আজ শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২৪%

টেরাকোটার শহরে একদিন

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:11:04 am, Saturday, 3 October 2026
  • 10

টেরাকোটার শহরে একদিন

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দিনাজপুর শহরে পা রাখলাম রোদ তখন কমে এসেছে। অটোরিকশা নিয়ে চলতে থাকলাম সতেরো শতকের এক মন্দিরের দিকে যা এখন দাঁড়িয়ে আছে। পথিমধ্যে ধানের শিষে সূর্যের আলো ঝলক দিচ্ছে। এর মধ্যে কিছু ছেলেমেয়ে খেলা করছে কৃষক ধানে পানি দিচ্ছে।

দেখতে দেখতে চলে আসলাম কান্তজির মন্দির। অনেকবার ছবি আর ভিডিও দেখার পর নিজ চোখে দেখার অনুভূতি আলাদা ছিল। প্রাচীন দরজায় পা গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, সময় যেন কয়েক শত বছর পেছনে চলে গিয়েছি। সামনের বিশাল আঙিনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত সুন্দর সেই মন্দির। লালচে পোড়ামাটির গায়ে সূর্যের আলো পড়ছে, আর টেরাকোটার নকশাগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

মন্দিরের দেয়ালে চোখ রাখতেই দেখিÑ ঘোড়ায় টানা রথে কৃষ্ণ, যুদ্ধের দৃশ্যে অর্জুন, কোথাও রাখাল ছেলেরা বাঁশি বাজাচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে, এসব নিখুঁত কারুকাজ তৈরি হয়েছিল প্রায় আড়াই শত বছর আগে, রাজা রামনাথের সময়ে! টেরাকোটার ভাষা আমি একেক করে টালি ছুঁয়ে দেখি। প্রতিটি টালি যেন একটা গল্প বলেÑ প্রেম, ভক্তি, বেদনা আর ইতিহাসের।

কারো মুখে ভক্তির হাসি, কোথাও বীরের গর্ব। মনে হয়, পোড়ামাটির ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনার প্রতিচ্ছবি। আশপাশে লোকজন বলতে লাগল, ‘এই মন্দিরটা একসময় তিনতলা ছিল। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে শীর্ষ অংশটা ধ্বংস হয়ে যায়। তবুও নিচের টেরাকোটাগুলো এখনো টিকে আছে, যেন সময়কে হার মানিয়ে। ’ আমি তাকিয়ে রইলাম। সত্যিই, সময় হয়তো অনেক কিছু বদলে দেয়, কিন্তু শিল্পকে নয়।

চারপাশের জীবন মন্দিরের চারপাশে তখন কয়েকজন শিশু খেলছে। পাশেই লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারি রাসমেলার গল্পÑ প্রতি বছর এখানে হাজারো মানুষ আসে, কীর্তন আর আলোয় ভরে ওঠে পুরো এলাকা। তার চোখে গর্বের ঝিলিক, যেন এই মন্দির তার নিজের ইতিহাস। দূরে সূর্য ঢলে পড়ছে। মন্দিরের গায়ে তখন কমলা আলো পড়েছে, যেন সে নিজেই এক দীপশিখা হয়ে উঠেছে।

ফিরতি পথে ফেরার পথে মনে হলো, কান্তজির মন্দির কেবল একটি স্থাপত্য নয়Ñ এ এক অনুভব, এক ইতিহাসের সঙ্গী। এখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, শিল্প কেবল দেখা নয়, তা অনুভব করা লাগে। দিনাজপুরের মাটিতে সূর্য যখন ডুবে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিলÑ এই মাটির গন্ধ, এই মন্দিরের রূপ, আর এই নিঃশব্দ এখানকার হাজার বছরের ইতিহাস জানান দিয়ে যায় আমাদের ঐতিহ্য আর গল্পের।

কান্তজির মন্দিরে একবার গেলেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের ঐতিহ্য কত সমৃদ্ধ, আর সময়ের বুকেও শিল্প কখনো হারায় না। টেরাকোটার এই মন্দির শুধু স্থাপত্য নয়, এটি একটি গল্প, বাংলার আত্মার গল্প।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

