যদি সার্বক্ষণিক হয়, দৃশ্যমান পুলিশ উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল না হয়, তাহলে চালকের আচরণ দ্রুত বদলাতে পারে। প্রযুক্তির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক শক্তি হয়তো এখানেই, এটি শাস্তির সম্ভাবনাকে ধারাবাহিক করে তোলে। তবে ক্যামেরা দিয়ে নিরাপদ সড়ক তৈরি হয় না।

এর পরের ধাপে দরকার একই মানের লেনচিহ্ন, প্রতিফলক, পর্যাপ্ত আলো, সুরক্ষিত মিডিয়ান, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ, নিরাপদ পথচারী পারাপার এবং ধীরগতির ও দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা। ক্যামেরা দুর্ঘটনাস্থল বা থেমে থাকা গাড়ি শনাক্ত করবে, রাডার গতি পরিমাপ করবে, রাস্তার পাশের ইউনিট সংযুক্ত গাড়িকে সতর্ক করবে, আর পরিবর্তনশীল বার্তা বোর্ড সামনে যানজট, কুয়াশা, বন্যা, নির্মাণকাজ বা দুর্ঘটনার খবর দেবে।

এই তথ্য একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষে গিয়ে পুলিশ, সড়ক কর্তৃপক্ষ, অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি সেবাকে সমন্বিত করতে পারলে প্রযুক্তি বাস্তব নিরাপত্তায় রূপ নেবে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পও একই যুক্তিকে সমর্থন করে। দুটি জাতীয় মহাসড়কে প্রকৌশলগত উন্নয়ন, সাইন ও রোড মার্কিং, পথচারী সুবিধা, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সড়ক মৃত্যুহার ৩০ শতাংশের বেশি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষা হলো পরিষ্কার, বুদ্ধিমান প্রযুক্তি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন এর নিচে প্রকৌশলগতভাবে সঠিক রাস্তা থাকে। এর পরেই আসবে স্বচালিত যানবাহন। বাংলাদেশের প্রথম পরীক্ষা ঢাকা শহরের বিশৃঙ্খল রাস্তায় চালকহীন গাড়ি নামানো হওয়া উচিত নয়। বরং চট্টগ্রাম বন্দর, শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক ইয়ার্ড, জাহাজ নির্মাণ এলাকা বা নিয়ন্ত্রিত শিল্পপ্রাঙ্গণের মতো পরিবেশে কমগতির স্বচালিত শাটল, কনটেইনার পরিবহন যান বা ইয়ার্ড ট্রাক দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

এখানে রাস্তা আগে থেকে মানচিত্রে নির্ধারণ করা যায়, পথচারী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, গতি সীমিত রাখা যায় এবং পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে রাখা যায়। এতে বাংলাদেশ সেন্সর, মানচিত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যান নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের নিজস্ব দক্ষতা তৈরি করতে পারবে, শহুরে বিশৃঙ্খলার সব জটিলতা একসঙ্গে মোকাবিলা না করেই।

স্বচালিত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়েও এখন বাস্তব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সহকর্মী মূল্যায়িত গবেষণায় ওয়েমোর চালকবিহীন স্বচালিত ব্যবস্থার ৫৬.৭ মিলিয়ন মাইল চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে মানুষের তুলনায় আঘাতজনিত, এয়ারব্যাগ সক্রিয় হওয়া এবং গুরুতর আঘাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্ঘটনা সূচকে পরিসংখ্যানগতভাবে কম হার পাওয়া যায়।

তবে এই ফলাফল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা, নির্দিষ্ট সড়ক এবং নির্দিষ্ট অপারেটিং পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৬ সালের জুনে ওয়েমো জানায়, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তাদের সম্পূর্ণ স্বচালিত যানবহর ২২০ মিলিয়নের বেশি মাইল চলেছে এবং একই এলাকাগুলোতে মানবচালকদের তুলনায় গুরুতর বা প্রাণঘাতী আঘাত সৃষ্টিকারী দুর্ঘটনায় ৯৪ শতাংশ কম সম্পৃক্ততা দেখা গেছে।

পথচারী, সাইকেল আরোহী এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের জড়িত আঘাতজনিত দুর্ঘটনাতেও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হার জানিয়েছে। এই তথ্য ওয়েমোর নিজস্ব বিশ্লেষণ, তাই এটিকে সর্বজনীন প্রমাণ হিসেবে নয়, চলমান বাস্তব পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে দেখা উচিত। বাংলাদেশের জন্য বাস্তব লক্ষ্য হওয়া উচিত না হঠাৎ করে পুরো দেশকে চালকহীন করে ফেলা।

লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ধাপে ধাপে রূপান্তর। সাধারণ রাস্তা থেকে স্মার্ট রাস্তা, মানবনির্ভর নজরদারি থেকে স্বয়ংক্রিয় আইন প্রয়োগ, বিচ্ছিন্ন যানবাহন থেকে সংযুক্ত যানবাহন, চালক সহায়তা থেকে নিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসন। এই রূপান্তরের প্রতিটি ধাপের নিজস্ব নিরাপত্তা পরীক্ষা, তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক প্রযুক্তির সমস্যা নয়। এটি প্রকৌশল, আইন প্রয়োগ, তথ্য ও জরুরি চিকিৎসার সম্মিলিত পরীক্ষা। স্বচালিত গাড়ি মানুষের অনেক ভুল কমাতে পারে, কিন্তু অনির্দেশ্য রাস্তার বিশৃঙ্খলা চিরকাল সামলাতে পারবে না। একটি ভালো স্মার্ট সড়ক অবশ্য স্বচালিত গাড়ি আসার আগেই মানুষকে নিরাপদ করতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই শুধু এমন রাস্তা নির্মাণে নয়, যেসব রাস্তা যন্ত্র সহজে বুঝতে পারে সেখানে।

আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সড়ক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে মানুষ, সংযুক্ত যানবাহন এবং স্বচালিত প্রযুক্তি একই অবকাঠামোয় নিরাপদে সহাবস্থান করতে পারে। প্রযুক্তি আর কল্পনা নয়। প্রয়োজন এখন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলে যুক্ত করা। বাংলাদেশ হয়তো এখনো সর্বত্র স্বচালিত সড়কের জন্য প্রস্তুত নয়। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার মতো সড়ক নির্মাণ শুরু করার সময় এসে গেছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

সড়ক নিরাপত্তায় নতুন পথ দেখাতে পারে প্রযুক্তি

Update Time : 04:44:15 am, Saturday, 3 October 2026

বাংলাদেশে প্রতিদিনের সাধারণ বাসযাত্রা, অফিসে যাতায়াত, স্কুলফেরত শিশুর হেঁটে চলা কিংবা পণ্য পরিবহনের মতো সাধারণ বিষয়গুলোও অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিতে রূপ নেয়।

সড়ক দুর্ঘটনা এখানে শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ এবং অনেক মানুষের দীর্ঘস্থায়ী শোক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৭,৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬,৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩,০২৯টি দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল জড়িত ছিল এবং এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২,৬৭১ জন, যা মোট মৃত্যুর ৩৬.২৯ শতাংশ।

পথচারী নিহত হয়েছেন আরও ১,৫৬৪ জন, অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ২১.২৫ শতাংশ। সমস্যাটির আরেকটি দিক আরও গভীর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে সরকারি রিপোর্টে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫,০৮৪। দুই হিসাবের এই বিশাল ব্যবধান নিজেই একটি বড় নীতিগত সমস্যা নির্দেশ করে।

বাংলাদেশের সরকারি পক্ষ অতীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই অনুমান নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছে। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার জন্য শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, রিপোর্টিং এবং যাচাই ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাই সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রথম আলোচনাটি শুধু নতুন প্রযুক্তির খরচ নিয়ে হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, বর্তমান ব্যবস্থার মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য আমরা কতদিন বহন করতে পারব।

এখানেই স্মার্ট সড়ক এবং স্বচালিত যানবাহনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে। একটি স্বচালিত গাড়ি নিজে থেকে একটি অনিরাপদ সড়ককে নিরাপদ বানাতে পারে না। যেখানে লেনচিহ্ন মুছে যায়, যেখানে পথচারী যেকোনো জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হন, রাস্তার পাশে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ থাকে, ধীরগতির যানবাহন দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে একই জায়গায় চলে এবং যেখানে ওভারটেকিং নিয়মের বদলে অভ্যাসে পরিণত হয়, সেখানে সবচেয়ে উন্নত সেন্সরযুক্ত গাড়িকেও অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে স্বচালিত গাড়িকে শুরু হিসেবে দেখার চেয়ে স্মার্ট সড়ককে ভিত্তি হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক। স্মার্ট সড়ক মানে শুধু রাস্তার পাশে কয়েকটি ক্যামেরা বসানো নয়। এর অর্থ হলোÑ এমন একটি অবকাঠামো, যা নিজের পরিবেশকে বুঝতে পারে, তথ্য বিনিময় করতে পারে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।

