ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেছেন নিক ম্যাডিনসন। কেমোথেরাপি তার ক্রিকেট-জীবন এলোমেলো করেছে। চোট এবং মানসিক লড়াইও তাতে কম ভূমিকা রাখেনি। একটা সময় তো তার মাঠে ফেরাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তবে সবকিছু পেছনে ফেলে সেই ম্যাডিনসন আবার অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে ফিরেছেন।
গতকাল ঘোষিত অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের টেস্ট স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন এই ওপেনার। গত বছরের মাঝামাঝিতে ম্যাডিনসনের টেস্টিকুলার ক্যানসার ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচার করেও বিপদ কাটেনি। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছিল। শুরু হয় কেমোথেরাপি। তখন তার স্ত্রী বিয়াঙ্কা ছিলেন দ্বিতীয় সন্তানের অপেক্ষায়। পরিবার সামলাতে চাকরি ছেড়ে দেন বিয়াঙ্কা। ঘরে ছিল একটি অল্প বয়সি সন্তানও।
চিকিৎসার জন্য নিয়মিত হাসপাতালে যেতে হতো ম্যাডিনসনকে। চিকিৎসার ধকল কতটা কঠিন ছিল, তা ম্যাডিনসনের কথাতেই পরিষ্কার, ‘দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই আমার সব চুল পড়ে গিয়েছিল। শরীরটা খুব খারাপ লাগত। ’ কেমোথেরাপির পাশাপাশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতে স্টেরয়েডও নিতে হতো ম্যাডিনসনকে। তাতে রাতের ঘুম নষ্ট হয়ে যেত। বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত হাসপাতালে সময় কাটত ম্যাডিনসনের।
এরপর ঘুম। রাতে খাবার খেয়ে আবার ঘুম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে জেগে থাকতে হতো সকাল পর্যন্ত। ম্যাডিনসনের ভাষায়, ‘হাসপাতাল থেকে ফিরে ঘুমাতাম। তারপর জোর করে রাতের খাবার খেতাম। রাত একটা পর্যন্ত ঘুমাতাম। কিন্তু কখনো কখনো ঘুম ভেঙে যেত এবং সকাল ৬টা পর্যন্ত আর ঘুম আসত না। ’ ম্যাডিনসনের শরীর তখন এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে ক্রিকেট দূরের কথা, স্বাভাবিক জীবনযাপন করাও তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল।
ম্যাডিনসন বলেন, ‘সময়টা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। ভীষণ ক্লান্ত থাকতাম। মনে হতো ২৪ ঘণ্টাই ঘুমাতে হবে। সবচেয়ে খারাপ লাগত, বাড়ির কোনো কাজই করতে পারতাম না। এ জন্য নিজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করত। ’ তার পরও থামেননি ম্যাডিনসন। সর্বশেষ কেমোথেরাপির মাত্র ১০ দিন পর আবার নেটে ব্যাট হাতে ফেরেন। পেশাদার ক্রিকেটে ম্যাডিনসন ফেরেন সর্বশেষ বিগ ব্যাশে।
সেই সময়ও অবশ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে খুব বেশি ভাবেননি। ৩৪ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাত্র তিনটি টেস্ট খেলা এই ক্রিকেটার জানতেন, জাতীয় দলে ফেরার পথটা সহজ নয়। ম্যাডিনসন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সর্বশেষ টেস্ট খেলেন ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। ম্যাডিনসনের ক্যারিয়ারে এমন বিরতি অবশ্য নতুন নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেছিলেন টি-টোয়েন্টি দিয়ে, ২০১৩ সালে।
প্রথম সুযোগ পাওয়ার পর মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে বিরতি নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া এ দলের ম্যাচ থেকেও সরে দাঁড়িয়েছিলেন একই কারণে। চোটও ম্যাডিনসনকে বারবার থামিয়েছে। ২০১৮ সালে পেসার ঝাই রিচার্ডসনের বলে আঘাত পেয়ে হাত ভেঙেছিল। ২০২৩ সালে হয় এসিএল চোট। তাতে এক বছরের বেশি সময় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয়।
ফিরে অবশ্য ব্যাটেই উত্তর দিয়েছিলেন ম্যাডিনসন। পাঁচ ইনিংসে করেছিলেন ৩টি সেঞ্চুরি। পরে ভিক্টোরিয়া ছেড়ে নিজের রাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলসে ফিরে যান। শেফিল্ড শিল্ডেও ম্যাডিনসনের ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত তার ব্যাটিং গড় ছিল ৫২.৩৭। ওই সময়ে অন্তত ২০ ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শুধু ক্যামেরন গ্রিনের গড় তার চেয়ে বেশি ছিল।
তবে ক্যানসারের আগে ২০২৪-২৫ মৌসুমটা ম্যাডিনসনের জন্য ভালো কাটেনি। ১১ ইনিংসে মাত্র একটি ফিফটি ছিল। এরপর শরীর খারাপ হতে শুরু করে। ভেবেছিলেন, হয়তো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পরে শিল্ডের শেষ রাউন্ডে বাদও পড়েন। এরপর শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। চিকিৎসা শেষে ক্রিকেটে ফিরলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এখনো নামতে পারেননি ম্যাডিনসন।
লিস্ট এ ক্রিকেটে গত সেপ্টেম্বরেই নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে ১২৬ রানের ইনিংস খেলেন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ম্যাডিনসন এখন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে। গন্তব্য দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাডিনসনকে কেন বেছে নিল অস্ট্রেলিয়া, তার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন নির্বাচক জর্জ বেইলি। ওপেনিং থেকে মিডল অর্ডারÑ দুই জায়গাতেই খেলতে পারেন ম্যাডিনসন।
তাই দলের ব্যাটিং অর্ডারে তাকে বিভিন্ন ভূমিকায় ব্যবহার করা সম্ভব।





