টেরাকোটার শহরে একদিন

Update Time : 03:11:04 am, Saturday, 3 October 2026

দিনাজপুর শহরে পা রাখলাম রোদ তখন কমে এসেছে। অটোরিকশা নিয়ে চলতে থাকলাম সতেরো শতকের এক মন্দিরের দিকে যা এখন দাঁড়িয়ে আছে। পথিমধ্যে ধানের শিষে সূর্যের আলো ঝলক দিচ্ছে। এর মধ্যে কিছু ছেলেমেয়ে খেলা করছে কৃষক ধানে পানি দিচ্ছে।

দেখতে দেখতে চলে আসলাম কান্তজির মন্দির। অনেকবার ছবি আর ভিডিও দেখার পর নিজ চোখে দেখার অনুভূতি আলাদা ছিল। প্রাচীন দরজায় পা গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, সময় যেন কয়েক শত বছর পেছনে চলে গিয়েছি। সামনের বিশাল আঙিনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত সুন্দর সেই মন্দির। লালচে পোড়ামাটির গায়ে সূর্যের আলো পড়ছে, আর টেরাকোটার নকশাগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

মন্দিরের দেয়ালে চোখ রাখতেই দেখিÑ ঘোড়ায় টানা রথে কৃষ্ণ, যুদ্ধের দৃশ্যে অর্জুন, কোথাও রাখাল ছেলেরা বাঁশি বাজাচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে, এসব নিখুঁত কারুকাজ তৈরি হয়েছিল প্রায় আড়াই শত বছর আগে, রাজা রামনাথের সময়ে! টেরাকোটার ভাষা আমি একেক করে টালি ছুঁয়ে দেখি। প্রতিটি টালি যেন একটা গল্প বলেÑ প্রেম, ভক্তি, বেদনা আর ইতিহাসের।

কারো মুখে ভক্তির হাসি, কোথাও বীরের গর্ব। মনে হয়, পোড়ামাটির ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনার প্রতিচ্ছবি। আশপাশে লোকজন বলতে লাগল, ‘এই মন্দিরটা একসময় তিনতলা ছিল। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে শীর্ষ অংশটা ধ্বংস হয়ে যায়। তবুও নিচের টেরাকোটাগুলো এখনো টিকে আছে, যেন সময়কে হার মানিয়ে। ’ আমি তাকিয়ে রইলাম। সত্যিই, সময় হয়তো অনেক কিছু বদলে দেয়, কিন্তু শিল্পকে নয়।

চারপাশের জীবন মন্দিরের চারপাশে তখন কয়েকজন শিশু খেলছে। পাশেই লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারি রাসমেলার গল্পÑ প্রতি বছর এখানে হাজারো মানুষ আসে, কীর্তন আর আলোয় ভরে ওঠে পুরো এলাকা। তার চোখে গর্বের ঝিলিক, যেন এই মন্দির তার নিজের ইতিহাস। দূরে সূর্য ঢলে পড়ছে। মন্দিরের গায়ে তখন কমলা আলো পড়েছে, যেন সে নিজেই এক দীপশিখা হয়ে উঠেছে।

ফিরতি পথে ফেরার পথে মনে হলো, কান্তজির মন্দির কেবল একটি স্থাপত্য নয়Ñ এ এক অনুভব, এক ইতিহাসের সঙ্গী। এখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, শিল্প কেবল দেখা নয়, তা অনুভব করা লাগে। দিনাজপুরের মাটিতে সূর্য যখন ডুবে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিলÑ এই মাটির গন্ধ, এই মন্দিরের রূপ, আর এই নিঃশব্দ এখানকার হাজার বছরের ইতিহাস জানান দিয়ে যায় আমাদের ঐতিহ্য আর গল্পের।

কান্তজির মন্দিরে একবার গেলেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের ঐতিহ্য কত সমৃদ্ধ, আর সময়ের বুকেও শিল্প কখনো হারায় না। টেরাকোটার এই মন্দির শুধু স্থাপত্য নয়, এটি একটি গল্প, বাংলার আত্মার গল্প।