ক্যামেরা, রাডার, যান গণনার ব্যবস্থা, গতি পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতা সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় আইন প্রয়োগ, পরিবর্তনশীল বার্তা প্রদর্শন এবং একটি কেন্দ্রীয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র একসঙ্গে কাজ করলে একটি সড়ক কেবল চলাচলের পথ থাকে না, এটি একটি তথ্যনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিণত হয়। ভেহিকল টু এভরিথিং বা ভি২এক্স যোগাযোগ যুক্ত হলে গাড়ি ও রাস্তার অবকাঠামো পরস্পরের কাছে এমন তথ্য পাঠাতে পারে, যা চালকের চোখে তাৎক্ষণিকভাবে ধরা নাও পড়তে পারে।

সামনে হঠাৎ ব্রেক, অন্ধ মোড়, সড়কের কাজ, পথচারী বা মোটরসাইকেল আরোহীর উপস্থিতি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দুর্ঘটনা প্রতিরোধের নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পথ একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সময়কালের জাতীয় ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম মহাপরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমে বুদ্ধিমান পরিবহন প্রযুক্তি বিস্তারের কথা বলা হয়েছে।

সেখানে ভেহিকল টু ভেহিকল এবং ভেহিকল টু ইনফ্রাস্ট্রাকচার যোগাযোগ, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক গণনা, যাত্রাসময় তথ্য, স্মার্ট ওয়ার্ক জোন এবং স্বচালিত যানবাহনকে সহায়তা করতে পারে এমন ব্যবস্থার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরিকল্পনাটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের কাঠামোও নির্ধারণ করেছে, যার প্রথম ধাপ ২০২৫ থেকে ২০২৭, দ্বিতীয় ধাপ ২০২৮ থেকে ২০৩০ এবং তৃতীয় ধাপ ২০৩১ থেকে ২০৩৪।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরীক্ষাগার হতে পারে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী মহাসড়ক। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নথিতে যাত্রাবাড়ী থেকে চট্টগ্রাম অংশটি প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার। এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াত ও বাণিজ্যিক করিডর। ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট এই মহাসড়কে এআইভিত্তিক অটো ফাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়। টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৯০টি পিলারে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যেগুলো অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, ভুল পাশে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক সংকেত বা নির্দেশ অমান্য এবং অবৈধ পার্কিং শনাক্ত করতে পারে।

লঙ্ঘনের তথ্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ডেটাবেজে পাঠানো এবং নিবন্ধিত মালিকের মোবাইলে জরিমানার তথ্য পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থার প্রাথমিক ফলও চিন্তার মতো। সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, চালুর প্রথম দিনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৪৪৬টি ট্রাফিক লঙ্ঘন ধরা পড়েছিল, দশম দিনে তা ৩৪টিতে নেমে আসে। অর্থাৎ লঙ্ঘন প্রায় ৯২.৩ শতাংশ কমেছে।

কিন্তু এখানেও পরিসংখ্যানের ভাষা সঠিক রাখা জরুরি। এর অর্থ দুর্ঘটনা ৯২ শতাংশ কমে গেছে এমন নয়। এটি দেখায় যে আইন প্রয়োগ যদি সার্বক্ষণিক হয়, দৃশ্যমান পুলিশ উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল না হয়, তাহলে চালকের আচরণ দ্রুত বদলাতে পারে। প্রযুক্তির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক শক্তি হয়তো এখানেই, এটি শাস্তির সম্ভাবনাকে ধারাবাহিক করে তোলে। তবে ক্যামেরা দিয়ে নিরাপদ সড়ক তৈরি হয় না।

এর পরের ধাপে দরকার একই মানের লেনচিহ্ন, প্রতিফলক, পর্যাপ্ত আলো, সুরক্ষিত মিডিয়ান, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ, নিরাপদ পথচারী পারাপার এবং ধীরগতির ও দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা। ক্যামেরা দুর্ঘটনাস্থল বা থেমে থাকা গাড়ি শনাক্ত করবে, রাডার গতি পরিমাপ করবে, রাস্তার পাশের ইউনিট সংযুক্ত গাড়িকে সতর্ক করবে, আর পরিবর্তনশীল বার্তা বোর্ড সামনে যানজট, কুয়াশা, বন্যা, নির্মাণকাজ বা দুর্ঘটনার খবর দেবে।

