শহরের কোলাহল থেকে দূরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রকৃতির এক গোপন দরজা, যেখানে সবুজের গভীরতা, পাতার মর্মর শব্দ, অচেনা পাখির ডাক এবং নীরবতার মাঝে কয়েক ঘণ্টার পথচলাও দীর্ঘ প্রকৃতি-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
সাতছড়ির পথে ঢুকতেই বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়, আর সামনে খুলে যায় ঘন সবুজের এক বিস্তৃত ক্যানভাস। উঁচু-নিচু গাছ, লতাগুল্ম, সরু আঁকাবাঁকা পথ আর গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে এসে পড়া রোদের টুকরোÑ সব মিলিয়ে বন যেন নিজের মতো করে আঁকা এক ছবি। নামের মতোই সাতছড়ির বুকে রয়েছে ছোট ছোট ছড়া ও জলধারা।
বর্ষায় সেগুলোতে পানির প্রবাহ বাড়ে, চারপাশের সবুজও হয়ে ওঠে আরও সতেজ। বৃষ্টিভেজা পাতার গন্ধ আর ভেজা মাটির সোঁদা সুবাস তখন বনের বাতাসে মিশে তৈরি করে অন্যরকম এক আবহ। বনের পথে হাঁটা সাতছড়ির সৌন্দর্য শুধু দূর থেকে দেখার নয়, বরং হেঁটে হেঁটে অনুভব করার। বনের নির্দিষ্ট পথে পা বাড়ালে প্রতিটি বাঁকে যেন নতুন কোনো দৃশ্য অপেক্ষা করে থাকে।
কোথাও গাছের ঘন ছায়া, কোথাও পাতার ফাঁক দিয়ে নেমে আসে রোদ। কখনো পথ মিশে যায় গভীর সবুজে, আবার কখনো চোখের সামনে খুলে যায় একটু ফাঁকা জায়গা। এই হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়া নেই। বরং ধীরে হাঁটলেই যেন সাতছড়িকে বেশি করে চেনা যায়। পাতার ওপর পায়ের শব্দ, দূরে পাখির ডাক কিংবা বাতাসে গাছের পাতার দোলÑ সবকিছু মিলে প্রকৃতি এখানে এক নিজস্ব সুর তৈরি করে।
পাখির ডাকে জেগে থাকা বন সাতছড়ি শুধু গাছপালার বন নয়; এটি নানা প্রজাতির পাখি, কীটপতঙ্গ ও বন্যপ্রাণীরও আবাসস্থল। তাই বনের পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কোনো গাছের ডালে রঙিন পাখির দেখা মিললে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। তবে বনের প্রাণীদের দেখতে হলে চোখের চেয়ে কানকে বেশি বিশ্বাস করতে হয়। একটু নীরব হলেই শোনা যায় ডানার শব্দ, পাতার নড়াচড়া কিংবা দূরের কোনো পাখির ডাক।
বন্যপ্রাণী দেখার আনন্দ তখন আরও গভীর হয়। তাদের কাছাকাছি যাওয়ার চেয়ে দূর থেকে তাদের স্বাভাবিক জীবন দেখাÑ প্রকৃতির প্রতি সেটিই বেশি সম্মানের। সবুজের ভেতর কিছুটা নির্জনতা সাতছড়ির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো তার নীরবতায়। এখানে শহরের হর্ন নেই, নেই মানুষের অবিরাম ব্যস্ততা। আছে শুধু বনের নিজস্ব শব্দ। কখনো মনে হবে, সময় একটু ধীর হয়ে গেছে।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চললেও চারপাশে যেন কোনো তাড়া নেই। গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করলেই বোঝা যায়, প্রকৃতির কাছে ফিরে আসার অনুভূতি কতটা সহজ অথচ গভীর হতে পারে। যারা ব্যস্ত জীবনের ভিড় থেকে কিছুটা সময় নিজেদের জন্য তুলে রাখতে চান, তাদের কাছে সাতছড়ি হতে পারে এক প্রশান্ত আশ্রয়। বর্ষায় বদলে যায় সাতছড়ি বর্ষা এলে সাতছড়ির সবুজ যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।
বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায় পাতার ধুলো, ছড়াগুলোতে বাড়ে পানির প্রবাহ। ভেজা মাটির গন্ধ আর মেঘলা আকাশ মিলে বনের চেহারায় আসে নতুন রূপ। বৃষ্টির পর বনের পথ ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতাও আলাদা। চারপাশে টুপটাপ পানির শব্দ, পাতার ডগা থেকে ঝরে পড়া ফোঁটা আর স্যাঁতসেঁতে বাতাসÑসব মিলিয়ে মনে হয়, বনটি যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। তবে বর্ষায় ভ্রমণের সময় পিচ্ছিল পথ, বৃষ্টি এবং স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশনার বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।
যেভাবে যাবেন ঢাকা থেকে সড়কপথে হবিগঞ্জ হয়ে চুনারুঘাট এলাকায় যাওয়া যায়। সেখান থেকে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের প্রবেশপথে পৌঁছানো সম্ভব। ভ্রমণের আগে প্রবেশের সময়, স্থানীয় নিয়মকানুন ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য জেনে নেওয়া ভালো। প্রকৃতিকে ভালোবেসে ফিরুন সাতছড়িতে বেড়াতে গিয়ে শুধু নিজের আনন্দের কথাই ভাবলে চলবে না।
এই বন অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাস। তাই সেখানে গিয়ে প্লাস্টিক বা খাবারের প্যাকেট ফেলে আসা, গাছপালা নষ্ট করা কিংবা বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলোÑ তাকে তার নিজের মতো থাকতে দেওয়া। সাতছড়ি আসলে শুধু একটি ভ্রমণকেন্দ্র নয়। এটি এমন এক সবুজ পৃথিবী, যেখানে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও মানুষ নিজের ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে সরে প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলতে পারে।
সরু বনের পথে হাঁটতে হাঁটতে, পাখির ডাক শুনতে শুনতে কিংবা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মনে হতে পারেÑ প্রকৃতির কাছে ফিরে আসার জন্য খুব বেশি কিছু দরকার নেই। শুধু একটু সময়, একটু নীরবতা আর সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকার মতো একটি মন দরকার। আর সেই মন নিয়ে সাতছড়িতে গেলে, বন হয়তো বিদায়ের সময়ও তার পাতার মর্মরে বলে দেবেÑ আবার এসো।





