এই তথ্য একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষে গিয়ে পুলিশ, সড়ক কর্তৃপক্ষ, অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি সেবাকে সমন্বিত করতে পারলে প্রযুক্তি বাস্তব নিরাপত্তায় রূপ নেবে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পও একই যুক্তিকে সমর্থন করে। দুটি জাতীয় মহাসড়কে প্রকৌশলগত উন্নয়ন, সাইন ও রোড মার্কিং, পথচারী সুবিধা, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সড়ক মৃত্যুহার ৩০ শতাংশের বেশি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষা হলো পরিষ্কার, বুদ্ধিমান প্রযুক্তি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন এর নিচে প্রকৌশলগতভাবে সঠিক রাস্তা থাকে। এর পরেই আসবে স্বচালিত যানবাহন। বাংলাদেশের প্রথম পরীক্ষা ঢাকা শহরের বিশৃঙ্খল রাস্তায় চালকহীন গাড়ি নামানো হওয়া উচিত নয়। বরং চট্টগ্রাম বন্দর, শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক ইয়ার্ড, জাহাজ নির্মাণ এলাকা বা নিয়ন্ত্রিত শিল্পপ্রাঙ্গণের মতো পরিবেশে কমগতির স্বচালিত শাটল, কনটেইনার পরিবহন যান বা ইয়ার্ড ট্রাক দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

এখানে রাস্তা আগে থেকে মানচিত্রে নির্ধারণ করা যায়, পথচারী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, গতি সীমিত রাখা যায় এবং পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে রাখা যায়। এতে বাংলাদেশ সেন্সর, মানচিত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যান নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের নিজস্ব দক্ষতা তৈরি করতে পারবে, শহুরে বিশৃঙ্খলার সব জটিলতা একসঙ্গে মোকাবিলা না করেই।

স্বচালিত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়েও এখন বাস্তব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সহকর্মী মূল্যায়িত গবেষণায় ওয়েমোর চালকবিহীন স্বচালিত ব্যবস্থার ৫৬.৭ মিলিয়ন মাইল চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে মানুষের তুলনায় আঘাতজনিত, এয়ারব্যাগ সক্রিয় হওয়া এবং গুরুতর আঘাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্ঘটনা সূচকে পরিসংখ্যানগতভাবে কম হার পাওয়া যায়।

তবে এই ফলাফল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা, নির্দিষ্ট সড়ক এবং নির্দিষ্ট অপারেটিং পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৬ সালের জুনে ওয়েমো জানায়, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তাদের সম্পূর্ণ স্বচালিত যানবহর ২২০ মিলিয়নের বেশি মাইল চলেছে এবং একই এলাকাগুলোতে মানবচালকদের তুলনায় গুরুতর বা প্রাণঘাতী আঘাত সৃষ্টিকারী দুর্ঘটনায় ৯৪ শতাংশ কম সম্পৃক্ততা দেখা গেছে।

পথচারী, সাইকেল আরোহী এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের জড়িত আঘাতজনিত দুর্ঘটনাতেও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হার জানিয়েছে। এই তথ্য ওয়েমোর নিজস্ব বিশ্লেষণ, তাই এটিকে সর্বজনীন প্রমাণ হিসেবে নয়, চলমান বাস্তব পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে দেখা উচিত। বাংলাদেশের জন্য বাস্তব লক্ষ্য হওয়া উচিত না হঠাৎ করে পুরো দেশকে চালকহীন করে ফেলা।

লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ধাপে ধাপে রূপান্তর। সাধারণ রাস্তা থেকে স্মার্ট রাস্তা, মানবনির্ভর নজরদারি থেকে স্বয়ংক্রিয় আইন প্রয়োগ, বিচ্ছিন্ন যানবাহন থেকে সংযুক্ত যানবাহন, চালক সহায়তা থেকে নিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসন। এই রূপান্তরের প্রতিটি ধাপের নিজস্ব নিরাপত্তা পরীক্ষা, তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক প্রযুক্তির সমস্যা নয়। এটি প্রকৌশল, আইন প্রয়োগ, তথ্য ও জরুরি চিকিৎসার সম্মিলিত পরীক্ষা। স্বচালিত গাড়ি মানুষের অনেক ভুল কমাতে পারে, কিন্তু অনির্দেশ্য রাস্তার বিশৃঙ্খলা চিরকাল সামলাতে পারবে না। একটি ভালো স্মার্ট সড়ক অবশ্য স্বচালিত গাড়ি আসার আগেই মানুষকে নিরাপদ করতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই শুধু এমন রাস্তা নির্মাণে নয়, যেসব রাস্তা যন্ত্র সহজে বুঝতে পারে সেখানে।

আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সড়ক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে মানুষ, সংযুক্ত যানবাহন এবং স্বচালিত প্রযুক্তি একই অবকাঠামোয় নিরাপদে সহাবস্থান করতে পারে। প্রযুক্তি আর কল্পনা নয়। প্রয়োজন এখন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলে যুক্ত করা। বাংলাদেশ হয়তো এখনো সর্বত্র স্বচালিত সড়কের জন্য প্রস্তুত নয়। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার মতো সড়ক নির্মাণ শুরু করার সময় এসে গেছে।